» চলে গেলেন আমাদের ‘পাগলা জগাই’

প্রকাশিত: ২৯. জুন. ২০১৯ | শনিবার

বিনেন্দু ভৌমিক

আমি যখন মৌলভীবাজার সদর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করি, তখন কিছু কিছু বিষয় ছিল বেশ গোলমেলে। এরমধ্যে একটা জিনিস ছিল খুব দৃষ্টিকটু— সমস্ত চত্বর জুড়ে ঝোপঝাড় আর জংলা। কোথাও কোনো সাজানো সজ্জা নেই। আর আরেকটা বিষয় ছিল খুব মর্মপীড়াদায়ক ও বিরক্তিকর— আমাদের হেড ক্লার্ক দিনের পর দিন, মাসের পর মাস- অফিসে আসেন না।

আমি সিএস অফিসে গেলে আমার অনুপস্থিত কর্মকর্তা কর্মচারীদের সম্পর্কে যখন জানতে চাওয়া হয়, তখন আমি বিপাকে পড়ি, বিব্রত হই।
বেশ কয়েকবার এরকম পরিস্থিতিতে আমি পড়েছিও। তাকে আমরা ফোনে জানাই, চিঠি দেই, কোন ভ্রুক্ষেপই নেই তার এসবে।

ভাবলাম এভাবে হবে না। একদিন অফিসে উনাকে ডাকালাম। এরপর কয়েক ঘন্টা মোটিভেটিভ স্পিচ দিলাম। আর ওদিকে আমাদের প্রাণাধিক প্রিয় সিএস স্যার ডাঃ সত্যকাম চক্রবর্তীকে বিষয়টা জানালাম। সিভিলসার্জন স্যারও প্রণোদনামূলক ভূমিকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বললেন। স্যারের এহেন পদক্ষেপ ও আমার চাণক্যের চালে হার মানলেন ‘কালীবাবু’।

অফিসে আসতে শুরু করলেন। কাজে মন দিলেন। এমনই সে মনোযোগ, প্রয়োজনে সকাল ছ’টায়ও তিনি হাসপাতালে এসে করেন কাজের তদারকি। হাত দেন পরিচ্ছন্নতার কাজে, হাসপাতালের শোভা বর্ধনে। আমি শুধু আমার চাহিদাটা জানাই। সকালে এসে দেখি আলাদীনের চেরাগের মতো সব মুশকিল আসান। তার এই পরিবর্তনের আমরা ভূয়সী প্রশংসা করি। তিনি আরও ক্ষুরধার হয়ে ওঠেন তার অন্বিষ্ট কর্মে। বাইরের শোভা বাড়িয়ে তার হাত এখন অন্দরের দিকে। ফুলদানি, ঘড়ি— এসবে সজ্জিত হতে থাকে আমাদের রুমগুলো।

আরেকটা বিরল গুণ ছিল মানুষটার। অদম্য সাহসী ছিলেন তিনি। হাসপাতালের ভেতরের অবৈধ বাসিন্দা যারা বহাল তবিয়তে জায়গা দখল করে আছেন যুগের পর যুগ তাদের উৎখাতের ব্যাপারে তার ছিল সাহসী ভূমিকা। হাসপাতালের ভেতরে যদৃচ্ছা প্রতিবেশীদের এঁটোকাঁটা ফেলাটা যখন ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার— তখন তিনি হয়ে উঠতেন রণংদেহী।

আমার আর কালীবাবুর রসায়ন গর্ব করার মতো একটা অভিধায় পৌঁছুতে শুরু করে। কিন্তু সবকিছুর অন্তরালে কালীবাবু ক্ষয়ে যেতে থাকেন। দু-তিনবার অসুস্থও হয়েছেন। ভারতেও চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন। চিকিৎসায় সেরেও উঠেছেন। কিন্তু এই জায়গায় আমাদের মোটিভেশন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়নি।

‘জগাই-মাধাই পাপী ছিল, হরির নামে উদ্ধারিল’— আমাদের জগাইকে আমরা পুরোটা উদ্ধার করতে পারলাম কই!

কাল আবার বুকে ব্যথা উঠলো, এক ব্যথায়ই থেমে গেলো আমার, আমাদের— ‘পাগলা জগাই’, আমাদের ‘বাঘের বাচ্চা’— কালীপ্রসাদ ভট্টাচার্যের দামোদর নদের মতো খরস্রোতা জীবনের আলুলায়িত গতিপথ।

বিনেন্দু ভৌমিক ঃ কবি ও চিকিৎসক


এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪৬০ বার

Share Button

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031