» চামড়া মুল্যের দরপতন, কওমী মাদ্রাসার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র: মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার

প্রকাশিত: ১৩. আগস্ট. ২০১৯ | মঙ্গলবার

সিলেট সুনামগঞ্জ জেলা জগন্নাথপুর উপজেলা ঐতিহ্যবাহি সৈয়দপুর টাইটেল মাদ্রাসা কতৃপক্ষের সিদ্ধান্তে ৭৪০ টি চামড়া মাটিতে দাফন করা হয়।
ইংরেজ বিতাড়নের প্রচেষ্টা ও পরিকল্পনার অংশ হিসাবে ১৮৬৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের এক নির্জন এলাকায় দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সময়ে সাহারানপুর মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করা হয়। দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুসরণে ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠতে থাকে অসংখ্য মাদ্রাসা। এগুলোকে কওমি মাদ্রাসা বলা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেওবন্দ মাদ্রাসার স্বাধীনতাকামী আলেমরা ধর্মীয় সভা-সমিতির মাধ্যমে ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ এবং ইসলামি জাগরণকে উপমহাদেশে টিকিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালান। তারাই তো প্রথম ইংরেজদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিল, স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিল।

১৮৬৭ থেকে ১৯৬৭, এই একশো বছরে বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং পার্শ্ববর্তী আরও কয়েকটি দেশে দেওবন্দি ধারার ৮৯৩৪টি মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলায় যখন দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এ প্রদেশের জনসংখ্যার ৬২.৭% হিন্দু ছিল। দেখা গেছে, দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সময়ে ব্যয় নির্বাহে হিন্দুরাও সহযোগিতা করেছে। কারণ, মাদ্রাসাটি ইংরেজ হঠানোর কর্মসূচি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৭ সালের পরও বহু কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জেলায়। ফলে শুধু বাংলাদেশেই বর্তমানে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ছাড়িয়েছে কয়েক হাজার। ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। ২০১৭ সালে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে-ই-হাদিসকে সরকার স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রির সমমান ঘোষণা করে।

সরকারের অনুদান-সহযোগিতা না নিয়ে, জনগণের সাহায্য-সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে দেড়শো বছর আগে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম দেওবন্দ ও হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসা যেভাবে আজো টিকে আছে, তা বিস্ময়কর ঘটনা। এ এক অনন্য উদাহরণ। দেড়শো বছরের মাথায় তারা স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশে। এটা তাদের অধিকার ছিল। সেই অধিকার দিয়ে এখন কওমী মাদ্রাসার অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার যে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে, তা রীতিমতো দুঃখজনক। কাউকে স্বীকৃতি দিয়ে, তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে যদি অথনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে কেমনে হবে?

কুরবানীর সময় সংগৃহিত পশুর চামড়া কওমী মাদ্রাসার আয়ের প্রধান উৎস। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের কওমী মাদ্রাসার। এটা মাদ্রাসার গরীব-এতিম ছাত্রদের হক। এবার তাদের সেই হকে যেভাবে লাথি মারা হলো, অন্যকথায় কওমী মাদ্রাসার উপর অর্থনৈতিক যে আঘাত হানা হলো, তা সত্যিই ভয়ংকর এক আঘাত। আজ থেকে ১৫ বছর আগেও দেখেছি, গরুর চামড়ার দাম দেড়-দুই হাজার টাকা ছিল। সেই চামড়া এবার কত টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে? সবাই তো জানেন। ১৫ বছর আগে যে চামড়ার দাম দুই হাজার ছিল, সেটা এখন চার/পাঁচ হাজার হওয়ার কথা ছিল। সেটা তো নয়-ই; এমনকি ৪০০ টাকাও নয়। এতে হতাশ হয়েছেন কওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষ। তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। চামড়ার মূল্য এত কমে যাওয়ায় বহু মাদ্রাসার লিল্লাহ বোডিং পরিচালনা করা দুরূহ হয়ে যাবে। হয়তো কর্তৃপক্ষ কোথাও কোথাও লিল্লাহ বোডিং বন্ধ করার চিন্তা করবেন, নয়তো সেসব বোডিংয়ের সিট সংখ্যা কমিয়ে দেবেন। এতে কওমী মাদ্রাসা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাহলে চামড়া মূল্য কমানো কওমী মাদ্রাসার বিরুদ্ধে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র নয় কি? এই ষড়যন্ত্রের সাথে কি শুধু ট্যানারী শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ঠরা জড়িত? ট্যানারী শিল্প বা চামড়া শিল্প কি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে? সরকার দলের সমর্থক বেশির ভাগই লোকই তো এসব শিল্পের মালিক। সরকার তো হস্তক্ষেপ করতে পারতো। করেনি কেন?

তাহলে বিষয়টা কী দাঁড়াল। স্বীকৃতি দিয়ে তাদের খুশি করা হলো, আর অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার এক গভীর পরিকল্পনা নেয়া হলো? স্বীকৃতিতে শুধু তারা নয়, আমরা সাধারণ জনগণও খুশি হয়েছি। কারণ, কওমী মাদ্রাসার সাথে জড়িত রয়েছে এই ভূখন্ডের ইংরেজ বিতাড়নের ইতিহাস। তারা তো লালন করছে ইসলামিক তাহযিব-তামাদ্দুন। তাদের সাথে তামাশা করার মানে কি? এটা কি এরকম যে, ‌‌”তুমি হাকিম হইয়া হুকুম কর পুলিশ হইয়া ধর, সর্প হইয়া দংশন কর ওঝা হইয়া ঝাড়”। হাকিমের অবস্থানে থেকে হুকুম করে স্বীকৃতি দিয়েছেন, দয়া করে পুলিশ হয়ে তাদেরে ধইরেন না। সর্প হয়ে দংশন কইরেন না। দংশন না করলে ওঝা হয়ে ঝাড়ারও প্রয়োজন প্রয়োজন পড়বে না। মাদ্রাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ করেছে। এখনো বিক্রি করে নাই। তাদের অর্থনৈতিক আয়ের এই প্রধান উৎস রক্ষা করার এখনো সময় আছে। দয়া করে, চামড়ার দাম যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসুন। সরকার এ ব্যাপারে দ্রুত এবং ইমার্জেন্সী ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করুক। নয়তো আমরা ভেতরে ভেতরে আওড়াতে থাকবো– ‌’তুমি সর্প হইয়া দংশন কর ওঝা হইয়া ঝাড়’।

লেখক: ডিইউজে সদস্য, কাউন্সিলর বিএফইউজে- আহবায়ক: জাতীয় জনতা ফোরাম ও প্রতিষ্ঠাতা: মাহফুজ উল্লাহ স্মৃতি পরিষদ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৮৭ বার

Share Button

Calendar

August 2019
S M T W T F S
« Jul    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031