» চায়ের উৎপাদন বাড়লেও, শ্রমিকদের জীবনমানের পরিবর্তন হচ্ছেনা

প্রকাশিত: ১৮. ফেব্রুয়ারি. ২০২০ | মঙ্গলবার


পংকজ কুমার নাগ শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি : বাংলাদেশ চা বোর্ড, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি, স্টার্লিং কোম্পানি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ছোট-বড় বাগানসহ সব মিলিয়ে বাংলাদেশে চা বাগান রয়েছে মোট ১৬৬টি । চা-শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রম, উৎপাদনে ভিন্ন কৌশল, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার ও শ্রমিকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, ক্লোন চা গাছের ব্যবহার বৃদ্ধি, চায়ের জমি সম্প্রসারণ, উপকরণের পর্যাপ্ততা ও চা বোর্ডের ব্যাপক নজরদারির কারণে প্রতিবছরই চায়ের উৎপাদন বাড়ছে। গতবছর (২০১৯) চা-শিল্পের ১৬৫ বছরের ইতিহাসে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ চা উৎপাদনের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে ।

বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে উৎপাদিত এ চায়ের পরিমাণ ৯৬.০৭ মিলিয়ন বা ৯ কোটি ৬০ লাখ ৭০ হাজার কেজি । ২০১৯ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ড এর চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ মিলিয়ন বা ৮ কোটি কেজি চা পাতা । উৎপাদনের পরিমান লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১৬.০৭ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৬০ লক্ষ ৭০ হাজার কেজি চা-পাতা বেশি উৎপাদন হয়েছে । 
চা সংশ্লিষ্টরা চায়ের এ বাম্পার ফলনের কারণ হিসেবে চা-বাগানগুলোতে চা শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত, অনুকূল আবহাওয়া, পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকা, খরার কবলে না পড়াসহ সর্বোপরী বাংলাদেশ চা বোর্ডের নজরদারিকে এবারের চা উৎপাদনে নতুন রেকর্ডের কারন হিসেবে মনে করছেন ।
প্রতিবছর চায়ের উৎপাদন বাড়লেও, পরিবর্তন হচ্ছেনা চা শ্রমিকদের জীবনমানের ।

সর্বশেষ ২০১৬ সালে চা-শ্রমিকের হাজিরা (দৈনিক বেতন) ৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০২ টাকা করা হয়েছিলো । এরপর প্রায় ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও আর বাড়েনি চা-শ্রমিকের বেতন । প্রতিদিন ২৪ কেজি পাতা তুললে একজন শ্রমিক পায় ১০২ টাকা । ২৪ কেজির কম পাতা তুললে সেই হারে বেতন কাটা হয়ে থাকে । প্রতিসপ্তাহে এই হাজিরা প্রদান হয়ে থাকে । একজন চা শ্রমিক সপ্তাহে ৬ দিন কাজ করে পায় ৬১২ টাকা । সাথে রেশন হিসেবে আছে সপ্তাহে মাত্র ৩ কেজি আটা । যা বর্তমান বাজারে অতি নগন্য বলেই বিবেচিত । যেখানে একজন মাটি কাটা শ্রমিকের প্রতিদিনের মজুরি ৪ শত টাকা, সাথে খোরাকি (খাবারের টাকা) ৫০ টাকা সেখানে চা শিল্পের একজন শ্রমিক মজুরি পায় ১০২ টাকা । এই বেতন শুধু শ্রমিক পরিবারের সেই সদস্যের জন্যই, যিনি বাগানের কাজে নিয়জিত । যারা কাজে থাকেনা তারা কোন সুযোগ সুবিধা পাননা । প্রতি পরিবার থেকে একজন, কোন কোন পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুইজন চা শ্রমিক হিসেবে কাজে নিয়জিত থাকে । ফলে একজনের রোজগারে শ্রমিক পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করে । বাগানগুলো ঘুরে দেখা যায় বেশিরভাগ শ্রমিকরাই রোগা-সোগা। তাছাড়া বাসস্থানের জন্য দেওয়া হয় অল্প জায়গা ও অসুস্থ হলে দেওয়া হয়ে থাকে ঔষধ, বাগান কর্তৃপক্ষের পক্ষথেকে । শ্রীমঙ্গলে কালিঘাট হাসপাতাল ও শমসেরনগরে ক্যামেলিয়া হাসপাতাল এই দুটি হাসপাতাল চা-শ্রমিকদের সেবা প্রদান করে থাকে । শ্রমিক পরিবারের যে সদস্যরা বাগানের কাজে নিয়জিত তাদের জন্য বাগান কর্তৃক বরাদ্দ এক কামড়া বিশিষ্ট একটি ঘর । ফলে বড় পরিবারগুলো এক কামড়াতেই ঠাসাঠাসি করে বসবাস করে ।

অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যপারটি হচ্ছে নারী শ্রমীকদের মাতৃকালীন ছুটি । সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মাতৃকালীন ছুটি ৬ মাস হলেও চা-বগানে একজন মায়ের মাতৃকালীন ছুটি ১৬ সপ্তাহ (৪ মাস) বলে জানিয়েছেন চা-শ্রমিক সন্তান রুপচান দোষাদ রুপক । তিনি বলেন, “আধুনিক ডিজিটাল যুগে বসবাস করেও আমাদের মায়েরা মাতৃকালীন ছুটি পায় মাত্র ১৬ সপ্তাহ । এটা কি করে সম্ভব ? একজন মা তার সন্তান প্রসব করার পর সেই সন্তানকে ৬ মাস পর্যন্ত বুকের দুধ পান করাতে বাধ্য থাকেন, সেখানে ১৬ সপ্তাহের ছুটি কি করে সম্ভব ? এটি অমানবিক” ।
একজন চা শ্রমিকরা বছরে মাত্র ১২ দিন সিক লিভ (অসুস্থতাজনিত ছুটি) পেয়ে থাকেন । ১২ দিনের উপরে কেউ অসুস্থ থাকলে, সেই ছুটিগুলোর ছুটি গুলোর জন্য হাজিরা (বেতন) কাটা যায় । বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে বাগানগুলোতে অসুখবিসুখ লেগেই থাকে । অনেক চা বাগানেই নেই গভীর নলকূপের ব্যবস্থা । পাহাড়ি গাং (ছড়া) ও প্রাচীন আমলের কুয়ো (কূপ) থেকেই চলে চা শ্রমিকদের পানীয়জলের ব্যবস্থা । ফলে বিশুদ্ধ পানীয়জলের অভাবে প্রতিবছর ডাইরিয়াজনিত অসুখে চা বাগান শ্রমিক কোয়াটারগুলোতে মহামারী আকার ধারণ করে । ফলে, অকালে মৃত্যু হয় চা শ্রমিকদের । 
চা বাগানগুলোতে নেই ভালো রাস্তাঘাট, নেই পানি নিষ্কাশনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা । তাছাড়া চা বাগানগুলোতে চা শ্রমিকদের জন্য নেই উন্নত সেনিটেশন ব্যবস্থা । এখনও চা শ্রমিকরা কুয়া পায়খানা ব্যবহার করে । তাছাড়া অনেক শ্রমিক চায়ের বাগানের ভেতর খোলা স্থানে মলত্যাগ করে থাকেন । এতে কর্তৃপক্ষের নেই কোন  মাথাব্যথা । তাদের প্রয়োজন শুধুই চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধি । 

বর্তমান সরকারের আমলে চা বাগানগুলোতে অনেকগুলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে । এতে চা শ্রমিকদের সন্তানরা প্রাথমিক শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করলেও ঝড়ে পড়ছে মাধ্যমিক পর্যায়ে । কারন বাগানগুলোতে নেই কোন মাধ্যমিক বিদ্যালয় । মাধ্যমিক পড়তে হলে শহরে আসতে হয় অথবা মাইলের পর মাইল দূরে গিয়ে পড়তে হয় । ফলে বেশিরভাগ চা শ্রমিক সন্তানই অশিক্ষিত থেকে যায় । 
চা শ্রমিকরা প্রতি বছর ৩ হাজার টাকা করে দুইবার বোনাস পেয়ে থাকেন । একটি বোনাস দেওয়া হয় শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় ও অপর বোনাসটি দেওয়া হয় দুল পূর্ণিমার সময় । এছাড়া সারা বছরে তারা বাগান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আর কিছুই পায়না । তবে সরকার ও বিভিন্ন সামাজিক সংস্থা, বিভিন্ন সময় চা বাগানগুলোতে নিত্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রী, শীতবস্ত্র ও কম্বল বিতরন করে থাকেন ।
একজন চা-শ্রমিকের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা এনালাইসিস করলে দেখাযায়, একজন শ্রমিক প্রতি মাসে বেতন পায় ২৪শত ৪৮ টাকা, খাওয়ার জন্য ১২ কেজি আটা । এই বেতনে একজন শ্রমিকের পরিবার নিয়ে জীবন যাপন করা খুবই কষ্টকর । ফলে তারা জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসায় । বাগানের শ্রমিক জনগোষ্ঠীর একটা বৃহদাংশ বগানের বাইরে কাজ করে, রিক্সা চালায়, বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে, মাটি কাটে, চৌকিদারি করে এবং আরো বিভিন্ন কাজ করে । চা বাগানের চা শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি করে বাগানের বাইরে কাজে যাওয়া শ্রমিকদের, চা বাগানের কাজে ব্যবহার করতে পারলে চায়ের উৎপাদন আরো বাড়তে পারতো বলে মনেকরেন কালিঘাট ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান প্রানেশ গোয়ালা । 
বর্তমানে চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে। বর্তমান সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে চায়ের উৎপাদন ১৪০ মিলিয়ন কেজিতে উন্নীত করতে “বাংলাদেশের চা শিল্পঃ উন্নয়নের পথনকশা” শিরোনামে পরিকল্পনা গ্রহণ করে কাজ করে যাচ্ছেন । এর সাথে যদি চা শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি, বাৎসরিক বোনাসের পরিমান বৃদ্ধি, মাতৃকালীন ছুটি বৃদ্ধি, বিশুদ্ধ পানীয়জলের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন, উন্নত সেনিটেশন ব্যবস্থা, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য দৃষ্টিপাত করেন এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ব্যাক্তি মালিকানা বা কোম্পানি মালিকানা বাগান সমূহকে সম্পৃক্ত করতে পারেন তাহলে চায়ের উৎপাদন ২০০ মিলিয়ন কেজিতে উন্নিত করাও সম্ভব বলে মনেকরেন চা-শ্রমিকরা ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২২০ বার

Share Button

Calendar

April 2020
S M T W T F S
« Mar    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930