» চিকিৎসা বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরুন

প্রকাশিত: ১৭. জুলাই. ২০২০ | শুক্রবার


খছরু চৌধুরী

ঘটনাটি বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ বাংলাদেশে আক্রমণের মাস দু’য়েক আগের। আমার এক বন্ধু ফিজিওলজিক্যাল নানা অজানা সমস্যা আর গ্যাস্ট্রিকের পেইনকে হার্টের অসুখ মনে করে ভয় পায়। চিকিৎসা নিতে ভর্তি হয় সিলেটের ‘মাউন্ট এডোরা’ নামের সরকার নিয়ন্ত্রণাধীন বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে সাত দিন চিকিৎসা নিতে বাধ্য করা হয় তাঁকে। বিল আসে ৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। অনেক দেন-দরবারের পর ২ লাখ কমিয়ে ৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা অর্থদন্ড দিয়ে ছাড়া পায়। পরবর্তীতে ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা পরামর্শ প্রদানকারী বিশেজ্ঞরা তাঁর হার্টের অসুখ খুঁজে পাননি। আজও সে ভালো আছে। তাঁর শরীর- স্বাস্থ্যের বর্তমান অবস্থা দেখলে যে কেউ বলবে শুধু গড় আয়ুষ্কাল নয়, সে আরও অনেক বছর বাঁচবে।

দ্বিতীয় উপসর্গটি গতকালের ডিবিসি’র টিভি নিউজ এবং এই কয়েক দিনের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক খবর। জনস্বাস্থ্যের জালিয়াতি নিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের আওয়ামী ব্র্যন্ডেড সাহেদ-কর্ম আর জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন সাবরিনার খবরে অনেক খবর-ই যেখানে হারিয়ে যায় – সেখানে ডিবিসির এই খবরটি যেন আমার উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হেলথ এর ডিজি পড়েছেন মহা-ফ্যাসাদে, যত দোষ যেন বেটা নন্দ ঘোষের! আর যেন সবাই দুধে ধোঁয়া পবিত্র তুলসি পাতা! সে যাই হোক, লুকিয়ে থাকা ঘাতক করোনাভাইরাসের অপ্রত্যাশিত আক্রমণে উন্নয়নের সকল সূচক যে বাধাগ্রস্ত হবে – এটা সুস্পষ্ট ছিল দেশের সরকার প্রধানের সংসদ বক্তৃতায়। সরকার ও দেশের কর্ণধার হিসেবে সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর গৃহিত কর্মসূচির সাথে সরকার পরিচালনার সহযোগি মন্ত্রী, আমলা ও ব্যবসায়ীরা কেমন ভূমিকা রাখছেন এবং কতটা আন্তরিক রয়েছেন এর মূল্যায়ন করতে জনগণ ভুল করবেনা।

এই কোভিড-১৯ শুধু আমাদেরকে নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। দুনিয়ার মানুষ এতদিন যে আমেরিকা রাষ্ট্রকে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, মারণাস্ত্রে শক্তিধর মনে করে আসছে, কোভিড-১৯ নিয়ে সেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টের উল্টাপাল্টা বক্তব্য আর জনগণের অসহায়ত্ব এবং এর বিপরীতে ছোট্ট রাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক কিউবা করোনাভাইরাস মোকাবেলায় ইউরোপে চিকিৎসক-নার্স পাঠিয়েছে। আমাদের পরে স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্র ভিয়েতনাম কোভিড-১৯ প্রতিরোধের সফলতায় পৃথিবীর বড় বড় রাষ্ট্র-শক্তিকেও নির্বাক করে দিয়েছে – এইসব সম্ভব হয়েছে রাষ্ট্রের সাথে তার জনগণ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্পর্ক, দেশপ্রেম, আইন-বিধির প্রতি শ্রদ্ধা ও সরকারের প্রতি আনুগত্যের উপর ভিত্তি করে। আমাদের দেশেও কোভিড-১৯ এর আক্রমণ না-হলে দীর্ঘ কয়েক যুগ থেকে আইন-বিধি-নীতিমালা লঙ্গন করে পরিচালনা করা অনৈতিক চিকিৎসা বাণিজ্যের বণিকদের সাথে রাষ্ট্রের উচ্চ আসনে আসীন রথি-মহারথিদের কি কি সম্পর্ক রয়েছে তার খোঁজ-খবর জনগণ রাখতেন কি? চিকিৎসা বাণিজ্যের দুষ্টচক্রের নিয়ন্ত্রক চিকিৎসা বণিকেরা কতটা অমানবিক ছিল – দেশের মানুষ আজ তা প্রত্যক্ষ করেছেন।

যে দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিঃসংকোচে বলেন, এসব চুক্তির বিষয়াদি পড়ে দেখার মতো সময় মন্ত্রীদের নেই, দূর্ভাগ্য কিংবা সৌভাগ্যক্রমে আমরা এই দেশেরই নগরিক। নিখাদ সত্য বলার কারণে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে আমি ধন্যবাদসহ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। মাননীয় মন্ত্রীরা প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন জনগণের স্বার্থরক্ষার সাংবিধানিক শপথ নিয়ে। কিন্তু চুক্তি না পড়ে-পড়ে সই-স্বাক্ষরের ফলে প্রজাতন্ত্রের মালিক প্রজারা চিকিৎসা বাণিজ্য আর চিকিৎসা বণিকদের খেয়াল খুশির পণ্য ও গিনিপিগে পরিণত করেছেন গোটা জাতিকে। চুক্তি পড়ে দেখার সময় না থাকার কারণে আমলারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের বিনিময়ে জনগণের কষ্টার্জিত টাকা বেহিসাবি নিয়মে কিছু সংখ্যক অমানুষ চিকিৎসা বণিকদের হাতে তুলে দেবার সুযোগ করে দিয়েছেন। ডিবিসি’র নিউজ থেকে জানা গেল, কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার জন্য কুমিল্লার ফরটিস হাসপাতাল সরকারের কাছে ১০ বেডের অাইসিইউ’র ২২ দিনের চিকিৎসা ব্যয় চাহিত হয়েছে ৫ কোটি টাকা(?)। মাননীয় মন্ত্রী আপনি তো ট্র্যাজারী বেঞ্চে, প্রশ্নটা আপনাকেই করছি, টাকা কি গাছে ধরে?

দেশের একশ্রেণির জ্ঞানপাপীরা বলে থাকেন, মুক্ত অর্থনীতির নিয়মে চিকিৎসা বাণিজ্যও অবাধ থাকবে৷ দুনিয়ার কোন এমন দেশ আছে, যেখানে নাগরিকের বেঁচে থাকার মৌলিক মানবিক অধিকার গুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রেখেছে; একটিও নেই। এমন হলে, জনগণ টেক্স দিয়ে, আনুগত্য দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র টিকিয়ে রাখার কোন মানে থাকে কি? রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হয়। চুক্তি না পড়ার সুযোগ নিয়ে সরকারের ছাড় পেয়ে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা হাজার হাজার বেসরকারী চিকিৎসা কেন্দ্র, প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ এগুলো পরিচালনার মান নিয়ে প্রশ্ন উহ্য রাখলেও এগুলো যে টাকার জন্য এক-একটা গলাকাটা কসাই খানায় পরিণত হয়েছে এবং কোভিড-১৯ এর আক্রমণকে তারা সর্বনাশ না ভেবে পৌষ মাসের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে – তার কারণ কি?

আমাদের মনে রাখতে হবে, জাতীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বেসরকারি অংশীদার-উদ্যোগক্তা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান গুলো কভিড-১৯ দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রথম দিকে পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। জনবলসহ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও জনগণকে রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিল সরকারি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান গুলো। এখন আবার সরকার ঘোষিত প্যাকেজগুলো আত্মসাৎ করার ধান্দা নিয়ে চিকিৎসা বাণিজ্যের বাজারে দখল নিতে মরিয়া হয়েছে। রিজেন্টের সাহেদ করিম আর জিকেজি’র ডাঃ সাবরিনাদের অপকর্ম ধরা পড়েছে – অন্যদের অনেক অপরাধ কর্ম এখনো গোপন রয়েছে – তফাৎ এই – ই।

শুধু দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি নয়, মাননীয় মন্ত্রীরা যে নিজের দপ্তর পরিচালনা করার নিয়ম-নীতির বিধি- বিধান পড়ে দেখে জ্ঞাতসারে কাজকর্ম করেন এমন নজিরও নেই। একটা উদাহরণ দিয়ে লিখাটি শেষ করতে চাই। অর্থাৎ চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়মে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কর্মপদ্ধতি পরিচালনা করার নীতিমালা ও অাইন-বিধি থাকলেও মন্ত্রীদের অদক্ষতার কারণে তা অনুসরণ করা হচ্ছে না। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নীতির পূর্বশর্ত ভারসাম্যপূর্ণ স্বাস্থ্য-জনবল। ১৯৭৩ সালের পর হতে কমিউনিটিতে ২৪ ঘন্টা অবস্থান করে সংক্রামক-অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধে কাজ করবে, জনগণকে নিরন্তরভাবে সংক্রামক রোগপ্রতিরোধের স্বাস্থ্য শিক্ষা দেবেন ও মেনে চলতে বাধ্য করাবেন তদ্রূপ স্বাস্থ্য জনবলের একটি পদও বাড়ানো হয়নি। নীতিমালা অনুসারে ১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন নার্সেস এবং ৫ জন মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট নিয়োগের বিধান মানা হয়নি। দেশে এখন সরকারি চিকিৎসকের সৃজিত পদের সংখ্যা ৫৮ হাজারের অধিক হলেও নার্সেস ও মিডওয়াইভসদের সংখ্যা ৫০ হাজার হয়নি এবং মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্টদের সংখ্যা মোটে ৭ হাজার! অার এই টেকনোলজিষ্টদের অভাবে দেশের সরকারী হাসপাতালের বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন টাকার রোগনির্ণয়ের মেশিনারিজ অকেজো পরে রয়েছে, মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে। মানুষ সেবা বঞ্চিত হচ্ছে। এটি শুধু জনবল ব্যবস্থাপনার বিষয়ে মন্ত্রী-আমলাদের অজ্ঞতা বা অদক্ষতা নয়; প্রকৃতপক্ষে এটি হলো – বেসরকারি চিকিৎসা বাণিজ্যের স্বার্থে সরকারী চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম অকার্যকর করে রাখার একটি ষড়যন্ত্র। স্বাস্থ্য প্রশাসনের টপ টু বটম এই ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত। শেখ হাসিনার সরকার দ্বারা হক ও এডহক পদ্ধতিতে হাজারে-হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছেন, আরো দিলেও সরকারি স্বাস্থ্য সেবায় জনগণের সন্তোষ্টি অাসবেনা। কারণ – সর্ষের মধ্যে ভূত ঢুকে পড়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এখন সব করতে হয়, তিনিই সব করছেন। পাইক পেয়াদা অনেকে যারা আছেন তাদের অনেকেই দেখছি এখন শিবের পুতুল এবং নিজের আখের গুছানোয় ব্যস্ত থাকুন বা না-থাকুন – উল্টাপাল্টা কথা বলে সরকারের সুনাম ক্ষুন্ন করছেন। আমার নাগরিক অধিকার নিয়ে বিনয়ের সাথে স্পষ্ট করে বলতে চাইছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সরকারী স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার উপর ভরসা রাখুন এবং সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জনবল ভারসাম্য ফিরিয়ে এনে দেখুন মানুষ কতটা সন্তোষ্ট হয়। তার পাশাপাশি চিকিৎসা বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরুন। কারণ – টাকা গাছে ধরে না; জনগণের শ্রমে-ঘামে উৎপাদন বাড়লে প’রে টাকা সৃষ্টি হয়।

লেখকঃ স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট ও উপদেষ্টা, স্বাসেপ।
ই-মেইলঃ mkmchowdhury@gmail.com

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫৭৯ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031