শিরোনামঃ-


» জীবনের গল্প

প্রকাশিত: ১৩. আগস্ট. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

কাজী কনক সিদ্দিকা

মনে আছে, প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল । মিরপুর সাড়ে এগারো থেকে মাছ নিয়ে আসা হয়েছিল । ১৯৮৪ সন, কালো কালো ক্যামেরার যুগ,এই ছবিটা তুলেছিলেন আমার মরহুম খালাত ভাই বাবুল ভাই।
কোনো দিন মাছ কাটে কী করে জানতাম না । ১৯৭৬ সালে বিয়ের পর
শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে শিখেছিলাম মাছ কাটা।
আমাদের ছোট্ট একটা বাবা মা আর তিন বোনের সংসার,বাবা পিয়ন চাচা ইকবাল কে নিয়ে বাজারে যেতেন,চটের ব্যাগে করে মাছ তরকারি আনতেন,
সেই মাছ কাটতো শিরিন নামের একটা কাজের মেয়ে নতুবা দাড়োয়ানদের বউরা,মা কে দেখতাম
ধোয়ার সময় ফাইনাল তদারকি করে রান্না করতেন।
মানুষ কম আর তখনকার দিনে সবাই রোজকার বাজার সম্ভবত রোজই করতো,বাবাকেও দেখতাম খুব সকালে বাজার করতেন নতুবা অফিস থেকে এসে বিকালে।
কিন্তু যখন বিয়ে হলো আমার শশুর বাড়ি যেহেতু গ্রামে আমার ও যেতে হতো গ্রামে,সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা ঢাকার পুরানো এয়ারপোর্টে ছিল তখন বাসস্ট্যান্ড সেখান থেকে ঝকর ঝকর করে গাজীপুর তারপর রথখোলা ঘাট থেকে তিলশুনিয়া গ্রামের উদ্দেশ্যে নৌকায় চড়া,
একটা কাহিনী না বললেই নয়, শশুর আব্বা ছিলেন বেশ স্বনামধন্য ব্যক্তি, উনি ডাক্তার এবং চেয়ারম্যান ছিলেন তাই বড় বড় নৌকা মাঝিরা ওনাকে নৌকায় ওঠানোর জন্য কাড়াকাড়ি লেগে যেতো,আমি বেশ উপভোগ করিতাম বিষয় টি,


নিজেকে খুব দামী মানুষ মনে হতো,বয়সের দোষ আর কি, মাত্র চোদ্দ পেরিয়ে পনেরো তে পা রেখেছি,
মাঝি নৌকা পাটাতনে চাদর বিছিয়ে দিত আমি গুটিশুটি মেরে ঠিক মাঝখানে বসে পরতাম,আব্বার সাথে গেলে আব্বা মাঝে মাঝে ভিতরে আসতেন নতুবা ছৈ এর বাহিরেই থাকতেন,
সে কী নৌকার দোল আর বৈঠার কচর কচর শব্দ,
পানিতে বৈঠা ফেলার শব্দ টা কেমন যেনো লাগতো মনে হতো বৈঠার সাথে হীমেল একটা বাতাস শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।আর সেই জার্নি গুলো ছিল কখনো আট ঘন্টা কখনো দশ ঘন্টা এখন যেটা এক ঘন্টা বা তাঁর চেয়ে কম।
বেলাই বিল নামক জায়গায় আসার আগেই আমি ঘুমিয়ে পরতাম,
মনে হতো আমি পানির উপরের নাগর দোলায় চড়েছি ।
বেলাই বিল পার হলেই টিফিন কেরিয়ার করে আনা ভাত বাবা আমি অথবা বাবুল সাহেব খেতে বসতাম,
বিলের পানিতে ধোঁয়া বিলের পানি পান করা কোনো ব্যাপারই ছিল না,সে কী স্রোত মাঝে মাঝে ঝড়ের মধ্যেও পরতাম,গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকতাম,লুকিয়ে কাঁদতাম ও।
যাই হোক্ বাড়িতে পৌছাতে হতো শরীরের পাঁজর ভেঙ্গে,
শশুর বাড়ি ধপ্ করে শুয়েও পরা যায় না,ঘাট থেকে শুরু হতো বাড়ির ভেতর পর্যন্ত বৌ দেখার হিড়িক,চুল টান মেরে খোঁপা খুলে একজন মুরগ্বী বলে উঠলো,এ মা আমি তো ভাবছিলাম গুছি দিয়া খোঁপা করছো এ মা এত্ত বড় চুল!শাশুরী কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো বাবুলের মা’র খবর আছে কয় ডিব্বা তৈল লাগবো বুঝবা নি,
পাশ থেকে অনেকটা কর্কশ গলায় বলে উঠলো
আফনের যে কতা, হে গো কম আছে নি?
এদিকে আমার দফা রফা,ক্ষুধা, ব্যথা, ঘুম সব মিলিয়ে ভীষণ কষ্ট লাগছিল কিন্তু কী আর করা বউ ১৪ হোক আর ২৪হোক বউ তো বউ ই।
তাদের নানা ধরনের ফর্মালিটি শেষে আমাকে ফ্রেস হওয়ার সুযোগ করে দিলো।আমার সাথে একে একে পরিচয় করিয়ে দিল ভাটপাড়ার ফুফু,ভাকোয়াদির ফুফু,কালিগঞ্জের ফুফু,কাকা, কাকী,প্রায় দুই ডজন ননদ দেবরদের সাথে,এত্ত মানুষ আমি বিয়ে বাড়ি ছাড়া কখনো একি বাসায় দেখি নাই,
তার উপর আয়মন,রয়মন,মরি,হাইয়াল,চানু,মতু,আয়ে, সামসু,এরা সবাই এই চেয়ারম্যান বাড়ির কামলা মূনি, পুব বাড়ির জেঠি, গোলাপী বু ইত্যাদি ইত্যাদি সব মনেও নেই,গম গম বাড়ি ভর্তি মানুষ।
বাবুল সাহেব আর শশুর ছাড়া কাউকে তেমন চিনিও না, পানি পিপাসায় গলা শুকিয়ে গেছে নাকি ভয়ে বুঝতেও পারছিলাম না।
অতি আপনজন যিনি তিনিও নেই হায় আল্লাহ্ কী করি,
সম বয়সী ননদটাকেই বললাম পানি দিতে, এ মা চাপ কলের পানি তার স্বাদটাও কেমন আলাদা আলাদা, বাবুল সাহেব উধাও মনে মনে খুঁজছি কিন্তু উনিতো ফেরেস্থা নয় যে বুঝবে আমি খুঁজছি,অভীমানের বয়সই তো ছিলো ওই বয়সটা,
ভেতরে ভেতরে ফুলছিলাম কিন্তু আমার স্বভাব টা ছিলো একটু চাপা তাই চেপে যেতাম সব কিছুতে,ঘুটঘুটে অন্ধকার হারিকেনের আলো কে মনে হতো জোনাকি পোকার আলো,আমার স্পষ্ট মনে আছে অমাবস্যা ছিলো সেদিন আমাকে যে ঘরটাতে থাকতে দিয়েছিলো তার দোতলা স্টাইলের একটা কাঠের জানালা ছিল ওদিকে একটা উঠোন আর তার পাশেই একটা বিশাল তেঁতুল গাছ,কেউ একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম অন্ধকারে দেখা যাচ্ছিল না তেমন কিন্তু মনে হচ্ছিল অন্ধকারের নীচে আরেকটা ঝোপড়ানো অন্ধকার যা ঠিক কেমন যেনো একটা অন্য রকম অন্ধকার,
জানালা বন্ধ করবো তারও উপায় নাই কারন গরম লাগে,এরপর খাওয়ার পালা চোখে দেখি না কী খাবো?
পেটের ক্ষুধা লাগলে বিষ ও খাওয়া যায়, অন্ধকার এতটাই বেশি লাগছিল যে কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে খেলাম,ফেনের নিচে ঘুমানোর অভ্যাস কী আর করা জানালার ভেতর দিয়ে থেমে থেমে আসা বাতাসেই ঘুমিয়ে গেলাম,
কাকডাকা ভোরে গরুর হাম্বা হাম্বা আর
পাখির ডাক তার উপর চাপ কলের কচর কচর শব্দ কঠিন এক নতুন সকাল,চোখ খুলে দেখি পাশের মানুষ টিও নেই জানালা দিয়ে তাকাতেই দেখি উনি আধা হাত লম্বা একটা লাঠি দিয়ে মহা আনন্দে দাঁতের সেবা করছেন,
হাইয়াল আমাকে একটা কাঠি এনে দিলো আর বল্ল ভাবী এই লন মটকিলার ডাইল দাঁত মাজেন কলপারে পানি দেওয়া আছে,
আমি কী করবো বুঝতে না পেরে আমার বিয়ের সুটকেসটাই ছিল ভ্রমন সঙ্গী ,ওটা খুলে টুথপেস্ট আর ব্রাশ বের করে দিক নির্দেশনা অনুযায়ী কলপারে গেলাম,হাত মুখ ধুয়ে খাবারের ঘরে ডাইনিং টেবিলে বসলাম,
ভাপা পিঠা,চাউলের শেমাই, জাউ, ভাত,ভর্তা,মুড়ি, গুড় আর গুরের জিলাপি দিল খেতে ,আমি এখানেও ধাক্কা খেলাম,এসব নাস্তা তো আমরা খাই না আমরা রুটি পরাটা ডিম চা এ ধরনের হাল্কা পাতলা নাস্তা খেয়ে অভ্যস্ত,
অতঃপর লজ্জা নিয়ে অল্প কিছু খেলাম,দাদী শাশুরী নিয়ে এলো এক বাঁটি কীযেনো উনি খুব সুইট ছিলেন আমাকে বললেন এই যে ককন নেও এলা কুমর পলা দিয়া গরম গরম ভাত খাও,মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাকে ককন বলেই ডেকেছেন।
এখানেও ধাক্কা খেলাম পলা কী?গাজীপুরের ভাষায় ঝুরো করে কোনো কিছু কেটে ভাজি করলে তা কে পলা বলে,আমি খেলাম না পেট ভরা বলে কোনো রকমে রক্ষা পেলাম,
আমি যথারীতি সেজে গুঁজে বসেছি শাশুরী আম্মা একটা নয় দশ মাসের বাচ্চা এনে কোলে দিয়ে বললেল নেও এই বাচ্চা টা তোমার পালতে হবে,সে আমার সাত ননদের সর্ব কনিষ্ঠ ননদ,
পায়ের নীচে কী যেনো গরম গরম লাগছিল তার পর যা হবার তাই হলো ননদীনি ভাবী বরণ করলো ভিজিয়ে,
একটা সিলসিলা নামের সুন্দর শাড়ি পরেছিলাম বিয়ের উপহার স্বরূপ পেয়েছিলাম এখনো মনে আছে আকাশি রংয়ের হাল্কা ছাপ ছাপ আর পুরো বডিতে সাদা জরির লাইন লাইন ডোড়া কাটা,
লজ্জায় বলতেও পারছি না আমি ভিজে গেছি,অই অবস্থায় কতক্ষণ ছিলাম আল্লাহ্ জানে কিন্তু মনে আছে কাপড় টা শুকিয়ে গিয়েছিল ন্যাচারাল ভাবেই,
তারপর এগারো টার দিকে আমার বর, মতু,হাওয়াল,আয়ে কাকা সবাই মিলে উঠোনটা ভরে ফেল্ল মাছ আর মাছে,হায় হায় এত্ত মাছ!!!
জীবনে একসাথে দেখি নাই নানু বাড়ির নদীর পার ছাড়া,
ওদের ভাষায় বলে ডেঙ্গা সেই ডেঙ্গা সেচে এত মাছ পেয়েছে বলার বাহিরে,আব্বা রুগী দেখে উঠোনে এসে এমন এখটা উত্তম কুমারের মতো হাসি দিলেন আর জোরে জোরে বলে উঠলেন
এই মাছ কনক মায়ের ভাগ্যে এসেছে এ পর্যন্ত না কি এত মাছ কেউ দেখে নাই,
এত বড় বড় কৈ,মাগুর,মেনি, বোয়াল, নলা,শৈল,টাকি, রুই,কাতলা,ছোট মাছের মধ্যে পুঁটি টেংড়া বইচা তাঁরা বাইম,পাথির পাথি, তারপর এলো বাঁশে ঝুলিয়ে বড় বড় মাছ,এখনো ভাবলে অবাক হয়ে যাই,দিনগুলি কোথায় হাড়ালো?
যাই হোক শশুর মশাই চেয়ারম্যান হওয়ার কারনে লিবারেশনের পরে পরে রিলিফ দিতো গ্রামে আর সেই বিস্কুটের টিনে জাগ দিয়ে রাখতো জিয়ল মাছেদের,
হাউজ ও ছিল মাছের এছাড়া বড় বড় ডেকচি আর ড্রাম তো আছেই,সুনসান রাতে মাছের দাপাদাপিতে সে কী এলাহী কান্ড,
একটা মাগুর মাছ কখনো কেটে রান্না করতো না, মাছকে গোল গোল করে কেঁচে সর্ষে তেলে মচমচে করে ভেজে দিতো একটা ভাতের প্লেট ভরে যেতো,মাংসালো মেনি মাছ ,ছোট মাছের চর্চরি, গুত্তুম মাছের ভূনা, লকলকে ডাটা দিয়ে বড় মাছের ঝোল,বড় বড় শৈল মাছের ভুনা, আরেকটা করল্লা দিয়ে শৈল মাছের ভুনা,মাথার মুড়িঘন্ট ইত্যাদি ইত্যাদি,
সেই উঠোনে কম করেও সাত আটজন বসে গেলো মাছ কুটতে, ফুফু শাশুরী বলে উঠলো নতুন বউয়ের মাছ কুটতে হবে আল্লাগো এখন কী উপায়?জীবনে কোনো দিন মাছ কাটি নাই ইজ্জতের ব্যাপার,
বসে পরলাম সবার সাথে বেছে নিলাম পুঁটি মাছের ঢিপি একটু বুদ্ধি খাটিয়ে অন্যের কাটা দেখে আমিও কাটা শুরু করলাম,প্রথম জীবনে পুঁটি দিয়ে শুরু,সবাই দশটা কাটে আমি একটা,
এভাবেই প্রশিক্ষণ চললো বহু দিন,
এক সময় মাছ কেটে কেউ পারতো না আমার সাথে, এখন কেচী ছুরি বঁটি সব দিয়ে কাটতে পারি,
যত বড় মাছই হোক না কেন আমি সেদিনের পর থেকে আর কখনো পিছ পা হই নাই,বরঞ্চ মাছ দেখলেই উৎসব উৎসব লাগতো,জীবনের গল্প শেষ হবার নয়, মাছের গল্পেই না হয় আজকে থেমে যাই পরে আবার কোনো ছবির সাথে স্মৃতির সংমিশ্রণ ঘটলে লিখবো,এটা ১৯৮৪ সনের ছবি বিয়ের আট বছর পরের ছবি ততদিনে আমি মাছ কাটাতে উচ্চতর ডিগ্রিধারী,
আসলে কাজ শিখার একটা প্লাটফর্ম প্রয়োজন যা আমার জন্য ছিলো আমার শশুর বাড়ি।অত বড়ই প্লাটফর্ম ছিলো যত বড় হলে মানুষ কখনো পিছলে পরে পা ভাঙ্গে না।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের কাছে শুকরিয়া আমি পেরেছি আমাকে দেওয়া কঠিন জীবন পাড়ি দিতে ,এখন মনে হয় আগেই তো ছিলাম ভালো কিছু অন্ধকার কিছু আলো।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৬৬ বার

Share Button