» জীবনের টানাপোড়েন

প্রকাশিত: ২০. মার্চ. ২০১৯ | বুধবার


শেলী সেনগুপ্তা
পিয়ারসন এয়ারপোর্টে বসে আছে বিজয়া। ফিরে যাচ্ছে কানাডা থেকে। দীর্ঘদিন ছিলো টরন্টোতে। প্রায় ছয়মাস ছিলো ৩০,ডেনটন এভিনিউতে। বিজয়া এসেছিলো একশত দিনের ভিসা নিয়ে। কিন্তু ঘটনার প্যাঁচে সাতমাস থাকতে হলো।
বিজয়া কলেজে পড়ায়। শিক্ষকতাকেই জীবনের আদর্শ করে নিয়েছে। পরিবারের বড় সন্তান, কোন ভাই নেই। তাই বাবামা আর ভাইবোনদের দেখাশুনা করে নিজের সংসার এর কথা ভাবার সময় পায় নি।। ছোট দু’বোনের বিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন, মা মারা গেছে। বেশ কিছুদিন পর বাবাও মারা যান। বিজয়া এখন ঝাড়া হাতপা।
বাংলা পড়ায়। একা মানুষ, তাই কলেজে অনেক সময় দিতে পারে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো বিজয়ার দায়িত্বে পরিচালিত হয়। রাগী কিন্তু নিবেদিত শিক্ষক হিসেবে সুপরিচিত।
সহকর্মী অলক, বিজয়ার সাথে খুব ভালো সম্পর্ক। বিজয়ার চেয়ে বেশ কয়েক বছরের ছোট। অলক ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সাথে জড়িত। কর্মজীবনে এসেও এর বাইরে যেতে পারলো না। তাই সরকারী চাকরি হলোনা। বেসরকারী কলেজে পড়াচ্ছে। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র, এখন ইংরেজির শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের মধ্যে খুব প্রিয় এক ব্যক্তিত্ব।
অলক সবসময় চেষ্টা করে বিজয়ার সব কাজের সাথী হতে। বিজয়ার একাকিত্বকে ভরিয়ে দিতে। কানাডা আসার আগে সারাক্ষণ সাথে ছিলো। কেনাকাটা করা, ব্যাগ গুছানো এবং এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেয়ার সব দায়িত্ব পালন করেছে। বিজয়াকে পৌঁছে দিয়ে শেষবার হাত নাড়ার সময় কী অলকের চোখে জল ছিলো? পকেট থেকে রুমাল বের করেছিলো নাড়ার জন্য কিন্তু তা চোখ পর্যন্ত উঠেই থেমে গেছে।

      ছোটবোন জয়া থাকে কানাডা, প্রবাসী ছেলেকে বিয়ে করে পাঁচ বছর আগে কানাডা চলে এসেছে। জয়ার স্বামী শমীত খুব ভালো ছেলে। ডিভি পেয়ে প্রথমে আমেরিকা আসে, অনেক দিন থাকার পর আর ভালো লাগলো না। কাজকর্মও খুব একটা ভালোভাবে করতে পারছিলো না। তারপর বন্ধু রোহান এর পরামর্শে কানাডা চলে আসে। বন্ধুটি অনেকদিন থেকে কানাডাতে আছে। শমীত এসেই বন্ধুর সাথে ব্যবসা শুরু করলো। দুই বন্ধু যেন হরিহর আত্মা। খুব পরিশ্রম করে। অল্প দিনেই বেশ গুছিয়ে নিয়েছে। তারপর দেশে গিয়ে জয়াকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। বিয়ের ব্যাপারে রোহানের কোন আগ্রহ নেই। শমীত বা জয়া কিছু বললে হাসে আর বলে, ‘ হবে , সময় হলেই হবে, এতো তাড়া কিসের?’ কিন্তু সময় আর হয় না।
     রোহান আর শমীত পাশাপাশি ফ্ল্যাট কিনে বসবাস করছে। ভালোই আছে। ছুটির দিনে লংড্রাইভে চলে যায়। অন্যসময় কাজে ব্যস্ত থাকে। জয়াকে বোনের মতোই দেখে। ওদের দেখে মনে হয় এক পরিবার।
    জয়া মা হবে। নানা ধরণের সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিন্তু দেখাশুনা করার কেউ নেই। বিজয়া বরাবরের মতো মায়ের দায়িত্ব পালনে উদ্যোগী হলো। কলেজ থেকে লম্বা ছুটি নিয়ে কানাডা চলে এলো। যতটা পারে জয়াকে দেখাশুনা করে, রান্নাবান্না আর নিজের লিখালিখি নিয়েও সময় কাটায়। মাঝেমাঝে রোহান আসে। সবাই মিলে হৈ হৈ করে গল্প করে। ছুটির দিনে ওরা লংড্রাইভে যায়। 
     আজকাল রোহানের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সে এখন যতটুকু পারে তাড়াতাড়ি ফেরে, ফিরেই চলে আসে শমীতের বাসায়। জয়ার সাথে গল্প করে। বিজয়ার বানানো কফি উপভোগ করে। ইদানিং সাহিত্য নিয়েও আগ্রহ দেখায়। শমীত মিটি মিটি হাসে। মাঝে মাঝে জয়ার সাথে চোখাচোখি করে। 
      বিজয়াও খুব উপভোগ করে রোহানের সান্নিধ্য। কখনো কেনাকাটা থাকলে রোহানের সাথে চলে যায়। অনেকটা সময় কাটিয়ে টিম হাটন এ কফি  পান করে ফিরে আসে। অনেক সময় জয়া নিজেকে কাজে ব্যস্ত রেখে ওদের কথা বলার সুযোগ করে দেয়। শমীতও নানা উছিলায় বাইরে চলে যায়। 
     রোহান আর বিজয়া দীর্ঘ সময় গল্পে মশগুল হয়ে থাকে। আলোচনা এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে চলে যায়। রাত গভীর হয়, কখনো কখনো সকাল হয়ে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আলো দেখে রোহান লজ্জা পায়। বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরে যায়।

      জয়ার ডেলিভারীর সময় এসে গেলো। প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো। একরাত একদিন পর জয়া একটা ছেলে সন্তান জন্ম দিলো।  সবাই খুব খুশি। শমীত ও বিজয়ার সাথে রোহানও হাসপাতালে  অনেক সময় দিয়েছে। মা এবং শিশু দু’জনেই সুস্থ। তাই একদিন পরেই জয়াকে বাসায় নিয়ে আসা হলো। বিজয়ার কাজের পরিধি আরো বেড়ে গেলো নতুন শিশুটিকে দেখাশুনা করা, জয়ার যত্ন নেয়া আর ঘর সামলানো। বিজয়া এসেছিলো একশত দিনের জন্য, দেখতে দেখতে পাঁচমাস পার হয়ে গেলো। জয়াকে রেখে যেতেও পারছেনা। শমীত ব্যস্ত থাকে ব্যবসার কাজে, সংসারে সময় দিতে পারেনা। ছেলেটা বিজয়াকে ভীষন চিনেছে, ওর চোখের আড়ালে যাওয়া যায় না। যায় যায় করেও বিজয়ার যাওয়া হচ্ছে না। জয়া আর শমীতের মনে গোপন ইচ্ছা বিজয়াকে রেখে দেয়া। জয়া ভাবছে যদি রোহানের সাথে দিদির বিয়ে দেয়া যায় তাহলে দু’জনেই সুখি হবে। দিদিকে দেশে গিয়ে একা থাকতে হবে না। সবার জন্য এতো কিছু করেও দিদি আজ একা জীবন কাটাচ্ছে।
    দেখতে দেখতে জয়ার ছেলের বয়স ছয়মাস হয়ে গেলো।  মন্দিরে অন্নপ্রাশন হয়েছে। সে উপলক্ষে বাসায় একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পার্টি রুমে অনুষ্ঠান, সারাদিন ধরে রুম সাজানো, রান্না বান্না ইত্যাদি কাজে বিজয়ার দিন কেটে গেলো।
     সন্ধ্যায়  অনুষ্ঠান। জয়া আর শমীত বাচ্চা নিয়ে আগেই পার্টিরুমে চলে গেছে। বিজয়া ঘর গুছিয়ে নিজে সাজগোজ করে যাবে। পার্টি রুম নিচতলায়। একটু পরেই সে নিচে নামবে। রোহান ওর জন্য অপেক্ষা করছে। একসাথে অনুষ্ঠানে যোগ দেবে।
    বিজয়া ব্যাগ থেকে শাড়ি বের করলো। সাদার উপর সোনালি বুটি শাড়ির সাথে মুক্তা সেট করা গলার, কানের আর আংটি পরলো। মুক্তা সেট করা সোনার চুড়ি হাতে পরলো। চোখে  কাজল, কপালে টিপ আর হালকা লিপস্টিকে জয়াকে অপরুপ লাগছে। সাজগোজ শেষে নিজেকে আয়নায় দেখে মুখ টিপে হাসলো। চমৎকার দেখাচ্ছে। অনেক দিন পর মনের মতো করে সাজলো। ভাবছে ওকে দেখে রোহান এর কী অবস্থা হবে।
     ভাবলো পারফিউম নিতে হবে। কাঁধের ব্যাগে সব সময় ছোট্ট পারফিউম থাকে, বের করতে গিয়ে একটা নীল খাম ফ্লোরে পরে গেলো। বিজয়া নিচু হয়ে খামটা তুলে নিলো। মুখটা ছিঁড়তেই হাতের মধ্যে একটা চেইন হাতে চলে এলো। সাথে একটা চিঠি। বেশ লম্বা একটা চেইন, ছোট্ট একটা লকেটসহ। লকেটে ইংরেজি দু’টো অক্ষর, এ এবং বি। অক্ষর দু’টো সাপের মতো জড়াজড়ি করে আছে। 
     মনে পড়লো এয়ারপোর্টে অলক খামটা দিয়েছিলো। বলেছে, ‘ ফ্লাইটে বসে খুলবেন’। বিজয়া খামটা ব্যাগে রেখে দিয়েছিলো। নানা ব্যস্ততায় খামটার কথা ভুলেই গিয়েছিলো। এতোদিনে বড় ব্যাগটা খোলা হয়নি।
     বিজয়া চিঠিটা খুলে আলোর কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
    অলক লিখেছে,  ‘ভালোবাসি,ভালোবাসি,ভালোবাসি। বলা হয়নি, বিজয়া নামের মন্ত্র জপে কাটছে জীবন। ফিরে এলে দু’জনে মিলে একটা সুখের সংসার গড়ে তুলবো। চেইনটা আমার পরলোকগতা মায়ের শেষ চিহ্ন, লকেটটা আমি দিলাম। ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রতিদিন দেয়ালে একটা করে দাগ কাটবো—অলক’।

       বিজয়া ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক হাতে চেইন আর চিঠি।  দরজার ওপাশে অপেক্ষা করছে রোহান। 

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২২ বার

Share Button

Calendar

August 2019
S M T W T F S
« Jul    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031