শিরোনামঃ-


» জীবন যখন যেভাবে ঃ পাঠ উন্মোচন

প্রকাশিত: ২৫. জুলাই. ২০২০ | শনিবার

শ্যামসুন্দর সিকদার
অধ্যাপক-কবি হরষিত বালার রচিত গ্রন্থ “জীবন যখন যেভাবে”(আত্মকথনের গল্প) প্রথম ভাগ নিয়ে আজকের আলোচনা।গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ধ্রুবপদ,প্রকাশকাল ২০২০,প্রচ্ছদ করেছে ইয়াদিরা এবং মূল্য ৩৪৭ টাকা।(ফোনেঅর্ডার করতে ০১৫১৯৫২১৯৭১ হটলাইন ১৬২৯৭)।মোট ১৯২ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থে ছয়টি অধ্যায় : উদ্-যাপন করছি নিজেকে; নেটুদা; আমার শিক্ষকজীবন; যা-কিছু সম্পদ আমার; আমার যা-বলার ছিল; প্রাক-অন্ত্যেষ্টি ।শুরুতেই বলি – এটি একটি অসাধারণ ব্যতিক্রম গ্রন্থ।

অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত সুলেখক হরষিত বালা এ গ্রন্থের আগে অর্ধ-শতাধিক গ্রন্থ লিখেছেন।কাজেই তাঁর লেখক পরিচিতি নতুন নয়। তাঁর লেখনির দক্ষতাও প্রশ্নাতীত।এ গ্রন্থটিকে ‘আত্মকথনের গল্প’ বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে সব গল্প বা লেখা লেখকের নিজের নয়।তবে অন্যরা যা বলেছেন অর্থাৎ লিখেছেন – তা লেখকের সম্পর্কেই বলেছেন কিংবা লেখকের অন্যান্য লেখা সম্পর্কেই বলেছেন।সে অর্থে অবশ্য গ্রন্থটি লেখকের আত্মকথনই বটে।

ব্যক্তি জীবনে লেখক যেমন মাটির সঙ্গে শুয়ে বসে – সততার সঙ্গে জীবন যুদ্ধ করতে করতে পর্বত চূড়ায় ওঠেছেন এবং ‘জিরো থেকে হিরো ‘ হয়েছেন, – তেমনি সেই সংগ্রামী জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতময় অভিজ্ঞতার কিছু ছিটেফোঁটা স্মৃতিকথার অকপট সত্যকথন এ গ্রন্থের প্রাণ।এসব সত্যকথনে লেখক হয়তো খানিক সময়ের জন্য নেটুটা হয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়েছেন – তা নেহায়েত খারাপ লাগেনি, বরং একটু রহস্যময় লাগতেই পারে ।

গ্রন্থের সূচি দেখেই বুঝা যায়- গ্রন্থের বিষয়গুলো বৈচিত্র্যময়-রূপ নিয়ে পাঠকের সামনে হাজির – তবে সেগুলো পরস্পর বৈমাত্রেয় নয়,সহোদরই বটে।কিন্তু এগুলো বিচিত্র ও বিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাধারণ ঘটনার চমৎকার বিবরণ, যা আমরা প্রায় সকলের জীবনেই প্রত্যক্ষ করেছি – অথচ লেখকের মত আমরা সেসব ঘটনাকে এত সুন্দর করে মনে রাখি না কিংবা সাহিত্যের জন্য গল্প তৈরি করি না।অবশ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিক্ষিপ্ত মজার ঘটনা বলেই কোনোটা পূর্ণতায় দানা বেঁধে ওঠেনি।বর্ণনার মধ্যেও যেন কবিগুরুর সেই কথা – ‘শেষ হয়েও হলো না শেষ’ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়।লেখকের অন্য একটি গ্রন্থের আলোচানায় মিয়াঁ মুহম্মদ আবদুল হামিদ যেমন বলেছেন, তেমন করেই বলি, ‘পাঠক স্বকীয় রসানুভূতির স্পর্শে এগুলোকে পূর্ণতায় পৌঁছে দেবার অবকাশ পাবেন ‘।

তবে লেখাগুলোর বেশ কিছু অংশ জুড়ে রয়েছে সাহসী উচ্চারণ, নীতির প্রতি অনুগত হয়ে অনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার-প্রতিবাদী সুর , সততার আপোষহীন চরিত্রে উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের সাক্ষ্য এবং নিজের দুর্বলতাকে অকপটে প্রকাশ করার দৃষ্টান্তে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি আদর্শের বার্তা দিবে এ গ্রন্থের লেখাগুলো।এ জায়গাটায় লেখক শতভাগ সফল হয়েছেন বলেই বলবো আমি, তবে কিনা – উচিত কথায় ‘কর্তা গোসসা’ হলে আমার মন্তব্য যুতসই মনে হবে না।

প্রথম অধ্যায়ের শুরুতেই মাকে নিয়ে অসাধারণ কবিতা।
[অংশবিশেষ বলি –
“পাগল ছেলের পাগলামি আজ
দেখবি নে মা চক্ষু মেলে ?
এতই যদি বাসিস ভালো,
আয় না সোনার স্বর্গ ফেলে !”]

কাজেই মায়ের বন্দনা দিয়েই হরষিত বালা শুরু করেছেন এই গ্রন্থের লেখা – এটি ব্যতিক্রম সূচনা এবং আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে।’নাতিদীর্ঘ ভূমিকা’য় তিনি লিখেছেন, “আমার জীবনে কোনো উৎসব ছিল না।জুনিয়র বৃত্তিলাভের পর মা কী বুঝলেন,বুঝা গেল না।… দরিদ্রের কেউ থাকে না।এসএসসি-তে মেধা তালিকায় স্থান পাবার সময় বাবা অনেকটা অপ্রকৃতিস্থ,ভীষণ অসুস্থ ; কোনো কিছু বোঝার শক্তি ছিল না।… শিক্ষকরা বলাবলি করছিলেন,হেডমাস্টার বরিশাল থেকে আসুক, পরে … তার আর পর নেই ;পরে আর কোনো কিছুই হয়নি।” সুতরাং তাঁর মা-বাবার এই ‘না বোঝার’ দুর্বলতাই হয়তো সুযোগ করে দিয়েছিল ‘সবল’ কর্তৃপক্ষকে এমন আনন্দের জন্যেও উৎসব না করার জন্যে।তাই লেখকের পরিণত বয়সে এসে এখন আক্ষেপ হওয়াই যথার্থ – তাই নিজেকে সান্ত্বনা দেন ‘দরিদ্রের কেউ থাকে না’ বলে।তিনি আফসোস করে আবার বলেছেন -“তাছাড়া,কোনো সুখ-স্মৃতিও নেই । … এক সহায়-সম্বলহীন মা তাঁর চার-চারটি শিশু-সন্তানকে বুকের মধ্যে আগলে রেখে একমুঠো খাবার আর একটু আশ্রয়ের জন্য আজীবন সে-কী যুদ্ধটা-ই না করেছেন ! …”।

অতএব, ব্যাক্তি জীবনে দারিদ্রের কষাঘাতের এমন সরল-স্বীকারোক্তি কয়জনই-বা প্রকাশ করতে পারে ? তাই আমি বলি হরষিত বালা মনের দিক দিয়ে দরিদ্র নন, অনেক বেশি ধনী, সাহসী এবং উদারও ! – যা অন্যদেরকে শিখতে উদ্বুদ্ধ করবে।

অতঃপর নিজের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিয়েছেন চুম্বক কথায় ‘থার্ড পারসন ল্যাংগুজে’( আত্মকথনে এমন ধারার বর্ণনা নতুন)।এতে তাঁর জন্মের সময় ,জনক-জননী ও পরিবারের পরিচয়,ঠিকানা,পেশাগত জীবনের কথা,নিজের প্রায় অর্ধশত গ্রন্থ প্রণয়ন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের কথা ব্যক্ত করা হয়েছে।ভালোই হয়েছে, সবকিছুর আগে নিজের পরিচয় বলে নেয়া ভালো।

দ্বিতীয় অধ্যায়টি চমৎকার – নেটুদার আগমনে।বলতে গেলে গ্রন্থের সব থেকে আকর্ষণীয় অংশ এটি।পনেরো পৃষ্ঠা হতে তিরাশি পৃষ্ঠা পর্যন্ত বর্ণিত জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা – হাসি-তামসায় যেন দারিদ্র-ক্লিষ্ট জীবনের কিছুটা ক্লান্তি-অবসাদ দূর করে দেয়।

[ এ অধ্যায়ের উপ-শিরোনামগুলো হচ্ছে – নেটুদার দুই জীবন,নেটুদার অন্যজীবন,নেটুদার কত কথা কত স্মৃতি,খণ্ড খণ্ড নেটুদা ,নেটুদার বিশ্বাস, নেটুদার দাদাগিরি, ও নেটুদাকে কিংবা তার সম্পর্কে কে-কী বলেন।
লেখক বলেছেন,“ ‘নেটুদা’ নামটা কে তাকে দিয়েছিল,নাকি সে নিজেই নিজের এমন একটা নাম রেখেছিল – আজ অবধি তার কাছ থেকে তা জানা যায় নি।” নামের ইতিহাস বা পটভূমি জানার খুব বেশি দরকার নেই, আমরা দেখি নেটুদা কী বার্তা নিয়ে এসেছেন পাঠকের জন্য ! ]

নেটুদার দুই জীবন -ছাত্রজীবন ও শিক্ষকজীবন।পাঠশালার পর্ব শেষ করে বড়ো স্কুলে এসে প্রধান শিক্ষকের প্রথম প্রশ্নেই নেটুদা কাত – ‘মনু কও তো,আমার একটা গরু আছে – ইংরাজি কী? সে উত্তর দেয় – I am a cow. শিক্ষক হেসে বলেন, ‘যাও, তুমি মাঠে গিয়া ঘাস খাও; তোমার আর থ্রিতে পড়ার কাম নাই’।তবে কিনা সেই নেটুদাই পরে এই বিদ্যালয় হতে এসএসসি-তে মেধা-তালিকায় স্থান পেয়েছিল।

নেটুদার শিক্ষকজীবনও শুরু তার পাঠশালা থেকে।তখন সে পঞ্চম কি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।একবার ছুটিতে গুরুমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলেই ছেলেমেয়েদের পড়া ধরার আদেশ।একফাঁকে একটি মেয়ে গুরুমশাইকে গিয়ে বলে “মাস্টারমশায় – মাস্টারমশায়, হ্যায় পড়াইতে পারে না; হোরদ্-রে কয় হ্রদ”। সেই নেটুদাই পরে বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষক হয়েছেন।

এমনই অনেক ‘অম্ল-মধুর’ ঘটনার বিবরণই অধ্যাপক হরষিত বালা সহজ সাবলীল ভাষায় লিখেছেন – যা কোনো কোনো পাঠকের নিজের জীবনেও ঘটেছে বলে একটু ‘নস্টালজিক’ হয়ে যাবেন পড়তে পড়তে।
নেটুদা কলেজজীবনে পড়েছে ইংরেজি মাধ্যমে।বাজারে তখন এই মাধ্যমের বই সহজলভ্য ছিল না।অর্থনীতির শিক্ষক পরীক্ষার খাতা দেখে মন্তব্য করলেন সে তো Economics পরীক্ষা দেয় নি; খাতায় শুধু ইংরেজি লিখেছে।বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসার সময় স্মরণিকায় নেটুদা লিখে আসে – “I always went my own road and on my own legs where I had a mind to go”.

শিক্ষকজীবনে এক তিক্ত অভিজ্ঞতা হয় নেটুদার – অহেতুক মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ ব্যক্তির রোষানলে পড়ে বিভাগীয় মামলা ‘ফেস’ করতে হয়।তবে কিনা তদন্ত রিপোর্টে লেখা হলো, “ছাত্রছাত্রীরা মনে করে,সে দেবতুল্য শিক্ষক”।একবার এসিআরে তার উর্ধতন কর্তা লিখেছেন , “শ্রেণিকক্ষে অসাধারণ।লিখন ও বাচনিক প্রকাশ ক্ষমতায় দেশের শীর্ষস্থানীয়”।জীবন-ঘনিষ্ট এমন আরো অনেক ঘটনাই লেখক লিখেছেন খুব মজা করে, যা পাঠকরা পড়তে শুরু করলে আর শেষ না করে ওঠতে পারবেন না।

নেটুদার অন্যজীবন মানেই তার লেখালেখির জীবন।কী লিখেছে সে জীবনে ? কবিতা, ছড়া, গল্প, নাটকের কত বই! কিন্তু প্রেম ? গভীর ভাবনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার প্রেম ‘উথলিয়া ওঠে মনে সাগরের ঢেউয়ের মতন – ঢেউ যেমন একবার উপরে ওঠে,আবার জলের সঙ্গে মিলিয়ে শান্ত হয়ে যায়’।কেউ দেখে,কেউ হয়তো দেখে না।নেটুদাও যেন তা প্রকাশে লাজুক-লতা।তবে তাঁর কবিতায় সেই প্রেম অনবৈদ্য।
[ “ভালো যে বাসে নাই – সে কি জানে
না-পাওয়ার কী সে জ্বালা,
পাওয়াতে কী পরমার্থ !
ভালো যে বাসে নাই সে কি বোঝে
কী বোঝা আকাশের মেঘে
কী চেতনা কৌমুদীরাশিতে !
… …
ভালো যে বাসে নাই – সে কি জানে
ভালোবেসে কী সে জ্বালা –
মর্মমূল দগ্ধ করে তিলে তিলে !”]

বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিত অধ্যাপক নেটুদাকে তাঁর বাসায় ডেকে নিয়ে প্রেমের কবিতার জন্য আদেশের সুরে বললেন : “বলো যুবক – কে সে, যে তোমাকে এত গভীর ভালোবেসে অবশেষে …”।

[ না, থাক সেকথা।পাঠকবৃন্দ নিজেরাই এখানে আরো কিছু কবিতার স্বাদ পাবেন ।তবে কে সে? নেটুদা এখানে রহস্যই রেখে দিয়েছে।বলেছে, “তাহার কথা থা’ক; তাহাকে তোমাদের খুঁজিয়া লইতে হইবে।”]

নেটুদার কত কথা কত স্মৃতি চমৎকার রসালো ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনা। ছোট ছোট হাল্কা ঘটনার সরস ও সরল ব্যঞ্জনময় বিবরণ পাঠকদের খুবই আনন্দ দিবে ।সবচেয়ে আকর্ষণীয় এখানকার ২৭ টি স্মৃতিকথার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সত্য গল্প। যারা গ্রামের আলো-বাতাস-মাঠ-বিল-খাল-নদীতে জীবনের প্রথম পাট শুরু করেছিলেন, এই ঘটনাগুলো যেন তাদের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।তবে এ সকল ঘটনা আমরা অনেকেই মনে রাখি না কিংবা এর ভেতরকার রস স্থায়ী করে রাখার জন্য গুরুত্ব দিই না।অথচ হরষিত বালা এগুলোকেই জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য-আলোকময় অংশ বিবেচনায় হৃদয়ে ধারণ করেছেন এবং সেগুলোকে সাহিত্যের উপজীব্য করে প্রকাশ করেছেন।তাই জীবনের এই রকম অগুরত্বপূর্ণ ঘটনার রসালো উপস্থাপনায় অধ্যাপক হরষিত বালা আমার কাছে এক কৃতি গল্পকার ।উল্লেখ্য, প্রতিটি গল্পের ঘটনাই আলাদা – কোনো ধারাবাহিকতা নেই।আর ছোট গল্পের মতই মজার – যেন শেষ হয়েও হলো না শেষ।

খণ্ড খণ্ড নেটুদা অংশের ঘটনাগুলোও তার জীবনের সত্য ঘটনা।তবে এই ঘটনাগুলোর গল্প ক্ষেত্রবিশেষে একটু অপেক্ষাকৃত বড় বিবরণে তৈরি।

[এখানকার গল্পগুলোর শিরোনামগুলি হলো : ১.নেটুদার নববর্ষ পালন,২.নাটের গুরু নেটুদা, ৩.নেটুদার রসিকতা ৪.নেটুদার দুষ্টুমি, ৫.নেটুদার দুঃখগুলি।]

গল্পরসের ধারা বর্ণনায় লেখক নিঃসন্দেহে দক্ষতার ছাপ রেখেছেন।সমাজের কিছু অব্যবস্থাপনায় বা অন্যায্যতায় লেখক জায়গামত খোঁচা দিয়েছেন ভালোভাবেই। এ থেকে বর্তমানের মানুষ সে সময়ের পরিস্থিতি বুঝতে পারবে – চাইলে শিখতেও পারবে।কারণ সব গল্প উপন্যাসেরই একটা মেসেজ থাকে ।অধ্যাপক হরষিত বালার এই লেখাতেও তা শক্তভাবে বিদ্যমান।নেটুদার কত কথা কত স্মৃতি এবং খণ্ড খণ্ড নেটুদা – এই দুটি পর্বের স্মৃতিকথার গল্পে হাসি-তামাশাই বেশি; তবে কিছু দুঃখ-বেদনা, হিংসা-বিদ্বেষ এবং প্রেমের আভাসও আছে।

অতঃপর নেটুদার বিশ্বাস ও নেটুদার দাদাগিরি শিরোনামে বেশকিছু বাক্য বা বাণী ( কিছু ইংরেজীতে আছে) সন্নিবেশিত করা হয়েছে জীবনের অভিজ্ঞতা হতে। এর অনেক গুলোই হয়তো অন্যান্য মনীষীর বাণীর অনুরূপ , তবে লেখক এগুলো তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই সঞ্চারিত করেছন বলে আমার ধারণা।এখানে এ বাণীগুলোর সন্নিবেশকরণে একটু ভূমিকা লিপিবদ্ধ থাকলে ভালো হতো।এই বাণীবদ্ধ বাক্যের অনেকগুলো আবার নীতিবাক্যের মতই – এজন্য শিক্ষার্থীদের জন্য এগুলো মূল্যবান।আর এ অধ্যায়ের শেষ পর্বটি হলো নেটুদাকে কিংবা তার সম্পর্কে কে-কী বলেন।নেটুদার সম্পর্কে বিভিন্নজনের চুম্বক মন্তব্যগুলো এখানে তুলে দেয়া হয়েছ ।পাঠকেরা এগুলো পড়ে নেটুদার ইতিবাচক গুণাবলীর একটা মূল্যায়ন-চিত্র পাবেন।সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তির মূল্যায়ন এখানে নেটুদার ব্যক্তিত্বকে সমহিমায় উদ্ভাসিত করেছে।

[এখানে নেটুদার বিশ্বাস ও দাদাগিরি হতে কয়েকটি বাণী উদ্ধৃত করছি :

নারীর নির্বুদ্ধিতা, আর অতি লোভ – বাড়ায় দুর্ভোগ ।

সুখী সেইজন, আকাঙ্ক্ষা যার কম।

সেই ব্যক্তিই সবচে দরিদ্র, জীবনে যার আদর্শ নেই।

দেহের বন্ধনে ‘দায়’ থাকে ; আত্মার বন্ধনে আছে ‘প্রেম’।

অজ্ঞতা-ই পাপ ; অশিক্ষা-ই জীবনের বড় অভিশাপ।

চিন্তায় ও কর্মে সংযম-ই সাধনা।

শ্রদ্ধাহীন ভালোবাসা ব্যভিচার ।

ধর্মান্ধদের মধ্যে ‘পরনিন্দা’ কালচার রক্তের মধ্যকার ক্যান্সারের মতো।

Love all ; trust no one.

A teacher is a living book to the students.

One who sacrifices everything,loses nothing. ]

এই গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম : আমার শিক্ষকজীবন ।লেখক এ অধ্যায়ের শুরুতে লিখিছেন – “সৎপথে থেকে স্বোপার্জিত শাকান্ন-ই আমার রাজভোগ।” এই উক্তির মধ্য দিয়েই একজন মানুষের আদর্শ কী, তা বুঝা যায়।অধ্যাপক হরষিত বালা একজন আদর্শ শিক্ষক – তাঁর পরিচিত মহলে সকলেই তা জানেন। আর এও জানেন যে, তিনি একজন আদর্শ মানুষও। তাঁর চলনে-বলনে, আচার-আচরণে, কথাবার্তায় – ওই বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবেই প্রকাশ পায়। যারা তাঁকে চিনেন বা জানেন , তারা সকলেই এ বিষয়ে একমত হবেন। তাঁর লেখার মধ্যেও এই আদর্শের ছাপ বিদ্যমান।

তবে তৃতীয় অধ্যায়ের (পৃষ্ঠা ৮৫ থেকে ১১৬ পৃষ্ঠা পর্যন্ত) লেখাসমূহ নিয়ে পূর্বেও লেখক একটি আলাদা গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন মর্মে এই গ্রন্থের ১৩০ পৃষ্ঠার লেখা ( শিক্ষকতার সাতকাহন, প্রবন্ধকার লুৎফুন নাহার) হতে প্রতীয়মান হয়।তখন ওই গ্রন্থের নাম ছিল : আমার শিক্ষকজীবন প্রোফাইল -১।এই অংশটি মূলতঃ আত্মজীবনীর ঢঙে লেখা।
[ এ অধ্যায়ের উপ-শিরোনামগুলো হলো – ও-বকুল,ও-পলাশ; অমারাত,পাছে ভুলে যাই(লঙ্কায় যে-যায়,কাকের মাংস কাকে খায়,হনুমান পর্ব ও অতঃপর); আমার পথে পথে(তিনটি সর্গ); বিয়াল্লিশটি বছর ধরে ।]
তাঁর শিক্ষকজীবনের চাওয়া-পাওয়া,প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি,সুখ-দুঃখ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ওঠে এসেছে অকপট বর্ণনায় এ অধ্যায়ের লেখায়।তিনি শিক্ষকতা পেশাকে অত্যন্ত পবিত্র পেশা মনে করেন।তবে কিছু শিক্ষক-ব্যক্তির নৈতিক স্খলন তাঁকে মানসিক পীড়া দেয় তীব্রভাবে।তাই তিনি নিজের পেশাগত বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সুন্দরের উল্টোপিঠের কুৎসিতরূপও উন্মোচন করে দিয়েছেন অকুন্ঠচিত্তে সবার সামনে।তাঁর উদ্দেশ্য – তিনি পরিবর্তন চান, সংস্কার চান,পবিত্রতা ফিরিয়ে আনতে চান পরিপূর্ণভাবে – আর আত্মসমালোচনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি চান তিনি।আমরা ছেলেবেলায় যখন স্কুলে পড়তাম, তখন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের চলন-বলন,পোষাক-পরিচ্ছদ,কথাবার্তা,আচার-আচরণ দেখে মনে হতো “স্যারেরা কোনো পাপ-কাজ করেন না,অন্যায় করেন না,মিথ্যেকথা বলেন না”।তাই তাঁদের স্বভাব-চরিত্রের ওই বিষয়গুলো আমরা অনুকরণ-অনুসরণ করার চেষ্টা করতাম।আর তখন পিতামাতার পরে শিক্ষকদের ওই চারিত্রিক-বৈশিষ্ট ছাত্রদের জীবনেও অনেকটা প্রভাব সৃষ্টি করতো বলেই মনে হয়।কিন্তু দিন বদলেছে। আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ বদলেছেন – এজন্য আমাদের গৌরবের জায়গাটা একটু যেন ফ্যাকসে হয়েছে। এই বোধ-অনুভূতিই অধ্যাপক হরষিত বালাকে দুঃখিত করেছে।তাই তিনি বাস্তবচিত্র চিত্রিত করেছেন তাঁর কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে এবং পরিত্রাণ প্রত্যাশা করেছেন।তবে অনেক ঘটনা আছে আনন্দের,গর্ব করার মতো ,অন্যরা অনুসরণ করার মতো। তিনি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেছেন তাঁর শিক্ষকদেরকে, বর্ণনা করেছেন সেসব শিক্ষার্থীবন্ধুদের যাদের চেষ্টা,নিষ্ঠা আর সততা মুগ্ধ করেছে লেখককে।

চতুর্থ অধ্যায় হলো ‘যা-কিছু সম্পদ আমার’।মূলতঃ এ অধ্যায়ের একটি লেখামাত্র লেখকের (‘আমার কথা’ , যা মূলতঃ ‘অনন-এর প্রথম পড়া’ গ্রন্থের পটভূমি)। অন্য লেখাগুলো লেখকের অন্যান্য গ্রন্থের ওপর ১১ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি-লেখকের রিভিউ বা মূল্যায়ন, যা বিভিন্ন সময়ে তাঁরা লিখেছিলেন (১৯৮৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত)। ওই লেখাগুলো দীর্ঘদিন থেকে হরষিত বালা অতি যত্নে সংরক্ষণ করেছেন এবং এই গ্রন্থে ‘সম্পদ’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই লেখাগুলো সংযোজন করায় এই গ্রন্থটি ঋদ্ধ হয়েছে বলে আমি মনে করি।

[ এতে লিখেছেন মিয়াঁ মুহম্মদ আবদুল হামিদ ও Syed Badrul Ahsan ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাব-কল্পনার কাব্যগ্রন্থ ‘স্মৃতিতে বিস্রস্ত যেমন’ -এর ওপর। তবে বদরুল সাহেব লিখেছেন ইংরেজীতে।কবীর চৌধুরী,বিমল গুহ ও আসাদ চৌধুরী লিখেছেন শিশু-কিশোরদের জন্য লিখিত ছড়াগ্রন্থ ‘খেলা’-এর ওপর। Abdus Selim ও Ananda Rahman ইংরেজীতে আলোচনা লিখেছেন ‘Bala’s Parables & Some Innocent Verses’ গ্রন্থের ওপর। এটি ইংরেজিতে লেখা Prose and Poetry. তবে আনন্দ রহমানের লেখাটি অনেক ভাল লেগেছে।লুৎফুন নাহার লেখকের ‘আমার শিক্ষকজীবন প্রোফাইল-১’ গ্রন্থের ওপর চমৎকার আলোচনা করেছেন, – যে গ্রন্থটির সব লেখাই আবার এ গ্রন্থেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।লুৎফুন নাহার অবশ্য ‘My Innocent Words’ গ্রন্থের ওপরও একটি আলাদা আলোচনা লিখেছেন।S.M.Azizul Islam ইংরেজীতে আলোচনা লিখেছেন হরষিত বালার বিরল গ্রন্থ ‘কিউপিড বিষয়ক’-এর ওপর। Nilratan Halder ইংরেজীতে লিখেছেন লেখকের ‘Lectures on Intermediate Literarue’ গ্রন্থের ওপর। এই গ্রন্থটি লেখকের একটি অসাধারণ ও ব্যতিক্রম গ্রন্থ। Tusar Talukder অবশ্য আলাদা দু’টি চমৎকার বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা লিখেছেন কাব্যগ্রন্থ ‘The Come Back’ ও ‘Evam’ নিয়ে।এই Evam গ্রন্থের ইংরেজী কবিতাগুলো হরষিত বালার অসাধারণ সৃষ্টি ।]

গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ে লেখক লিখেছেন – ‘আমার যা-বলার ছিল’ ।’দুদিনের এই খেলাঘরে’ শিরোনামে মূলতঃ কতগুলি সুন্দর অনুকবিতা (বাংলা ও ইংরেজীতে )লিখে কাব্যিক অনুভূতি ও ভাবের প্রকাশ করেছেন ছন্দে ছন্দে।এখানে এসে হরষিত বালা আবার কবি হিসেবে তাঁর স্বরূপ প্রকাশ করেছেন।তাঁর ঋণ বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন কিংবা নিজের বিশ্বাস ও নীতির প্রকাশ করেছেন ।আর ‘যবে প্রথম জেনেছি’ শিরোনামে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর কিছু শিক্ষার বিষয় – কোন্ শব্দ বা শব্দের উচ্চারণ বা অর্থ কিংবা অন্য বিষয় কার কাছে প্রথম শুনে শিখেছেন তিনি তার একটি তালিকা দিয়েছেন। তিনি যেন আবার মনে করিয়ে দিলেন – “সবার আমি ছাত্র”।এই অধ্যায়ের শেষ সংযোজন একটি চমৎকার ইংরেজি কবিতা ‘Before I Leave’. এই কবিতাটি পাঠকদের খুব ভাল লাগবে।

এই গ্রন্থের সর্বশেষ ষষ্ঠ অধ্যায় : প্রাক-অন্ত্যেষ্টি ।এতে লেখক স্বয়ং নিজে ‘আমার কৈফিয়ত’ নামে একটি লেখায় বলেছেন, “আজ একটা দিন মৃত্যুর কথা ভাবতে চাই।” Death is a must এই সত্য মেনে নিয়ে তিনি বলেছেন, “বড় অতৃপ্তি নিয়ে চলে যেতে হচ্ছে এখান থেকে।” এখানে লেখক কিছু চুম্বক শব্দাবলী (মোট বারোটি উদ্ধৃতি)দিয়ে তাঁর বিশ্বাস ও ভাবাদর্শের প্রকাশ করেছেন। যেমন – “তোমায় না-দেখাই ছিল ভালো ; মিলনে সে শুধু বিরহ বাড়াল।” শেষে বলেছেন, “আসুন না, আরও কতো বেশি ঋণী হওয়া যায়, আমরা সেই প্রতিযোগিতায় কৌশল আঁটি – I took loan from the bank … Before I leave. … যাদের সাথে এতটা কাল একসাথে থেকেছি, হেসেছি, খেলেছি – রাগ-অনুরাগের কতো-না অম্ল-মধুর স্মৃতি জড়িয়ে, তাদের প্রতি কি কোনই কর্তব্য নেই ? … ভালোবাসা পেতে হয় ভালোবাসা দিয়েই। সেই অধিকারে, সম্পূর্ণ বিস্মৃত হবার আগে বলে যেতে চাই : ভালোবাসি সবে।” কাজেই লেখকের এই মৃত্যুচিন্তা এবং তৎকালে তাঁর এই বলে-কয়ে বিদার নেবার অভিপ্রায় হলো প্রাক-অন্ত্যেষ্টি – এটাই তাঁর কৈফিয়ত।

কিন্তু এই প্রাক-অন্ত্যেষ্টি বিষয়ে লেখকের কিছু পরিচিত শুভানুধ্যায়ীর নিকট হতে লেখা চেয়ে নিয়ে এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন। তিনি মূলতঃ স্মৃতির ভাণ্ডারে হাত রেখে জীবদ্দশায় বুঝে নিতে চেয়েছিলেন – না চাওয়ার বহরে কিছু পেলাম কিনা ? সেটাই প্রাক-অন্ত্যেষ্টি ! অথচ লক্ষ্য করলাম, – প্রাপ্ত সবলেখাই যেন লেখকের প্রসূস্তি গেয়ে রচিত হয়েছে ।মোট আটজনের লেখা এখানে স্থান পেয়েছে ( আমারও একটি আছে)।কেউ কেউ লেখক হরষিত বালার সাথে কর্মের বা সম্পর্কের সূত্রে অভিজ্ঞতার অত্যন্ত আবেগঘন স্মৃতিচারণ করে ওই লেখা তৈরি করেছেন।সেগুলো হতে লেখকের অতীত পরিচয়, ব্যক্তিত্ব, সততা, আদর্শের আরো কিছু প্রমাণ পাওয়া গেলেও – তা কিন্তু প্রাক-অন্ত্যেষ্টির বিষয় বলা যাবে না।অতঃপর গ্রন্থের শেষদিকে লেখকের একটা টিভি সাক্ষাতকার সন্নিবেশিত করা হয়ে যা খুবই চমৎকার।

পরিশেষে বলি, মূদ্রণজনিত কিছু কিছু ভুল বানান পরিলক্ষিত হয়েছে এবং স্মৃতিচারণের বিষয়গুলোতে কালানুক্রমিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি।তবে সামগ্রিকভাবে গ্রন্থটি খুবই পাঠকপ্রিয়তা পাবে মর্মে আমি বিশ্বাস করি॥

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৩৪ বার

Share Button