» জ্ঞানতাপস অধ্যাপক ডঃ মুনিম খান স্মরণে

প্রকাশিত: ২৭. জুন. ২০২০ | শনিবার

ড.নাঈমা খানম :

ইতিহাসে কিংবদন্তি তারাই হয়ে থাকেন যারা নিজ মেধা, মননশীলতা,অসাধারণ প্রতিভা ও কর্মগুণে নিজের ব্যপ্তি ছড়িয়ে যান দেশ, জাতি তথা মানবতার কল্যাণে। দেশ- বিদেশে সমানভাবে আলোচিত ও খ্যাতিমান যেসব মহান ব্যক্তিত্ব নিরলস জ্ঞানসাধনায় মানব জাতির কল্যাণে অশেষ অবদান রেখে যান, নিজেদের কর্মগুণেই শ্রদ্ধাভরে তারা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। বহুমাত্রিক প্রতিভাধর অধ্যাপক, লেখক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক,,বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, নজরুল গবেষক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুল মুনিম খান এর আজ প্রথম প্র‍য়াণ দিবস, মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১৯ সালের ২৯ জুন এদিনে মৃত্যবরণ করেন।
সেসব মনীষীদের একজন তিনি যিনি আজীবন তার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন পার করে গেছেন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিমন্ডলে খ্যাতিসম্পন্ন বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হিসাবে,শিক্ষাঙ্গনে প্রাজ্ঞ ও বিচক্ষণ অধ্যাপক হিসাবে, সমাজে জ্ঞানতাপস, ধর্মীয় মনস্তাত্ত্বিক ও সংস্কারক হিসাবে, সাহিত্যে পন্ডিত, গবেষক, লেখক, ভাষ্যকার, আলোচক, অনুবাদক ও সঞ্চালক হিসাবে এবং পরিবারে আত্নপ্রত্যয়ী,সৎচরিত্র বান, দায়িত্বশীল, উদার,স্বাধীনতায় বিশ্বাসী বন্ধুসুলভ, জীবনবোধ ও রসবোধসম্পন্ন বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী একজন স্বার্থক সন্তান, আর্দশ ভাই, স্বামী ও স্নেহশীল পিতা হিসাবে। আত্নীয় বা অনাত্মীয়, দুঃস্থ- দরিদ্র কেউই বঞ্চিত হয়নি তার স্নেহাস্পর্শ হতে।বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ও সদা পরোপকারী অধ্যাপক ড. মুনিম খানের অসামান্য অবদান প্রতিটি ক্ষেত্রে যেভাবে সমুজ্জ্বল, দেশ ও জাতি সেটা কখনো ভুলবে না।
জাতির ক্রান্তিলগ্নে যে কোন বিষয় ভিত্তিক সমস্যায় ধর্ম ও ইসলাম সম্পর্কিত, মানবাধিকার, শিল্প ও সংস্কৃতি বা আন্তর্জাতিক যে কোন ইস্যুতে তার জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, সাক্ষাৎকার বা গবেষণামূলক মূল্যবান প্রবন্ধ- নিবন্ধ বিভিন্ন গণমাধ্যমে টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলগুলোতে প্রচার ও জাতীয় পর্যায়ের দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশের মাধ্যমে জাতীয় ও সামাজিক সমস্যা সমাধানের নিরলস প্রচেষ্টা তিনি আজীবন অব্যাহত রেখে গেছেন।
বহুমুখী প্রতিভাধর এই শিক্ষক এশিয়ান ইনিস্টিটিউটের পরিচালক ছিলেন।ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা এবং ইনিস্টিউট অব ল্যাংগুয়েজ এর চেয়ারম্যান ও তারা টিভি নিউজের এডভাইজার ছিলেন।।এছাড়া সেনাবাহিনীর অফিসারদের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।।ড.মুনিম ২০০৩ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার ধর্ম বিষয়ক কলাম লেখক ছিলেন।মানবতার ব্যাখ্যা, ভালবাসায় ইসলাম, জীবনবোধে ধর্মের প্রভাব,জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ ইসলামবিরোধী,ধর্মের নামে যে কোন অপব্যবহার ও অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে পবিত্র কোরান ও হাদিসের আলোকে তার লেখার অবস্থান ছিল স্বচ্ছ ও সুচিন্তিত ।তিনি প্রথম আলোর সর্বকনিষ্ঠ উপদেষ্টা(২০০৭ – ২০১২) হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং পাঁচ বছর নিষ্ঠার সাথে তিনি সে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম আলো থেকে প্রকাশিত হজ্ব গাইড তিনি লিখেছেন। এছাড়াও ইত্তেফাক, সংবাদ, যুগান্তর, সংগ্রাম, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস,ক্রীড়ালোক ও ক্রীড়াজগত সহ বিভিন্ন পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন। অধ্যাপক ড. মুনিম খান রচিত ও সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা ২৪টি, যার অধিকাংশই স্কুল- কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক। আরবী ভাষা,সাহিত্য, কাব্য, ভাষাতত্ত্ব, ইসলামের ইতিহাস, ধর্ম বিষয়ক বহু প্রবন্ধ- নিবন্ধ (৮৩টি) বিভিন্ন গবেষণামূলক জার্ণালে প্রকাশিত হয়।ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্টার ফেইথ জার্ণালে প্রকাশিত তার গবেষণামূলক ইংরেজি প্রবন্ধের সংখ্যা৫০ টি।ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত অগ্রপথিক সংকলনে তার প্রবন্ধের সংখ্যা ৮৩ টি।এশিয়ান ইউনিভার্সিটি বার্তা, টাইমস- বিডি ২৪ ডট কম’, পায়রা নিউজ,নীলরঙ, শিক্ষাবার্তা ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিক্রমা পত্রিকার তিনি উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন।তিনি একাত্তর, বাংলাভিশন, যমুনা, এটিএন বাংলা,চ্যানেল আই, ইনডিপেন্ডেন্ট, নাগরিক টিভি, মাই টিভি,বিটিভি সহ বিভিন্ন চ্যানেলে নিয়মিত সমসাময়িক বিষয়ে টকশো অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও আলোচক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন।

ড.মুনিম খান আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব বরেণ্য শিক্ষাবিদ, বহুভাষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড.আ.ন.ম.আব্দুল মান্নান খান ও মা রেহানা আক্তার এর প্রথমপুত্র। তিনি ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা থানার সৈয়দাবাদ গ্রামেরড. মুনিমের জন্ম ও বেড়ে উঠা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে।ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে শিক্ষা অজর্নকালে সকল ক্লাসে সর্ব্বোচ্চ সংখ্যক নম্বর পেয়ে প্রথম হয়ে বিনাবেতন অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদে বি.এ অনার্স পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তির জন্য ‘নীলকান্ত স্বর্ণপদক -১৯৯১’ লাভ করেন যা তার বাবা ও ড.মান্নান খান ছাত্র জীবনে সর্ব্বোচ্চ নাম্বার প্রাপ্তির জন্য একই সন্মানে ভূষিত হন। । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আরবী বিভাগ থেকে বি.এ অনার্স ও মাস্টার্স (থিসিস গ্রুপ) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেনীতে প্রথম স্থান লাভের জন্য ড. মুনিম ‘গ্রন্থ পদক পুরস্কার – ১৯৯১ ও ১৯ ৯২’, ‘সাইদুর রহমান ফাউন্ডেশন পুরস্কার’, ‘ নাসিরুন্নেসা ফাউন্ডেশন পুরস্কার’ এবং ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এম. ফিল ও পিএইচ.ডি বৃত্তি পুরস্কার’ লাভের কৃতিত্ব অর্জন করেন।তিনি কলা অনুষদের অধীনে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে ২০০২ সালে পিএইচডি অর্জন করেন।অধ্যাপক মুনিম খানের রচিত ২ টি গবেষণা অভিসন্দর্ভের বিষয় শিরোনাম হচ্ছেঃ ১.’ আহমদ শাওকীর কবিতায় ইসলামী ভাবধারা’ মাস্টার্স থিসিস ২.’ আহমাদ শাওকী ও নজরুল ইসলাম – এর কবিতায় ইসলামী চিন্তাধারা’।

ড.মুনিম বিভিন্ন পর্যায়ে ১৬ টি বিরল সন্মাননা পদক ও পুরস্কার লাভ করেন।তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ২০০৫ সালে ওয়াশিংটন ডিসি,শিকাগো ও নিউইয়র্ক সিটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ‘হিন্দু- মুসলমান -বৌদ্ধ- খ্রিস্টান’ ঐক্য প্রচেষ্টায় ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার সিম্পোজিয়ামে আন্তঃধর্মীয় সংলাপে মতবিনিময় করেন।জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এর আমন্ত্রণে ২০১৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ও যোগজাকার্তায় ‘ডেভেলপমেন্ট স্ট্র‍্যাটেজিক পার্টনারশিপ উইথ ফেইথ বেইজড অর্গানাইজেশন এন্ড রলিজিয়াজ লিডারস ইন পপুলেশন, ফ্যামিলি প্ল্যানিং, রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ এন্ড জেন্ডার প্রোগ্রাম’ আন্তর্জাতিক ট্রেনিং প্রোগ্রাম এ অংশগ্রহণ করেছেন।এছাড়াও সার্কট্যুরে ১৯৯৭ সালে আমন্ত্রিত হয়ে ভারত,নেপাল ও পাকিস্তান এ বিভিন্ন কনফারেন্সে যোগদান করেন।
একজন সাদা মনের অসাধারণ মানুষ ছিলেন ড.মুহাম্মদ আব্দুল মুনিম খান।তার জীবনাদর্শে সবকিছুই ছিল অনুকরণীয় ও অনুসরণযোগ্য।তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন একজন ইনিস্টিউট। একজন আদর্শ শিক্ষক, সৎ,নীতিবান,মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, নিরহংকারী, উদার,সদালাপী ও সদাহাস্যজ্বলমুখ এই সাদা মনের মানুষটা অকালে আকস্মিক ভাবে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে চলে গেলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে মরহুমের জানাযা শেষে তার শেষ ইচ্ছানুযায়ী মৃত্যর পর তাকে তার গ্রামের বাড়ি সৈয়দাবাদের পারিবারিক খান কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে শায়িত করা হয়।মৃত্যু কালে তিনি স্ত্রী, একছেলে,একমেয়ে, ভাই-বোন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান।কৃতিমান এ শিক্ষাবিদকে বাঙালি জাতি ও মুসলিম বিশ্ব আরবী ভাষা – সাহিত্য ও ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
লেখায় : ড.নাঈমা খানম
ড.মুনিম খানের সহোদর বোন

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯৪ বার

Share Button

Calendar

July 2020
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031