জ্বালানী পরিবেশ ও জীবন

প্রকাশিত: ১০:০০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২০

জ্বালানী পরিবেশ ও জীবন

ইঞ্জিনিয়ার রাসনা

আদিম মানুষের আগুন আবিষ্কার থেকে আজকের টাচ্ফোন মানুষের ইতিহাস এক কথায় ‘জ্বালানী পরিবেশ ও জীবন’। মানুষ আগুন আবিষ্কার করে সেদ্ধ খাবার গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে কালক্রমে হিংস্র পশুর দাঁত হারিয়ে আজকের দন্ডবিকশিত সভ্য মানুষ! সেদ্ধ খাবার মানুষের মাথায় দারুণ কাজ করেছিলো সেটা অন্য প্রাণিরা এখনো আবিষ্কার না করার কারণে অসভ্যই রয়ে গেলো। মানুষের মগজের গঠন পাল্টে দেয়ার পেছনে এই সেদ্ধ খাবার আর তার পেছনে আগুন বা জ্বালানী ! এ কারণেই মানুষ বুদ্ধিমান হয়ে উঠলো এবং হয়ে উঠলো অদম্যও বটে। বুদ্ধিমান মানুষ বুদ্ধি খাটাতে খাটাতে আজকের অলস টাচ্ফোনে পৌঁছে গেছে। মানুষের আর গতর খাটিয়ে পরিশ্রমের দরকার নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই সব প্রয়োজন মেটাবে। সভ্যতার শেষ প্রান্তে এসে মানুষ পৃথিবী ছেড়ে নতুন আবাসন খুঁজছে। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই এই নিবন্ধের অবতারনা।

জ্বালানী পিপাসা মেটাতে ভোগী মানুষের চাহিদায় পৃথিবীর পরিবেশকে ধ্বংস করে বারোটা বাজিয়ে দেয়া হয়েছে, বেজে উঠেছে পৃথিবীর মৃত্যু ঘন্টা, তাই মানুষ এখন পৃথিবী ছেড়ে পালিয়ে বাঁচতে চায়। পৃথিবীকে রক্ষা করতে প্রচলিত জ্বালানী সূত্র ছেড়ে অপ্রচলিত পুনঃপ্রক্রিয়াজাত জ্বালানী ব্যবহারের সংস্কৃতি চালু করতে দন্ত বিকশিত সভ্য মানুষের উদ্বিগ্ন বদন এখন ব্যস্ত। এই অক্লান্ত প্রচেষ্টার বোঝা অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে কোভিড-১৯ মহামারী। জ্বালানী রাক্ষস উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ইস্যু’ প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের ঘরের কাছেই কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ডলফিন নাচানাচি করছে। প্রকৃতি ও পরিবেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছে। জ্বালানী যে পরিবেশের গায়ে লেগে থাকা একটি অনুসঙ্গ তা আর বুঝতে বাকি রইল না, আর ডলফিনের নৃত্যই প্রমাণ করে জ্বালানী পরিবেশ ও জীবনের গল্প। এতক্ষণ যে আলাপ করলাম তা আমাদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বর্তমানের চলমান মানব ইতিহাস। এবার দেখা যাক বাংলাদেশ প্রেক্ষিত।

বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাস এবং এর সংহার প্রক্রিয়া খুব জটিল নয়, খুবই সহজ সরল! বাংলাদেশ যে টেকটনিক প্লেটের উপর হিমালয় ঢলের পলিযুক্ত বদ্বীপ সেটির রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। আমাদের প্লেটের পরেই বার্মা, এখন মায়ানমার, মাঝে নাফ নদী। যেটা পাড়ি দিয়ে সম্প্রতি ‘মিলিয়ন’স অব রোহিঙ্গা’ শরনার্থী বাংলাদেশের টেকনাফ প্যানিনসুলায় হাসফাস করছে! এই রোহিঙ্গা শরণার্থী আগেও বাংলাদেশে এসেছে। বাংলা ভাষা রপ্ত করে বাংলাদেশের পাপেসার্ট নিয়ে সৌদি আরবে বিশাল প্রবাসী বাংলাদেশী অর্থনৈতিক শক্তি! এরাই এখন বাংলাদেশের জ্বালানী ইতিহাসের সর্বশেষ উপসর্গ।

যারা জ্বালানী সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডার এবং নিয়ন্ত্রক তারা সবাই জানেন হয়তো অনেকেই বোঝেন না বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল জ্বালানীকে কেন্দ্র করে। জীবাশ্ম খনিজ ও খরস্রোতা নদী প্রবাহ এর লক্ষ্য বস্তু। যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানী, সৌর শক্তি ও বায়ু প্রবাহ নতুন অনুষঙ্গ ও প্রযুক্তি।

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের আগেই বর্বর, ভোগী ও তথাকথিত সভ্য জাতিগণ বুঝতে পেরেছিলো ঔপনিবেশিক শাসক বর্গের সূর্য ডুবে যাবে। বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে জ্বালানী সূত্র নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের বিশৃঙ্খল পরিবেশে অসংখ্য সংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদীদের স্বাধীনতার নামে বহু নতুন ও পুরাতন সার্বভৌম দেশের অভ্যুদ্যয় ঘটে। যাদের মধ্যে অনেকেই ‘ল্যান্ড লক কান্ট্রি’ আর অনেকেই পাগড়ী ও জোব্বা কিংবা ধূতি পরিহিত ঠুটো জগন্নাথ! রাজনৈতিক স্বাধীনতায় আপ্লুত জাতিরা এক সময় অনুধাবন করলো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা একটা ‘জাঙ্গিয়ার’ অতলে ভূ-রাজনৈতিক জ্বালানী কৌশল! এই কৌশলেই আটকে আছে পৃথিবীর ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ঠান্ডা যুদ্ধ। বর্তমানে মুক্ত বাজারের বিশ্বগ্রাম ও এর ব্যবহৃত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি যুগ। আমরা মাটির চুলায় লাকরী ঠ্যালা ভাত রাধা জাতি! নব্য নাগরিকেরা পাইপ লাইনে জলের মত প্রাকৃতিক গ্যাসের সুফল ভোগীও বটে। কিন্তু জনসংখ্যা ও জিডিপি, ভোগবাদী খাগরাই তত্ত্বে শংকিত ক্লাইমেট ভিকটিমের শ্রেষ্ঠ জাতি। আমাদের কোন অপরাধ নেই অথচ আমাদের ৭০ এর প্রলয়ংকারী জলোচ্ছ্বাস আছে। আমাদের উন্নত বিশ্বের পরিমাপে উল্লেখযোগ্য কোন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ নেই অথচ আমরা পরিবেশ দূষনের মাক্স পড়া পুঁজিবাদী হাইব্রীড উন্নয়নের শরনার্থী। এতক্ষণ যা লিখলাম তা হচ্ছে সত্য কথার তত্ত্ব একটু কাব্যিক ঢঙে, এই জন্য যে এই তিক্ত ও সত্য বচন সকলের জন্য জানার এবং প্রিয় বিষয় নয় যেমন কাব্য কথা। গদ্যটি খুব নির্মম তা হচ্ছে আমরা যদি নবায়নযোগ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাত জ্বালানী ব্যবহারে অগ্রগতি অর্জন করতে না পারি আমাদের জীবন যাত্রায় মৃত্যুঘন্টা অবধারিত। শুধু বাংলাদেশ নয় সমগ্র পৃথিবীর প্রেক্ষাপট। বাংলাদেশ আলাদা এই কারনে যে এই দেশ প্রযুক্তি নিঃস্ব মেধামুক্ত নৃতাত্ত্বিক সংকর জাতি, এখানে উদ্ভাবনী শক্তিকে জীবিত হত্যা করা হয় নানা করম প্ররোচনা প্রনোদনায়। এখানে ধূতি ও টুপির ব্যবহার বাড়ন্ত, বিজ্ঞান মনোস্কতা নাস্তিক আসামী। এখানে ছাগল পালনে পুরস্কৃত করা হয় আর হরিণ পালনের লাইসেন্স নিতে হয়! এমন পরিবেশে পরিবেশ বান্ধব জীবাশ্ম জ্বালানীর বিকল্প উদ্ভাবন কি সম্ভব! এসব ভাবনার বিষয় এবং গভীর উদ্বেগের বিষয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিন্তু এ সকল বিষয় ভাবনার সূত্রপাত করে গিয়েছিলেন আশ্চর্যজনক ভাবে আমাদের স্বাধীনতার উষালগ্নে ! তিনি ১৯৭৫ সালের ৯ই আগষ্ট বাংলাদেশ থেকে বিদেশী কোম্পানীদের হাতে বন্দি আমাদের গ্যাসক্ষেত্র ক্রয়ের মাধ্যমে জাতীয় জ্বালানী নিরাপত্তার দিগন্ত উম্মোচন করেছিলেন। এর ঠিক ৬ দিনের মাথায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের এ দেশীয় দোসরচক্র বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবার হত্যা করে। ১৫ই আগষ্টের হত্যাযঞ্জের পর আমাদের জ্বালানী সম্পদ পুনরায় বিদেশী ঋণের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলচক্রে বন্দী হয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় আমাদের টেকসই অগ্রগতি, আমরা হয়ে পড়ি ঋণগ্রস্থ অভাবী ভিক্ষুকের জাতী।

দুর্গম রাজনৈতিক বহু পথ বেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে আবার নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছেন, পৌঁছে দিয়েছেন ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ। অন্ধকার ঘুচে আলোর সন্ধান পেয়েছে এদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আগামীর প্রজন্ম বিদ্যার্থীরা। কৃষকের সেচ যন্ত্রে সৌর বিদ্যুতের জাদুরকাঠি স্পর্শ করেছে অপূর্ব ছন্দে। নির্মানযজ্ঞ চলছে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের। সমুদ্র জয় করে এবার শুরু হবে অফশোর ড্রিলিং। ব্লু-ইকোনমি নতুন দিগন্ত। সবই হচ্ছে এবং হবে, তবে মনে রাখতে হবে, ‘মুজিবর্ষে’ সংলগ্ন স্বাধীনতার ৫০তম সন্ধিলগ্নে জাতির জনক জাতীয় জ্বালানী নিরাপত্তার যে আত্মনির্ভরশীল জ্বালানী কৌশল রচনা করেছিলেন বুকের রক্ত দিয়ে, সেই কৌশলে যেন কোন ব্যত্যয় না হয়, জাতিকে অতিভোগী জনগোষ্ঠিতে যেন রূপান্তর করা না হয়। ভোগী মানুষের লোভী অন্তর পৃথিবী ধ্বংসের মূল আসামী, তাকে এড়িয়ে জাতিকে তৈরী করতে হবে নির্ভোগ, পরিবেশ বান্ধব, জ্বালানী সাশ্রয়ী পরিশ্রমী জাতিতে, কেননা জ্বালানী পরিবেশ ও জীবনের গল্প এর মধ্যেই নিহীত, জীববৈচিত্রময় এই পৃথিবী নামক গ্রহের ভবিষ্যত অস্তিত!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

http://jugapath.com