» জ্যোৎস্নারাতে হঠাৎ

প্রকাশিত: ২২. মে. ২০২০ | শুক্রবার

সাজেদা আকতার

আঙিনাজুড়ে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে আছে।রূপসী চাঁদকে আজ আরো বেশি আকর্ষণীয় লাগছে।এত আলো আগে খুব একটা চোখে পড়েনি। মনে হচ্ছে ঠিকরে বের হচ্ছে। আমার আশৈশব লালিত উঠোনটি যেন আলোয় ফকফক করছে। আশ পাশের ফুলের, ফলের গাছের পাতাগুলোও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। খুব লোভ হচ্ছিল তাই জ্যোৎস্নার নরম আদুরে কোমল ছোঁয়া গায়ে মাখতে একটু বের হলাম। হালকা হিমেল হাওয়ায় গা জুড়িয়ে যাচ্ছে। বহুদিন এমন অনুভবে মন মাতোয়ারা হয়নি। নিরব কোলাহল মুক্ত সুখের নতুন ঠিকানা যেন পেলাম।

 উঠোনে কিছুক্ষণ পায়চারী করে সদর  দরজার দিকে এগুচ্ছি। দুপাশের সুপারি গাছের ছায়া দেখে মনে হচ্ছে, পাতাগুলো যেন আমাকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছে। ভীষণ ভাল লাগায় আপ্লুত হয়ে কিছুদূর এগোতেই দেখলাম, ছায়ার মতো কেউ একজন আমার পিছ পিছ আসছে। ঘুরে তাকাতেই দেখি, সকিনা।

আমাকে সব ঘরের কাজে সাহায়্য করতো। শান্ত শিষ্ট মিষ্টি একটা মেয়ে। বয়স বার কি তের হবে। মা বাবাকে হারিয়ে ফুটপাতে বসে কাঁদছিল। তখন অসহায় মেয়েটিকে আমি আশ্রয় দিই। তারপর পাঁচ বছর পর মোটামুটি উপার্জনক্ষম পাত্রের সাথে বিয়ে দিয়ে আমার চিলেকোঠার ঘরটাতে থাকার বন্দোবস্ত করে দিই। ভালই চলছিল। কিন্তু বিয়ের পর কেমন যেন বদলে গেল মেয়েটা। একদিন সন্ধ্যেবেলা হঠাৎ এসে বললো,
” কাল থেইক্যা আমি আর আইসতে পারুম নে।”
“কেন?” জিজ্ঞেস করতেই বললো,
“তাইনে ভালা কামাই করে। কয়, বাড়ি বাড়ি যাই কাম করন ভালা দেহাই না”
তারপর আমার অনুরোধে আরো কিছুদিন ছিল। চম্পা হওয়ার পর ছেড়ে দিয়েছে কাজ। আমার চিলেকোঠাও ছেড়ে অন্যত্র বাসা ভাড়া করেছে। মেয়েকে নিয়ে তার সময় কাটে। জামাইয়ের রোজগারের উপর তাদের ভরণ পোষণ ভালই চলতো। সুখের সংসার তার। কিন্তু আজ বলছে অন্য কথা। চাঁদের আলো দেখবো বলে প্রসন্ন চিত্তে বের হয়েছিলাম, সকিনার কথা শুনে ভাটার টানের মতো আমি চাঁদ ফেলে যেন সমুদ্রে ডুবে গেলাম।

আমি হাঁটছি। সকিনাও আমার পিছন পিছন হেঁটেই কথা বলছে। কখনো পাশাপাশি হাঁটছে না। আমি বললাম,
“চল, ডালিম গাছের নিচে ওই আসনটাতে বসি।”
সে বললো,
“খালাম্মা, ঘাটলায় চলুন,পুকুরের পানিতে চাঁন্দের আলো বেজায় ভালা লাইগবো।”
আমিও জানি, পানির মধ্যে যখন চাঁদের আলো পড়ে, তখন পানি রূপোলি রঙে চিক্ চিক্ করে। দারুন সৌন্দর্য যেন লুটিয়ে পড়ে। ঘাটলার দিকে যেতে হঠাৎ একটা প্যাঁচা ডেকে উঠলো। আমি আঁৎকে উঠলাম। ছোটবেলায় শুনেছি, রাতে প্যাঁচার ডাক নাকি অশুভের লক্ষণ।

ঘাটলায় গিয়ে বসতেই মনে হলো, আমার পাশে বিকট শব্দে কোন অশরীরী বসে পড়লো। হঠাৎ অজানা ভয়ে আমার গা ছমছম করে উঠলো। সকিনার দিকে ফিরে তাকাতেও ভয় পাচ্ছি। ক্ষণকাল পরে সকিনা বললো,
“খালাম্মা, জলে নামবেন?”
এবার আমার সন্দেহের মাত্রাটা বেড়ে গেল। সকিনা তো কখনো জল বলে না। আমি বললাম, “জল কী?”
থতমত খেয়ে বললো,
“জল অইলো হানি। আমরা হানি কই,আর হিন্দুরা জল কয়। ঘুরায় হিরায় এক কতা।” “চলেন খালাম্মা” বলতেই আমার চোখ তার পায়ে পড়লো। দেখলাম, পাগুলো খুব ছোট। আমার মনে পড়ল, একবার দাদি বলেছিল, অশরীরীদের ছায়ায় পায়ের পাতা থাকে না। থাকলেও পেছনের দিকে থাকে। আমি ভাল করে পেছনের দিকে তাকালাম। তাও ছোট ছোট পা দেখতে পেলাম। মনে হলো, আমার তাকানোটা বুঝতে পেরে সে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কারণ সামনে পেছনে তো একই রকম ছোট পা হতে পারে না। আমি আরো বিচলিত হয়ে উঠলাম ভয়ে। বাসায় ফিরে যাওয়ার কথাও বলতে পারছি না, যদি গলা চেপে ধরে। সাহস সঞ্চয় করে বললাম,
“তোর কথা বল, কিভাবে কী হল?”
সে বললো,এখন কঠিন সময় পার করছে। মেয়েকে নিয়ে জীবিকার অন্বেষণে বাড়ি বাড়ি আবার কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কেউ তার অসহায়তাকে মনের কোণে ঠাঁই দিচ্ছে না। কারণ তার স্বামী যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেছে। শুনে আমার খুব কষ্ট হলো। আবার মিথ্যা যে বলেছে,সেটাও ভাবতে পারছি না। কারণ মহামারী ততদিনে মহা আকার ধারণ করেছে। পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে।

সকিনার দুঃসময়ের সাথে সাথে পৃথিবী কখন তার নিজের দুঃসময় কাটিয়ে সুসময়ের উজ্জ্বল মুখ দেখবে জানি না। ভাবছি, সকিনাকে আবার কাজে রেখে দিব। আমারও সাহায়্যকারী লোকের খুব দরকার। ঘরের কাজ, বাচ্চাদের দেখাশুনা সব মিলিয়ে হাঁফিয়ে উঠছিলাম। সকিনাকে বলতেই সে বিড় বিড় করে কি যেন বললো। আমার মনে হলো, সে বলছে,
“এই তো সুযোগ।”
কী সুযোগের কথা বলছে সকিনা?

ততক্ষণে বাসার মধ্যে আমার খোঁজ পড়ে গেল। মেয়ে “আম্মু, আম্মু” করে ডাকছে। আমি বললাম,
“আমি এখানে, পুকুর ঘাটে। আমার সাথে সকিনা আছে।”
আমি মেয়েকে চাঁদের আলোয় ডাকলাম।

আমার মেয়ে যখন ঘাটলায় এলো, তখন আমাকে একা দেখতে পেল। “সকিনা কোথায়” জিজ্ঞেস করতেই আমি এদিক ওদিক তাকালাম। সকিনা,সকিনা করে অনেক ডাকলাম, কিন্তু কোনো সাড়া পেলাম না। মুহূর্তেই কোথায় হারিয়ে গেল সে।

পরের দিন সকিনার জন্য অপেক্ষা করলাম। সে এলো না। বলেছিল তার কাজ খুব দরকার। তাহলে এলো না কেন? নানান চিন্তা ঘুনি পোকার মতো মাথার ভেতর কিলবিল করছে।

এক সপ্তাহ অপেক্ষা করে, কিছু চাল, ডাল, তেল, মসলা কিনে নিয়ে তার ভাড়া বাসায় গেলাম। সেখানে গিয়ে আমি আরো হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমাকে দেখে দৌড়ে এসে কদমবুচি করলো। বললো, এতসব জিনিষ কেন এসেছি? আমি চম্পার বাবার কথা জিজ্ঞেস করলাম। বললো,
“কামে গ্যাছে, চলি আইসবে নে।”
আমি বুঝতেছিনা, আমি কী কানে উল্টা পাল্টা শুনি।

এই যদি সকিনা হয়, তাহলে কাল রাতে কোন সকিনা আমাকে সঙ্গ দিয়েছিল? নাকি কোনো সকিনাই ছিল না। সবই কী আমার মধ্য রাতের জ্যোৎস্না উপলব্ধির অনুভূতি মাত্র?

        ১২/৫/২০২০

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৭৪ বার

Share Button

Calendar

July 2020
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031