» জয়তু ফেইক আইডি

প্রকাশিত: ০৯. মার্চ. ২০১৯ | শনিবার

হাসিদা মুন

যে গল্প শুরু করতে যাচ্ছি সে হলো এক পাহাড়ি মেয়ের অদ্ভুত কল্পনাতীত কাহিনী । আমরা এ পর্যায়ে ভাবতে পারি যে , সেই মেয়েটিই এখন এই মুহুর্তে আমাদের সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে । প্রথমে দূর থেকে তাঁকে হলুদ একটা ‘বিন্দু’র মতো দেখাচ্ছে । কেউ যদি দূরে এই নাক বরাবর তাকিয়ে থাকে তবে দেখতে পাবে মাটির দিকে মাথা নিচূ করে হেঁটে আসছে সে এক মেয়েলি গঠন কিংবা নারী প্রতিকৃতির মতোই দেহধারণ করে , সেই মেয়েই হচ্ছে এই গল্পের সেই মেয়ে – শ্রাবন্তী মং ।
হ্যাঁ – মং’ , তাই বা হলো কেন ? এর উত্তরে জানানো যায় যে , উত্তাল বঙ্গোপসারের জলসীমার তীরবর্তী উপকূল ঘেঁষে এক পাহাড়ী জনপদ আছে উখিয়া উপজেলায় । সেখানে ‘জালিয়াপালং’ নামের গ্রামে এই ,মেয়ের ‘বাপুই’কে সবাই এক সময়ে ‘শানু মং’ বলে ডাকতো । ডাকতো বলা যায় এই জন্য যে , মং রাজত্বের মতো সেও এখন এক প্রাচীনত্ব পুরাকৃত্তির গল্প কাহিনী । শ্রাবন্তী নিজেই পড়েছে তার বংশধরদের ইতিহাস , ইতিহাসবিদদের ধারণা, অস্ট্রো-এশীয় জাতিগোষ্ঠীর অধস্তন আসামের খাসী এবং মিয়ানমারের মং জাতিগোষ্ঠীর লোকজনই ছিল কক্সবাজার এ অঞ্চলের আদিবাসী। আমরা এখন স্পষ্ট যে মেয়েটার আপাদ মস্তক বেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি । হলুদ সর্ষেফুল রঙের কামিজ শালোয়ার আর সাদা ওড়নায় জড়ানো মেয়ে দেহ , তাঁকে কিন্তু আদৌ উপজাতী বা আদিবাসী বলে ভ্রমও করা যায়না । বেশ চোখ ধাঁধানো রঙ ও রুপের কম্বিনেশানে দুরস্ত গড়নের মুখায়বে এক সুন্দরী কিংবা রূপসী যুবতী মেয়ে । শানু মং ও বিন্তী মংয়ের বড় সন্তান এই ‘শ্রাবন্তী’ , যার জন্ম হয়েছিল শ্রাবণ মাসে বলেই বিন্তী মং আহ্লাদ করে নাম রেখেছিল ‘শ্রাবন্তী’ , এ নামের অর্ধেকে জমা রেখেছে তার নিজের নাম বাকি অর্ধেকে শানুর সোনালী রেখে যাওয়া স্বাক্ষর । বির্তকিত এক রহস্যজনক মৃত্যুর মামলায় পড়ে পুলিশের অত্যাচার বা নির্যাতনে থানা হাজতেই অঘোষিত অপরাধের দায় মাথায় নিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালেই মারা যায় – শানু মং । কি ছিল তার কারণ ? ‘বিন্তী মং’ বড় মিনতি করে করে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আজও জানতেই পারেনি সেই মৃত্যু রহস্য । শুধুই লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কোথাও পাওয়া যায়নি তেমন কিছুই । সেও তো প্রায় বছর পাঁচেক আগের ঘটনা যা কিনা তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান শুজানা মং জন্মাবার পরপরই ঘটেছিল । শ্রাবন্তীর তখন মাত্র সাত বছর বয়স পাহাড়ী এন জিও স্কুলে ক্লাস টু’ তে সে পড়ে । এর পরের লম্বা ইতিহাসের পাতা উল্টাতে উল্টাতে দশ বছর পর আজ অথবা এই এখন সেই শ্রাবন্তী মং ঢাকার এক মহিলা কর্মজীবী হোস্টেলে অবস্থানরত । কে এই শ্রাবন্তী , আমরা গোড়ায় গিয়ে জেনে আসার বোধহয় একটু চেষ্টা করলেও করতে পারি ।

শ্রাবন্তী মং , বাড়ী – পরী নেমে আসা কোন এক পাহাড়ের পাদদেশে, মহাকাশের নিচের আকাশে যে গ্রাম থেকে কিছু আলোর ধোঁয়া বের হয়ে গিয়ে বায়ুমণ্ডলের অন্ধকারে মিশে যায় । কাটা ধানগাছের খোঁচা খোঁচা গোড়া যেখানে হাঁটতে গেলে পায়ে বিঁধে যায় , চারিপাশে গাছগুলির মধ্যে ছায়াছবি ভাব সারাক্ষণ জমে থাকে । যেখানে উঁচু-নীচু নীল রঙের মেঘেদের তলদেশটি আশপাশের নীল রঙ আড়াআড়ি কিংবা প্রলম্বিত ছড়িয়ে তাজা সবুজের উপত্যকা আর পাহাড়ের ঘাসে ঘাসে পাতায় পাতায় দ্রবীভূত হয়ে থাকে । এমন মহান পাহাড়ী প্রাচীর ঘেরা ছোট্ট গ্রাম । সাধারণ এখানের শোরগোলকে সন্ধ্যার প্রথম প্রহরেই থামিয়ে দিয়ে হাঁস মুরগী , গরু ছাগল নিয়ে ঘরে ফেরে পাহাড়িয়া লোকালয়ের বসতী গড়া মানুষেরা ।
পাহাড়ী জীবন রচনাশৈলীতে অদ্ভুত সুন্দর হলেও সব ধরনের লাভজনক শ্রমের জন্য অপ্রতিরোধ্য ও প্রতিবন্ধকতাযুক্ত হয়ে থাকে । যা নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়হীন করে তুললেও তুলতে পারে । তবুও প্রবল অধ্যাবসায়ে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য শ্রাবন্তী ও তার ছোট বোন কাঁধে ঝাড়ু বানানোর ফুলের গোছা , টুকরো করে ভাঙ্গা শুকনো কাঠ নিয়ে ধর্মশালা গম্বুজের পাশদিয়ে নেমে আসা পাহাড়ি পথ বেয়ে , বনের কবুতরের দলকে ছুটে গিয়ে উড়িয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে পেটের পাটাতন জুড়ে খিদে ঢুকিয়ে নিয়েই বাড়ী ফেরে তাদের চিরচেনা ডেরা’ পর্যন্ত। পারিবারিক দায়িত্ব পালন করার জন্য শ্রাবন্তীর পরিবারে আর কেউ নেই । পড়ালেখার পাশাপাশি দুই বোন মিলে মাছ ধরতেও গিয়েছে কখনো দলের সাথে করে । তবুও জীবনকে যথাযথ পালন করতে গিয়ে এক বিশাল অসম্ভবকেই খুঁজে পেয়েছে বারবার ।পাহাড়ীদের মন্দ সময় নিঃসন্দেহে গার্হস্থ্য ক্লেশের অগ্নিকুণ্ডে আজীবন হুহু করে পুড়ে যায় নিদারুণ ক্ষুধায় । দারুণ নমনীয় পর্দা তাঁদের গায়ের পরিচ্ছদও যেন পাহাড়ী পাথুরে ধারে ছিঁড়ে যায় খুব দ্রুত । ধৈর্য এবং দীর্ঘ সহনশীলতার গুণাবলী শেখায় ধর্মোপদেশ দেয়া ধর্মগুরু , তাতে মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখতেই প্রভূর উপরে আস্থা রেখে দিন যদিও কাটে দারিদ্র’ তো আর কাটে না । ঘরের টিন প্রায়ই উড়ে যায় দুরন্ত বাতাসে , পেটের ভিতরে ক্ষুধাদের প্যারেড চলে ক্রমাগত , সহ্যশক্তি আর কত ? উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত তার পূর্বপুরুষের মার্শাল চরিত্রের সামান্য তাদের বংশগতি বহন করছে বলেই কসরত করে , পাহাড়ি চরাই উতরাই বেয়ে বেয়ে পাহাড়ের শাক সবজি ফল মূল আর খড়ি কাঠ বয়ে আনে শ্রাবন্তী প্রায় রোজ । রাস্তার পাশে বসে সেগুলো বিক্রি করে মা ও নানু । পাহাড়ে চাষ করা কলা ,কচু ,পেপে বিক্রি করে শ্রাবন্তীর নানা মং প্রু তাদের তিনজনের লালন পালন করেছেন , এখন তিনিও শয্যাশায়ী । পিঠা বিক্রি করে মা আর নানুর সাথে তাদের দুইবোনের কোন মতে দুইবেলা খাওয়া হয়ত চলতো । গুমোট অন্ধকার ঘর জুড়ে মং পরিবারে চিরস্থির হলেছিল বহুকাল ধরেই । সেই ঘুসঘুসে অন্ধকার ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে , জানালা দিয়ে একটু আলো এনে দিতে চাইলো পাশের বাড়ীর বান্ধবী ‘লীলা প্রু ‘ । সে ঢাকার একটা প্রাইভেট হাসপাতালে কাজ করে । এনজিও ডাক্তার দিদিমনির সাথে ঢাকায় চলে গেছিল লীলা বেশ কয়েকমাস আগেই । এখন ওদের অবস্থা ভাল এবং সচ্ছল হয়ে উঠেছে । এমন সম্ভাবনার গল্প শুনে শ্রাবন্তী মনেমনে ঢাকা যাবার স্বপ্ন গোছায় ।

শরত্কালে সূক্ষ্ম ধরনের দীর্ঘ জাল তৈরী করে জেলেদের কাছে বিক্রি করে পথের টাকা জোগাড় করে অবশেষে একদিন লীলা প্রু’র সাথে রাজধানীর পথে পা বাড়ায় চাকরীর আশায় শ্রাবন্তী মং । পাহাড়ের অবারিত সবুজ , প্রিয় খেলার উপত্যকা , পাঁথরে উঁচু স্বরে কারো নাম ধরে ডাকা প্রতিধ্বনি , টিলার উপর ছড়ানো বিকালের আলতো রোদ ,এ সবের ভিতরে নিজেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে , নতুন কোন খোলস ধারণ করে শ্রাবন্তী চলেছে জীবনের অদেখা সামনের দিকে দৃঢ় পায়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে । তাঁকে সব প্রতিকূলতার ভিতরে থেকেই মাথা তুলে বাঁচতে হবে , বাঁচাতে হবে ছোটবোন ও মায়ের পরিবারকে । সমৃদ্ধ বনভূমির অনেক মাইল জুড়ে থাকা দূরত্ব এখন একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে , এটাই মহাসত্য । ‘দূর’ তাকে তার নিঃশব্দ কিন্তু মহিমাম্বিত চলন্ত রক্তবর্ণ মেঘের প্রতিফলনে গোপনে বুকের ভিতরের এক ক্ষরণ’ বুঝিয়ে দিচ্ছে । সমুদ্রের বুকে জাহাজ ভেসে কোন এক বিজন এলাকায় চলে যাচ্ছে , মেঠো পথ ধরে যেতে যেতে এখান থেকে সে দেখতে পাচ্ছে । দিনের আলো নিজেকে হারাতে চেয়ে পর্বতমালা ও উপত্যকার উপরে দীর্ঘ নীল সাদায় ধূসর ছায়া ফেলতে শুরু করেছে । গ্রাম ছাড়ার আগেই অন্ধকার না হয়ে যায় , দ্রুত পা চালায় শ্রাবন্তী ‘সই’ লীলার সাথে । নাইটের বাসে ঢাকা পৌঁছুতে হবে । পিছনে রয়ে গেল তাঁদের পুরানো অবলম্বন একটি ব্যস্ত নিবিড় গ্রাম আর বিতর্কিত বেঁচে থাকা জরাজীর্ণ অতীত । শোনা যাচ্ছে , দূরবর্তী সমুদ্রের স্রোতের বজ্রধ্বনি , গভীর আছড়ে পড়া শব্দরাশির তোলপাড় । বড় বড় পাথরের কৃশকায় গায়ের উপর শুভ্র পায়ের ছাপ রেখে চলে যাচ্ছে সে । মনে প্রাণে ভাবছে ভাবনার বিরতি সময়ে । ঘন বর্ষায় এখানে কাঁকড়া ধরতে আসে তারা দলবেঁধে । ঝিলমিল পাতার চমকে শাখা দোলে , উপরে মেঘদোলা আকাশ – আকাশ ! উজ্জ্বল আলো করা সন্ধ্যায় মেঘের পরতে লাল বেগুনি ঝলক ধরা গোধূলি বেলা খুব প্রিয় শ্রাবন্তীর । প্রচণ্ডভাবে মনেহয় এখানে সুখ যেন চাদনী রাতের চোরাবালি । দুঃখের সাথে দরিদ্রভাব মাথাব্যথা হয়ে জেগে থাকে অহর্নিশি !

পাহাড়ের পথ জুড়ে একচেটিয়া কাক উড়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়লো না শ্রাবন্তীর । অদ্ভুত চিত্রে পাথরগুলো যেন আঁকড়ে ধরছে তাকে এবং তার পিঠের উপর দিয়েও যেন সেই পাঁথরের ভার বয়ে যাচ্ছিল । এমন কিছু ওজন একাকী বয়ে না নিতে কষ্ট হওয়ায় লীলার সাথে কথা বলা শুরু করে শ্রাবন্তী । অপ্রচলিত স্থান সেই ঢাকার আবাসে কোন মানুষ দেখতে কেমন , কি করে , বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাস করছে সে । কিছুদূর যেতেই বাসের যান্ত্রিক শব্দ জানায় খুব কাছেই চলে এসেছে তারা । দু’জন একটা কাঠের কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ায় , সেখান থেকে ঢাকার বাসের টিকিট কেটে বাসে উঠে বসে । পিছনে শৈশব , কৈশোর , ঝুম চাষ , স্কুল কলেজের স্মৃতি , পাশের বাড়ী সহপাঠী ছেলেটার মুগ্ধ চোখ , মায়ের মুখ সব সরিয়ে সরিয়ে দিয়ে বাস ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে অচেনা পথের বাঁক ধরে । কেমন অবশ করা ঝিমভাব ধরে শ্রাবন্তীর চোখে চোখে ।

  • শ্রাবন্তী ওঠ ওঠ , আমরা আইসা পরছি রে । আর ঘুমাইস না , জলদী কর ।
    লীলার হাঁকডাকে হঠাত চোখ খুলে তাকিয়ে প্রথম ‘ঢাকা’ দেখে শ্রাবন্তী, সকালের বেশ কড়া রোদে চোখ ধাধিয়ে দেয় । গিজগিজ করছে মানুষের সংখ্যার সাথে তেল পেট্রোল এবং মানুষের মূত্রের উৎকট গন্ধ মিশে সয়লাব হয়ে আছে ভোরের বাতাস । নিঃশ্বাস যেন আটকে আসছে , শ্বাস ভিতরে ঢুকতে চাচ্ছেনা আর ।
  • শ্রাবন্তী নামিয়া আয় , আইসা পরচি । আমার হাত ধর , অনেক ভির হারাইয়া যাইবি রে ।
    এক হাতে কাপড়ের ব্যাগ অন্য হাতে লীলার হাত খামচে ধরে সামনের দিকে এগোয় শ্রাবন্তী মং । তারপরের সময়টাতে বিভিন্ন ভিড় ভাট্টা অসনীয় রাস্তার ট্রাফিক জ্যাম পেরিয়ে ওরা এসে ওঠে লীলার সেই লেডিস হোস্টেল ‘মনোরমা’য় । হাত খরচের জন্য আনা অনেকদিনের জমাকরা টাকায় সেখানের খাতায় নাম রেজিস্ট্রেশান করে , সাথে ছবি দুইকপি , লোকাল গার্জেনের জায়গায় লীলা প্রু’ এসে দাঁড়ায় সই করতে । ঢাকায় সে ছাড়া তো আর কেউ , কিছুই চেনা জানা নেই শ্রাবন্তীর ।

পরের দিন রবিবার , সকাল সাড়ে দশ টা । ‘সিটি নার্সিং হোম’ হাসপাতাল ।
লীলার পিছনে পিছনে ম্যানেজারের রুমে ঢোকে শ্রাবন্তী মং ।
নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে সিটি নার্সিং হোমের ‘স্পেশাল আয়া’ হিসাবে যোগদান করতে আসা এই মেয়ে । মুমূর্ষু কোন রোগীর পাশে সার্বক্ষণিক থাকার জন্য নিবেদিত এক আত্মা হতে হবে তাঁকে বিনিময়ে পাবে বেতন নামের কিছু টাকা , যার বিনিময়ে সে ফিরে পাবে একটু সচ্ছল জীবন । কিছুটা স্বস্তিতে জীবন চালিয়ে নেয়া । হাসপাতলের ম্যানেজারের রুমের টেবিলের এইপাশে দাঁড়িয়ে ওরা দুইজন মেয়ে ।

  • কি নাম তোমার ?
    -শ্রাবন্তী ছ্যার ।
    -আগে পিছনে আর কিছুই নেই পদবী ?
  • ছ্যার , এখানে লেখা আছে ।
  • এইচ এস সি পাশ করেছো , বেশ রেজাল্ট । তবে ,তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছেনা , এই কাজে তুমি থাকবে । মানে এই কাজের উপযুক্ত তুমি নও । কদিন পর আমাকে আবার এই পদের জন্য ইন্টার্ভিউ নিতে হবে নতুন করে ।
  • না , ছ্যার – আমার চাকরীটা খুব দরকার , ঢাকায় আমার কেউ নেই , একটা লেডিস হস্টেলে উঠেছি সেটার ভাড়া না দিতে পারলে আমাকে হয়ত গ্রামেই ফিরে যেতে হবে , সেখানে প্রচন্ড দারিদ্র্যতায় দিন কাটছে আমার মা আর ছোট বোনের । আমার বাবা নেই , ছ্যার , আমি ফিরে গেলে তাঁরাও বাঁচার আশা হারাবে ।
  • ঠিক আছে , কাজ করতে থাকো , পরে দেখা যাবে ।
  • আচ্ছা , থ্যাংকইউ ছ্যার ।
  • লীলা , বেতনের কথাটা এঁকে তুমি বুঝিয়ে দিও ঠিক করে । ওকে ?
  • জী ছ্যার , বলেছি ।
  • ঠিক আছে , এখন এসো তোমরা , আমার কাজ আছে বেরোবো ।
  • সালাম ছ্যার ।
    ওরা দু’জন সিঁড়ি দিয়ে উপরের তলার দিকে উঠে যায় । যেতে যেতে লীলা প্রু’ বলে , ‘ তোরে পনেরো হাজার টেকা দিবে । এইখান থিকা পাঁচ হাজার টেকা দিবি এই মেনেজার বাবুরে । এটা অপিছে কাউরে কইবিক লা ‘ । মুনে থাকে জেন কতাডা , কেউরেই কইবিক লয় । বুইজবার পারছ ? ‘ তাইলে আর চাকরী থাকবে লায় । মেনেজার বাবু’ , চুরির কথা বইলে তুকে খেদায় দিবে , হুম ম ।
  • বুঝছি , তোকে আর এতোকথা ভাইঙ্গা বুলতে হবেনা । তুই ডিউটি কর , আমি রুমে যাই , না খাইয়া আসছি , ক্ষিদা লাগছে , রাইতে দেখা হবে তুর সাথে ।
    সিটি নার্সিং হোম থেকে বেরিয়ে ভীষণ ক্ষুধা পায় শ্রাবন্তীর , আজ সকালে উঠে কি এক অদ্ভুত টেনশানে থেকেই কিচ্ছুই খেতে করেনি শ্রাবন্তীর । আসার সময় পুটলি করে বিন্তি মং মেয়ের জন্য কিছু ‘মুন্ডি ‘ দিয়ে দিয়েছে , সেটা হচ্ছে পাহাড়িদের হাতে তৈরি চালের ‘নুডলস’ , ঘরে ফিরে তা খেতে আর মন চাইলো না ।
    সামনেই একটা ঝকঝকে রেস্টুরেন্ট দেখা যাচ্ছে , সাজানো গোছানো সেটার সামনের দিকটাও সুন্দর ফুলসহ গাছের সারি দিয়ে রঙ্গিন টব সাজানো বেশ মনমুগ্ধকর পরিবেশ । সেখানে বসে খুব ‘সাহেব’ জাতের মানুষেরা খাবার খায় । গতকাল আর পরশু হাসপাতালে এই পথে আসা যাওয়া করতে গিয়ে সে দেখেছে বেশ কয়েকবার । কয়েকবার আসা যাওয়া করার অর্থ হচ্ছে লীলার সাথে করে নিয়ে ঘুরেঘুরে রাস্তা ঘাট চিনে নেওয়া । যাহোক ,রাস্তার পাশে একটা টং দোকান থেকে বন রুটি – কলা কিনে সে ।
    ঝুলানো পলিথিনের ভিতরে বিভিন্ন নিম্মমানের খাবার নিম্নমানের খরিদ্দারের দৃষ্টি আকর্ষণে উঁকি দিচ্ছে শাবন্তী দাঁড়িয়ে দেখে নেয় সেসব খাবারের দরিদ্র চেহারা , যার সাথে অনেকটা মিল দেখে রাস্তায় রঙচঙে দেহপসারিনি মেয়েদের মতো আলগা চোখেপড়া রঙ করা । শ্রাবন্তীর হস্টেলের দুই একজন যে এ পেশায় কর্মরত সে দুই তিন দিনের আলাপচারিতায় সে বুঝেও নিয়েছে । কয়েকজন মেয়ে পাশের কলেজে লেখাপড়াও করছে এই হোস্টেলে থেকে । তার ফাঁকে ফাঁকে তাঁরা মাঝবয়সী এবং পৌঢ়দেরও সফর সঙ্গী হয়ে এদিক সেদিক যায় নিজের হাত খরচ যোগাতে , যার জোগানদার তাদের বাবা – মা হয়ত দিতে পারেনা দারিদ্রতার কারণে । নির্বিবাদে সিম্বায়োসিস প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে এমন সব জীবন যাপনে । কেউ আবার সখের বশেই বিভিন্ন পার্টি পরিবেশে গিয়ে মেশে উপভোগের কিংবা ভোগীদের ইচ্ছা পূরণে । এই ধরণের উঠকো স্মার্ট মেয়েরা শহরে পা দিয়েই চুলের স্টাইল , আই ভ্রু প্লাক করা , কড়া মেকআপ শিখে ফেলে , এমন কি নামটাও পালটে নেয় খুব দ্রুত । । গতকাল পাশের রুমের এক মেয়ে লীলাকে বলছিলো , দ্যাখো আমাকে ‘জরিনা’ আপা বলে ডাকবেনা , বলবে ‘জেরিন’ । কি বিচিত্র এই অদ্ভুত ধরণের সামাজিকীকরণ ! শহুরে জীবন যাপনের বিশেষ নিরুত্তাপ কিংবা নিরুদ্বেগ অজানা এমনও এক অধ্যায় রয়ে গেছে অগোচরেই । যা কিনা অনেকেরই হয়ত জানা আছে কিন্তু মানাও করা নেই তেমন করে । বেশ মিল খুঁজে পায় শ্রাবন্তী এমন জড়িয়ে থাকা পরস্থিতির সাথে , পাহাড়ী বাহারি বুনো অর্কিড ফুলের মতোন লতাগুলো যেমন বুড়ো গাছ জড়িয়ে বেড়ে ওঠে উপরের দিকে সূর্যালোকের খোঁজে , এও কিছুটা তেমনই প্রক্রিয়াকরণ । বিভেদ শুধু বৃক্ষ ও মানুষ নামের । মনেমনে হাসে শ্রাবন্তী । এসব ভাবতে ভাবতেই একদিন সে চলে আসে সেই নামী দামী রেস্টুরেন্টের দোড় গোড়ায় , নাহ , সে ফিরে যাবেনা , একটু দেখেই নাহয় যাওয়া যাক । ঢুকে পড়ে শ্রাবন্তী মং । বাহ , কি অদ্ভুত ঠান্ডা ছিমছাম আলোছায়া ঘেরা পরিবেশ , বেশ মোহনীয় লাগছে তার কাছে । রোজ দামী রেস্টুরেন্টের সামনে দিয়ে সে যায় যখন , কাঁচের ভিতর দিয়ে সুন্দর সুন্দর পোষাকে মানুষজন ঢুকতে দেখে বেরোতে দেখে । আন্দাজে বুঝেও নেয় অনেক দাম সেসব খাবারের । আজ সে ইচ্ছে করে কিছু সুখ নিজের আয়ত্তের ভিতরে আনবার জন্য চেষ্টা করতে চাইলো বোধহয় । চাইলো কিছুটা স্বস্তি আর সময়কে নেড়েচেড়ে দেখার একটু সময় দরকার , যা এই শীতাতপ খাবার ঘর হয়ত দিতে পারে এমন সম্ভাবনা । প্রায় টেবিলগুলো খালি , একটা চেয়ার টেনে বসে শ্রাবন্তী । সাথে সাথে একটা ছেলে এগিয়ে এসে মেন্যু বই সামনে মেলে ধরে , শ্রাবন্তী প্রতিটি খাবারের ছবির পাশে মূল্য দেখে আশ্চর্য হয় । কিচ্ছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে উঠে দাঁড়ায় , ছেলেটা এগিয়ে এসে বলে ‘গেস্ট আসবে বুঝি ম্যাম ?’ ।
  • না না , ঠিক আছে আমি পরে আসবো । বলে উঠে দাঁড়িয়ে সামনে দরজার দিকে যায় । কোনার দিকে খুব ঘনিস্টভাবে বসে আছে এক জোড়া ছেলে মেয়ে , অভিসারে মগ্ন বিভোর কপোত কপোতী । সমাজের থেকে পাওয়া উপাত্ত মিলিয়ে দেখে যা বুঝেছে সে , তা হলো – প্রতিবেশীদের চোখে ধুলো একটু বেশিই লাফিয়ে পড়ে কারো সাথে যদি সুখ সান্নিধ্যভরা সময় কেউ যদি দেখে ফেলে এবং যদিও তারা আত্মীয় বা কিছু বন্ধু, সে হলেও হয়ত হতে পারে হরিহর আত্মা ।
    স্নেহ অনুভব কিংবা কতোটা ভালবাসা আছে সেটুকু বুঝে নেওয়া যায় , তাদের কুৎসা রটনায় । কোন মেয়ে যদি কোন ছেলে বন্ধুর সাথে একান্তে কথা বলে তাহলে তার ভুল এবং ভুলগুলি ধরিয়ে দেবার লোকের মোটেই অভাব হয়না । এ জেনেছে সে বহুদিন আগেই । দুঃখের সময়ে যেন এই চেনাভাবটা আরো স্পষ্টতর হয়ে ওঠে । এটি এক সময় ভয়ংকর সন্দেহজনকও হতে শুরু করে দেয় । উপহাস , আঘাত বা অবমাননা করার উদ্দেশ্যে না হলেও গাল গল্পও অল্প হয়না এসব বিষয় নিয়ে অহরহ । কোন একটা কাজে যদিও সহায়তা করার সময় হয়ত পায়না তেমন কেউই, তবে কারো স্মৃতি সমালোচনার সময় সমালোচকদের সময়ের অভাব মোটেও দেখা যায়না । প্রশংসা করার মতো মনোভাব না হলেও পরনিন্দা করার জন্য আশেপাশের মানুষের মন ও মস্তিষ্ক তুরীয় হয়ে ওঠে প্রবল ভাবেই পরচর্চার বিষয়ে । বেশ বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে । অন্ধকারের ঘোমটা সংগ্রহ করবে সূর্যের মেলে রাখা চূড়ান্ত শেষ রশ্মি , এই অপরিসরে নিজের থেকে সরে গিয়ে গৌরবময় মুকুটের মতো আলোক উজ্জ্বল কিছু সময়ে সে ঢুকে পড়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চাইলো । কাজেই একান্তে দূরে কোথাও গিয়ে বসতে চাইলো শ্রাবন্তী কিছুটা স্থির হতে ।
    স্পষ্ট সন্ধ্যায় আকাশে তাদের গাঢ় সীমারেখাগুলি মুদ্রণ করছে বিভিন্ন রঙ ও আঁকারে । যখন বাকি ভূ-দৃশ্য অন্ধকার হয়ে এলো প্রায় , তখন ধূসর বয়ামের অন্ধকার ঠেলে শ্রাবন্তী গিয়ে পৌঁছালো ঝকঝকে তকতকে এক করিডোরে ।
    সিটি নার্সিং হোমে ঢুকতেই কি যেন এক উৎকণ্ঠা চোখে পড়লো , তিন তলার করিডরে লোকজন দৌড়াদৌড়ি করছে পাশেই কোন এক ভিআইপি গোছের লোকের আদরের মেয়ের এক্সিডেট হয়েছে , শ্রাবন্তী জানতে পারলো । পাশের রুম তিনশ ছাব্বিশ নম্বরে গত পাঁচদিন ধরে এক বয়স্কা মহিলার দেখাশোনা করছে সে , অচেতন মহিলা চুপচাপ পড়ে থাকে , ছেলে মেয়েরা অভিজাত এলাকার বাসিন্দা , বিদেশেই যারা বছরের বেশিভাগ সময় থাকে । কালে ভদ্রে তারা দেখতে আসে অসুস্থ মা ‘কে। এসে বিছানার বেশ দূরেই দাঁড়িয়ে থেকে চোখের দেখা দেখে শ্রাবন্তীকে বিভিন্ন নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে যান তাঁরা । কি আশ্চর্য ব্যাপার , একটু গা’য়ে হাত দিয়েও মা’কে ছুঁয়ে দেখেনা , অসুস্থ হয়ে যেন সেই সাথে অস্পৃশ্যও হয়ে উঠেছেন মৃতপ্রায় জীবন্ত মমী হয়ে বেঁচে আছেন তিনি । যার জন্য বেঁচে থাকাও ঠিক নয় , মরে যাওয়াও ঠিক নয় , ‘কোমা’ জগতের ভিতরে কম কম কেমন যেন কমমাত্রায় জিইয়ে থাকা । শ্রাবন্তীর মনেহয় , ইচ্ছে করেই ডাক্তারেরা ঘুমের ইঞ্জেকশান দিয়ে রেখেছে , যেন ক্যাবিন ভাড়া পাওয়া যায় নির্বিবাদে , অতিরিক্ত দেখভালের তেমন দরকারও নেই । বেশ নিশ্চিন্তে টাকা কামানোর উত্তম পন্থা বিশেষ । শ্রাবন্তী পেসেন্টের খবর দিতে ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বারান্দায় বেরিয়ে এলো , এক নার্স জানালো , ভিআইপি লোকের মেয়েটা আত্মহত্যা করতে চেয়ে বাম হাতের কবজি ব্লেড কিংবা ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেছে প্রেমে প্রত্যাখ্যান পেয়ে। প্রচুর রক্তপাত হয়ে রক্ত শূন্যতা দেখা দিচ্ছে , ইমিডিয়েট’ ওরা এক ব্যাগ রক্তের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে রাজী হচ্ছে , রক্তের গ্রুপ শুনে শ্রাবন্তী চমকে ওঠে । তার নিজেরই রক্তের গ্রুপ । খারাপ কি , যদি এক ব্যাগ রক্ত দিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা পাওয়া যায় ? তার সাথে মেয়েটাকে এবং এই পরিবারকেও খানিকটা উপকার করা যায় । সেইসাথে তার এই সময়ের সমস্যাগুলোর সমাধান হয় আর বাড়ীর সমস্যা কিছুটা হলেও মিটে যাবে । শ্রাবন্তী ব্লাড ব্যাংকের দিকে দ্রুত হাঁটে । প্রায় ঘন্টা খানেক পরে সে ফেরে একটা এক হাজার টাকার নোটের বাণ্ডিল ভরা একটা খয়েরী রঙের খাম হাতে করে । ডিউটি রুমে ঢুকে তার ব্যাগে রেখে চেইন টেনে দেয় । আজ রাতে অন্য কোন মেয়ে থাকবে ডিউটিরত ক্যাবিনটিতে , শ্রাবন্তীর আজ ‘নাইট অফ’ । আজকের রাতে সে নিজের বিছানায় ঘুমাবে হস্টেলের সেই এক চিলতে চৌকিতে , একটা নানীর দেয়া সেলাই করা কাঁথা বিছিয়ে । তোষক কেনার টাকা তাঁর জোগাড়ে ছিলনা । টাকাটা পেয়ে ভাবতে থাকলো , এই টাকা দিয়ে সে কি কি করতে পারবে ? আপাতত শুজানা’র জন্য জামা আর একটা স্কুল ব্যাগ কিনে পাঠাতে বলেছে , পলিথিনের ব্যাগে করে সে সপ্তম শ্রেণীর বই খাতা নিয়ে স্কুলে যায় , মনেমনে সেটা বেমানান মনেকরে বলেই গত পরশু লীলার ফোনে সেই দুঃখবোধটা জানিয়েছে শুজানা । তারপর নিজের জন্য একটা মোবাইল ফোন কিনতে হবে , যাতে করে মা আর শুজানার সাথে যোগাযোগ রাখতে পারে নিয়মিত । তারপর নিজের জন্য দুই সেট থ্রী পিস কিনতে হবে । বাকি টাকা দিয়ে পাশের একটা মহিলা কলেজে বিকালের সিফটে গ্রাজুয়েশানে ভর্তি হতে চায় শ্রাবন্তী । দেখা যাক , আপাতত সে নিজের কাজ হিসাবে ওই রোগিণীর সব ওষুধপত্র গুছিয়ে দিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামে । বেশি দূরে নয় তাদের লেডিস হোস্টেল ‘মনোরমা’ , সেদিকেই সে পা চালায় । কিছুদূর আসতেই নজর পড়ে রাস্তার উলটো দিকের নামী দামী সেই রেস্টিরেন্টের নিয়ন আলো জ্বলছে উজ্জ্বল হয়ে যা তার চোখে ধাঁধাঁ তৈরি করে । শ্রাবন্তী রাস্তা পার হয়ে সেদিকেই হেঁটে যায় । যেতে যেতে ব্যাগের টাকাটার অস্তিত্ব হাত দিয়ে টের পেতে চায় মৃদু আঙ্গুলের চাপ দিয়ে । নাহ , আজ ওখানে সে বসে কিছু খেয়েই উঠে আসবে , খালি খালি না খেয়েই বেরোবে না । বেশ ক্ষুধাও পেয়েছে তার ।
    দামী রেস্টুরেন্টটিতে ঢুকে সামনের একপাশের টেবিলে জড়সড় হয়ে বসে সে , মেন্যুতে নাম না জানা দুই তিনটা আইটেমের খাবার অর্ডার করলো শ্রাবন্তী ছবি দেখে দেখে । গোলাপি রঙের শালোয়ার কামিজে রেস্টুরেন্টের আধো আলো আধো ছায়ায় তাকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে ।
    অনেক ছেলে মেয়েরা একসাথে জোড়ায় জোড়ায় এবং দলবেঁধে এসে ভিতরে ঢুকছে । বয়স্ক ভদ্রলোকরাও একসাথে বসে মিটিং করছে কোন টেবিলে । একপাশে একটা টেবিল নিয়ে চুপচাপ বসে আছে শ্রাবন্তী । অর্ডার করা খাবার পাবার অপেক্ষায় । হিসাব কষছে ব্যাগে রাখা টাকার অংক সাথে অনেক কিছুর মূল্যমান , যোগ বিয়োগ চলছে মনেমনেই । সামনের খালি টেবিলে তার কাঁধের ব্যাগটি নামিয়ে রেখে আনমনা হয়ে বসে আছে শ্রাবন্তী । হঠাত এক ছেলে হুড়মুড় করে ঢুকে তার সামনের চেয়ারে এসে ধপাস করে বসে পড়ে , বসেই বলা শুরু করে ,
  • নিশ্চয় তুমি আইমান শারমীন ? আমি ‘সোহেল’, সরি ! সরি , গতকাল আমার আসতে লেট হয়েছিল বলে তুমি রেগে মোবাইল ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তোমার ফোনটাই ভেঙ্গে ফেলেছো । শিহাব আমাকে রাতে ফোনে বলছে এসব কথা । আর আজও দেরী হলো , কারণ কি জানো ? তোমার জন্য ফোন কিনতেই তো গেছিলাম মার্কেটে, তাই দেরী হয়ে গেছে । রাস্তায় খুব ট্রাফিক জ্যাম ছিল । তুমি কিন্তু না বলতে পারবে না , এটা আমার তরফ থেকে তোমার জন্য ফার্স্ট ‘গিফট’ ।
  • আপনার বোধহয় কোথাও একটা ভুল’ হচ্ছে , আমি আপনার সেই ‘আইমান’ নই , আমি শ্রাবন্তী ।
    -বাহ বেশ করেছো , আগেই খাবারের অর্ডার করে দিয়েছ ? দারুন হবে ! আমারও খুব খিদে পেয়েছে ।
  • শোনো , ফোনে প্রথমেই আমার নম্বর দুইটাই তোমাকে এই ফোনে সেইভ করে দিয়েছি , আজ রাতে কল দিও কথা হবে , অনেক অনেক কথা !
  • আসলে আপনি সেই শুরু থেকেই ভুল করছেন । আমি আইমান’ না । আর আমিও আপনাকে চিনি কিংবা জানিও না । প্লিজ ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করেন ।
  • তুমি বললেই হলো , এই যে আমার কথামতো তুমি আমার পছন্দের পিংক কালারের ড্রেস পরে এসেছো , এই যে ডান দিকের কর্নারে সামনের টেবিলে বসেছো । এই তো তোমার সুন্দর খোলা চুল , সব মিলে যাচ্ছে আমাদের আগের কথা মতো ।
  • আমি বলছি , আপনি ভুল করছেন ।
  • নাহ আমি মোটেও ভুল করছিনা মাই ডিয়ার ! রেগে তুমিই আমাকে চিনতে অস্বীকার করে ভুল করছো । যাহোক , খাওয়া এসে গেছে , খেয়ে নিই , ‘হাংরি ম্যান ইজ এংরি ম্যান ‘ , পরে সব ঠিক বুঝাবুঝি হবে । নাও নাও , ওয়াও ! এ দেখি সব আমার পছন্দের খাবার ।
  • কি আশ্চর্য , পাগল নাকি ? বলছি আমি যাকে আপনি ভাবছেন, আমি সে নই । আর আপনার পছন্দও আমি জানিনা , আমি শ্রেফ আমার জন্যই খাবার অর্ডার করেছি ।
  • ঠিক আছে যেই হও , যাই হও , আই লাইক ইউ , লাভ ইউ বেইবী । ওকে ?
    শ্রাবন্তী এতোক্ষণে এই ছেলের বক্তব্য থেকে বুঝে নিয়েছে , ‘আইমান’ নামে এক মেয়ের সাথে তাঁর পরিচয় হয়েছে , ফোনে কথা হয়েছে কিন্তু একে অপরকে ওরা দু’জনেই দেখেনি , আজ এইখানে দেখা করার কথা ছিল এই একই সময় । তার মতো এই একই রঙের গোলাপী জামা কাপড়ে , এই একই টেবিলে । ওহ , কি অদ্ভুত এই ছেলে , তবে দেখতে মন্দ না , সুদর্শন , স্মার্ট – তবে বেশ একটু পাগলাটে ।

খাবার পরিবেশনের জন্য ওয়েটার এসে পাশে দাঁড়িয়ে পরিবেশন করতে চাইলে সে বলে –

  • আমিই দিয়ে দিচ্ছি , আপনি রাখেন টেবিলে ।
    খাবার শ্রাবন্তীর প্লেটে তুলে দিতে দিতে ছেলেটি বলে ,
  • আমার আইডি ‘ফেইক’ , মানলাম । কিন্তু আমার নাম , আমার পরিচয় , আমার ভালোবাসা সব খাটি আইমান, ওহ, সরি ‘শ্রাবন্তী’। বিশ্বাস করো , আমি তোমাকে সব আজ বলবো , তাই তো আসতে বলছিলাম , যাতে সামনাসামনি সবকিছু বুঝায় বলতে পারি ।
  • ঠিক আছে , বলেন শুনি , আমার কথা তো শুনতেই চাইলেন না , আমিই শুনে দেখি কি বলতে চান আপনি ।
  • গুড গার্ল ।
    শ্রাবন্তীর প্লেটে সোহেল খাবার তুলে দিচ্ছে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে বসে ওর মুখের দিকে হাসিমুখ নিয়ে তাকিয়ে থেকে । কি যেন এক ভালোলাগা বুকের ভিতরটা ভরিয়ে দিচ্ছে ।
  • আরে করেন কি ! আমাকেই তো সব দিয়ে দিচ্ছেন , প্লিজ আর না । শ্রাবন্তী উঠে দাঁড়িয়ে সোহেলের কব্জি দুইহাতে ধরে ঠেলে জোর করে ওর প্লেটের দিকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে ।
    ঠিক সেই মুহূর্তে রেস্টুরেন্টের দরজা দিয়ে এক মেয়ে প্রবেশ করে সামনের কর্নার টেবিলের অদূরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রাগে ক্ষোভে চোখ মুখ লাল করে দ্রুত বেরিয়ে যায় । শ্রাবন্তীর মুখ দরজার দিকে থাকায় সে মেয়েটিকে স্পষ্ট দেখতে পায় , সোহেলের পিঠ দরজার দিকে বলে সে এই মুহুর্তে দেখতে পারছেনা । শ্রাবন্তী মনেমনে হিসাব করে নেয় , এই হচ্ছে সেই ‘আইমান’, গোলাপি সুন্দর একটা থ্রি পিস’ পরা গোলগাল চেহারার সুন্দরী এক মেয়ে , যে কিনা সোহেলের প্রস্তাবিত না দেখা সেই প্রেমিকা । বড়লোকের বদমেজাজি মেয়ে । তাঁদের দু’জনের এমন ঘনিষ্ঠ পরিবেশে দেখে অসম্ভব অস্থির হয়ে রেগে ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত গেটের দিকে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় । শ্রাবন্তী মৃদু হাসে । বিষয়ের নাটকীয়তা টের পায় সে । আর যাই হোক , এই মেয়ে আর ফিরছেনা , এতোটুকু বুঝে ফেলে ।
  • শোনো শ্রাবন্তী, কেন ভুল বলেছি , ওই আইডি আমার না । ওইটা ফেইক আইডি খুলেছি এই জন্য যে , এক মেয়ের সাথে আমার তিন বছরের প্রেম ছিল , পারিবারিক ভাবে কিছু অশান্তি আমাদের দুই পরিবারের ভিতরে সৃষ্টি হওয়ায় , তার ভাই আমার নামে ‘কেইস’ করে দেয় । ,তা নিয়ে ‘মামলা’ হয় , তারা এলাকায় খুব প্রভাবশালী , আমি একটা পলিটিকাল পার্টি করি , ওরা হইল আমার বিপরীত পার্টি , আমাদের সাথে এইজন্য বনিবনা হয় নাই। মেয়েটার জোর করে ওরা অন্য জায়গায় বিয়েও দিয়ে দিয়েছে । এই সমস্ত কারণেই আমি নাম বদলে , ছবি বদলে ‘ফেসবুকে’ ওই নামে আইডি খুলেছি , প্লিজ প্লিজ মন খারাপ করোনা ।
  • না , মন খারাপ করছিনা , আমার কোন আইডিও’ নাই ।
  • নাই মানে ? ওইটা বন্ধ করে দিছো ? বেশ ভালো করছো , আমার তোমার বন্ধুগুলারে একদম পছন্দ না ।
  • আমার কোন বন্ধুই নাই ।
  • আরো ভালো হইছে , সব ভূয়া পাব্লিক মেয়েদের আইডি’ দেখলেই লাফাইয়া পড়ে , যত্তোসব ।
  • খুশি তো আইডি’ না থাকায় ?
  • আরে খুশি মানে , এই খুশিতেই আগামীকাল ট্রিট’ দিবো তোমাকে ।
  • আর একটা কথা শ্রাবন্তী ! তুমি যে রাগ হয়েছো , বলো তুমিও তো তাইলে নিজের নামে ‘আইডি’ খুলোনি , এর আগে তুমিতো বলোও নাই যে , তোমার নাম ‘আইমান’ না । তারপর ছবিও ছিলো ‘ফেইক’ তাইলে বুঝো তুমিও তো এক ধরণের ‘ফেইক’ আইডি ।
    যাহোক , আমি খুব খুশি এই কারণেই যে , তোমার কণ্ঠস্বর ফোনের চাইতে সরাসরি বেশি মিষ্টি আর দেখতেও সামনাসামনি তুমি অনেক অনেক আকর্ষণীয়া । আজ থেকে আমরাই আসল , আমিও আসল , তুমিও আসল থাকি , বাদ দাও তোমার আমার ওই ‘ফেইক’ আইডি ।
  • হুম ম , বাদ দিলাম সব , জয়তু – ‘ফেইক আইডি’ …

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১০৮৫ বার

Share Button

Calendar

May 2019
S M T W T F S
« Apr    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031