শিরোনামঃ-


» টেকসই উন্নয়নে কৃষি

প্রকাশিত: ১৭. জুলাই. ২০২০ | শুক্রবার

মো. সাব্বির খান

আলমাস মিয়া উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ব্যক্তি। গ্রামের মানুষ তাকে এক নামে জানেন। উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে তিনি বড়ো ধরনের চাকুরি করবেন স্যুট কোট টাই পড়ে অফিসে 


যাবেন এমনটাই ধারণা ছিল সবার। কিন্তু তিনি পড়াশুনা শেষ করে চাকুরিতে মনোযোগ না দিয়ে নেমে পড়েন চাষাবাদ কাজে। এলাকার লোকজন তার এ কাজে সমালোচনা করলেও বর্তমানে তিনি এলাকার একজন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং সমাজে সুপরিচিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।

বছর তিনেক আগে বেগুন চাষাবাদের মধ্যে দিয়ে তার সাফল্যের সূত্রপাত ঘটে। প্রথমে তিনি এক একর জমিতে বেগুন চাষাবাদ করেন। চাষাবাদে যাবতীয় পদ্ধতি যেমন কিভাবে বীজ তলা তৈরি করা যায়, মাটিকে বেগুন চাষে উপযোগী করা,  পরিমাণ মতো সার প্রয়োগ ও 

বিভিন্ন প্রকারের সার প্রয়োগ পদ্ধতি ও অন্যান্য উপকরণ প্রাথমিক অবস্থায় উপজেলা কৃষি অফিসাদের সাথে সার্বক্ষণিক পরামর্শে তিনি চাষাবাদ শুরু করেন। বর্তমানে  চাষাবাদ সম্পর্কে যাবতীয় পরামর্শ ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে নিজ বাড়িতে থেকেই সেবা নিয়েছেন। করোনার এই সংকটময় অবস্থায় কৃষিতে ডিজিটালের সংযোজন কৃষিকে আরো বেশি সমৃদ্ধ করেছে।  

ডিজিটাল কৃষি বাস্তবায়নে কৃষি তথ্যসেবা ও কমিউনিটি রেডিও কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য কমিউনিটি বুরাল রেডিও স্টেশন, ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি 

তথ্য ও যোগাযোগকেন্দ্র বা Agriculture Information and Communication Centre (AICC) স্থাপন করা হয়েছে। কৃষি এবং কৃষিভিত্তিক সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের ই কৃষি সেবার ব্যাপক উন্নয়ন এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কৃষকের জানালা, কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা, কৃষি বাতায়ন, বন্ধুফোন, Online Fertilizer Recommendation Software, Bangladesh Rice Knowledge Bang  ইত্যাদি । কৃষক বন্ধু ফোনসেবা ৩৩৩১ মাধ্যমে বাড়ি বসে কৃষি পরামর্শ পেতে পারেন সবাই । 

অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক যে কোনোখাতের ইতিবাচক এবং টেকসই পরিবর্তনকে উন্নয়ন বলে অভিহিত করা যায়। গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষিত, কম শিক্ষিত কিংবা বিভিন্নভাবে ব্যবহারিক এবং কর্মমুখী শিক্ষালব্ধযুব ও যুব মহিলাদের কাজে লাগিয়ে দেশে উৎপাদনশীলতা 


বাড়ানোর ক্ষেত্রে কৃষি একটি বিশালখাত। দেশের উন্নয়নখাতের সমৃদ্ধি বিবেচনায় কৃষিখাতের 
ভূমিকা স্বীকার করতেই হবে। বর্তমান সরকার কৃষিতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন এনে দিয়েছে। বিশাল জনগোষ্ঠীর এ দেশে খাদ্যের চাহিদা মেটানো বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য । কৃষির উন্নত জাতের বীজ, ক্ষুদ্র সেচের মানোন্নয়ন, বিভিন্ন জায়গায় জলাবদ্ধতা নিরসনে দেশ এগিয়ে গেছে 

অনেক দূর। শুধু বীজ বপন করেই নয়, বীজ থেকে ফলন পেতে, ফসলকে যাবতীয় রোগের হাত থেকে মুক্ত রাখতে সরকারি কার্যক্রম উল্লেখ করার মতো। এছাড়াও, কম সময়ে দ্রুতউৎপাদন, সঠিক সময়ে সঠিক বীজবপন, একই জমির পূর্ণব্যবহার সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই কৃষির উন্নয়ন সম্ভব। পরমাণু ও জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করে লবণাক্ততা সহিষ্ণু এবং স্বল্প 


সময়ের শস্যেরজাত ও প্রযুক্ত উদ্ভাবন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল উপকূলীয় এলাকা ধান চাষের আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবনের ফলে দেশের দক্ষিণ অংশের উপকূলীয় এলাকা ধানচাষের আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গা এলাকায় উপযোগী সর্বোচ্চ ১১০ দিনে উৎপাদিত শস্যের জাত চাষের মাধ্যমে এলাকাটিকে ক্ষধামুক্ত করার পাশাপাশি বেকারদেরও কর্মসংস্থান হয়েছে।

করোনা দুযোগের কারণে বহু মানুষকে চাকুরি হাড়াতে হয়েছে ও ব্যবসায় করতে না পারার কারণে অনেক মানুষ আজ কর্মহীন হয়ে গ্রামের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এখন এই মানুষগুলোকে একমাত্র কৃষিই পারে তাদের অর্থনীতিক কিংবা আয়বর্ধক কাজে ফেরাতে। উৎপাদনশীলতা ও 

আয়বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধির জন্য কৃষির ভূমিকা অনবদ্য। দেশের জিডিপিতে সার্বিকভাবে কৃষিখাত গুরুত্বপূ র্অবদান রাখে। কৃষি সামাজিক কর্মকান্ডের এক বিশেষক্ষেত্র, যা জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা 

আয়ের সুযোগসৃষ্টি ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসকরণে কৃষিক্ষেত্রের উন্নয়ন এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা অপরিহার্য। বর্তমানে এসব বিষয়াদি মাথায়রেখে পূর্বের ন্যায় কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

কৃষি জমি কমতে থাকা, জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরির্তনের ফলে বন্যা, খরা লবণাক্ততা ও বৈরি প্রকৃতিতে খাদ্য শস্য উৎপাদনের বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনের মাধ্যমে দেশের 


বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটানো সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্য পূরণে দেশজখাদ্য শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ কৃষিখাতের সার্বিক উন্নয়নকে সরকার সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। কৃষি খাতের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ক্ষুদ্র সেচ সম্প্রসারণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, উন্নতমানের ও 


উচ্চফলনশীল বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রভৃতি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ ও সেচ যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা বৃদ্ধি লক্ষ্যভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণ, ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ সহজলভ্যকরণ ও এর সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, কৃষি উপকরণে পর্যাপ্ত ভর্তুকি প্রদান, কৃষিজাত পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ, ফসল সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণসহ সকল 

কৃষিজাত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও হাওর এলাকায় পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে

 


কৃষি জমির আওতায় সম্প্রসারণ ও একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি করে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিশাল জনগোষ্ঠীর দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি, পল্লি অঞ্চলের উচ্চতর প্রবৃদ্ধি, কৃষি উন্নয়ন এবং গ্রামীণ কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট অ-কৃষি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উন্নয়নের প্রযোজনীয় তার উপর গুরুত্ব আরোপ করে জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। 

কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়।  বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯ থেকে নেওয়া তথ্যেরভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এর সমন্বিত হিসেব অনুযায়ী (২০১৭- ১৮) অর্থবছরে খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদন হয়েছে ৪১৩.২৫ লক্ষ মেট্রিকটন। এর মধ্যে আমান ১৩৯.৯৪ লক্ষ মেট্রিকটন, 

বোরো ১৯৫.৭৬ লক্ষ মেট্রিকটন এবং গম  ১১.৫৩ লক্ষ মেট্রিকটন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আউশ ২৭.০২ লক্ষ মেট্রিকটন এবং ভুট্টা ৩৮.২৮ লক্ষ মেট্রিক টন উৎপাদিত হয়েছে। কৃষি উপকরণ পর্যাপ্ত ভর্তুকি প্রদান, কৃষকের কাছে সহজলভ্যভাবে কৃষি উপকরণ পৌঁছানো লক্ষ্যভিত্তিক কৃষির উন্নয়ন, ফসল সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টির ফলে আজকে আমরা সোনার বাংলার দাড়প্রান্তে অবস্থান করছি।

করোনা পরবর্তীতে দেশের খাদ্য সঙ্কট মোকাবিলায় কৃষিখাতে গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। আর তাই বাড়ানো হয়েছে কৃষি খাতের বাজেটও। বাজেটে কৃষি বরাদ্দের পাশাপাশি ভর্তুকিও বাড়িয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরে কৃষকদের টিকেয়ে রাখতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া 

হয়েছে। বাজেটে কৃষিক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ানোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কৃষি অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা। যে বরাদ্দ রয়েছে তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন যেন হয় সেটি বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বাজেট বক্তৃতায় কৃষির ওপরও গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী  বলেন, “কৃষি হচ্ছে আমাদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত। আমরা অধিক খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ ও বীজে 

প্রণোদনা, কৃষি পুনর্বাসনে জোর দেওয়া ও সারের ওপর ভর্তুকি অব্যাহত রাখবো”। ২০২০-২১ অর্থবছরের কৃষককে টিকিয়ে রাখতে কৃষি খাতের কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, ভূমি এবং পানি সম্পদ এই পাঁচটি খাতে ২৯ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা মোট বাজেটের ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে  এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ১৮ কোটি টাকা। সে হিসেবে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে দুই হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা।

জনসাধারণের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরনে লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় বিভিন্ন খাত ও উপ-খাত যেমন: কৃষি গবেষণা ও শিক্ষা  কার্যক্রম; কৃষি সম্প্রসারণ ও প্রশিক্ষণ, কৃষি পণ্যের বিপণন, কৃষি সহায়তাও পূর্ণবাসন; কৃষি উপকরণ ও  যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন সংগ্রহ ও 

ব্যবস্থাপনা; বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ: সেচ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেচ কার্যক্রম; শস্য সংরক্ষণসহ সামগ্রিক কৃষি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বহুমুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে আমরা শুধু চাল নয় টেকসই উন্নয়নে দেশজ চাহিদা 

পূরণ করে অনেক কৃষিপণ্যেই রপ্তানি করতে পারবো। এতে করে আমাদের দেশ যেমন সমৃদ্ধি অর্জন করবে তেমনি দেশের মানুষের জন্য বয়ে আনবে কল্যাণ। সে প্রত্যাশা হোক সবার।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৭১ বার

Share Button