‘ডর’-এর ‘টেরট বাবা’কে গ্রেফতার করেছে সিআইডি

প্রকাশিত: ১০:৫০ অপরাহ্ণ, মার্চ ২, ২০১৮

‘ডর’-এর ‘টেরট বাবা’কে  গ্রেফতার করেছে সিআইডি

রেডিও অনুষ্ঠান ‘ডর’-এর ‘টেরট বাবা’কে (৩২) গ্রেফতার করেছে  সিআইডি।

বুধবার রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় বিষয়টি ।

সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম জানান, গ্রেফতারকৃত রেজা ওরফে টেরট বাবা ২০১৬ সালের অক্টোবর মাস থেকে এবিসি রেডিওর ‘ডর’ অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। প্রথম দিকে সেই অনুষ্ঠানে শুধু ভূতের গল্প বলা হতো। পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠানটিতে মানুষের নানা ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য ‘টেরট কার্ড সেগমেন্ট’ নামে একটি বিষয় যুক্ত করেন। সেই অংশে রেজা মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষৎ বলে জ্বিন-ভূতের ভয় দেখাতেন। এর মাধ্যমে সহজ-সরল মানুষের কাছে আতর, মুক্তা, আংটি চড়া দামে বিক্রি করতেন তিনি।

সিআইডির এই কর্মকর্তা জানান, চড়া দামে পণ্য কিনে স্বাভাবিকভাবেই কারো কোনো উপকার হয়নি। প্রতারণার শিকার বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী রেজার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মামলা করেন। সেসব মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়।

নজরুল ইসলাম জানান, রেজা ফেসবুক ও ইউটিউবে বেশ কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেগুলোতে দেখানো হয়, তিনি হাত দিয়ে জ্বিন ধরতে পারেন, খালি হাতে মোমবাতি জ্বালাতে পারেন। বিভিন্ন রঙের কার্ড দেখিয়েও প্রতারণা করেন এই যুবক।

এবিসির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ডর’ উপস্থাপনা করত রেডিও জকি (আরজে) কিবরিয়া। এই ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক আছে কি না জানতে চাইলে সিআইডির পুলিশ সুপার বলেন, ‘গ্রেফতার রেজাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই ঘটনার সঙ্গে যদি আরজে কিবরিয়ার কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তবে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এই বিষয়ে আরজে কিবরিয়া বলেন, ভালো সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আমি গত বছরের ডিসেম্বর মাসেই এবিসি রেডিও ছেড়ে দিয়েছি। এখন অন্য একটি রেডিওতে আমি ভালো সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ করছি। আর রেজার এই ঘটনার সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম জানান , এবিসি রেডিওতে ডর অনুষ্ঠানে শুধু ভৌতিক গল্প শোনানো হত। রাদবি রেজা সেখানে কথিত প্যারানরমাল রিসার্চার হিসাবে যুক্ত হন। আর যুক্ত হবার পর থেকেই শুরু হয় মানুষের নানারকম সমস্যার সমাধান পর্ব- ‘ট্যারট কার্ড সেগমেন্ট’।

এই পর্বে কোনো মানুষকে অংশগ্রহন করতে হলে তাকে নির্দিষ্ট একটি নম্বরে ফোন করে নিজের পরিচয় দিতে হতো। ফলে খুব সহজেই বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে তাদের ফোন নাম্বার পেয়ে যেতেন ‘ট্যারট বাবা’। এর পর সংগৃহীত নাম ও মোবাইল নম্বর দিয়ে সার্চ করে ফেসবুক আইডি খুঁজে বের করতেন। সেখান থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতেন। পরে ওই ব্যক্তি যখন তার সাথে (ট্যারট বাবা) দেখা করতেন, তখন তিনি তার ব্যক্তিগত অনেক তথ্যই আগে-ভাগেই বলে দিতে পারতেন। ফলে ওই ব্যক্তির মনে একটা ধারনা জন্ম নিত যে, ‘ট্যারট বাবা’ অনেক কিছু জানেন বা অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী।

বিশেষ পুলিশ সুপার জানান, অনুষ্ঠানটি যেহেতু জনপ্রিয় রেডিও চ্যানেলে প্রচার করা হতো, তাই অল্প সময়ের মধ্যেই এটি লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌছে যেত। আর সহজ সরল মানুষেরা ট্যারট বাবার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি তাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষৎ সম্পর্কে বেশ কিছু কথা বলতেন, যা শুনে অনেক মানুষই তা সত্য ভেবে তার ভক্ত হয়ে যেত। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেওয়াসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা আদায় করতেন।

সিআইডির ভাষ্যমতে, কোন মানুষ তার কাছে চিকিৎসা নিতে গেলে তাদেরকে ‘ট্যারট বাবা’ জানাতেন, তাদের জীন ও ভুতের সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানের নামে আতর, মুক্তা, আংটি ইত্যাদি ব্যবহার করার নামে মানুষের কাছে থেকে টাকা হাতিয়ে নিতেন। মুক্তাগুলো স্বপ্নে পাওয়া বলে দাবি করতেন তিনি।

স্বপ্নে পাওয়া মুক্তা সংক্রান্ত একটি গল্প এবিসি রেডিওতে ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল রাতে প্রচারিত হয়েছিল।

মোল্লা নজরুল ইসলাম জানান, রাদবি রেজা ইউটিউব ও ফেসবুকে বিভিন্ন ম্যাজিক ট্রিকের ভিডিও দেখাতেন। এসব দেখিয়ে দাবি করতেন, তিনি হাত দিয়ে জ্বিন ধরতে পারেন, ব্রেইন দিয়ে লাইট জ্বালাতে পারেন, খালি হাতে মোমবাতি জ্বালাতে পারেন, পরীক্ষার ফলাফল আগে থেকেই বলে দিতে পারেন, ক্যান্সার ও প্যারালাইসিসের রোগীকে ভাল করে ফেলতে পারেন, এমনকি কোমায় থাকা রোগীকেও সুস্থ করে তুলতে পারেন।

রাদবি রেজা ‘ডর’ অনুষ্ঠানের ফেসবুক পেজ ছাড়াও ‘ফেসবুক ট্যারট লাইভ’ নামে একটি পেজ খুলেছিলেন। সেখানে তিনি লাইভে আসতেন। আর ফেসবুকে ট্যারট কার্ড পড়ে মানুষের ‘ভবিষ্যত’ বলে দিতেন। সেই লাইভ পেজে বিভিন্ন মানুষ তার কাছে ভবিষ্যত ও নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান জানতে কমেন্টস করত। অনেকে লাইভে এসে তার সাথে কথা বলত। তখন তিনি তাদের তার সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করতে ববলতেন। এমন যোগাযোগের নামেই তিনি মানুষকে বাসায় নিয়ে চিকিৎসার নামে অর্থ হাতিয়ে নিতেন।

এছাড়াও তার একটি ওয়েবসাইট আছে এবং একটি ট্যারট কার্ড কন্সালটেন্সি ফার্ম আছে। সেখানে তার সাথে দেখা করতে হলে একজন ব্যক্তিকে ২ ঘণ্টার জন্য অগ্রিম ২০ হাজার ৪০০ টাকা দিতে হয়।

সিআইডির সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, রাদবি রেজা ২০১২ সালের ১৪ ই জানুয়ারি শেরে বাংলা নগর থানায় ২০টি চোরাই মোটরসাইকেলসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। এই সংক্রান্ত একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছিল। মামলা নং-১৯, তারিখ- ১৪ জানুয়ারি ২০১২।

এখন যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা এক ভুক্তভোগীর মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলা নম্বর ৩৬, তারিখ ১২ ফেবরুয়ারি ২০১৮।

গ্রেফতারের সময় ট্যারট বাবার কাছে থেকে ট্যারট কার্ড, ১ টি জিপিএস জ্যামার, ২২ টি কথিত মুক্তা, ২৮ টি ধুপ, কথিত ইস্তাম্বুলের আতর ২ টি, ১ টি পড়া পানির বোতল, ৩ টি মোবাইল ফোনসেট, ২ টি সিপিউ ও লাইভের জন্য ব্যবহৃত ১ টি ক্যামেরা উদ্ধার করা হয়েছে ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

http://jugapath.com