» ডাঃ সাবরিনা ও দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা

প্রকাশিত: ১৪. জুলাই. ২০২০ | মঙ্গলবার


খছরু চৌধুরী

ডাঃ সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। পেশায় প্রজাতন্ত্রের সরকারি বেতনভুক স্বাস্থ্যকর্মী। জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের চিকিৎসক। আইনের হেরফের যাই থাকুক, বস্তুত দেশের আর দশজন চিকিৎসকের মত সে তার স্বামীর গড়ে তোলা এনজিও দ্বারা পরিচালিত স্বাস্থ্য সেবামূলক ব্যবসার ভাগীদার। তিনি জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার গ্রুপ (জেকেজি)’র চেয়ারম্যান কি না, এর চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হলো – তার অপরাধ কি? দেশের জনস্বাস্থ্য রক্ষার নাম করে জনস্বাস্থ্য ধ্বংসের যে কিলিং মিশন চালিয়েছে জেকেজি – ডাঃ সাবরিনা তার চিকিৎসা বিজ্ঞানের শপথ (OATH) ভুলে গিয়ে এই মিশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, এই সত্যটাই আইনের চোখে বড় অপরাধ। একজন চিকিৎসক যখন এই অপরাধের কর্মে জড়িয়ে পড়েন তখন জনমনে ব্যাপক আতংক, প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক এবং এই প্রতিক্রিয়াটাই সর্বত্র দেখা যাচ্ছে।

চিকিৎসা সেবার আইন-বিধি-নীতিমালা ভঙ্গ করে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের নির্ধারিত কাজের পদ্ধতি অনুসরণ না করে চিকিৎসা বাণিজ্যে রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায় থেকে যে যে সহযোগিতা প্রদান করা হয় ইহার একটি হলো জেকেজি নামের অখ্যাত এনজিও’র কার্যক্রম। দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা একটা ব্যবস্থাপন পদ্ধতিতে হঠাৎ এরকম অস্বাভাবিক অসঙ্গতি ধরা পড়লে বুঝতে হবে এর শেখর অনেক গভীরে। এসব অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও অপরাধ কর্ম কখনো একদিনে বা এক মাসে সংঘটিত হতে পারে না। একটা মিথ্যা মিথের উপর দাঁড়িয়ে কিছুদিন আগেও যারা উন্নয়নের গালগল্প শুনিয়ে বাংলার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে বিশ্বের রোলমডেল বলে প্রচার করতেন, বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯ এর আক্রমণ না আসলে তাদের মুখে চুনকালিও পড়ত না। বাংলার জনগণের মৌলিক মানবিক অধিকার ‘স্বাস্থ্য’ নিয়ে যে অমানবিক চিকিৎসা বাণিজ্যের অনৈতিক মুনাফায় সহজেই কোরপতি হওয়া যায় এই জঘন্য চিত্রটাও জনসমক্ষে আসত না।

সচেতন দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, দেশের সংবাদকর্মী ও মিডিয়া মালিকেরা অনুসন্ধানী সৃজনশীল জনকল্যাণমুখী সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ যেমন হারিয়েছেন তেমনি ঝোক বাড়ছে চটকদার মুনাফা নির্ভর সাংবাদিকতায়। ডাক্তার সাবরিনার অপরাধকর্ম কেন্দ্র করে মিডিয়া মালিকেরা পত্রিকার বিক্রি বাড়িয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলে মনোযোগ দিয়েছেন। এই অশুভ প্রবণতার আড়ালে ঢাকা পড়ছে চিকিৎসা বাণিজ্যের নানা অপকর্ম, আড়াল হচ্ছে অনৈতিক ইন্ধনদাতা, সরকার ও মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত রাস্ট্রের ভূমিকা। সাবরিনা পেশায় একজন চিকিৎসক হলেও প্রচলিত পশ্চিমা ভোগবাদী আত্মকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা একজন মানুষ। এরকম মানসিক গড়নের কোন নারীর সামনে যখন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামজিক কাঠামোর সকল স্তরে অনৈতিক বা অবৈধ সহযোগিতা দিয়ে শর্টকাট টাকা কামানোর রাস্তা উন্মুক্ত রাখা হয়, তখন ভোগ-বিলাসের মানসিকতা চরমে পৌঁছা স্বাভাবিক। সে কেমন পোজে ছবি উঠেছে, কোথায় গিয়েছে, কয়টা বিয়ে করেছে, কার কার সাথে ঘুমিয়েছে – এটা এই সময়ে প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়োরিটি পাচ্ছে। মিডিয়ায় সাবরিনার ব্যক্তিগত ভোগের বিষয়াদি প্রায়র করা লিখা-লিখি দ্বারা অপরাধী সাবরিনা ও রাস্ট্রযন্ত্রের স্তরে স্তরে থাকা অপরাধী চক্রকে জনমতের রোশানল থেকে বাঁচানোর অপচেষ্টা বলেই প্রতিয়মান হচ্ছে।

৭৫ পরবর্তী সময়কাল থেকে দেশের জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কলাকৌশল যে চিকিৎসা বাণিজ্যের কমিশন নির্ভর ও মুনাফা কেন্দ্রীক নীতির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এই বিষয়টি সকলকে স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। এখানে আইন-বিধি ও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি হলো কাজীর কেতাব। এগুলোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার নীতি ও কর্মপদ্ধতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব-বোধ আমলাতন্ত্র ও সরকার – করোর মধ্যেই নেই। যে কোন দেশের কোনো একটি সুনির্দিষ্ট পেশায় চরম বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম দেখা দিলে ‘প্রেশার গ্রুপ’ নামের সংগঠন এগিয়ে এসে সরকার ও সরকার নিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্রকে পরামর্শ দেয়, কার্যকর ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পর থেকে পেশাদারিত্বের নিরপেক্ষ চরিত্র হারিয়ে বাস্তবে দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করছে। এমনকি কখনো কখনো ভুলতথ্যের সন্নিবেশন দিয়ে একদিকে সরকারকে বিভ্রান্ত করছে, অন্যদিকে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধাভোগী অনৈতিক চিকিৎসা বাণিকদের অবৈধ কর্মতৎপরতা সমূহকে উৎসাহের করছে। জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি নির্ধারিত ১ঃ৩ঃ৫ অনুপাতের ভারসাম্যপূর্ণ স্বাস্থ্যজনবল নিয়োগ দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ জনমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালনের জন্য কোনরূপ প্রস্তাবনা সরকারকে দেয়নি বিএমএ।

দেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রমের একটি বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করে লেখাটি শেষ করতে চাইছি। ধরেন, জেলা সদরের ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। সিটিস্ক্যান, সনোগ্রাপি, এক্সরে, ইসিজি মেশিন-সহ আধুনিক ও রোগ-নির্ণয়ের জরুরি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সুবিধা সরকার রেখেছেন। কিন্তু ঐ হাসপাতালে সপ্তাহে ১ দিন সিটিস্ক্যান, সনোগ্রপি ও ইজিসি সুবিধা প্রদান করে। এর মানে হলো, সরকার পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির সর্বাহ সুবিধা দিলেও, কিভাবে সেবাগ্রহীতাকে বঞ্চিত রাখতে হবে সেই (অপ)কৌশলের নীতিতেই হাসপাতালগুলো পরিচালনা করছেন ম্যানেজারেরা। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। একজন সার্জারী ডাক্তার সরকারী কর্মসময়ে সরকারি হাসপাতালে ২ বা ৪ জনের সার্জারীর বেশী করেন না। কিন্তু ঐ ডাক্তার-ই বেসরকারি চিকিৎসা বাণিজ্যের দোকানগুলোতে গিয়ে দিনে ১২ থেকে ১৪ টা রোগীর সার্জারী সানন্দে করার নজির রাখছেন। আপনি যদি জানতে চান, সপ্তাহে সব দিন কেন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা নেই? ম্যানেজারের সহজ (অজুহাত) উত্তর জনবল সংকট। প্রতি বছর বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগের পাশাপাশি অন্যান্য মেডিকেল টেকনোলজিস্ট স্বাস্থ্যজনল নিয়োগ না দেয়ার মত অব্যবস্থাপনার দায়টাও যে এসকল ম্যানেজারদের – এটা তারা স্বীকার করবেন কি? বিগত ২০০৯ ও ১১ সাল থেকে রোগপ্রতিরোধের ও রোগ-নির্ণয়ের স্বাস্থ্যজনবল তৈরী করে নিয়োগ না দেয়ার দায়টা কার? আর আমাদের জনগণের অধিকাংশ, স্বাস্থ্য-খাতের জনবল সংকট বলতে ডাক্তার ও নার্সেস সংকট মনে করে থাকেন। একটা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি কার্যকর পন্থায় পরিচালিত করতে হলে সকল ক্যাটাগরির জনবল যে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রাখতে হবে, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণের প্রতিনিধি স্বাস্থ্য মন্ত্রী নানা ধরণের আকামে যুক্ত থাকায় এই কাজের কাম গুলো দেখার মত সময় ক’ই? দেশে সরকার নিয়ন্ত্রিত যতগুলো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে তার ৯৮ ভাগ-ই যে সরকারের নিয়ম নীতি মানছেন না – এই সত্য কি সংশ্লিষ্টদের অজানা? উনারা জানেন বলেই, সাধারণ অসুখ-বিসুখেও বিদেশে চিকিৎসা নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

একটা ব্যবস্থাপনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেখানে অনিয়ম অব্যবস্থাপনা ও জনগণকে সরকারি সেবা প্রদানে বঞ্চিত রাখার মানসিকতা কাজ করে, সেখানে এক চিকিৎসা কর্মী ডাঃ সাবরিনার অপরাধকর্ম জনসমক্ষে আসলেও শত শত সাবরিনা-মানসিকতার চিকিৎসা কর্মীর অপরাধ কর্ম জনসমক্ষে এখনো আসেনি। এটা হলো কভিড-১৯ এর মতো, পরীক্ষা না-করালে কতজন সাবরিনা-রোগে অাক্রান্ত তার সঠিক সংখ্যাও বলা যাচ্ছে না। আমার তো মনে হয়, গোঠা সিস্টেমটাকেই সাবরিনা-রোগে পেয়ে বসেছে। ডাক্তার সাবরিনার সেক্স এক্সপোজিং ছবি নয় বরং সাবরিনার অপরাধ কর্মের সূত্র ধরে আমাদের স্বাস্থ্য সেবার গলদগুলো কেন হয়েছে, কে কে করছেন, কেন করছেন, কি সুবিধা পেয়পছেন – এখন এই সব প্রশ্ন বেশী বেশী করা দরকার। তথ্যানুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন তৈরি করে ব্যাপক জনমত ও গণজাগরণ সৃষ্টির তাগিদও থাকা দরকার। এই কাজের অংশীদারীত্ব সকলের হলেও দায়টা সাংবাদিক সমাজের। জাগরিত সচেতন জনমত-ই হতে পারেন অসুস্থ ডাঃ সাবরিনাদের ও অসুস্থ স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা পদ্ধতি বদলে ফেলার একমাত্র চিকিৎসা।

লেখকঃ স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট ও উপদেষ্টা, স্বাসেপ।
ই-মেইলঃ mkmchowdhury@gmail.com

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৭৬০ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031