» ডিজিটাল চলচ্চিত্র

প্রকাশিত: ১০. জুন. ২০১৯ | সোমবার


সৌমিত্র দেব

গণযোগাযোগের ধারায় বিকাশমান একটি শিল্প হলো ডিজিটাল চলচ্চিত্র । নয়া প্রযুক্তিকে ধারণ করেই এর অগ্রযাত্রা । এখানে আছে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত ।দেশ কাল পাত্র সব কিছু ছাপিয়ে যেতে পারে এই মাধ্যম । ডিজিটাল চলচ্চিত্র বিষয়ে আলোচনার আগে জানতে হবে , চলচ্চিত্র কি ? উইকি পিডিয়ার তথ্যে বলা হয়েছে -“চলচ্চিত্র এক প্রকারের দৃশ্যমান বিনোদন মাধ্যম। চলমান চিত্র তথা “মোশন পিকচার” থেকে চলচ্চিত্র শব্দটি এসেছে। এটি একটি বিশেষ শিল্প মাধ্যম। বাস্তব জগতের চলমান ছবি ক্যামেরার মাধ্যমে ধারণ করে বা এনিমেশনের মাধ্যমে কাল্পনিক জগৎ তৈরি করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। চলচ্চিত্রের ধারণা অনেক পরে এসেছে, ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে। আর এনিমেশন চিত্রের ধারণা এসেছে আরও পরে। বাংলায় চলচ্চিত্রের প্রতিশব্দ হিসেবে ছায়াছবি, সিনেমা, মুভি বা ফিল্ম শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়।

চলচ্চিত্রের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ। যে সংস্কৃতিতে তা নির্মিত হয় তাকেই প্রতিনিধিত্ব করে চলচ্চিত্রটি। শিল্পকলার প্রভাবশালী মাধ্যম, শক্তিশালী বিনোদন মাধ্যম এবং শিক্ষার অন্যতম সেরা উপকরণ হিসেবে খ্যাতি রয়েছে চলচ্চিত্রের। ছায়াছবির সাথে ভিজ্যুয়াল বিশ্বের সমন্বয় থাকায় সাধারণ মানুষের সাথে সবচেয়ে ভাল যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। অন্য কোন শিল্পমাধ্যম সাধারণের সাথে এতোটা যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম নয়। অন্য ভাষার চলচ্চিত্রের ডাবিং বা সাবটাইটেল করার মাধ্যমে নিজ ভাষায় নিয়ে আসার প্রচলন রয়েছে।

প্রথাগতভাবে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় অনেকগুলো একক ছবি তথা ফ্রেমের ধারাবাহিক সমন্বয়ের মাধ্যমে। এই স্থিরচিত্রগুলি যখন খুব দ্রুত দেখানো হয় তখন দর্শক মনে করেন তিনি চলমান কিছু দেখছেন। প্রতিটি ছবির মাঝে যে বিরতি তা একটি বিশেষ কারণে দর্শকের চোখে ধরা পড়ে না। ধরা না পড়ার এই বিষয়টাকে দৃষ্টির স্থায়িত্ব বলে। সহজ কথা বলা যায়, ছবির উৎস সরিয়ে ফেলার পরও এক সেকেন্ডের ১০ ভাগের ১ ভাগ সময় ধরে দর্শকের মনে তার রেশ থেকে যায়। এভাবে চলমান ছবির ধারণা লাভের বিষয়টাকে মনোবিজ্ঞানে বিটা চলন নামে আখ্যায়িত করা হয়। “

তবে বাংলাদেশের খ্যাতনামা চিত্র পরিচালক তারক মাসুদ মনে করেন চলচ্চিত্রের সংজ্ঞা বারবার বদলেছে । তিনি বলেন -“চলচ্চিত্রের একাডেমিক অঙ্গনে সিনেমা শব্দের পরিবর্তে ‘মুভিং ইমেজ’ শব্দটি প্রবর্তনের জোরালো তাত্ত্বিক আওয়াজ তোলা হচ্ছে আজকাল। চলচ্চিত্রের বৃহত্তর সংজ্ঞা কি খুবই দরকার হয়ে পড়েছে? লক্ষ্য করার বিষয়, মুভিং ইমেজ শব্দটি বাংলা ‘চলচ্চিত্র’ শব্দের আক্ষরিক অর্থের অনেক কাছাকাছি।

চলচ্চিত্র কোন দ্রব্য বা পদার্থের নাম নয়, এটি একটি শিল্প-মাধ্যম। দৃশ্যকে সেলুলয়েডে ধারণ করলেই তা চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে না — যেমন টেলিভিশনে কোনো ধ্রূপদী ছবি সম্পপ্রচার করলেই তা টেলিফিল্ম বা নাটক হয়ে যায় না। কারিগরি অর্থে সিনেমার সংজ্ঞা বার বার বদলেছে। মাধ্যমটির আকার-প্রকারের সামান্য পরিবর্তন-পরিবর্ধনে ‘গেল গেল’ রব উঠেছে। কিন্তু বোদ্ধাজনের আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হয়েছে — সিনেমার মৃত্যু ঘটেনি।”

সিনেমা বা চলচ্চিত্র সব সময়ই প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প । এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিত্যনতুন উদ্ভাবন । এটা সত্য, নির্বাক যুগের বাক্সময় ছবিতে আমরা ‘শিশিরের শব্দ’ শুনতে পেতাম, আর আজকের ছবি সারাক্ষণ বকবক করে। তাই বলে এতকাল পরে মাধ্যমটির কণ্ঠরোধ করা বোধ হয় ঠিক হবে না। বহুকাল সাদা-কালোর আলোছায়া ছিল চলচ্চিত্রের মূল বিশেষত্ব। তাতে রঙ লাগলে ‘সর্বনাশ’ হয়ে যাবে বলে তখনকার ডাকসাইটে নির্মাতারাও আশঙ্কা করেছিলেন। অশনি সংকেত (১৯৭৩) দেখে আমরা এখন অবশ্য মেনে নিয়েছি — দুর্ভিক্ষেরও রং আছে। ৩৫ মি.মি.-এর সাথে ১৬ মি.মি.-এর পার্থক্য মূলত মাত্র ১৯ মি.মি. — একথা মানতে অনেক চলচ্চিত্র পণ্ডিতই প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো ষাট-সত্তর, এমনকি আশির দশকের প্রথম সারির অনেক নির্মাতাই তাদের মাস্টারপিস তৈরি করেছেন ১৬ মি.মি. ফরম্যাটে। বাংলাদেশেও তার উদাহরণ রয়েছে — তানভীর মোকাম্মেলের চিত্রা নদীর পাড়ে (১৯৯৯) ও মোরশেদুল ইসলামের চাকা (১৯৯৩)।

কেউ কেউ ধর্মাচারের সাথে চলচ্চিত্র সংস্কৃতির মিল খুঁজে পান। ধর্মের দুটো দিক আছে — এক. অনুশাসন, দুই. সংস্কৃতি। তেমনি চলচ্চিত্র মাধ্যমেরও রয়েছে আকার-আকৃতি ও প্রকার-প্রকৃতির দিক। অর্থাত কারিগরি ও সংস্কৃতির দিক। সিনেমার সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি ‘তুলনামূলকভাবে একটি বড় আকারের অন্ধকার ঘরে অনেকে একত্রে অথচ নিঃশব্দ একাকীত্বের সাথে বড় পর্দার কাছে আত্মসমর্পণ করা’। রিমোট আর মোবাইল টেপার ফাঁকে, লোডশেডিং আর বিজ্ঞাপন বিরতির আগে-পরে, ফোন আর বাচ্চা সামলানোসহ যাবতীয় গার্হস্থ্য কাণ্ডকারখানার মাঝে মাঝে ক্যাবল ও ডিভিডির কল্যাণে আমরা টিভির মিনি পর্দায় যা দেখি তা দেখা নয় — তাকানো; চলচ্চিত্র নয় — চলমান চিত্র মাত্র।
তাহলে এবার আমরা ডিজিটাল চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলি । তারেক মাসুদের মতে -“আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ডিজিটাল চলচ্চিত্র এখন আর তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়। ভবিষ্যতের ব্যাপারও নয়। এটি ইতোমধ্যে একটি বাস্তবতা। বিখ্যাত-অখ্যাত, প্রবীন-নবীন, বড় বাজেট – ছোট বাজেট, উন্নত দেশ – অনুন্নত দেশ, কাহিনীচিত্র-প্রামাণ্যচিত্র নির্বিশেষে নির্মিত হচ্ছে ডিজিটাল ফিল্ম। বিচিত্র কারণে নির্মাতারা ঝুঁকছেন এই ফরম্যাটটির দিকে। অভিন্ন কয়েকটি কারণ অবশ্য ধারণা করা যায়, যা ফরম্যাটটিকে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নির্মাতার স্বাধীনতা, কারিগরি সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক সাশ্রয় ও সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ তাদের অন্যতম। তবে সৃজনশীলতার সুবিধার দিকটিই হয়তো প্রধান কারণ, যা ভিম ভেন্ডারস, কিয়েরোস্তামি, ‘ডগমা’ ধারার নির্মাতা থেকে শুরু করে মাইকেল মুর, হলিউড ব্লকবাস্টার ওপেন ওয়াটার-এর (২০০৩) পরিচালক — সবাইকে একত্র করেছে।

২০০০ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিজিটাল চলচ্চিত্র বিষয়ক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অনেক বিখ্যাত নির্মাতার সাথে আব্বাস কিয়েরোস্তামি ও সামিরা মাখমালবাফ অংশগ্রহণ করেন। ঐ সেমিনারের জন্য সামিরার লেখা নিবন্ধের কিছু অংশের অনুবাদ এখানে তুলে ধরছি —

ঐতিহাসিকভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের সৃজনশীল প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক, আর্থিক ও কারিগরি — এই তিনটি নিয়ামক শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। . . . চাকাকে যদি বলা যায় মানুষের পায়ের গতি সঞ্চালন, তাহলে নির্মাতার জন্য ক্যামেরা তার চোখের সম্পপ্রসারণ। গত শতাব্দীতে ব্যবহৃত ক্যামেরার অতিরিক্ত ওজনের পাশাপাশি, জটিলতার কারণে এটি চালাতে যে পরিমাণ যান্ত্রিক জ্ঞানসম্পন্ন জনবল দরকার হতো, তাতে করে চলচ্চিত্র-নির্মাতার আবেগ ও চিন্তার জন্য এই চোখ আসলে একটা বোঝা ছিল। কিন্তু আজ ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমরা ক্যামেরাকে কল্পনা করতে পারি একজোড়া সরু কাঁচের চশমা কিংবা একজোড়া লেন্সের সঙ্গে, যা চোখের কর্নিয়ায় সংযোজিত হবে অথচ বোঝাই যাবে না . . .

ডিজিটাল বিপ্লবকে আমি কারিগরি জ্ঞানের সর্বশেষ অর্জন হিসেবে দেখি। তবে এই বিপ্লব সিনেমার বিরুদ্ধে নয়। বরং সিনেমা-ইন্ডাস্ট্রির কিছু পেশাদারী কাঠামো ও চরিত্রের বিরুদ্ধে। ডিজিটাল সিনেমার কারণে আমরা চলচ্চিত্রের কেন্দ্রবিন্দু — চিত্রনাট্য, দৃশ্যায়ন, সৃজনশীল সম্পাদনা, অভিনয়সহ কোনো কিছুই হারাবো না। ডিজিটাল ছবি যা বদলে দেবে, তা হলো চিত্রগ্রহণের ধরন, আলোর আয়োজন, পোস্ট-প্রোডাকশন ল্যাবের কাজ ইত্যাদি। চলচ্চিত্র উৎপাদন যন্ত্রের এই কারিগরি বিপ্লরের ফলে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে হয়তো চলচ্চিত্রের মৃত্যু হবে, তবে এই বিপ্লবই চলচ্চিত্রকে সৃজনশীল শিল্প হিসেবে বাঁচিয়ে রাখবে।

এবার আসা যাক বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের পরিপ্রেক্ষিতে ডিজিটাল ফরম্যাটের প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে। প্রথমত, আমাদের দেশে ৩৫ ও ১৬ মি.মি.-এ চিত্র নির্মাণের কারিগরি অবকাঠামোর প্রধান সীমাবদ্ধতা কী কী তা আলোচনা দরকার:

বিভিন্ন স্পিডের ফিল্ম স্টক বেছে নেয়ার সুযোগ থাকাতো দূরের কথা, অনেক সময় তারিখ পার হয়ে যাওয়া স্টক ব্যবহার করতে বাধ্য হন স্থানীয় নির্মাতারা। দরকারি লেন্স, ভিডিও এসিস্টসহ একটি ভালো ক্যামেরাও নেই এদেশে। শব্দ ট্রান্সফারসহ ল্যাবের যাবতীয় কাজ এতই নিম্নমানের যে ‘চলচ্চিত্র অবনয়ন সংস্থায়’ বাকি ও ফাঁকিতে নির্মিত বস্তাপচা কিছু ফ্লপ ‘বাণিজ্যিক’ ছবি ছাড়া সব ছবিরই সম্পাদনাসহ পোস্ট-প্রোডাকশন হয় ভারতে। ব্যবসা সফল মনের মাঝে তুমি ছবির কেবল পোস্ট প্রোডাকশন নয়, প্রোডাকশনও ভারতেই হয়েছে। আর এজন্য নির্মাতাদের মাসের পর মাস মাদ্রাজ, বোম্বে, কলকাতায় কাটাতে হয়েছে।
বিদেশে রাশ প্রিন্টের অন্য নাম ‘ডেইলিস’ (Dailies)। কেননা দিনের শুটিংয়ের ফল দিন শেষেই দেখে কোনো ত্রুটি থাকলে তা পরের দিন শুধরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু আমরা রাশ প্রিন্টকে ‘মান্থলি’ (monthly) নামেও ডাকতে পারি না, কারণ আমলাতন্ত্রের লাল ফিতার গিট খুলে দেশের বাইরে ফুটেজ নিতে নিতে তিন মাস পেরিয়ে যায়। ততোদিনে বসে থেকে থেকে এক্সপোজড ফুটেজ তার রং, রূপ, রস সব হারাতে বসে। এরকম ব্যাপক কারিগরি বিপত্তির মুখে অসহায় নির্মাতার সৃজনশীলতা হার মানে। তার স্বপ্নের চলচ্চিত্রটি প্রায় পুরোপুরি থেকে যায় তার মনের কোণে, অনেকটা থেকে যায় তার চিত্রনাট্যে, কিছুটা রয়ে যায় চিত্রায়নের সময় আর সম্পাদনার টেবিলে। যা অবশিষ্ট থাকে তা মেরামত করাই হয়ে দাঁড়ায় সম্পাদকের কাজ। এই কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারাগারে থেকে কেবল ছবির শৈল্পিক দিকটাই বিসর্জিত হয় না, রাজনৈতিক বিসর্জনও হয় বিস্তর। নানাবিধ সরকারি অনুমতি, অনুমোদন, অনাপত্তির ঘেরাটোপে সেলফ সেন্সরশীপ এসে পড়ে নির্মাতার অজান্তে। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে ডিজিটাল ফিল্ম।

বেশ কয়েক বছর ধরে দুয়েকটি ক্যাবল টেলিভিশনে টেলিফিল্মের বাজেটে ৩৫ মি.মি.-এ দু-আড়াই ঘণ্টার ছবি বানিয়ে টিভি প্রিমিয়ার করছে। তার সঙ্গে একটি, বড়জোড় দুটি হলে, প্রতীকী মুক্তি দিচ্ছে। লক্ষ্য করার বিষয়, টিভি মাধ্যম থেকে একঝাঁক মেধাবী তরুণ নির্মাতা, কলাকুশলী ও শিল্পী বেরিয়ে এসেছেন। বিশেষ করে ভিডিও ফরম্যাটে তাদের অনেকেই দতা অর্জন করছেন। কিন্তু এই টিভি প্রযোজনা সংস্থাগুলো নিজেদের তৈরি কলাকুশলীদের তাদের প্রযোজিত সিনেমায় ব্যবহার করতে পারছেন না। কারণ তাদের ৩৫ মি.মি.-এর কারিগরি জ্ঞান নেই, তারা নির্ভর করছেন তথাকথিত বাণিজ্যহীন বাণিজ্যিক সিনেমার কলাকুশলীদের উপর। একই সাথে ছোট পর্দার সফল নির্মাতারা বড় পর্দায় কাজ করতে এসে তাদের মান বজায় রাখতে পারছেন না। এর কারণ ৩৫ মি.মি.-এর অবকাঠামোর স্থানীয় সীমাবদ্ধতা ও মাধ্যমটির কারিগরি জ্ঞানের অভাব। অথচ তাদের ডিজিটাল প্রোডাকশন ও পোস্ট প্রোডাকশনের অভিজ্ঞতার সদ্ব্যবহার করলে চ্যানেল প্রযোজিত ছবিগুলোর চেহারা বদলে যেত। ছোট পর্দায় — বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মেধাবী যেসব নির্মাতা কাজ করছেন তারা — ক্যামেরা থেকে শুরু করে পোস্ট-প্রোডাকশনের শেষ কাজটি পর্যন্ত কম্পিউটার বা ডিজিটাল প্রযুক্তিতে করে অভ্যস্ত। এই তরুণ প্রজন্ম যদি তাদের পরিচিত কারিগরি যন্ত্রাদি ও কৃৎ-কৌশলকে ভিত্তি করে ছবি বানাতে পারে, তাহলে তাদের নির্মিত চলচ্চিত্রে তাদের প্রতিভার প্রমাণ রাখতে পারবে বলে আমার ধারণা।

ক্যামেরা যতদিন কলমের মতো সহজ ও সস্তা না হবে, ততোদিন চলচ্চিত্র-শিল্পের সৃজনশীল মুক্তি ঘটবে না — একথা এখনও ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাকলেও তরুণ প্রজন্মের কম্পিউটার-স্বারতা স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রে ইতোমধ্যেই ইতিবাচক ফল নিয়ে আসছে — চলতি চলচ্চিত্র উৎসবই এর প্রমাণ। এই উৎসবের ১৬৫টি ছবির মধ্যে কয়টি ছবি চলচ্চিত্র ফরম্যাটে তৈরি? কয়টি ছবি চলচ্চিত্র ফরম্যাটে প্রদর্শিত হচ্ছে? দু’মাস আগে নেপালে অনুষ্ঠিত একটি চলচ্চিত্র উৎসবে জুরিপ্রধান হিসেবে যোগদানের সুযোগ হয়েছিল আমার। শ’খানেক ছবির মধ্যে মাত্র একটি ছবি ছিল ৩৫ মি.মি.-এ তৈরি এবং সেটি ছিল হলিউডের নির্মাতা মিরা নায়ার প্রযোজিত।

আমাদের দেশে চলচ্চিত্র ফরম্যাটে, এমন কি স্বাধীন ধারায়ও, এমন কিছু চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে, যা ঠিক চলচ্চিত্র হয়ে ওঠেনি। অথচ ভিডিও ফরম্যাটে এমন কিছু ভাল কাজ হয়েছে, যেগুলো নিয়মিত ভিডিও ফরম্যাটের পরিবর্তে ডিজিটাল ফরম্যাটে চিত্রায়ন করলে তাকে সহজেই ৩৫ মি.মি.-এ উন্নীত করে দেশে-বিদেশে বড়ো পর্দায় পরিবেশনার সুযোগ নেয়া যেত। এক্ষেত্রে অনেকের সাথে স্বাধীন ধারায় নির্মিত নূরুল আলম আতিক ও শামীম আখতারের ভিডিও ফিল্মসহ বেশ কিছু উদাহরণ দেয়া যায়। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এরকম ভিডিও চিত্রগুলোর চূড়ান্ত পরিণতি টেলিভিশনের odd hour।

গত বছরের জানুয়ারিতে ভারতের মুম্বাইয়ে তুলনামূলক ফরম্যাটের একটি কর্মশালায় যোগদানের সুযোগ হয়েছিল আমার। এর উদ্যোক্তা ছিল ভারতীয় চিত্রগ্রাহকদের সংগঠন সিনেমাটোগ্রাফারস কম্বাইন। এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন কে কে মহাজন থেকে শুরু করে অনিল মেহতাসহ ভারতের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন চিত্রগ্রাহক। জার্মানি থেকে এসেছিলেন একজন নামকরা চিত্রগ্রাহক। তিনি একই আলোতে ১৬ মি.মি., এইচডি, ডিভি ক্যাম বিভিন্ন ফরম্যাটে একই সঙ্গে তোলা দৃশ্যগুলো ৩৫ মি.মি.-এ রূপান্তর করে কর্মশালায় প্রদর্শন করেছিলেন। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সবাই একমত হন — ১৬ মি.মি. থেকে ৩৫ মি.মি.-এ ব্লো-আপ করা ছবির তুলনায় উন্নতমানের ডিভিক্যামে তোলা ডিজিটাল চলচ্চিত্রের ব্লো-আপের পিকচার কোয়ালিটি অনেক ভালো। এইচডি-তো অবশ্যই আরো বেশি ভালো।

চলচ্চিত্রের প্রযুক্তি কেবল উন্নত হচ্ছে না, ক্রমশ সহজ, সহজলভ্য ও সস্তাও হচ্ছে। এটি সম্ভব হয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তির আগমনের ফলে। চলচ্চিত্রের চিত্রায়নের প্রকরণ হওয়ার আগে থেকেই, ডিজিটাল প্রযুক্তি চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্যান্য কারিগরি দিকগুলোতে কেবল ব্যবহৃতই হচ্ছে না, এর ব্যবহার এখন অনিবার্যও হয়ে পড়েছে। শব্দ-গ্রহণ, শব্দ-মিশ্রণ, সম্পাদনা এমনকি পরিস্ফুটনের ক্রিয়াকর্মও এখন ডিজিটাল ডিভাইসের আওতায়। ডিজিটাল ইন্টারমিডিয়েট (D.I.) আজকের রক্ষণশীল নির্মাতাদের কাছেও অজানা নয়। হলিউড-বলিউডের প্রথম সারির নির্মাতারা ৩৫ মি.মি.-এ চিত্রায়ন করেও প্রথাগত এনালগ প্রক্রিয়ায় ফেড-ইন, ফেড-আউট থেকে শুরু করে সব ধরনের অপটিক্যাল ইফেক্টের দৈন্য ঢাকতে এই ডিআই প্রক্রিয়া ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ ডিজিটাল ফরম্যাটের শরণাপন্ন হচ্ছেন।

তবে পশ্চিমে, বিশেষ করে স্টুডিও ভিত্তিক চলচ্চিত্রে ডিজিটাল ফরম্যাটের ব্যবহারের চরিত্র বেশ ভিন্ন। সেখানে High end H.D. ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে — যা বাজেটের দিক থেকে ৩৫ মি.মি.-এ ছবি নির্মাণের থেকে সস্তা নয়। তাছাড়া একাধিক ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে উন্নত বিশ্বে স্বাধীন ধারায় ডিজিটাল ফরম্যাটে যে সব কাজ হচ্ছে, তা অনেকটা প্রোডাকশন পর্যায়ে ১৬ মি.মি. ব্যবহার করে পরে পরিবেশক বা তহবিল সংগ্রহ করে ৩৫ মি.মি.-এ ব্লো-আপ করার সাথে তুলনীয়। অর্থাৎ বড় বাজেটের ছবির ক্ষেত্রে ডিজিটাল ফরম্যাট নির্মাতার বেছে নেয়া মাধ্যম। স্বাধীন ধারার ক্ষেত্রে এটি এখনও বিকল্প মাধ্যম। কারণ ফরম্যাটটি সহজ, সুলভ ও সস্তা।

আশির দশকে যেকোনো সৃজনধর্মী নির্মাতার জন্য যখন মূলধারায় চলচ্চিত্র নির্মাণ অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, তখন মোরশেদুল ইসলাম ও তানভীর মোকাম্মেলের নেতৃত্বে বেশ কিছু তরুণ ১৬ মি.মি.-এর বিকল্প ফরম্যাটে ছবি বানিয়ে একটি আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। কম্পিউটার স্বার নতুন প্রজন্মের জন্য আজ ১৬ মি.মি.-এর সেই বিকল্পধারার সময়োপযোগী বিকল্প খুঁজে বার করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এখন হয়তো গুরুত্বের সঙ্গে হয়তো ভাবতে হবে ডিজিটাল ফরম্যাটের কথা। নতুন প্রজন্মকে বড় পর্দার কাছে — বৃহত্তর দর্শকের কাছে — যেতে হবে। বুঝতে হবে ভিডিও চিত্রের চূড়ান্ত দৌড় টেলিভিশন পর্যন্ত। পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে, দখল করে নিতে হবে মূলধারা। মাত্র দশ বছর আগেও বাংলাদেশের একজন নির্মাতার পে ইউরোপ, আমেরিকার ছবির কারিগরি মানের সাথে পাল্লা দেয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু ডিজিটাল বিপ্লব (Digital Revolution) প্রযুক্তির গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আজ এই সুযোগ ব্যবহার করে অর্জন করতে হবে ডিজিটাল লিপ ( Digital leap)। শুধু দেশীয় মূলধারা নয়, স্থান করে নিতে হবে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের মানচিত্রে।

ডিজিটাল বিপ্লব চলচ্চিত্র মাধ্যমের চরিত্র নষ্ট করবে না, বরং চলচ্চিত্র নির্মাণের অতিযান্ত্রিক চরিত্রকে নির্মাতার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে, নির্মাতা ও টেকনিশিয়ানদের মধ্যকার বিশাল বিভাজন ও দূরত্বকে দূর করবে। একজন নির্মাতা সহজেই টেকনিশিয়ানের দায়িত্বের ভাগ নিতে পারবেন। টেকনিশিয়ানরাও নির্মাতাকে কারিগরি অবদান বোঝাতে সক্ষম হবেন।
ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবাদে একজন চলচ্চিত্রকার কারিগরি বোঝায় ভারাক্রান্ত না হয়ে, ইয়াসুজিরো ওজুর ভাষায়, সত্যিকারের কারিগর হয়ে উঠবেন। আর চলচ্চিত্র মাধ্যমকে ইন্ডাস্ট্রির অট্টালিকা থেকে নামিয়ে সাধারণ কুটিরে এনে তাকে কুটির শিল্পের সৃজনশীলতা ফিরিয়ে দেবে।
তবে বর্তমানের ডিজিটাল ফরম্যাটই শেষ কথা নয়। একটা সময় হয়তো আসবে, যখন কেবল নির্মাণ নয় প্রদর্শনও ডিজিটাল হয়ে যাবে। তখন হয়তো ডিজিটাল ফরম্যাটে চিত্রায়ন করে ৩৫ মি.মি.-এ রূপান্তর করার প্রয়োজন হবে না, বরং ধ্রূপদী চলচ্চিত্রগুলোও ডিজিটাল ফরম্যাটেই আমরা দেখবো। সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন আমরা আজকের এই উত্তপ্ত, উত্তেজিত তর্ককে নিয়ে নিজেরাই হাসাহাসি করব।
এবার আসি ডিজিটাল চলচ্চিত্রের বিপণন বিষয়ে । তরুণ চলচ্চিত্রকার আশরাফ শিশিরের মতে _”বাংলাদেশে সেলুলয়েডে নির্মিত চলচ্চিত্র নিয়ে সেন্সরশিপের যে কালো আইনটি ছিল, তা যখন দুর্বল হয়ে পড়ল ডিজিটাল ফরম্যাটে নির্মিত চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের সরকারি স্বীকৃতিতে, তখন তা একুশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিল। ঐতিহ্যগত আধিপত্য থাকলেও সারা বিশ্বেই থেমে যাচ্ছিল সেলুলয়েডের জয়যাত্রা, সেখানে পাল্লা দিয়ে এগোতে থাকল নতুন নতুন প্রযুক্তির কল্যাণে ডিজিটাল ফরম্যাটে চলচ্চিত্র নির্মাণ। প্রথম দিকে অতটা সফল না হলেও একপর্যায়ে ডিজিটাল ক্যামেরায়ও সেলুলয়েড ফিল্মের মতো রেজুলেশন, শ্যালো ডেপথ অব ফিল্ড পাওয়া গেল। নতুন-পুরনো নির্মাতাদের পছন্দের জায়গাটা দখল করে নিল এসব প্রযুক্তি। ডিজিটাল ক্যামেরায় শুট করার সুযোগে ডিজিটাল পদ্ধতিতে চলচ্চিত্র নির্মাণের জোয়ার দেখা দিল। গুটিকয়েক নির্মাতা রেজুলেশন সম্পর্কে ধারণা না নিয়েই টিভি নাটকে ব্যবহূত প্রোজুমার এইচডিভি ক্যামেরা দিয়ে দু-একটা ডিজিটাল ফিল্ম বানিয়ে ফেললেন, উন্মুক্ত বা ইনডিপেনডেন্ট চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সেটা তেমন কোনো নেতিবাচক বিষয় না, কিন্তু তারা যখন এটাকে সিনেমা হলে প্রদর্শন করতে চাইলেন বাণিজ্যিকভাবে, তা ছিল নিতান্তই হতাশাজনক। কারণ ভিডিও ফরম্যাটে খারাপ রেজুলেশনে তৈরি ছবিটি বড় পর্দায় মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর দিয়ে প্রদর্শন করলে একেকটা পিক্সেল যখন ফুটবলের সমান দেখা যাবে, তখন দর্শকরা কী দেখতে পাবে? একটা ধূসর চলচ্চিত্র?

মূলত ২০১২ সাল থেকে বিশ্বমানের রেড ক্যামেরা বা টু কে রেজুলেশন দেয়, এমন ক্যামেরায় এ দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। সমস্যা দেখা দিল এর প্রদর্শন ব্যবস্থায়। আমরা নামে বলছি ডিজিটাল সিনেমা, কিন্তু আসলে কি তা ডিজিটাল সিনেমার শর্তগুলো পূরণ করছে? ঠিক এ প্রশ্নের কিছু উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব নিচের আলোচনায়। স্বাভাবিকভাবেই অনলাইন বিশেষ করে উইকিপিডিয়ার কাছ থেকে কিছু তথ্য নিয়েছি এর জন্য সংস্থাটির কাছে কৃতজ্ঞ।

ডিজিটাল সিনেমা সেই সব চলচ্চিত্রকে বলা হচ্ছে, যা নির্মাণের প্রতিটি পদক্ষেপে— প্রি-প্রডাকশন, প্রডাকশন, পোস্ট-প্রডাকশন থেকে শুরু করে ডিস্ট্রিবিউশন ও প্রজেকশন হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। যদিও বহু আগে থেকেই ডিজিটাল ইন্টারমিডিয়েটের মাধ্যমে বা অ্যানিমেশন ছবিতে ডিজিটাল পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২০১৫ সালের মধ্যে সারা বিশ্ব থেকেই বিদায় নেবে সেলুলয়েড ফিল্ম। কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত সেলুলয়েডের র’স্টক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে তাদের উত্পাদন বন্ধ করে দিয়েছে।

ডিজিটাল ফরম্যাটে নির্মিত অথবা সেলুলয়েডে নির্মাণের পরে তা ডিজিটাল ফরম্যাটে কনভার্ট করার পরে স্যাটেলাইট, ফিজিক্যাল মিডিয়া বা ফাইবার অপটিক্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সিনেমা হলগুলোয় পাঠানো ও প্রদর্শন করা হয়ে থাকে। ডিজিটাইজড চলচ্চিত্রটি কোনো একটি সার্ভারে প্রিজার্ভ করে রাখা হয়, যা কিনা প্রতিটি চলচ্চিত্রের প্রত্যেক শোতে পৃথক পৃথকভাবে ডাটা পাঠাতে পারে।

বিশ্বে এখন প্রায় ৯০ হাজার সিনেমা হলে ডিএলপি প্রজেক্টরে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। ১৯৯৯ সাল থেকে ‘ডিএলপি সিনেমা সিস্টেম’-এর প্রচলন ঘটতে থাকে। ২০০২ সালের মে মাসে ‘স্টার ওয়ারস এপিসোড টু: অ্যাটাক অব দ্য ক্লোন’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে তা জনপ্রিয় রূপ পায়।

জর্জ লুকাস, স্টিভেন স্পিলবার্গের উত্তরটি হচ্ছে— ‘হ্যাঁ’। মজার বিষয় হলো, ৩৫ ট্রিলিয়ন কালার রেঞ্জে ডিজিটাল চলচ্চিত্রটি আপনি প্রথম মুক্তির দিন যেভাবে দেখবেন, কয়েক মাস বা বছর পরও সেই একই কোয়ালিটি দেখতে পাবেন, কিন্তু সেলুলয়েড ফিল্মে তত দিনে যোগ হবে স্ক্র্যাচ, ফেডিং, পপস আর জিটার!

ডিজিটাল সিনেমাকে একটি স্ট্যান্ডার্ড রূপ দিতে ছয়টি বিশ্ববিখ্যাত স্টুডিও যৌথভাবে একটি সিস্টেম স্পেসিফিকেশন ঘোষণা করেছে। তাদের মতে, ডিজিটাল চলচ্চিত্রে ছবির ক্ষেত্রে ISO/IEC 15444-1 ‘JPEG2000’ (.jp2) standard হতে হবে। সেসঙ্গে প্রজেকশনের ক্ষেত্রে CIE XYZ কালার স্পেস যেন প্রতিটি বিটে ২.৬ গামাসমৃদ্ধ কম্পোনেন্ট প্রোথিত থাকে। অডিওর ক্ষেত্রে একটি সর্বোচ্চ ডাটা রেটে MXF-compliant file, যা কিনা একটি XML-format Composition Playlist দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে এবং অডিওটি Broadcast Wave (.wav) format-এ শব্দগুলো চালাবে।

ডিজিটাল সিনেমা ইনিশিয়েটিভের ঘোষকরা দাবি করছেন, তাদের স্ট্যান্ডার্ড যে ছবিগুলোয় মেইনটেইন করা হবে, সেগুলো ডি-সিনেমা; বাদবাকি সব ডিজিটাল ফরম্যাটে নির্মিত ছবি ই-সিনেমা।

ডিজিটাল সিনেমা ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে সঙ্গে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব থিয়েটার ওনারস (ন্যাটো) তাদের নিজেদের ডিজিটাল সিনেমা সিস্টেমের ঘোষণা দিয়েছে। ডিসিআইর সঙ্গে অনেক মিল থাকলেও তারা Theatre Management System (TMS) নামে সিনেমা হলের একটি সফটওয়্যারকে সংযুক্ত করেছে।

Digital Cinema Initiatives, LLC (DCI) গঠিত হয়েছে ২০০১ সালের মার্চে। এ উদ্যোগে যৌথভাবে সঙ্গে আছে ডিজনি, ফক্স, প্যারামাউন্ট, সনি পিকচারস এন্টারটেইন্টমেন্ট, ইউনিভার্সাল এবং ওয়ার্নার ব্রাদারস। এদের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, একটি স্ট্যান্ডার্ড ফরম্যাট ঘোষণা করা; যা ডিজিটাল চলচ্চিত্রের উচ্চতর কারিগরি কার্যকারিতা এবং মান নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে।

ডিজিটাল সিনেমা প্যাকেজ (ডিসিপি) হচ্ছে প্রথাগত সেলুলয়েড ফিল্মের স্ট্রিপের কাছাকাছি একটি বিষয়, যা আসলে ডিজিটাল ফরম্যাটে নির্মাণ করা হয়। ডিসিপিতে নির্মিত চলচ্চিত্রের ট্র্যাকটি ফ্রেম বাই ফ্রেম JPEG-2000 ফরম্যাটে রূপান্তর করা হয়। এ ফরম্যাটে নির্দিষ্ট প্রকারের উপকরণগুলো পৃথক পৃথক ফোল্ডারে সাজিয়ে রাখা যায়। একটি ডিজিটাল সিনেমা সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফোল্ডারগুলো থেকে নির্দিষ্ট উপকরণগুলো খুঁজে বের করে শব্দগুলো শব্দযন্ত্রে আর ছবিগুলো আলোক প্রক্ষেপণ যন্ত্রে পাঠায়।

ডিসিডিএম (ডিজিটাল সিনেমা ডিস্ট্রিবিউশন মাস্টার) হচ্ছে ডিজিটাল ফরম্যাটে নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের ছবির যে ফাইলগুলো থাকে, তার সিকোয়েন্স; যা ফ্রেম বাই ফ্রেম সাজানো থাকে।

XYZ ডিজিটাল চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সব চিত্রের কালার ডাটা প্রক্ষেপণে ব্যবহূত ‘কালার স্পেস’। আমরা অনেকেই RGB এবং CMYK এর কথা শুনে থাকতে পারি। ডিসিপি ক্ষেত্রে একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সময় নিখুঁত রঙ প্রক্ষেপণে X’Y’Z’ কালার স্পেস ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ডিজিটাল সিনেমা ডিস্ট্রিবিউশন চলচ্চিত্রের এমন একটি বিপণন ও বিতরণ প্রক্রিয়া, যা কিনা প্রথাগত সেলুলয়েড ফিল্ম টেকনোলজির পরিবর্তে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ফরম্যাটে কার্যকরী হয়ে থাকে। নির্মাণ থেকে শুরু করে প্রজেক্টরের মাধ্যমে এর প্রদর্শন— সবই হয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে।

ব্যবসায় ডিজিটাল চলচ্চিত্র: একসময় দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশের সিনেমা হলে ৩৫ মিমি ফিল্মের ছবি টানাহেঁচড়া, বহন করা ব্যয়সাপেক্ষ ছিল বৈকি। ডিজিটাল চলচ্চিত্র সেই জায়গাটিতে দারুণ পরিবর্তন এনেছে। একটি পোর্টেবল হার্ডডিস্কে ভরে হাই-রেজুলেশনের ডিজিটাল চলচ্চিত্র নিয়ে বিশ্ব ঘুরে আসা যায়। সার্ভারের মাধ্যমে কোয়ালিটি ঠিক রেখে পৃথক পৃথকভাবে দেশে ও দেশের বাইরের সিনেমা হলে পাঠানো যায় ডিজিটাল ফিল্মটি। অনেকগুলো রিল তৈরি না করে, কোনো ম্যারিড প্রিন্ট তৈরি না করে একসঙ্গে কয়েক হাজার সিনেমা হলে রিলিজ দেয়া যায়। সেক্ষেত্রে শো-অন-ডিমান্ড পদ্ধতিতে সিনেমা হল মালিক দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ছবির অর্ডার দিতে পারেন, যা নির্দিষ্ট সময়ে সার্ভারের মাধ্যমে ওই হলগুলোয় প্রদর্শনযোগ্য হয়ে উঠলেও তা পাইরেসি করার সুযোগ অনেক কম থাকে। তাই ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও নির্মাতা, প্রযোজক ও প্রদর্শকের লাভের অঙ্কটা নেহাত কম নয়।

যেভাবে খরচ কমে যাচ্ছে: ১. বিপণন খরচ হ্রাস পাচ্ছে। ২. ফিল্ম প্রিন্টের খরচ বেঁচে যাচ্ছে। ৩. ফিল্মের দাগ, ধূসর হয়ে যাওয়ার মতো বিষয় আর থাকছে না। ৪. ক্যানভর্তি ফিল্মের দুঃস্বপ্ন হ্রাস পাচ্ছে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহারের কারণে। ডাক খরচও কমে যাচ্ছে। ৫. পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে। ৬. যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো সংখ্যক সিনেমা হলে প্রদর্শন করা যায়। ৭. রেকর্ড পরিমাণ সিনেমা হলে একত্রে মুক্তি দেয়া যায়।

৮. বিনিয়োগের অর্থ ওঠাতে অপেক্ষাকৃত কম সময় লাগে। ৯. একসঙ্গে অনেক হলে রিলিজ করলে প্রচার ব্যয় তুলনামূলক কম হয়। ১০. পৃথক পৃথক সিনেমা হলে পৃথক পৃথক শোতে চলমান ছবিতে নির্দিষ্ট লুক্কায়িত কোডিং পাইরেসি রোধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। ১১. অনুমতিবিহীন শো প্রটেক্ট করতে পারে।

ডিজিটাল সিনেমার পেছনের ইতিহাস: ১৯৯৮ সালের ২৩ অক্টোবর ‘ডিএলপি সিনেমা প্রজেক্টর’ প্রথম জনসম্মুখে পরীক্ষামূলকভাবে প্রদর্শন করা হয়। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের পাঁচটি সিনেমা হলে পরীক্ষাটি করা হয়। এটা ছিল প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র; যা ডিজিটালি শুট, সম্পাদনা ও প্রদর্শন করা হয়েছিল।

১৯৯৯ সালের ১৮ জুন Star Wars: Episode I: The Phantom Menace চলচ্চিত্রটি লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউইয়র্কে ডিএলপি প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয়। ২০০০ সালের ১৯ জানুয়ারি এসে Society of Motion Picture and Television Engineers নামের সংগঠনটি ডিজিটাল সিনেমার একটি স্ট্যান্ডার্ড রূপ নির্ণয় করার কাজ শুরু করে।

২০০০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে উত্তর আমেরিকায় ১৫টি, পশ্চিম ইউরোপে ১১টি, এশিয়ায় চারটি এবং দক্ষিণ আমেরিকায় একটি ডিজিটাল চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। এ সময় বিশ্বের জায়ান্ট সব মোশন পিকচার কোম্পানি একটু নড়েচড়ে বসে। তারা ২০০২-এর মার্চে Digital Cinema Initiatives (DCI) গড়ে তোলে।

২০০৪ সালের এপ্রিলে ‘আমেরিকান সোসাইটি ফর সিনেমাটোগ্রাফারস’ সেই ‘ডিজিটাল সিনেমা ইনিশিয়েটিভস’-এর সঙ্গে এক হয়ে টু কে ও ফোর কে রেজুলেশনের ব্যাপারে একটি মান নির্ণয়ে (the ASC/DCI StEM material) সম্মত হয়। তারা ঠিক করে ছবিগুলো হবে JPEG2000 কম্প্রেশনে নির্ধারিত।

এদিকে চীনে ই-সিনেমা সিস্টেম প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালের জুনে। ২০০৯ সালের মধ্যে তারা ৪০ হাজার সিনেমা হলে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে। ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ৪০০ সিনেমা হল টু কে প্রজেক্টর দিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শুরু করে। কিছু বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার তত দিনে স্টেরিও থ্রিডি ছবি বানানোর কাজে হাত দিয়েছেন।

ভারতে ২০০৬ সালের আগস্টে মালায়ালাম ভাষায় নির্মিত মুন্নামাথরাল ওই দেশের প্রথম ডিজিটাল চলচ্চিত্র হিসেবে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সিনেমা হলগুলোয় প্রদর্শিত হয়। ২০০৭ সালে ডিসিআই অনুযায়ী Jpeg2000 কম্প্রেশনে প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে ‘গুরু’ প্রদর্শিত হয়।

২০০৭ সালে যুক্তরাজ্যে ডিসিআই অনুযায়ী মাল্টিপ্লেক্সগুলো নিজেদের মানিয়ে নেয়। একই বছর সিঙ্গাপুরে ‘সনি ফোর কে ডিজিটাল প্রজেক্টর’ দিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু হয়।

২০০৯ সাল থেকে সনি বিভিন্ন হল থেকে টু কে প্রজেক্টর উঠিয়ে নিয়ে ফোর কে প্রজেক্টর প্রতিস্থাপন করে, যার প্রক্রিয়া ২০১৫ সালের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

২০১০ সালের জুনের মধ্যে দেখা গেল, ১৬ হাজার ডিজিটাল সিনেমা হল তৈরি হয়ে গেছে, যার মধ্যে ৫০০০ আবার থ্রিডি দেখার মতো স্টেরিওসকোপিক সুবিধাযুক্ত। যার প্রবৃদ্ধি হার ছিল ১২১.৮ শতাংশ।

২০১২ সালের শেষের দিকে যুক্তরাজ্যের ৯১ দশমিক ৪ শতাংশ সিনেমা হল ডিজিটাল সিনেমা প্রদর্শনে তৈরি হয়ে যায়। ধীরে ধীরে অন্য দেশগুলোয়ও এমন পরিবর্তন আসতে থাকে।

ডিজিটাল সিনেমা মূলত ডিসিআই অনুযায়ী ডিজিটাল সিনেমা প্রজেক্টর এবং ডেডিকেটেড সার্ভারের মাধ্যমে প্রদর্শিত হয়ে থাকে।

এক্ষেত্রে ডিজিটাল সিনেমাটি ডিসিপি নামে এক ধরনের ডিজিটাল ফাইল আকারে সিনেমা হলগুলোয় পাঠানো হয়। সাধারণত একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ৯০ থেকে ৩০০ গিগাবাইট জায়গা ধারণ করতে পারে। সেক্ষেত্রে হার্ডড্রাইভ বা স্যাটেলাইট বা ফাইবার অপটিক ব্রডব্যান্ডের মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি থিয়েটারে পৌঁছে যেতে পারে। ডিসিপি আকারে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের আগে সিনেমা হলে রাখা সার্ভারে হার্ডড্রাইভে কপি হতে থাকে, তবে তা অন্য কোনো ডিভাইসে কপি করা সম্ভব হয় না। প্রত্যেক হলের প্রতিটা শোয়ের জন্য পৃথক আইডেন্টিটি তৈরি করা হয়, পাইরেসি রোধের স্বার্থে।

বাংলাদেশে কয়েকটি প্রযোজনা সংস্থা কর্তৃক নির্মিত ডিজিটাল চলচ্চিত্র একযোগে ৮০ থেকে ১৩০টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সিনেমা হলগুলোয় কোনো রকম সার্ভার ব্যবহার করা হচ্ছে না, নেই কোনো স্যাটেলাইট বেইজড সার্ভার, যেখান থেকে সিনেমা হলের সার্ভারগুলোয় অর্ডার অনুযায়ী ছবিটি নির্দিষ্ট এনকোডিংসহ ডাউনলোড হবে এবং প্রদর্শিত হবে। এখন যা করা হচ্ছে তা হলো, হার্ডডিস্ক বা ল্যাপটপসহযোগে ডিস্ট্রিবিউটর হলগুলোয় চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করছেন ১০৮০পিক্সেল রেজুলেশন দিতে পারে এমন মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর দিয়ে, যার কোনোটাই ‘ডিজিটাল সিনেমা প্রজেক্টর’ নয়! এমনকি সেক্ষেত্রে ‘ডিজিটাল সিনেমা প্যাকেজ’ পদ্ধতি তো দূরের কথা, ডিজিটাল সিনেমা ইনিশিয়েটিভের কোনো মানই মেনে চলা হচ্ছে না। হিন্দি-তামিল-কলকাতার ছবির কাহিনী হুবহু নকল করে ছোট-বড় সিনেমা হলগুলোয় সঠিক মানের প্রদর্শন না হওয়ায় আলো-আঁধারির সেই পুরনো ঐতিহ্য ফিরে এলে তাতে সত্যিই বাংলাদেশের সিনেমায় ডিজিটাল ফিল্মের বিপ্লব মাঠে মারা যাবে, সেক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এ মুহূর্তে খুবই প্রয়োজন।”
চিত্র পরিচালক কাজী হায়াত ডিজিটাল চলচ্চিত্র সম্পর্কে বলেন,” ডিজিটাল মাধ্যম সিনেমার অনেক উন্নতি করেছে। এই মাধ্যম সাধারণ মানুষের কাছে, সাধারণ মানুষের আবেগ নানা রূপে বদলে দিয়েছে। অনেকেই এই মফস্বলে ডিজিটাল সিনেমা তৈরি করছে। ক্যামেরার মধ্যেই এডিটিং করছে কিংবা ছোট্ট একটি এডিটিং প্যানেল দিয়ে এডিটিং করছে। এগুলোও সিনেমা হচ্ছে। সেই সিনেমা অনেকেই টিভিতে বসে দেখছে, অনেকে সিডি প্লেয়ারে দেখছে। এসব চলচ্চিত্র নিয়ে গ্রামগঞ্জে একটা এলাকাভিত্তিক লাইব্রেরি হোক, সেই এলাকার মানুষের কাছে সেটা বিক্রি করা যেতে পারে।

হয়তো কারো নাটক বা সিনেমা তৈরি করতে ৫০ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। তারা এটা বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা তুলে ফেলুক। অর্থাৎ, আমি বলছি যে, সবাইকে একত্রিত করে এটাকে কীভাবে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে আনা যায় সেটা করতে হবে। সেটা একমাত্র সরকারি পদক্ষেপ ছাড়া আর কোনোভাবেই কারো দ্বারা করা সম্ভব নয়।”
তথ্যসূত্র ঃ উইকি পিডিয়া
২, ডিজিটাল চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রাসঙ্গিকতা: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশঃ তারেক মাসুদ রেডটাইমস ডটকমডটবিডি ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৯
৩, বাংলাদেশে চলচ্চিত্র বিপণন ও ডিজিটাল সিনেমার প্রসার

আশরাফ শিশির | বণিক বার্তা , আগস্ট ১১, ২০১৫
৪,ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ৫‘বাংলাদেশে ডিজিটাল সময়ের চলচ্চিত্রকী পেলাম, কী হারালাম’
কাজী হায়াৎ সংখ্যা ৯, জুলাই ২০১৫

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৯০ বার

Share Button

Calendar

September 2019
S M T W T F S
« Aug    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930