» ডিজিটাল বাংলাদেশ ও অনলাইন মিডিয়া

প্রকাশিত: ২০. নভেম্বর. ২০১৭ | সোমবার

সৌমিত্র দেব

ডিজিটাল বাংলাদেশ এর সঙ্গে অনলাইন মিডিয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ।    ডিজিটাল  বাংলাদেশের কথা প্রথম শোনা গেছে সম্ভবত ২০০৮ সালে। নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে এর উল্লেখ করে বলেছিল ‘২০২১ সালের মধ্যে তথ্য প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্পর্কে সরকার আরও স্পষ্ট ভাবে তার অঙ্গীকার ও পরিকল্পনা ব্যাক্ত করে। বিশেষ করে ২০১০সালের ফেব্র“য়ারি ও মার্চ মাসে শেখ হাসিনার সরকার এব্যাপারে অনেকগুলো পদক্ষেপ নেয়। ঐবছর সরকারে বর্ষ পূতিতে ৬ জানুয়ারি ২০১০সালে প্রকাশিত সরকারি ক্রোড়পত্রেও ডিজিটাল বাংলাদেশকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের একুশ শতকের সোনার বাংলা বলে অভিহিত করা হয়। তবে ডিজিটাল বাংলাদেশ কী- এব্যাপারে তথ্য প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলেন, “এটা কোন অলীক বিষয় নয়-এটি জাতির সম্মৃদ্ধির একটি অঙ্গীকার।”

গত ২ ও ৩ মার্চ ২০১০সালে আর্ন্তজাতিক টেলিকম ইউনিয়নের সভাপতি হামাদুন আই ট্যুরের বাংলাদেশ সফরকালে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হয়। যদিও সেই সময় ডিজিটাল বাংলাদেশে ধারণাপত্র উদ্বোধন করা হয়েছে বলে কোন কোন মিডিয়ায় খবর প্রচারিত হয়-বস্তুত সেটি ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশের জনসংযুক্তির পরিকল্পনা। অবশ্য উদ্যোগতারা কখনো কখনো এরকম ভাবে কথা বলেছেন যেন সেটি আসলেই ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা পত্র।
এই ধারণা পত্রের পাশাপশি প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন পেশ করেছিলেন। একেও ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা পত্র বলে মনে করতে হবে। সরকাররে ডাক ও তার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঢাকার এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ: জনসংযুক্তির পরিকল্পনা-এর উন্মোচন করেন। সেই অনুষ্টানে বক্তব্য প্রধান কালে প্রধানমন্ত্রী তার ঘোষণায় যা বলেছেন তার মধ্যে রয়েছে:
ক.এক বছরের মধ্যে দেশের এক হাজার ইউনিয়ন পরিষদকে ফাইবার অপটিক সংযোগের আওতায় আনা হবে।
খ.ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্বাস্থসেবা প্রদানের জন্য দেশের সকল হাসপাতালকে তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধার আওতায় আনতে হবে। এরই মধ্যে সকল সরকারি হাসপাতালে কম্পিউটার, ইন্টারনেট সয়যোগ ও ওয়েবক্যাম দেয়া হয়েছে। শিক্ষসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই সংযোগ দেয়া হচ্ছে।
গ. তথ্য পারাপারের সুবিধার জন্য দেশকে আরও সাবমেরিন কেবল সংযোগে যুক্ত করা হবে।

সরকারের অর্থমন্ত্রী এবং ভিশন ২০২১-এর প্রণেতাদের একজন, আবুল মাল আবদুল মুহিত, এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে হচ্ছে এমন এক ব্যবস্থা যেখানে সুশাসন থাকবে, সরকারের কার্যক্রমে দায়বদ্ধতা-স¡চ্ছতা থাকবে, দুর্নীতি কমে যাবে। তিনি বলেন, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তারা তথ্য প্রযুক্তির শক্তিকে ব্যবহার করতে চান।

অটোমেশনের উদ্যোক্তা মাহবুব জামান বলেন, “বহুল আলোচিত ডিজিটাল বাংলাদেশ এমনই একটা লক্ষ যা অর্জন করতে হলে সমাজের সর্বত্র এক জোয়ার সৃষ্টি করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে গণজাগরণ- আমার কাছে ডিজিটাল বাংলাদেশ শুধু একটা শ্লোগান নয়, এমনকি শুধু একটা ভিশনও নয়, এটা একটা সমগ্র নতুন জীবন ব্যবস্থা। ডিজিট বা সংখ্যারসাথে এর কোন সম্পর্কই নেই। এটা নেহায়েতই একটি প্রতীকি শব্দ। প্রযুক্তিকে আলিঙ্গণ করে দারিদ্রমুক্ত, সমৃদ্ধ, আতœনির্ভর, সুশিক্ষিত, অ-সাম্পদায়িক, উন্নত, বিজ্ঞান মনষ্ক, আধুনিক এক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হচ্ছে এর লক্ষ্য।
কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গ্রমীনজীবনের সর্বত্র আধুনিক যুগোপযোগী ও লাগসই প্রযুক্তির ব্যবহার করে নতুন রূপে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে হাজির করাই এর লক্ষ্য।”

ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্পর্কে এখনো নানা মুনির নানা মত। এব্যাপারে পিআইবির গবেষক মেহেরুন নেসা তার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত’ প্রবন্ধে লিখেছেন “ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাটির মর্মে রয়েছে বাংলার প্রতি কণা মাটি, প্রতি বিন্ধু জল, প্রতি দানা শস্য এবং প্রতিটি মানুষ জীব জন্তু ও উদ্ভিদকে পৃথক ভাবে সনাক্তকরে একান্ত ও নিবিড় সেবা পৌছে দেয়া-একটি প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞান ভিত্তিক দেশ ও সমাজ গড়ে তোলা। নতুন সম্ভাবনার আলোকবর্তিকা যা বাংলাদেশের মানুষের দিন বদলে স্বপ্ন পূরণের একটি প্রযুক্তিগত রশ্মি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে রূপান্তরের দৃপ্ত প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন, যা ছিল তাঁর নির্বাচনী ম্যান্ডেট। ডিজিটাল বাংলাদেশ সর্ম্পকে সাধারণ সমাজে স্বচ্ছ ধারণা তেমন পরিলক্ষিত না হলেও এ সম্পর্কে মানুষেলর কৌতুহলের শেষ নেই।

কোনো প্রকার বিড়ম্বনা ও প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা রাষ্ট্রের নিকট থেকে সাধারণ মানুষের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দেয়ার পক্রিয়াগত কৌশল বা প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে। সংক্ষেপে এটাই হলো “ডিজিটাল বাংলাদেশ”- যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো জনগণের সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্বপ্ন ছিল একটি শোষণহীন, সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা যেখানে কোন নিরন্ন মানুষের কান্নার ধ্বনি বাতাসে ভাসবে না। ত্রিশ লক্ষ বাঙালীর রক্তে গড়া সেই বাংলাদেশ আজ যে স্বাধীনাতর পতাকা তলে দাড়িয়ে আছে সেই দুরূহ স্বাধীনতা শব্দটি যদি বাঙালি জাতি ছিনিয়ে আনতে পারে তাহলে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রবর্তনের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদন বাঙালি জাতির পক্ষে খুব অসম্ভব নয়।”

বাংলাদেশে এখনো যত লোক কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তার পরিমাণ দেশটির জনসংখ্যার তুলনায় নগণ্য। তবে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ ব্যবহার করেন মোবাইল ফোন। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকলে কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের পাশাপাশি মোবাইল ফোনের ভূমিকাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে এই প্রকল্পে সরকারকে সহায়তাদানকারী জাতিসংঘ উন্নয়ন কমর্ঞ্চসুচি বা ইউএনডিপি। ইউএনডিপির কান্ট্রি ডিরেকটর স্টেফান প্রেটজনার বলেন, উন্নয়নের জন্য তথ্য প্রযুক্তি বা ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে শুধু কম্পিউটার নয়, এদেশের জনসংখ্যার এক বড় অংশের হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে, এবং এটাকে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা জনগণের কাছে পোঁছে দেবার একটা বড় হাতিয়ার বলে তারা মনে করেন।

সরকার মনে করছে, তথ্য প্রযুক্তি-ভিত্তিক সেবাদানের প্রক্রিয়া সবে মাত্র শুরু হয়েছে। এর আ রো প্রসার ঘটলে, এবং কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা আরো বাড়লে এই ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা পরিষ্কার হবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল বিষয় তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠন। আর এর আধেয় হয়ে আছে বহু কিছু। যেমন:তৃণমূল পর্যায় থেকে বৃহৎ রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত একটি সামগ্রিক উন্নয়ন মডেলকে সচ্ছতা ও জবাবদিহীতার মাধ্যমে গণমানুষের দোর গোরায় পৌঁছে দেয়াই হলো ই-গর্ভনেন্স বা ই-সেবা। ডিজিটাল বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। আয়কর অফিস থেকে শুরু করে বেশিরভাগ সরকারী কার্যক্রমকে তথ্য প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসার কারণে মানুষ এরই মধ্যে সুফল পেতে শুরু করেছেন। এর পরিধির মধ্যে আছে যেকোন বিষয়ে তথ্য চাওয়ার বা পাওয়ার অধিকার। এরই মধ্যে মানুষেল তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তথ্য কমিশন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির আওতাভুক্ত যেসব মাধ্যমগুলো ই-সেবা প্রধান করতে পারে তার মধ্যে আছে:
১.টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক
২.ডাটা কালেকটিভিটি
৩.টেলিভিশন নেটওয়ার্ক
৪.রেডিও নেটওয়ার্ক
৫.ই-পোষ্ট
৬.টেলি সেন্টার ও সাইবার ক্যাফে
৭.পাওয়ার সেক্টর
৮.অনলাইন মাধ্যম।

জনগণের দ্বারপ্রান্তে তথ্য ও সেবা পৌছে দিতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কুইক উইন নামে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তার সেবা জনগণ এরই মধ্যে পাচ্ছেন। এর মধ্যে আছে:

১.সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে সরকার বিদ্যুৎত সঙ্কট সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন।

২.মিল্কভিটার অটোমেটেড দুধ সংগ্রহ পক্রিয়া, এর মাধ্যমে দুধের গুনগত মানের সাথে কৃষকরা তার ন্যায্য দামও পাচ্ছেন।
৩.নির্বাচন কমিশন এসএমএসের মাধ্যমে ভোটারদেকে তথ্য দিচ্ছে এবং ইভিএম পদ্ধতির মাধ্যমে নারায়নগঞ্জ ও কুমিল্লায় সফলভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।
৪.ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কল সেন্টার যার মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের সমস্যা জানাতে পারেন।
৫.স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গ্রামগঞ্জে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা
৬.সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ডায়নামিক ওয়েবসাইট
৭. তিতাস গ্যাসের অনলাইন বিল পরিশোধ
৮. যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট
৯.বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের গ্যান্ট মেনেজমেন্ট সিস্টেম
১০. ডাক ও টেলি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এসএমএস ভিত্তিক ল্যান্ড ফোন বিল
১১. প্রতি জেলার তথ্য বাতায়ন নামে নিজস্ব ওয়েবসাইট। এখন এ সেবা উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ও দেয়া হচ্ছে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার:
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ও বিভাগের মধ্যে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে ই-সেবা কার্যক্রমের আরো প্রসার ঘটানো হচ্ছে। যেমন:শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল ও গ্রেডশিট নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে অনলাইনে ও মোবাইল ফোনে পাওয়া যায়।

>>ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডেমরা সারকেলে ভূমি ব্যবস্থাপনা কম্পিউটারাইজড করা হয়েছে পরীক্ষামূলকভাবে। এতে করে ভূমির দলিল দস্তাবেজ বা জমি কেনা বেচা সংক্রান্ত বিভিন্ন হয়রানির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

>>তথ্য প্রযুক্তিখাতে দেশীয় তথ্য প্রযুক্তিবিদ ও প্রতিষ্ঠানের আরও একটি সফল উদাহরণ হচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের অটোমেশন। এই পক্রিয়ার ফলে শুল্কায়নের জন্য এখন আর ৪২টি পর্যায় অতিক্রম করতে হয় না। একন এটি নেমে এসেছে মাত্র ৬টি ধাপে। আর এর ফলে ব্যবসায়ীদের খরচ কমেছে ৬০শতাংশ এবং সময় বাচে ৮০ শতাংশ।

>>র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান তাদের অফিসে অটোমেশনের ফলে যাবতীয় দাপ্তরীক কাজ অনেক কম সময়ে দক্ষতার সঙ্গে সম্পূর্ণ করতে পারছে।

>>কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনলাইনে কৃষি পণ্যের দৈনিক বাজার দর দেয়ার ব্যবস্থা করেছে।

>>হজ্ব ব্যবস্থাপণা পদ্ধতির চালু করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এটি একটি সক্রীয় ওয়েব সাইট যার মাধ্যমে হাজীরা হজ্ব সর্ম্পকীত যাবতীয় তথ্য পাবেন।

>> বাংলাদেশ রেলওয়ে ই-সেবা কার্যক্রম শুরু করেছে অনেক দিন হলো। যাত্রীরা এখন স্টেশনে না গিয়েও রেলের সময় সূচী জানতে পারছেন। মোবাইলে রেলের টিটেক কিনতে পারছেন।

>>এছাড়া বহুল আলোচিত মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ও মেশির রিডেবল ভিসা কার্যক্রম শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। এই ডিজিটাল পাসপোর্ট বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের শ্রমিক ও সাধারণ জনগণকে বিভিন্ন হয়রানির এবং জালিয়াতির হাত থেকে রক্ষা করছে।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও শে−াগানের মধ্যে নতুন প্রজন্মকে সবচেয়ে বেশী আকর্ষণ করেছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা। এই অঙ্গীকারের মধ্যে দিয়ে তরুণ সমাজ যেমন একটি প্রযুক্তিমনস্ক নেতৃত্ব দেখতে পেরেছিল, তেমনি পেয়েছিল তাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে একটি সমৃদ্ধ, উন্নত ও অগ্রসর রাষ্ট্রে পরিণত করার স¡প্নের উপাদান।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পূবশর্ত হচ্ছে, নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ – সকলের মধ্যে তার রূপরেখা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা থাকা। জনগণের প্রাপ্তির হিসাবে স্পষ্টভাবে জানতে ও জানাতে হবে হবে কি থাকবে ডিজিটাল বাংলাদেশে আর কি থাকবে না। এখন পর্যন্ত যতটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে সংশি−ষ্টগণ ভিডিও কনফারেনিং আর তার সাথে অফিস আদালতে ইন্টারনেট সংযোগকেই বুঝে নিয়েছেন।

কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশের বিষয় ও আধেয় অনেক ব্যাপক।
১. তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার এবং দৈনন্দিন জীবনে তার ব্যাপক ব্যবহারের ফলে জীবন যাত্রার প্রচুর পরিবর্তন আসবে। যেহেতু বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, জনগণের জীবনমান, নিরাপত্তা ইত্যাদি এখনও সরকার কতৃক নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত, সে কারণে সরকারী খাতগুলোকে ব্যাপকভাবে কম্পিউটারীকরণ করা হবে। এখন যেমন ঘরে বসে নাগরিকেরা শেয়ার মার্কেটে লেন-দেন করতে পারেন, তখন তেমনিভাবে তারা সরকারের সাথে অধিকাংশ লেনদেন ইন্টারনেটের মাধ্যমে করতে পারবেন। কারো পাসপোর্ট প য়োজন, তাকে আর পাসপোর্ট অফিসে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ের মধ্যে লম্বা লাইন দিতে হবে না, এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইলের নড়া চড়ার জন্য স্পীডমানি দিতে হবে না, কেউ ব্যবসায়ের জন্য ট্রেড লাইসেন করবেন, তিনি ইন্টারনেটের মাধ্যমেই অধিকাংশ কাজ সমাধা করতে পারবেন, টেন্ডার জমা দেয়ার জন্য অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে মহড়া দিতে হবে না। ডিজিটাল বাংলাদেশে সরকারের কর্মকান্ডেও যথেষ্ট স¡চ্ছতা আসবে এবং সরকারের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, ফলে দুবর্ঞ্চল ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট অপচয় কমে যাবে।

২. তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প ও সেবাখাতে বাংলাদেশ প্রচুর সংখ্যক বিশ¡মানের কর্মী ও পণ্য তৈরী করবে এবং তা রফতানী করে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করবে। তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প বলতে শুধু সফটওয়্যার শিল্প নয়, বরং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সাথে সংশি−ষ্ট বিভিন্ন যন্ত্রপাতি যেমন কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, মোবাইল ফোন, অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

৩. ডিজিটাল বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণও ঘটবে। বর্তমানে বাংলাদেশে সব কিছুই রাজধানীকেন্দ্রীক। ঢাকার বাইরে আসলেই ফাঁকা। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদির জন্য দেশের সকল নাগরিককে রাজধানীতে ছুটতে হয়, যার ফলে একদিকে যেমন রাজধানী হয়ে পড়ছে বসবাসের অনুপযোগী, তেমনি রাজধানীর সাথে অন্যান্য এলাকার উন্নয়ন বৈষম্য বাড়ছে যা প্রকারান্তরে জঙ্গীবাদ, চরমপন্থা ইত্যাদির জন্ম দিচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রসারের ফলে বড় ধরণের প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়াই অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব হবে। তথ্য যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নত হলে কল সেন্টার, ডাটা সেন্টার, ডিজাসটার রিকভারি সেন্টার ইত্যাদি দেশের প্রত্যন্ত এলাকা গুলোতে গড়ে উঠবে।

বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে হলে রোগীকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজধানীতে আসতে হয়। তখন মফ:স¡লের সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালগুলো তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজধানীতে অবস্থানরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা তাদের হাসপাতালে দিতে পারবে। শিক্ষার ক্ষেত্রে ই-লার্নিং চালু হলে মফ:স¡ল শহরগুলোতেও উন্নত গুণমানের শিক্ষা দেয়া যাবে। তখন হয়তো আমাদের নামী দামী স্কুলের শিক্ষক মহোদয়গণ ই-কোচিংও চালু করে ফেলতে পারবেন। পত্রিকা, টিভি স্টেশন ইত্যাদিও রাজধানীর বাইরে থেকে চালানো সম্ভব হবে। ভালোভাবে পরিচালনার সুবিধার জন্য এখন অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান রাজধানীর উপকণে গড়ে তোলা হচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তির বিস্তার ও ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে শিল্প মালিকগণ রাজধানীতে বসেই দূরে অবস্থিত প্রতিষ্ঠান চালাতে পারবেন। রাজধানীর বাইরে শিক্ষা ও চিকি[ৎ]সার মত নাগরিক সুযোগ-সুবিধার বিস্তার ঘটানো গেলে বর্তমানের রাজধানী কেন্দ্রীকতা বেশ কমে যাবে।

৪. ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়িত হলে বিশ¡ব্যাপী বাংলাদেশের একটি অগ্রসর ও উন্নত ইমেজ তৈরী সহজ হবে। ভারতের যে শাইনিং ইমেজ তার পিছনে কাজ করছে মূলত: দেশটির তথ্য প্রযুক্তি খাত। একজন বিদেশী যখন দেখবে তার ব্যবহারের সফটওয়্যারটি বাংলাদেশে তৈরী, কিংবা তার অফিসে উচু পদগুলোতে কাজ করে বাংলাদেশীরা, তখন দারিদ্র ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের যত দীনহীন ইমেজই তৈরী করতে চেষ্টা করুক, তা সফল হবে না। দেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার ব্যপকভাবে বেড়ে যাবার কারণে বাংলাদেশের ইতিবাচক এ সমৃদ্ধ ইমেজটি তৈরীর জন্য আরও বেশী সংখ্যক নাগরিক ও সংস্থা এগিয়ে আসবে।

তথ্য প্রযুক্তি যেভাবে বিকাশলাভ করছে এবং এ জাতীয় পণ্য ও সেবা যেভাবে সহজলভ্য হচ্ছে, তাতে ২০২১ এর আগেই ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্জন করা সম্ভব। অবশ্য বিগত এক যুগেরও বেশী সময় ধরে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে খুব বেশী অগ্রসর হতে পারে নি।

করণীয় প্রধান কাজগুলো:
১. দেশের অভ্যন্তরে তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতকরণ:
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রধান পূর্বশর্ত এটি। দেশের অভ্যন্তরে তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও বিকাশ না ঘটলে পুরো প্রচেষ্টাটিই ভেস্তে যেতে পারে। বর্তমানে যে তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তা অনেকটাই বেসরকারী উদ্যোগে এবং সমন¡য়হীনভাবে। সরকারী খাতের অবস্থা আরও করুণ। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে এখনও কোন একক নেটওয়ার্ক নেই যা সকল মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করে। একইভাবে সচিবালয়ের সাথে বিভিন্ন দপ্তর-অধিদপ্তরের যোগাযোগগের কোন নেটওয়ার্কও স্থাপিত হয়নি। সরকারী উদ্যোগে একটি ব্যকবান নেটওয়ার্ক স্থাপন করতে হবে যা অন্তত: প্রত্যেকটি জেলা, উপজেলা এবং সকল সরকারী অফিসকে যুক্ত করবে। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিয়ে এই নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হবে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবাও দেয়া যাবে। সরকারকে এ বিষয়ে একটি রোডম্যাপ তৈরী করে জনগণকে জানাতে হবে কবে নাগাদ তারা তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার কতটুকু স্থাপন করতে পারবে।

২. ছাত্র-ছাত্রী এবং সাধারণ নাগরিকের মধ্যে তথ্য প্রযুক্তির বুনিয়াদী শিক্ষার বিস্তার:
ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করতে হলে অন্ততপক্ষে সকল শিক্ষিত নাগরিককে কম্পিউটারের বুনিয়াদী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।

৩. তথ্য প্রযুক্তির উপর উচ্চ শিক্ষার সুবিধা বৃদ্ধি করা:
বিগত বছরগুলোতে তথ্য প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ উলে−খযোগ্য অগ্রগতি করতে না পারার মূল কারণ হচ্ছে, এ খাতে কাজ করার জন্য যে গুণমান ও সংখ্যার দক্ষ কমীর্ঞ্চ তৈরী হওয়া প্রয়োজন, তা তেরী হয় নি। বেসরকারী বিশ¡বিদ্যালয়গুলো এ বিভাগে প্রচুর ছাত্র-ছাত্রী ভতির্ঞ্চ করেছে এবং তাদেরকে সার্টিফিকেটও দিয়েছে। কিন্তু, যেহেতু মেধার প্রতিযোগিতায় সামনে থাকা ছাত্র-ছাত্রীরা পাবলিক বিশ¡বিদ্যালয়ে ভতির্ঞ্চ হয় আর সে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াদের একটি বড় অংশ ভর্তি হয় বেসরকারী বিশ¡বিদ্যালয়ে এবং অধিকাংশ বেসরকারী বিশ¡বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান যেহেতু যথেষ্ট নয়, তাই তথ্য প্রযুক্তিতে ডিগ্রীধারী এই বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী এ খাতের বিকাশে তেমন অবদান না রেখে বরং হতাশাই বৃদ্ধি করেছে। তাই, পাবলিক বিশ¡বিদ্যালয়গুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কিত আসন সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়াতে হবে।

তথ্য প্রযুক্তিখাতে আমাদের পিছিয়ে থাকার আরেকটি কারণ হচ্ছে কয়েকটি প্রশ্ন মুখস্ত করে সার্টিফিকেট যোগাড় করার সনাতন প্রথা। সরকারকে এ বিষয়েও আশু উদ্যোগ নিতে হবে এবং শিক্ষানীতিতে তা অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।

৪. তথ্য প্রযুক্তি সংক্রান্ত ব্যবসা ও শিল্পে বড় বিনিয়োগকারীদেরকে আগ্রহী করা
মোবাইল ফোন কোম্পানী ছাড়া তথ্য প্রযুক্তির অন্য কোন খাতে বড় ধরণের বিনিয়োগ হচ্ছে না এবং বড় বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসছেন না। মোবাইল সেবার বিস্তার জনগণের জীবনযাত্রায় কিছুটা পরিবর্তন আনলেও তা দেশের টাকা বাইরে পাঠানোর সবথেকে উপযোগী মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমরা বিদেশ নির্ভরতার চরম পরকাষ্টা প্রদর্শন করেছি। কোটি কোটি মোবাইল সেটের বিশাল বাজার বাংলাদেশে অথচ, একটি মোবাইল সেটও এখানে তৈরী হচ্ছে না। সফটওয়্যার শিল কচ্ছপের গতিতে হলেও কিছুটা এগিয়েছে, যাতে বড় বিনিয়োগকারীদের কোন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। কম্পিউটারের খুচরা যন্ত্রাংশগুলো দেশে তৈরীরও কোন উদ্যোগ নেই। যেহেতু এই শিলকে বিশে¡র বড় বড় কোম্পানীর সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হয়, তাই বড় বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে না আসলে টিকে থাকা সম্ভব নয়। সরকারকে এ ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিতে হবে।

৫. সরকারী সেবাসমূহকে কম্পিউটারাইজ করা
ডিজিটাল বাংলাদেশে জনগণের সবথেকে বেশী প্রত্যাশা সরকারী খাতের নিকট। ই- গভর্নেন চালু হলে সরকারী কমর্ঞ্চকান্ডে স¡চ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পথ সৃষ্টি হবে। সরকারের উচি[ৎ] ই-গর্ভনেনের একটি বোধগম্য রোডম্যাপ প্রকাশ করা যাতে থাকবে জনগণ সরকারী কোন সেবাটি আগামী কতদিনের মধ্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পেতে পারবে তার একটি স্পষ্ট চিত্র। এই ধরণের একটি রোডম্যাপ থাকলে সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক দল – সকলে পরিকলনার বিপরীতে অগ্রগতির পযালোচনা করতে পারবে এবং যে সকল কারণে অগ্রগতি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে সরকার তা দূর করার উদ্যোগ নিতে পারবে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৮৮৮ বার

Share Button

Calendar

July 2020
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031