» ডিজিটাল শিল্প বিপ্লব যুগের ডাক সেবা

প্রকাশিত: ০৮. অক্টোবর. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

ম. শেফায়েত হোসেন

বিশ্ব ডাক দিবস ৯ই অক্টোবর। ১৮৭৪ সালের এই দিনে সুইজারল্যন্ডের বার্ণে ২২টি দেশের প্রতিনিধিদের অংশ গ্রহণে গঠিত হয় ইউনিভার্সেল পোস্টাল ইউনিয়ন(ইউপিইউ)। ইউনিয়ন গঠন করার মহেন্দ্রক্ষণটি স্মরণীয় রাখতে সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৯৬৯ সালে জাপানে টোকিওতে অনুষ্ঠিত ইউনিভার্সেল ডাক ইউনিয়নের ১৬তম অধিবেশনে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সদস্য আনন্দ মোহন নারুলা (Anand Mohan Narula) ৯ অক্টোবরকে বিশ্ব ‘ডাক ইউনিয়ন দিবস’ হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এবং প্রতি বছরের ৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক ইউনিয়ন দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে জার্মানের হামবুর্গে অনুষ্ঠিত ১৯তম অধিবেশনে নাম পরিবর্তন করে ‘বিশ্ব ডাক দিবস’ রাখা হয়। এর পর থেকে প্রতিবছর দিবসটি ‘বিশ্ব ডাক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ডাক সেবা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করাই দিবসটি পালনের মূল লক্ষ্য। বিশ্ব ডাক দিবসের কোনো নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নেই।তবে উদ্ভাবন, একাগ্রতা এবং অন্তর্ভুক্তি এই তিনটি স্তম্বের ওপর এবছর ইউপিইউ পোস্টার ডিজাইন করেছে।ইউপিইউ এর মহাপরিচালক এ বছরের বিশ্ব ডাক দিবসের বাণীতে ডাক সেবাকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনের উপযোগী করে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ইউনিভার্সেল পোস্টাল ইউনিয়ন (ইউপিইউ) এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) এর সদস্য পদ অর্জন করে। এর পর থেকে দেশে প্রতিবছর বিশ্ব ডাক দিবস পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক ডাক ও টেলিযোগাযোগ ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক যাত্রা সূচিত হয়।

আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের পর ইউনিভার্সেল পোস্টাল ইউনিয়ন বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম আন্তর্জাতিক সংস্থা। ইউপিইউ বিশ্বব্যাপী ডাক ব্যবস্থা ছাড়াও সদস্য দেশগুলির মধ্যে ডাক নীতিসমূহের সমন্বয় সাধন করে। এটি ১৯৪৮ সালের ১ জুলাই জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত সংস্থায় পরিণত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১৯২টি দেশ ইউপিইউ এর সদস্য।

ইউপিইউ বিভিন্ন প্রকল্পে জাতিসংঘের অনেক সংস্থার সাথে অংশীদার হয়ে কাজ করছে। এই সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি), আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ), আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান সংস্থা (আইসিএও), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ইউপিইউ জাতিসংঘের সংস্থাসমূহের বাইরেও অন্যান্য সংস্থাসমূহের সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখে যেমন আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণ সমিতি (আইএটিএ), আন্তর্জাতিক মানক সংস্থা (আইএসও), আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশন (ডব্লিউসিও)।

ইতিহাসের পথ রেখায় ডাকসেবার অভিযাত্রা আজ থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগ থেকে। প্রাচীন মেসোপটমিয়া হয়ে ব্যাভিলনীয় সভ্যতার পথ হেটে অগ্নিশিখা সংকেত, শিকারি কবুতর পাঠিয়ে কিংবা ঘোড়ার পিঠ-রানারের ঝুলি, স্যামুয়েল মোর্সের টরে টক্কার যুগ পেরিয়ে কম্পিউটার বাটনে সংবাদ আদান-প্রদানের যুগে আজ ডাক বিভাগ প্রবেশ করেছে। সুদূর অতীতে যেমন ডাক সার্ভিসের প্রয়োজন ছিল আজও আছে এবং আগামীতে থাকবে।ডিজিটাল প্রযুক্তি বর্তমান বিশ্বকে একটি ‘গ্লোবাল হোম’ এ পরিণত করেছে। প্রযুক্তি নির্ভরতার সাথে ডাক সার্ভিসকে লাগসই প্রযুক্তিতে রূপান্তর করার বিকল্প নেই। ডাকসেবা জনবান্ধব করতে ডাকঘর প্রযুক্তি নির্ভর করতেই হবে। সেদিক বিবেচনায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অবিসংবাদিত রাজনীতিক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ব্রেইন চাইল্ড ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার অভিযাত্রায় বাংলাদেশ ডাক অধিদপ্তর সনাতনী পদ্ধতি থেকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। দেশে দশ হাজার ডাকঘরে প্রায় ৪০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ডাকসেবায় নিয়োজিত। চল্লিশ হাজার মানুষের আশি হাজার হাত ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের মধ্যদিয়ে জ্ঞান ভিত্তিক জাতি বিনির্মাণের উপযোগী শক্তি হিসাবে গড়ে তুলতে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ডাক অধিদপ্তরকে ইতোমধ্যেই ডিজিটাল শিল্প বিপ্লব যুগের উপযোগী করে গড়ে তুলতে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা হয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গ্রামীণ ৮ হাজার ৫শত ডাকঘরকে ডিজিটাল ডাকঘর হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।পাশাপাশি বিদ্যমান জনবলকে ডিজিটাল উপযোগী করে গড়ে তুলতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এর ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ টেলি- মেডিসিন, ডিজিটাল-এডুকেশন, ই-কমার্স ও ই-হেলথসহ তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর বিদ্যমান সকল সেবা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। অটোমেশনের ফলে ডাক বিভাগে ডিজিটাল মানিট্রান্সফার সার্ভিস নগদ, ই-মানিঅর্ডার, পোস্টাল ক্যাশকার্ড এবং ডিজিটাল কমার্স ইত্যাদি

 

কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এই সকল ডাকঘর থেকে তৃণমূল জনগোষ্ঠী সরকারের ২০০ ডিজিটাল সেবা পাচ্ছে। সরকারের গৃহীত কর্মসূচির ফলে এক সময়ে অস্তিত্বের সংকটে পড়া ডাকঘর আজ জনগণের কাছে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে গড়ে উঠেছে। সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি ডাক বিভাগকে সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে প্রযুক্তি নির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছে। দেশ যত বেশি ডিজিটাল হচ্ছে ডাকঘরের সম্ভাবনা ততটাই বাড়ছে। ডাকসেবা মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বাণিজ্যিক দিক যত না গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে জনসেবাকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসেও ডাক বিভাগের গৌরবোজজ্জ্বল অর্জন রয়েছে। মুজিবনগর সরকার প্রকাশিত স্মারক ডাকটিকিট স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব প্রকাশে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে। একাত্তরের ২৯ জুলাই মুজিবনগর সরকার এবং যুক্তরাজ্যের হাউজ অব কমন্স থেকে প্রকাশিত ভারতীয় নাগরিক বিমান মল্লিকের ডিজাইন করা ৮টি “স্মারক ডাকটিকিট বিশ্বে আমাদের জাতিসত্তা, রাষ্ট্রসত্তা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব তুলে ধরা হয়েছে যা সারা দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ডিজাইনার বিমান মল্লিকের অবদান চির অম্লান হয়ে থাকবে। মাননীয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী বলেন, স্মারক এই ডাকাটিকিটসমূহ কেবলই ইতিহাসের ধারক ও স্মারক নয়। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব তুলে ধরা হয়েছে যা সারা দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে”।

কোভিড-১৯ সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারিতে থেমে যাওয়া জীবনযাত্রায় ডাকঘরের বিস্তৃর্ণ পরিবহন নেটওয়ার্ক ও বিশাল অবকাঠামো মানুষের সেবায় কাজে লাগানো হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশের ফলে প্রাচীন প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগ বিলীন হয়ে গেছে এটাই ধারণা ছিল। করোনার শুরু থেকেই কৃষির প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্বারোপ করে আসছেন। সেই লক্ষ্যেই কর্মকান্ড পরিচালিত করছে ডাকঘর। করোনার লকডাউনের সময় জাতীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে কৃষির প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার সেই আবশ্যকতা বিবেচনায় মানিকগঞ্জ জেলার ঝিটকা বাজার, খাগড়াছড়ি এবং রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কৃষকের পণ্য বিনা ভাড়ায় পরিবহনের যাত্রা শুরু হয়। লকডাউনের সময় জাতীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে ডাক অধিদপ্তর খুলে দিয়ে সঞ্চয় ও পেনশনভোগী মানুষদের লেনদেন চালু রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। লাখ লাখ মানুষ এতে উপকৃত হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা লেন- দেন হয়েছে। সরকার ডাক অধিদপ্তরকে জরুরি সেবার আওতাভুক্ত করে সেবার জন্য মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে।

করোনা সংকটকালে জনগণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সেবাসমূহ সহজতর করতে সরকার গত ৯ মে থেকে কৃষকবন্ধু ডাক সেবা চালু করেছে। এছাড়াও বিনা মাশুলে করোনা চিকিৎসা উপকরণ পিপিই ও কীট দেশব্যাপী সিভিল সার্জন কার্যালয়সমূহে পৌঁছানোসহ জনগণের দোরগোড়ায় নিরবচ্ছিন্ন ডাকসেবা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমান ডাকসেবা চালু করা হয়। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ করা; প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম সরবরাহ করা এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক পরিষেবাগুলি বজায় রেখে করোনাকালে অচল জীবনযাত্রায় প্রাণের সঞ্চার করেছে।ডাক অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে করোনাকালে দেশের ডিজিটাল বাণিজ্যের নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারি আন্তর্জাতিক ডাকখাতের জন্য একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। যাত্রীবাহী বিমান বাতিল করার ফলে অপারেটররা ইউপিইউর সহায়তায় দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মেইল পরিবহণ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়। বিশ্বব্যাপী মহামারি চলাকালীন ডাক অপারেটর এবং তাদের কর্মীরা অবিশ্বাস্য ত্যাগ স্বীকার করে ডাকসেবা সচল রেখেছে। মানুষ যখন লকডাউনে গৃহবন্দি ডাক কর্মীরা তখন মেইল সরবরাহ করার চেষ্টা করেছেন, মানুষের ঘরে ঘরে ডাকসেবা পৌঁছে দিয়েছেন। ডাক অবকাঠামোসহ ডাক সেবা আধুনিকায়নে সরকার গৃহীত চলমান কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে পাল্টে যাবে প্রচলিত ডাকসেবার ইতিহাস এবং সেদিন বেশি দূরে নয়।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৮৬ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031