» ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন: আ’লীগ-বিএনপির ভোট কোথায়?

প্রকাশিত: ০৪. ফেব্রুয়ারি. ২০২০ | মঙ্গলবার

মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার: দু’দলের প্রায় ৮০ শতাংশ সমর্থকের অনেকে ভোট দিলেন না কেন -প্রশ্ন বিশ্লেষকদের সরকারের দাবি অনুযায়ী তাদের ৮৫ শতাংশ জনসমর্থনের ভোট গেল কই, কেন ১৩-১৭ শতাংশ ভোট নিয়ে মেয়র হতে হবে- সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিতে এক ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, নানা কারণে সামগ্রিকভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি ভোটারদের অনেকের আস্থা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। তারা মনে করেন, ভোট দিয়েও এর প্রতিফলন ফলাফলে মিলবে না। এই যখন অবস্থা তখন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের অনেকে একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছেন। তারা বলেন- ধরে নিচ্ছি, সাধারণ ভোটারদের নির্বাচনের প্রতি আস্থা কমে গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন ফোরামে দাবি করে আসছে, তাদের দল সমর্থিত রিজার্ভ ভোটের সংখ্যা ৩৫-৪০ শতাংশ। অর্থাৎ বড় দু’দলের এই ভোট সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ। তাহলে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে এর প্রতিফলন ঘটল না কেন। তাদের নিজেদের লোকজনের অনেকে কেন ভোট দিতে এলো না- পুরো জাতির সামনে এখন এটি বড় একটি প্রশ্ন। তাদের মতে, এ প্রশ্নের মধ্যে নিশ্চয় উত্তর রয়েছে।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন রেডটাইমসকে বলেন, সরকার দাবি করছে ৮৫ শতাংশ লোক তাদের সমর্থন করে। তাহলে এই ভোটগুলো গেল কই। কেন ১৩-১৭ শতাংশ ভোট নিয়ে মেয়র হতে হবে। তার মতে, আর ইভিএম না হলে আমরা বুঝতেও পারতাম না, কত শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, অনেক ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা ছিল। এটিও কাজ করেছে। তিনি আরও বলেন, ভোটাররা মনে করেছেন, ভোট দিয়ে লাভ নেই। কারণ ভোটের আগে কেন্দ্র দখল ও কেন্দ্রের বাইরে লোক যেতে দেয়া হচ্ছে না। ভয়ভীতির কারণে মানুষ যেতে চায়নি। এ ছাড়াও বিভিন্ন রিপোর্ট প্রকাশ করা হচ্ছে। এসব রিপোর্টে বলা হচ্ছে,ওমুকে জিতে যাচ্ছে। এ ধরনের প্রচারণার কারণে মানুষ ধরেই নিয়েছে, ভোট দিয়ে লাভ কোনো নেই।

প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী এবার দুই সিটি নির্বাচনে সব মিলিয়ে গড়ে ভোট পড়েছে ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ। যদিও মেয়র নির্বাচিত হয়েছে অনেক কম ভোটে। ভোটের এ হার ২০১৫ সালের তুলনায় অন্তত ১৬ শতাংশ কম। এমনকি এক বছর আগে ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচনেও ৩১ দশমিক ০৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল।

এদিকে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একে অপরকে দুষছে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বিএনপির নির্বাচনবিরোধী চরিত্রের কারণেই সিটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কমেছে বলে দাবি করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি নানক রেডটাইমসকে বলেন, নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকে বিএনপি নেতা ও তাদের প্রার্থীরা ভোটারদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে নানা ধরনের বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। বিএনপির আচরণ দেখে মনে হয়েছে, জয়ের জন্য নয়, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের জন্যই তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। তার মতে, ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার জন্য এটি একটি বড় কারণ।

অপরদিকে ইসি ও আওয়ামী লীগকে দায়ী করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন তিনি রেডটাইমসকে বলেন, ভোটারদের অনীহার অন্যতম কারণ হচ্ছে বর্তমান সরকার ও ইসির ওপর জনগণের কোনো আস্থা নেই। ভোটাররা মনে করেন, এদের অধীন নির্বাচনের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত। তাই ভোট দিয়ে কোনো লাভ নেই। সরকার এবং ইসি ইভিএম দিয়েও ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। উল্টো ইভিএম যে একটি ভোট চুরির যন্ত্র, তা এ নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে।

তিনি বলেন, ভোটারদের আগ্রহ সৃষ্টির জন্য গবেষণার প্রয়োজন নেই। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচন আয়োজন করলেই ভোটাররা কেন্দ্রমুখী হবেন। কারণ তখন ভোটারদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মাবে যে, তাদের মতামতের ভিত্তিতে ফলাফল আসবে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক রেডটাইমস প্রতিবেদককে বলেন, মূলত তিন কারণে ভোটার উপস্থিতি কম। প্রথমত, ভোটাররা মনে করেছেন, যে মার্কায়ই আমি ভোট দেই না কেন, এটি জমা বা গণনা হবে নির্দিষ্ট একটি মার্কায়। ফলে ভোট দেয়া না-দেয়া একই কথা। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার পর শান্তিতে নির্বিঘ্নে কোনো ধরনের হেনস্তা ছাড়া ফিরে আসতে পারা যাবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়। এ ক্ষেত্রে হুমকিও ভয় কাজ করেছে। তৃতীয়ত, ইলেট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে বিএনপি যে প্রচারণা চালিয়েছে, তাতে এই সিস্টেমের প্রতি মানুষ আস্থা হারিয়েছে। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ভোটের প্রতি মানুষের আস্থা নেই। তার মতে, এর সমাধান কঠিন। কারণ, কোনো দলীয় সরকারের নির্বাচনে মানুষের আস্থা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এ জন্য একটি নির্দলীয় ব্যবস্থার অধীন নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে মানুষ আর ভোটের প্রতি উৎসাহ দেখাবে না।

ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকেও দায়ী করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি রেডটাইমস ডটকম প্রতিবেদককে বলেন,যে কোনো নির্বাচনেই মূল ফ্যাক্টর মধ্যবিত্ত। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তাদের উপস্থিতি কম ছিল। এর কারণ হল- নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কমেছে। তিনি বলেন, মানুষ মনে করেছে, ভোট দিলেও যিনি জিতবেন, না দিলেও তিনি জিতবেন। অর্থাৎ ভোটে কোনো পরিবর্তন হবে না। তার মতে, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মূল বিষয় হল- ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। আর সেটিই যদি না হলো, তাহলে নির্বাচনের মানে কী দাঁড়ায়, তা আমার বুঝে আসে না। তাছাড়া আওয়ামী লীগ দাবি করছে, তাদের অনেক ভোট রয়েছে। তাহলে সেই ভোট গেল কই। এ ক্ষেত্রে শুধু সরকারকে দোষ দিলে হবে না। নির্বাচন কমিশনেরও দায় রয়েছে। তারা বলছেন, তাদের দিক থেকে চেষ্টার কোনো ঘাটতি ছিল না। এরপরও ভোটার আসেনি। রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এ অবস্থা উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মানুষের আস্থা বাড়ে- এমন নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

দুই সিটি নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবার দুই সিটিতে ৫৪ লাখ ৬৬ হাজার ২৮৫ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১৪ লাখ ৭৫ হাজার ৮৩৮ জন, যা মোট ভোটের ২৭ শতাংশ। দুই সিটিতে ভোট গ্রহণের এমন চিত্র নজিরবিহীন। এর আগে ২০১৫ সালে দুই সিটিতে নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৪২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ৪২ লাখ ১৫ হাজার ৬৭৮ ভোটারের মধ্যে ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৬৫ জন ভোট দিয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে দুই সিটিতে নতুন ১৮টি করে ৩৬টি ওয়ার্ড যুক্ত হয়েছে। বেড়েছে ভোটার সংখ্যা। সেদিক দিয়ে ভোটার উপস্থিতি বেশি হওয়ার কথা থাকলেও ৩ লাখ ৫ হাজার ভোট কম পড়েছে। মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়র পদে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও ভোট পড়ার হার ছিল ৩১ দশমিক ০৫ ভাগ। এদিক বিবেচনায়ও এবার ভোট কম পড়েছে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৯২ বার

Share Button

Calendar

July 2020
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031