» তিনি বিখ্যাত অধ্যাপক

প্রকাশিত: ১৭. জানুয়ারি. ২০১৯ | বৃহস্পতিবার

কামরুল হাসান

তিনি বিখ্যাত অধ্যাপক, এ দেশে যারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি পড়ান বা পড়েন তারা সকলে চেনেন তাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষকদের চেনেন প্রায় সকল বুদ্ধিজীবী ও লেখক। কেননা ব্যতিক্রমহীনভাবে তারা প্রত্যেকেই লেখক। সাহিত্যের অধ্যাপকগণ সাহিত্য রচনা করবেন- এটাই স্বাভাবিক। অধ্যাপক ফকরুল আলম সেই অর্থে সাহিত্য রচনা করেন না, তাঁর মনোযোগ সাহিত্য গবেষণায়, এমন কোন বছর যায় নি তিনি জার্নালে লেখেন নি, ফি বছর বিদেশী ও দেশী জার্নালে তাঁর গবেষণাপত্র বেরিয়ছে। গবেষণার দক্ষতা তাকে দিয়েছে সম্পাদনার বিপুল সক্ষমতা। ইংরেজির উপর অগাধ দখল আর সাহিত্যের জ্ঞান যে পাণ্ডিত্য দিয়েছে তাতে আন্তর্জাতিক মহল বড় বড় সংকলন ও সম্পাদনার কাজে তাকে ডাকেন।

প্রথমদিকে কেবল ঐ গবেষণাপত্র রচনা আর শ্রেণীকক্ষে পাঠদান করে কাটিয়েছেন। পরে তার আগ্রহ জন্মে অনুবাদে। প্রথম অনুবাদেই সারা ফেলে দেন, কেননা তিনি অনুবাদ করেছেন সাহিত্যের দুরূহ শাখা কবিতার, আর যার তার কবিতা নয়, বাংলা কবিতার কিংবদন্তি জীবনানন্দ দাশের কবিতা, যার কবিতা অনুবাদ করা দুরূহ কাজ। এই দুরূহ কাজটি তিনি অবলীলায় হাতে তুলে নেন। যিনি এমনকি প্রকাশ্য সভায় বিনয়ের সঙ্গে বলেন, তিনি বাংলা ভালো জানেন না, তাঁর ঐ কাজ হতবুদ্ধি করে রাখে। ড. ফকরুল আলমের স্বীকারোক্তির মাঝে সত্য লুকানো আছে যদিবা, তার অনুবাদের স্বাচ্ছন্দ্য ও শক্তি প্রমাণ করে তিনি বিনয়ী। বাংলা না জানার একটি কারণ হতে পারে তিনি আগাগোড়াই পড়াশোনা করেছেন ইংরেজি মাধ্যমে।

কী করে জীবনানন্দ অনুবাদ করলেন, সে প্রশ্নে তিনি জানালেন, জীবনানন্দ অনুবাদ করা অপেক্ষাকৃত সহজ, কেননা তার কবিতার ভাষা মুখের ভাষার কাছাকাছি। কঠিন হলো রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করা, কেননা তা সাঙ্গীতিক। জীবনানন্দের প্রতি অনুরাগ জন্মায় একটি-দুটি করে সে মহারথীর কবিতা পাঠ করতে করতে। কবি তারাপদ রায় যেমন তার একটি কবিতায় বলেছেন লাশকাটা ঘর থেকে সেই যে ভূত হয়ে জীবনবাবু ঘাড়ে চাপলেন, আর নামলেন না। ভূতটি তাঁর ঘাড়েও চেপেছিল। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর বই The Essential Tagore প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে।

নিজেকে তিনি একজন close reader ভাবেন। এর ব্যাখ্যা হিসেবে বলেন, ‘আমি যখন একটা কবিতা পড়ি তখন এর সবকিছু পড়ি, শব্দের ব্যবহার, অলঙ্কারের ব্যবহার, উপমা, চিত্রকল্প, কাঠামো, ধ্বনিমাধুর্য, ছন্দ, চেতনাপ্রবাহ -সব’। এজন্যই সম্ভব হয়েছে জীবনানন্দ অনুবাদ। তিনি নিজে কি কখনো কবিতা লিখেছেন? তা লিখেছেন বৈকি। যেহেতু তিনি নিজেই নিজের নির্মম সমালোচক, উপলব্ধি করেছেন, কবিতা তার জগৎ নয়। কবিতা রচনার জন্য যে স্বতঃস্ফূর্ততা লাগে, যে প্রণোদনা (তাঁর ভাষায় ‘spark’) তা তার নেই। অনুবাদকর্মকে তিনি বলেন peripheral work, মূল কাজ নয়। আমার কবিতার নিরীক্ষা তাঁর ভালো লাগে বলে জানালেন। তার খুব ভালো লেগেছে আমার চতুর্দশপদী ‘কবিতা কোথা থেকে আসে’ আর টানাগদ্যে লেখা ‘মেয়েদের টেনিস’। বল্লেন, ‘I think you are an under-rated poet। তোমার লেখার পর্যাপ্ত প্রচারণা হয় নি।’

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটির নির্ভরযোগ্য অনুবাদক হিসেবে তাকে বেছে নেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। এই অনুবাদ তাঁর পরিচিতিকে বুদ্ধিজীবি বৃত্তের বাইরে বৃহত্তর পরিধিতে এনে দাঁড় করিয়েছে। যে বছর বইটি প্রকাশিত হলো সে বছরই তিনি অনুবাদে বাংলা একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন। এটা অনুমিত ছিল। ঢাবির ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের যে তিন অধ্যাপককে Trio বা ত্রিরত্ন বলা হয়, তাদের একজন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আগেই কথাসাহিত্যিক হিসেবে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। তৃতীয়জন কায়সার হক কবিতা লিখেন ইংরেজিতে। আমার প্রতিভাবান বন্ধু আজফার হোসেন এঁদের ছাত্র। সেই আশির গোড়া থেকে তাদের চিনি বন্ধুর শিক্ষক হিসেবে।

অনেক বছর পরে ড. ফকরুল আলম যখন পড়াতে এলেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে তখন তাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো। কিছুটা ঘনিষ্ঠ হলাম দিল্লী ও লক্ষ্ণৌর সার্ক সাহিত্য উৎসবে। এখন তাকে প্রায়শই দেখতে পাই, মাঝে মাঝে তাঁর বিরাট, সুসজ্জিত কক্ষখানিতে যাই, গল্প করি। তার রুচিবোধ ছড়িয়ে আছে প্রশস্ত কক্ষটির সমগ্র জুড়ে। তাঁর পরের অনুবাদ প্রকল্প মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’। বাংলা সাহিত্যের ঐ এপিকধর্মী ঢাউস রচনা অনুবাদ এক বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি তা নিয়েছেন এবং সমাপ্ত করেছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ছাড়া তিনি বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ অনুবাদ করেছেন।

যখন স্কুলে ছিলেন, ক্লাসের সেরা ছাত্র ছিলেন না, ছিলেন শীর্ষের খানিকটা নিচে, কেননা তখন মেতে থাকতেন খেলাধুলা নিয়ে, পড়াশোনার চেয়ে বেশি ভালো লাগতো খেলাধুলা। স্কুলজীবনে খুব খেলতেন বাস্কেটবল ও ফুটবল। বাস্কেটবল তার আজীবনের ভালোলাগা খেলা, বহুদিন খেলেছেন টেনিস। তার সুঠাম কাঠামো সে ইঙ্গিতই দেয়। এখন পারেন না পায়ের জন্য; এই পায়ের জন্যই সম্প্রতি সিঁড়ি ভেঙে আলেকজান্দ্রিয়ার মন্দির চত্বরে উঠতে পারেন নি। বাড়িতে পড়াশোনার জন্য বাবা কখনোই চাপ দেন নি, মা-ও নন, ক্লাসে প্রথম হতেই হবে – এমন কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। ভালোবাসতেন সাহিত্য আর ভয় পেতেন অঙ্ক। ‘ও লেভেল’ পরীক্ষায় অঙ্কের বৈতরণী পার হতে পারেন নি। তাতে উত্তরণ আটকায় নি, কেননা প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিষয়ে তার ভালো গ্রেড ছিল। জীবনে আর অঙ্কের মুখোমুখি হননি। একবার পরীক্ষার পাতা থেকে অঙ্ক মুছে গেলে সাহিত্যের ছাত্রটির একাডেমিক পারফরম্যান্স ডানা পেয়ে যায়, ক্রমশই উজ্জ্বল হতে থাকে। অধ্যাপক ফকরুল আলমের ক্যারিয়ারও তাই, ক্রমশ উজ্জ্বলতর!

তিনি পড়াশোনা করেছেন দেশের তিনটি সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে – সেন্ট যোশেফ হাই স্কুল, নটরডেম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কানাডার দুটি সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি মাস্টার্স ও পিএইচডি করেছেন। তার থিসিস ছিল উপনিবেশিক সাহিত্য নিয়ে যার কেন্দ্রে রযেছেন ডানিয়েল ডেফো। কানাডার যে দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যথাক্রমে মাস্টার্স ও পিএইচডি করেন সেই ম্যালকম ফ্রেজার ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়াকে তুলনা করেন জাহাঙ্গীরনগর আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে। প্রথমটি শহরের প্রান্তসীমায়, আধুনিক ও নিরীক্ষাপ্রবণ; দ্বিতীয়টি শহরের ভেতর ছড়ানো, সনাতন ও রক্ষনশীল। সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা জন্মায় পরিবার থেকে। চারবোনের একমাত্র ভাই তিনি, স্বভাবতই মনোযোগের কেন্দ্রে ছিলেন। ঘরেই একটি ছোটখাটো লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল, সবাই বই পড়তে ভালোবাসতেন। বই পড়ার অভ্যাস তার আজীবনের।

অসংখ্য গবেষণাপত্রের পাশে উজ্জ্বল তাঁর তিনটি গ্রন্থ। পিএইচডি করেছিলেন ডানিয়েল ডেফোর সাহিত্যকর্মের উপর। সে থিসিস থেকে প্রথম বই, দ্বিতীয় বই ভারতী মুখার্জিকে নিয়ে, তৃতীয়টি Collections of Essays। সম্পাদনা করেছেন দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ Anthology। তিনি ঢাকা লিট ফেস্ট, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ছাড়াও বিবিধ প্রকাশনা ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত, কিছুদিন সম্পাদনা করেছেন ডেইলি স্টার লিটারারি পেজ। পড়িয়েছেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও ইউল্যাব সহ বেশকিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে।

‘এত কাজ কী করে করেন?’ আমার ঐ বালকসুলভ বিস্ময়বোধক জিজ্ঞাসার উত্তরে বলেন, ‘আমি খুব একাগ্র (focused)। জানি কী করতে হবে, সেটাই মনপ্রাণ দিয়ে করি।’ অধ্যাপক ফকরুল আলমকে যত জানছি তত মুগ্ধ হচ্ছি। আমাদের এখানে নবীনবরণ অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তৃতাই সবচেয়ে মনোহর লাগে। উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ ও স্বাভাবিকের চেয়ে ঢের বেশি উচ্চতা নিয়ে তিনি এমনিতেই আলাদা। অসম্ভব সুদর্শন মানুষটি বেশ বিনয়ী, ভেতরে লাজুক, নিজেকে প্রদর্শন করতে চান না। আমার ইন্টারভিউমার্কা জিজ্ঞাসার ধরণ দেখে অনুমান করে নেন আমি বোধহয় তাকে নিয়ে লিখতে যাচ্ছি। অনুমান মিথ্যে নয়। বিষয়টি তাকে যে কিছুটা অস্বস্তির মাঝে ঠেলে দিচ্ছে- খোলামনেই আমাকে জানালেন। কিন্তু আমি তো লিখবোই। অমন মানুষকে নিয়ে না লিখে পারা যায়?

গোপনে বলি, তাকে আমি ঈর্ষা করি। ঈর্ষার আরেকটি কারণ তার দেশভ্রমণের ঝোঁক, সামর্থ্য ও স্বাচ্ছন্দ্য। গত বছরের গোড়ার দিকে গেলেন রাশিয়া ভ্রমণে। আমি তখন পুনর্বার পড়ছি রাশিয়ার ক্লাসিকসমূহ। মন প্রতিদিন ছুটে যায় কাজান, নিজনি নভোগ্রদ, মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গে। আমি পারলাম না, তিনি চলে গেলেন। বছরের শেষের দিকে গেলেন প্রাচীন সভ্যতার এক বিস্ময় মিশর দেখতে। আমার চিকিৎসক বন্ধুরা অজ্ঞাত কারণে আমাকে না নিয়ে চলে গেল পিরামিড আর স্ফিংসের দেশ মিশরে। ভাবছিলাম কী জবাব দেই সে অবহেলার? তবে আমি নই, নীল নদের দেশে চলে গেলেন অধ্যাপক ফকরুল আলম, যিনি ঘণ্টা ঘণ্টা, এমনকি পুরোদিন কাটাতে ভালোবাসেন জাদুঘরে। দালানকোঠার চেয়ে তাকে বেশি টানে প্রত্নসম্ভার। বিশ্বের ত্রিশটির অধিক দেশের শতাধিক নগরে গ্রন্থাগার, চিত্রশালা আর জাদুঘর দিনের পর দিন যিনি ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষন করেছেন, যার সৌন্দর্য অবলোকের চোখের পাশে থাকে সমালোচকের দ্বিতীয় চোখখানি, তাকে ঈর্ষা না করে পারা যায়?

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২১ বার

Share Button

Calendar

April 2019
S M T W T F S
« Mar    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930