» দিশাহারা দ্রাবিড়া’দি

প্রকাশিত: ১৬. জুন. ২০১৯ | রবিবার

দিলরুবা আহমেদ

দ্রাবিড়া’দি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন।
২৫ বছরের কোন ইয়াং মেয়ে নাক ডেকে ঘুমালে যে তাকে কেমন লাগে শাপলা আগে তা জানতো না। এখন বুঝতে পারছে। কিন্তু ঠিক রূপায়ন করতে পারছে না। দু’একবার ঠেলা দিয়ে দেখেছে থামে কি না। না থামছে না। যাক বাবা, ডাকুক নাক। ডাকু ডাকু যে লাগছে সে কথা না হয় উঠলে বলেই দেবে।
কিন্তু উঠবে কখন! সূর্য্যরে আলোয় ঘর বাড়ি ছটফটাচ্ছে। কিন্তু উনি খুব আরামেই ঘুমাচ্ছেন। রাতভর জেগে ছিলেন। চাঁদ দেখবার জন্য নয়, কাঁদবার জন্য। রাতে বললেনও কয়েকবার, কলকাতায় কাদতে ইচ্ছে করেনি, এখন করছে। কেন করছে তা ভেবে বার করতে বললেনও তাকে। সেই থেকে শাপলা বহুক্ষণ খুবই চিন্তাযুক্ত মুখে যতক্ষণ দ্রাবিড়া’দি না ঘুমিয়েছে চেয়েছিল তাঁর দিকে। বলেওছিল,
আমার কি জানার কথা কেন তুমি ওপারে কাদনি, এপারে কাদছো?
উনি সাথে সাথে বললেন, ভেবে বের কর।
দ্রাবিড়া’দি তাকে হঠাৎ করেই তুই করে বলতে শুরু করেছেন। বেশি আপন হলেই ‘তুই’ তে আসা যায়। ফলে সে নিজেও একটা দায়িত্ব বোধ করছে ভেবে ভেবে বের করার। খুজে বের করতে চাইছে কিছু যা বলে দ্রাবিড়া’দির মনটা ভালো করে দেওয়া যায়। বলেও ফেললো,
মনে হয় তুমি ভেবেছো এই পারের শস্য ক্ষেতগুলো খরা থেকে বাচবে তোমার চোখের জলে।
তার কথায় পিক করে হেসে ফেললেন দ্রাবিড়া’দি। আধারের মাঝে চিক চিকে সাদা দাঁত, ঝকমকিয়ে বিদ্যুৎ চমকে উঠলো যেন কোন এক ভরা বর্ষার রাতে।
বললেন,
নোনা জলে সবকিছু ধ্বসে যায় রে।
তোমার জল মিষ্টি।
আবারও হেসে ফেলেছিলেন দ্রাবিড়া’দি। তারপর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকলেন। তারও পরে বেশ কয়েকবার এই সকাল হবার মাঝে উঠলেন, কাদলেন, গড়ালেন ।
দ্রাবিড়া’দির মাসী বেশ ক’বারই রাতে এসে বলে গেছেন,চিটাগং আসার পর থেকে তো কিছুই মুখে দেয়নি দ্রাবিড়া’দি, একটা পুরা বেলা গড়িয়ে পেরিয়ে গেছে।শুধু তাই না এখনও অতিথি না খেলে কি কি অমঙ্গলের সম্ভাবনা রয়েছে এই পরিবারের ইত্যাদি সব কথাও বলছেন। অতিথি তাই শুনে বলেছেন, তিনি অতিথি নন। ঘরের মানুষ।
তারপরও খালা বা মাসী শেষ বার যখন এলেন তখন ভালই পিড়াপিড়ী করছিলেন, দ্রাবিড়া’দি হঠাৎ তখন বললেন,
তুমি বুঝি ভুলতে পারনি যে তোমার বোন আমাকে কারও থেকে তুলে নিয়ে গেছিল ২৫ বছর আগে। তাই অতিথি ভাবছো।
খালা এ কথায় এতই থামকে ছিলেন যে একটি কথাও জুটলো না ওনার মুখে। সম্ভবত উনিও জানতেন না যে দ্রাবিড়া’দি জেনেছেন সব। বা উনি নিজেও সত্যিটা জানতেন না। উনি চুপচাপ চেয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ। ওনার বয়স সম্ভবত ৫০ এর আশেপাশে। বেশ নাদুশ নুদুশ। দেখলেই মমতাময়ী মনে হয়। আসার পর থেকেই বহুবার বুকে টেনে নিয়েছেন দিদিকে। তাকেও বলেছেন, তোমরা তো আমার পরম আত্মীয়। এখন যখন হঠাৎ তিন চার মিনিটের জন্য কোন শব্দ বা ভাষা খুজে পেলেন না, তখনও তারপরের প্রথম যে কথাটা মুখ দিয়ে বের হলো সেটা ও হচ্ছে,
তোমরা তো আমার পরম আত্মীয়।
দ্রাবিড়া’দিও যেন উত্তর মুখে নিয়েই বসে ছিলেন, বললেন, ও,ওই শাপলা হতে পারে। ও তোমার বোনের বরের ভাইয়ের মেয়ে, আমি নই। যদিও ওর ধর্ম ভিন্ন। আর তোমার বোন মুসলমান বিয়ে না করলে এর -ও তোমার পরম আত্মীয় হবার কোন সম্ভাবনা ছিল না।
এ কথায় খালা কান্নাকাটি করে না উঠে বরঞ্চ আরো শক্ত হয়ে চুপচাপ চেয়ে থাকলেন।
শাপলা বুঝলো তার কিছু বলা উচিত পরিস্থিতি সামাল দিতে। তবে বললো যা, তা বলে নিজেরই মনে হলো, এ কোন হাদারামগিরি। সে বলল,
কেদো না খালা। দিদি মনের দুঃখে এসব বলছেন। সবে সবে জেনেছেন উনি পালক,তাই।
তবে বলেই খালার কড়কড়ে শুকনো চোখের দিকে চেয়ে বুঝলো হাদারাম আর কাকে বলে। খালা তো কাদছেন না! তবে দ্রাবিড়া’দি সাথে সাথেই বললেন,
না আমি সত্যি কথাই বলছি। এতদিন আমাকে সবাই মিথ্যা বলেছে। মাত্র একমাস হয় আমি সত্যি জেনেছি। তুমি কি জান কে আমার জন্মদাতা মা আর বাবা। আমাকে কি কোন ডাসবিন থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তোমার বোন।
খালা চুপচাপ চেয়ে আছেন। হঠাৎ যেন সস্বিৎ ফেরত পেলেন। বললেন,
দাড়া, দরজাটা আগে বন্ধ করে দেই। আমার শ্বশুর বাড়িতে জানাজানি হলে অসুবিধা।
দেশে দেশে এত বড় সত্যি গোপন করে রেখেছো তোমরা বোনেরা। কিইবা হবে তোমার শ্বশুর বাড়ির সবাই জেনে গেলে। মারবে তোমাকে মাসী?
আস্তে, গলা নামিয়ে কথা বল। ভদ্রভাবে আমরা এসব কথা আলাপ করতে পারি। আমি চাইনা আমার শ্বশুর বাড়িতে সবাই জানুক আমার বোনের তুমি নিজের মেয়ে নও।
জানলে কি হবে।
হাজারটা প্রশ্ন উঠবে।
কেন ? অন্যের বাচ্চা পালা কি অপরাধ।
অবশ্যই না।
নাম পরিচয় গোত্রহীন বাচ্চা পালা নিশ্চয়ই তোমাদের বাড়িতে গ্রহণযোগ্য নয়। সবাই নাক সিটকাবে ডাসবিন থেকে তুলে আনলে, তাই না?
শাপলা দেখলো কথা বলতে বলতে চোখমুখ কেমন বদলে যাচ্ছে দ্রাবিড়া’দির। কেমন যেন হিংস্র হয়ে উঠছেন তিনি। তাড়াতাড়ি সামাল দিতে গিয়ে শাপলা বলল,
আরে, এ যুগে এসব কোন ব্যাপারই না। ডাসবিন, পতিতালয়, ফুটপাত, অনাথাশ্রম,ব্যক্তি বিশেষ, সবই ওকে,অলরাইট।
বলেই বুঝলো, আরো ভুল করেছে।
অত্যন্ত খরখরে চোখে দু’জনাই তাকে দেখছে। খালা বললেন,
শোন তোমরা দুজনাই বুঝে শুনে কথা বলবে, এটা আমার শ্বশুর বাড়ি। এসেছো এক বেলা হয়নি,অথচ মনে হচ্ছে অশান্তির পথ খুজছো। ২৫ বছর আগে এলে এই বাড়ীতে তোমাদের ঢুকানোই যেত না। যুগ বদলেছে বলেই তোমাদের ঢ়ুকাতে পেরেছি।
থতমত খেয়ে শাপলা বললো,
দ্রাবিড়া’দির জীবনে কি হলো না হলো তা নিয়ে আপনাকে কেন অশান্তি পোহাতে হবে।
হবে। আমার জীবন নরক হয়ে উঠবে। সারাক্ষণ গবেষণা চলবে। সবাই সারাক্ষণ জানতে চাইবে এই বাচ্চা কার, কোত্থেকে এলো, কেন পালক নিলো, কেন তোমার বোনের বাচ্চা হয়নি। কত কি? কেন মুসলমানের সাথে পালালো সেই কথাও আবার উঠবে।
উনি তো মারা গেছেন বহুদিন,তারপরও।
হ্যা, তারপরও। থাকনি তো কখনো যৌথ পরিবারে, তাই বুঝবে না। শোন দ্রাবিড়া,তুমি থাক যে ক’দিন ইচ্ছে কিন্তু কাউকে জানাবে না তোমার অতীত, কে তুমি। আমার চৌদ্দ পুরুষের দিব্যি থাকলো।
আমি তো জানিও না আমি কে ! আমাদের চৌদ্দপুরুষও এক না। তোমার চৌদ্দপুরুষের কোন অসুবিধা হলে আমার কিছু যায় আসে না। চৌদ্দ পুরুষের দিব্যিকে তাই আমি ভয়ও পাই না। আমিও তোমার কেও না।
কথাটা খুব শান্তভাবে বলে, দ্রাবিড়া’দি অন্য দিকে ঘুরে শুয়ে পড়লেন।
খালা আহত চেহারা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকলেন। কয়েকটা দীর্ঘশ্বাসও ফেললেন। একসময় বললেন,
তুমি আসাতে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম,সেই কতদূর কোলকাতা থেকে এসেছো। আমি জানতাম না যে তুই আমার বোনের মেয়ে না।
সে কি বলছো!
দ্রাবিড়া’দি এবার চিৎকার দিয়ে উঠে বসলেন। অবাক হয়ে বললেন,
মানে? তুমিও জান না। তুমি না আমার মায়ের একমাত্র বোন।
হ্যাঁ, কিন্তু মুসলমান ছেলেকে বিয়ে করায় ওর সাথে তো আমাদের কোন যোগাযোগ ছিল না। একবার বহু পরে কে যেন তোকে তোর মায়ের কোলে দেখেছিল, শিয়ালদহ স্টেশনে। সেই থেকে আমরা জানি দিদি’র একটা মেয়ে আছে।
মা তাহলে কাওকে বলে যায়নি? মার কি উচিত ছিল না মরে যাবার আগে বলে যাওয়া। আমাকে বা বাবাকে একটা কিছু বলে যাওয়া!!
সে কি জানতো যে সে মারা যাবে। যখন সে মারা গেল তোর বয়সইবা কত। ১০/১২ বছর। অত ছোট মেয়েকে কি বলবে। বুঝবে কি সে!
দ্রাবিড়াদি আনমনে বললেন,
এটা সে ঠিক করে নি। এখন কোথায় খুজে পাব আমার অতীত।
খালা বললেন,দরকার কী?
দরকার আছে। আমার নিজের বাবা মাকে আমার খুজে বার করতে হবে।
ভ্র-কুচকে খালা বললেন, সে-টাই! পর কখনো আপন হয় না।
গজ গজাতে গজাতে খালা এরপর উঠে পড়েছিলেন।
ইশারায় শাপলাকেও ডাক দিয়েছিলেন।
শাপলাও বাধ্য মেয়ের মত পিছু নিয়েছিলো।
রুম থেকে বের হলে সোজা বারান্দা, তারপর দুইতিন ধাপ সিড়ি দিয়ে নেমে গেলে লম্বা একটা গলির মতন, দুপাশে কিছু রুম, বেশ অন্ধকার, লোড় শেড়িং, ধুপের গন্ধ আসছে। তারপরে বিশাল একটা খাবার ঘর। এক পাশে টিভি আছে। পুরা বাড়িতে মনে হয় ঐ একটাই টিভি। বিভিন্ন বয়সী মানুষজন তার সামনে জড়ো হয়ে বসে আছে। বাড়িটার বিভিন্ন দিকে লতাপাতার মতন শাখা প্রশাখা গজানো হয়েছে। যখন যেদিকে খুশি রুম বাড়ানো হয়েছে। আসতে আসতে মনে রাখতে চেয়েছে কিভাবে ফিরে যাবে নিজেদের ঘরটায়। ওটা মনে হয় সাড়ে তিন তলায়। এদিকে আসতে আসতে এই খালা আনমনে নিজের মরা বোনকে কত কি বলতে বলতে এসেছে, খোলা আকাশের দিকে চেয়ে বহু বিড়বিড়িয়েছে। সে অবশ্য দু’একবার এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে চাঁদটাকে দেখতে চাইছিল। কিন্তু হলো না, কই সে চাঁদ। লুকায়েছে যে কোথায়!!
তুমি বস, রাতের খাবারটা খেয়ে নাও। যাবার সময় ওরটা নিয়ে যেও।
বিনাবাক্যে সে খেতে বসে গিয়েছিল। সে চায় না আর কোন ড্রামা।
ওপাশে থেকে খালার মহাবৃদ্ধা শ্বাশুড়ী বললেন,
সেকি? আরেকজন আসেনি কেন? আমরা হিন্দু বলে কি তোমার বোনঝি বিরক্ত।
না মা, ওর নাম শুনেননি, দ্রাবিড়া, সে মুসলমান না তো।
আমার মা বলেছেন, উনি মুসলিম।
তাহলে ওকে তুমি দিদি বলছো কেন?
উনি বলেছেন তাই। দ্রাবিড়া আপা শুনতে কেমন যেনো লাগে। বলে শাপলা নিজেই হাসলো। কিন্তু খালা বললেন,
না, হিন্দু বলেই বলেছেন। তুমি কি আমার বোনের মেয়ের খবর আমার থেকে বেশি জান।
বলেই খালা চোখ টিপলেন। বুঝলো খালা আর কথা বাড়াতে দিতে চান না। সেও সবার সামনে আর মনে করিয়ে দিল না যে, দ্রাবিড়া’দি ওনার বোনের মেয়ে না। বোনের সাথেই সম্পর্ক ছিল না তো এখন জানবে বোনের মেয়ের খবর। হুম। তাহলেই হয়েছে! তবে কথা না বাড়িয়ে মজা করে খেতে লাগলো মেথী মেশানো তরকারী। দারুন খেতে।

এরপর রুমে ফিরে এসেছিল।
খালাও আসা যাওয়া করেছেন রাতভর। দ্রাবিড়া’দি নিরবে বা সরবে কেদেছেন। এখন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন।
থাক ঘুমাক,যতক্ষণ মন চায়।
সে ভুুুতুম ভাইয়ের সাথে যোগাযোগের ভাবনায় ব্যস্ত হলো। ভেবেছিল চিটাগং এলে ভুুুতুম ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করবে। কিন্তু ফোন তুলেও আবার রেখে দিল, কেমন যেন সংকোচ বোধ করছে। পরক্ষনেই মনে হলো আচ্ছা দ্রাবিড়া’দি কি ঘুমের মাঝেও খুজছেন হারানো জগত? কিন্তু সে জগতে তো তিনি ছিলেনও না কখনো। ধরতেও কি আর তাহলে পারবেন কোন এক স্বপ্নে ? শাপলার তার সামনে দলা পাকানো ভাবে শুয়ে থাকা দ্রাবিড়া’দিকে দল ছুট এক বিভ্রান্ত ছুটন্ত নিহারিকা বলে ভ্রম হতে লাগলো।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৮৬৬ বার

Share Button

Calendar

November 2019
S M T W T F S
« Oct    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930