শিরোনামঃ-


» দুদুলের স্বপ্ন

প্রকাশিত: ৩১. অক্টোবর. ২০১৯ | বৃহস্পতিবার


পার্থ সারথী তাপস

কড় কড় কড়াৎ, ভীষণ ঝড়ের মত সাঁই সাঁই গর্জনে দুদুলের পড়ার টেবিল কাঁপিয়ে কি যেন সশব্দে উঠানে পড়ে গেল। চমকে ওঠে দুদুল, কিন্তু বুঝতে পারে সিন্দুরে আম গাছটাই কাটা হয়েছে। ঐ গাছের সিঁদুর রঙা পাকা আমগুলো খেতে কি মজাই না লাগতো। নতুন দো’তলা বাড়ি করার জন্য বাবা শেষ পর্যন্ত সিন্দুরে আম গাছটাই কাটালেন ।

অসংখ্য পাখির কিচির মিচির শব্দে আর অনেক লোকের হৈ চৈ-এ দুদুল পড়ার ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো। একি কান্ড ঝাঁক ঝাঁক পাখি কিচির মিচির শব্দে সারা বাড়ি যেন মাথায় তুলে ফেলেছে। আর খিপ্ত পাখিগুলো বার বার কদ্দুছ মিয়ার মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। আমাদের উঠান উৎসুক জনতায় ভরে গেছে। সবাই চিৎকার করে কদ্দুছ মিয়াকে উপদেশ দিচ্ছে। বলছে পাখিদের আক্রমন থেকে বাঁচতে হলে ঐ গোয়াল ঘরে ঢুকে পড়। পাখিদের থেকে আত্মরক্ষার্থে কদ্দুছ মিয়া শেষ পর্যন্ত গোয়াল ঘরে আশ্রয় নেয়। চঞ্চল পাখিরা এগাছ থেকে ওগাছে উড়তে থাকে। দুদুল তার ছোট কাকাকে বলে পাখিগুলো কদ্দুছ মিয়ার উপর ক্ষেপে গিয়ে ওর মাথায় খামছি মারতে চাইছে কেন? তুই জানিস না বুঝি, ওই আম গাছটায় আর লেবু বাগানে অসংখ্য পাখির বাসা ছিল। এ সময়টা পাখিরা ডিম দেয়, বাচ্চা ফুটায়। কদ্দুছ মিয়া পাখিদের বাসা ভেঙ্গে দিয়েছে। পাখিরা তাই ক্ষেপে গিয়ে বার বার কদ্দুছ মিয়াকে আক্রমন করছে। দেখেছিস দুদুল পাখিরাও কেমন জোট বেধে আন্দোলন করে আর কিচির মিচির করে ¯েøাগান দেয়। দুদুলের ছোট কাকা পাখিদের কিচির মিচিরের শব্দের সঙ্গে নিজের কন্ঠের সুর মিলিয়ে বলে “গাছ কাটা চলবে না, পাখির বাসার নিরাপত্তা চাই।” পাখির বাসা ভাঙ্গা কদ্দুছ মিয়ার ফাঁসি চাই – ফাঁসি চাই। দুদুল ছোট কাকাকে বলে এটাতো পাখিদের ¯েøাগান না। মনে হচ্ছে তুমি ¯েøাগান দিচ্ছ। দুদুলের ছোট কাকা বলে কান আর মন একসঙ্গে করে পাখির কিচির মিচির এর শব্দটা ভালো করে শুনতে চেষ্টা কর, তাহলে পাখিদের শ্লোগানটা তুইও আমার মত শুনতে পাবি।

স্কুলের সময় হয়ে যায়। স্কুলে যেয়েও দুদুলের ভালো লাগছে না। বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে বাসা ভাঙ্গা পাখিদের করুণ আর্তি। কদ্দুছ মিয়াটা কি ভীষণ বোকা। ঐ গাছগুলোতে পাখিদের বাসা রয়েছে তা আগে থেকেই বাবাকে জানালেই হতো। তাহলে তো নির্বোধ বেটাকে পাখিরা এত আক্রমন করতো না। সন্ধ্যর অন্ধকারে জোঁনাকির আলোয় সিন্দুরে আম গাছের কাটা টুকরো গুলোকে মৃত লাশের মত পড়ে থাকতে দেখে দুদুলের চোখে জল এসে যায়। দিদি ডাকে। দুদুল দুদুল অন্ধকারে একা একা দাড়িয়ে কি করছিস। আয় পড়তে বস। দিদির ¯েœহের ডাকে দুদুল ঘরে এসে দিদির পাশে শুয়ে ভাবতে থাকে, বাসা ভাঙ্গা পাখিগুলো আজ রাতে বাচ্চা-কাচ্চাদের নিয়ে থাকবে কোথায়।

কদ্দুছ মিয়া মানুষটা কি ভংঙ্কর। পাখিগুলোর বাসা তো ভেঙ্গেছেই! তার পরেও একটা পাখির বাসা দুদুলের সামনে ধরে বলে, দেহ দুদুল এইটা টুনি পক্ষির বাসা। পাখিডা ছুডু হইলে কি হবো কি সুন্দর কইরা বাসাডা বানাইছে হাতে লইয়া দেহ। দুদুলের ইচ্ছা করে না বাসাডা হাতে নিতে। কিন্তু কি ভেবে যেন হাতে নেয় । কি আশ্চার্য, ছোট্ট একটা টুনি পাখি কি অপূর্ব বুনন কৌশলে শুকনা ঘাস পাতা দিয়ে নির্মাণ করেছে নিজের সুখের বাসা। আর দুদুলের বাবা তাদের নতুন দোতলা বাড়ি তৈরি করতে গিয়েই মুহুর্তেই ভেঙ্গে দিল হাজারো পাখির ঘর। দুদুল এই সন্ধ্যা রাতেই ঘুমিয়ে গেলি , এবার না তোর সমাপনী পরীক্ষা। দিদির ডাকে ঘুম ঘুম চোখে দুদুল বলে আজ আমার মনটা ভালো নেই। আজ আমি পড়বো না। দিদি, মাকে বলে দিও আমি আজ রাতে কিছু খাবো না। দুদুল দুদুল ও দুদুল আমাদের ডাক শুনতে পাচ্ছ।
কে ? কে ? আমরা তোমাদের আম গাছের, লেবু বাগানের বাসা হারা টুনটুনি, ময়না, শালিক, দোয়েল, ফিঙ্গে, বুলবুলি পাখিরা। দুদুল খুব খুশি হয়ে বলে তোমরা এসে ভালোই করেছ। আমি তোমাদের কথাই ভাবছি। শালিকটা এগিয়ে এসে ফর ফর করে গলাটা একবার ডানে একবার বামে ঘুরিয়ে বড় বড় হলুদ চোখে একেবারে দুদুলের মুখের কাছে এসে নেচে নেচে বলে কি ভাবছো দুদুল ? ভাবছি পুকুর ধারে ঐ বড় কাঁঠাল গাছটায় অনেকদিন নিশ্চিন্তে বাসা বেধে থাকতে পারবে। ছোট্ট টুনটুনি ফুড়–ত ফুড়–ত শব্দে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বলে, দুদুল দেখছি কোন খবরই রাখনা। ঐ কাঁঠাল গাছটা দিয়েই তোমার বাবা নতুন বাড়ির দরজা জানালা তৈরি করাবেন। কাঠ মিস্ত্রিও ঠিক হয়ে আছে। তাহলে, তোমরা আমাদের লিচু গাছটাতেই বাসা বেধে থাকো। লিচুর মৌসুমে লিচুও খেতে পারবে বলে দুদুল পাখিদের দিকে তাকায়। পাখিদের মধ্যে শালিকটা যেন বড় নেতা। ফোঁস ফোঁস শব্দ করে কর্কশ গলায় হেঁসে উঠে বলে, লিচু গাছে কি পাখি থাকে। পাখি ধরার জন্য লিচু গাছে জাল টানানো হয়। তাছাড়াও টিনের একটা ঘন্টা বেধে রাখা হয়। সারা দিন সারা রাত ছোট ছেলে মেয়েরা দড়ি টেনে ঢং ঢং করে ঘন্টা বাজিয়ে পাখি তাড়িয়ে কি মজাই না করে। এভাবেই পাখিদের ভয় দেখানো হয়। নিশ্চয় তোমাদের আশ্রয়ের জন্য কোথাও না কোথাও নিরাপদ গাছ পেয়ে যাব। সব পাখিরা এক সঙ্গে চেচামেচি করে বলে উঠে দুদুল আমাদের কে নিয়ে তোমাকে আর ভাবতে হবে না। আমরা আর কোনদিন তোমাদের কোন গাছে বাসা বাধবো না। অন্য কোথাও চলে যাবো। এর পর দেখবে, আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, আতা সব ফলেরাও তোমাদের ছেড়ে চলে যাবে। বুঝেছি বুঝেছি তোমরা আমার বাবার উপর রাগ করেছ। আমার বাবা না বুঝে তোমাদের ক্ষতি করেছে। কিন্তু ফলেদের তো কোন ক্ষতি করে নাই। ফলেরা তোমরা আমাদের ভুল বুঝে ছেড়ে চলে যেও না। দোয়েল, ময়না, টিয়া, টুনটুনি বলে ভোর না হতেই গানে গানে আমরা তোমাদের জাগিয়ে তুলি। আমাদের গানে গানে মুখরিত হয়ে ফুলেরা জেগে উঠে। প্রজাপতি, মৌমাছিরা দলে দলে মধু সংগ্রহে ছুটে আসে। চারিদিকে ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। তোমাদের জন্য আমরা কত কিছুই না করি। এখন আর তোমাদেরকে বিশ^াস করিনা। তোমাদের নিরবিচ্ছিন্ন অত্যাচারে আমরা জর্জরিত। মানুষ মাত্রই ভুল করে। আমার বাবাও না বুঝে ভুল করেছে। পাখিদেরকে দুদুল তার বাবাকে ক্ষমা করতে বলে। কালচে পালকে ঝিলিক দেওয়া টুক টুকে হলুদ ঠোঁটে ময়না মুখ ভেংচিয়ে বলে দুদুল তোমাদের আদিক্ষেতা দেখে এখন আমাদের হাসি পায়। পরিবেশ কে যেমন তোমরা দুষিত করেছ, তোমাদের মনকেও করছ কলুষিত। প্রতিনিয়ত তোমাদের মন আরো বর্বর ও নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। ময়না তুমি না গানের পাখির রাজা, তুমি না গানের শিল্পী। আমাদের সম্পর্কে এ রকম কর্কষ কথা তোমার মুখে মানায় না। দুদুলের কথা শুনে ফিঙ্গে ঝুলানো লেজটি ডানে বামে উপরে নিচে জোরে জোরে ঝাকি দিয়ে। ব্যাঙ্গ করে বলে, চতুর মানুষ বাঘকে বলে ‘মামা‘, শিয়ালকে উপাধি দিয়েছে ‘পন্ডিত’ আর আমরা যে পাখিগুলো সুরে শব্দ করি তাদের কে বলল ‘গানের পাখি’। এখানেই তাদের চাতুর্যের শেষ হলো না। দোয়েল কে বলল জাতীয় পাখি, টসটসে রসে ভরা কাঁঠালকে সম্মান দিল জাতীয় ফলে, বিলের শাপলা ফুলের সৌন্দের্যে মুগ্ধ হয়ে বাঙ্গালী শাপলাকে দিল জাতীয় ফুলের মর্যাদা আর সুন্দর বনের হিং¯্র বাঘ কে বাঘ মামা বলেই নিশ্চিত হলো না। তাকে রাজকীয় উপাধি দেওয়া হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার কিন্তু খুঁত খুঁতে বাঙ্গালী একসময় কি মানসিকতায় যেন হিং¯্র বাঘকেও জাতীয় পশু হিসাবে ঘোষণা করলো। দুদুল পাখিদের বলল আমাদের দেশের কবি, গায়ক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক সবাই তোমাদেরকে কত ভালোবাসে তা তোমরা নিশ্চই জান। তোমাদের কে খেচর, পক্খি, বিহঙ্গ কত সুন্দর সুন্দর নামে ডাকি। শুধু একটা ভুলের জন্য এভাবে আমাদেরকে অপমান করা ঠিক হচ্ছে না। দোয়েল এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, হঠাৎ করেই ক্ষেপে গিয়ে বলে দুদুল তুমি বুকে হাত দিয়ে সত্যি করে বলতে পারবে আমরা কি তোমাদের কাছে যথাযথ সম্মান ও যতœ পাই। ফাঁদ পেতে আমাদেরকে ধরে ধরে খাচ্ছ। বনের গাছ গাছালি কেটে আমাদের খাদ্য ও আশ্রয়ের সমস্যা করেছ। গুলি করে বাঘ মেরে বাঘের চামড়া বিদেশিদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছ আর ভ‚মি দস্যুরা খাল, বিল, ঝিল সবই দখল করে নিয়েছে। কোথাও তো দেখিনা ফুটতে তোমাদের জাতীয় ফুল শাপলা। তোমাদের রাক্ষসে হিং¯্রতার কাছে পৃথিবীর অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণী আজ বিপন্ন। সব পাখি একসঙ্গে বলে উঠে দুদুল দুদুল জাতীয় পাখি দোয়েলের কথাগুলো কঠিন হলেও খুব সত্যি কিন্তু। সত্যি মিথ্যা জানি না, কিন্তু মানুষ অবিবেচক নয়, যার যা প্রাপ্য সম্মান সবসময়ই মানুষ দিয়ে থাকে। সব পাখি একসাথে বলে উঠে তোমাদের কোন বিষয়ে লজ্জা বা অনুশোচনা নেই। তোমরা শুধু আমাদেরই ধ্বংস করছো না, তোমরা ধ্বংস করছো নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য কেও। তোমাদের চৌদ্দ পুরুষের ভিটা এই বাংলাদেশ। পূর্ব পুরুষের ব্যবহারি জিনিস, লাঙ্গল, মই, পাখা, ঢেকি, মাটির কলস, খেলার পুতুল, কুলা, চালুন এদেরকেও ভুলে গেছ। বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে আজ তোমরা সাহেবী মনে ঘড়ি, টেলিভিশন, ফ্রিজ, মোবাইল, সানগøাস ইত্যাদি নিয়ে বিভোর। তোমার নানী কত যতেœ পান্তা ভাত খেত সেটা ভাবতেও আজ বোধ হয় ঘেন্না লাগে। দুদুল চিৎকার করে বলে উঠে না না, আমরা কিছুই ভুলে যাইনি, বাংলার ছড়া, গান, কবিতা আর নকশি কাঁথাতে আজও আমরা বাঙ্গালি বলেই পরিচিত। পাখিদের কিচির মিচির আর অসংখ্য মানুষের হৈ চৈ। দুদুলের ঘুম ভেঙ্গে যায়। মা মা বাইরে এত কিসের হৈ চৈ। মা বললেন আজ পহেলা বৈশাখ। সবাই মঙ্গল শোভা যাত্রায় যাচ্ছে। দুদুল তুই যাবি না? যাবো। কিন্তু একটা কথা বলবে মা, স্বপ্ন কি কখনো সত্যি হয়! দুদুলের মা বলেন স্বপ্নকে সব সময়ই সত্যি করে গড়ে তুলতে হয়। তাহলেই স্বপ্ন সত্যি হয়ে উঠে। মা আমি মঙ্গল শোভা যাত্রায় যাচ্ছি। এসে কিন্তু পান্তা ভাত খাব।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২১০ বার

Share Button