» অন্তরীণের দিনগুলি

প্রকাশিত: ২৫. মার্চ. ২০২০ | বুধবার

খায়রুন নাহার চৌধুরী

আজ ২৫ শে মার্চ ২০২০ । ১৯৭১ সালের এই রাতটি ছিল বাঙালির দুঃস্বপ্নের রাত। ইতিহাসের পাতায় যাকে আমরা “কালো রাত্রি” বলে জানি। পুরো জাতি আজ গভীর বেদনায় কালো রাত্রি পালন করবে। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে সকল শহীদদের ।
“করোনা” নামক ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার কারণে পৃথিবীর মানুষদের প্রতিটা দিন কাটছে এখন প্রচন্ড উৎকন্ঠায় । প্রতিদিন করোনার আপডেট জানছি। টিভি, ফেবু,বিভিন্ন পোর্টাল মাধ্যমে এখন করোনাই সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে।এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাস আমাদের নীল গ্রহটাকে ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে । চলছে মানব জাতি বনাম ভাইরাসের যুদ্ধ ।এ যেনো কল্পকাহিনীকেও হার মানায় । করোনা যখন চীনের ইউহান নগরীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে,ঠিক সেই সময়টাতে আমি ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরের একটি শান্ত সুনিবিড় আবাসিক এলাকা ইকেনহামে।সেখানে কেবল বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে। প্রকৃতি এক রূপ থেকে আরেক রূপে নিজেকে সাজাতে ব্যাস্ত । গাছে গাছে নতুন কুঁড়ি এসেছে, পাখীদের আনাগোনা শুরু হয়েছে । সেই সময়টাতে আমরা টিভিতে চীনের করুণ অবস্থা দেখছি আর হায় হায় করছি। আমার একমাত্র সন্তান আমাকে জড়িয়ে ধরে চোখ বড় বড় করে অপলক দৃষ্টিতে টিভির পর্দায় তাকিয়ে থেকে বললো, “মা আজ থেকে ৪০ বছর আগে করোনা ভাইরাস নিয়ে Dean Koontz একটা বই লিখেছিলেন,নাম “The eyes of daekness “.আশ্চর্যের বিষয় বলি আর কাকতালীয় ভাবেই বলি,আজ আমরা এই ভয়ংকর ভাইরাসের সম্মুখীন হয়েছি।” মেয়ের ইউনিভার্সিটি তখনও খোলা, কিছু দিনের ভীতর ক্লাস শুরু হবে। এক রুমের একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে। আমি চলে আসবার পর সে ফ্ল্যাটে উঠে যাবে। আমি গেছি বোনের মেয়ের বিয়েতে। আমার আসার দিনটি ছিল ৫ ফেব্রুয়ারী। আমার আসার দিন পর্যন্ত ইংল্যান্ডে মাত্র চারজনের শরীরে করোনার উপস্থিত পাওয়া গেছে। বৃটেনের নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তখন বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেন নাই। তিনি ব্রেক্সিট পরবর্তী সমস্যার সমাধান নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ৫ ফেব্রুয়ারী বেলা দেড়টায় আমার ফ্লাইট । এয়ারপোর্টে এসে আমার একটু ধাক্কার মতো লাগলো। কেমন যেনো নির্জীব, চেনা বিমানবন্দর খুব অচেনা মনে হলো। নিজের লাগেজ নিজেই ওজন করলাম, বোর্ডিং পাস নিলাম।লোকজন চোখে পড়ার মতো কম ছিল। নির্দিষ্ট সময় ফ্লাই করলাম । দুবাই ট্রানজিট ছিল। পুরো ভ্রমণ বেশ উপভোগ করেই দেশে ফিরলাম । দেশে পৌছে আরো ভালো লাগলো,খুব দ্রুত ইমিগ্রেশন সেরে ফেললাম।অবশ্য ইমিগ্রেশনে আসবার আগে প্রতিটি যাত্রীকে একটা কাগজ ধরিয়ে দেয়া হলো। এই কাগজে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নানান প্রশ্ন রয়েছে। এগুলো পূরণ করে ইমিগ্রেশনে জমা দিতে বলা হলো। আমি তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কাগজটি হারিয়ে ফেললাম ! ইমিগ্রেশন অফিসার মাক্স আর গ্লাভস পরে বসেছেন। চোখ বড় করে বললেন, “কোন দেশ থেকে ফিরলেন?” ইংল্যান্ড বলায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। পাসপোর্ট চেক করতে করতে কিছুক্ষণ খোস গল্পও করলে নিলেন।উনার মনে নেই স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ফরমটির কথা, আর আমারও মনে ছিল না। যেমন যাত্রী তেমন ইমিগ্রেশন অফিসার । এয়ারপোর্টের কোনো কর্মকর্তার “করোনা ” নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা আছে বলে মনে হয়নি। নির্দ্বিধায় লাগেজ কালেকশন করে বাড়ি ফিরে আসলাম। অহ্ একটা কথা বলতে ভুলে গেছি,পুরো যাত্রা পথে আমি অসংখ্যবার হ্যান্ড সেনেটাইজার ব্যবহার করেছি,মাক্স পরেছি এবং বাড়ি ফিরে দশদিন হোম কোয়ারেন্টিনে থেখেছি। এসবই আমি আমার মেয়ের পরামর্শে করেছি। তখনও “কোয়ারেন্টিন” শব্দটির বহুল প্রচার হয়নি। দিন যত যাচ্ছে “করোনা ” তার শক্তি তত বাড়াচ্ছে । একে একে আজ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ দখল করে নিয়েছে । শত শত কোটি মানুষ আতংকে দিন পার করছেন। সবার আজ একটাই চাওয়া, করোনা থেকে মুক্তি ।পৃথিবীর সব শক্তিধর রাষ্ট্রপ্রধানের চোখে আজ পানি। সব শক্তি আজ একটা ভাইরাসের কাছে নতি স্বীকার করেছে।মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে । মক্কা মদিনাও আজ জন মানব হীন । কল্পনাতেও ছিল না,এমন দিন আমাদের দেখতে হবে। এমন একটা ভাইরাস আসবে,যেটা সবাইকে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখবে। আপনজন রোগে কষ্ট পাচ্ছে,শেষ নিঃশ্বাসের জন্য ছটফট করছে,অথচ আপনি তার কাছে যেতে পারছেন না । প্রিয়জন মারা যাচ্ছেন হসপিটালের নিবিড় কক্ষে। একা অসহায় অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছেন অথচ কেউ কাছেও যাচ্ছেন না শেষ বিদায়টুকু জানাতে। মারা গেলে দাফন করতে যাওয়া পর্যন্ত নিষেধ । এ কেমন মৃত্যু! এ কেমন অভিশপ্ত জীবনাবসান!
আমাদের হতদরিদ্র দেশটাকেও করোনা ছাড়েনি। ঘনবসতিপূর্ণ ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্র । যে রাষ্ট্রের অধিকাংশই দিন এনে দিন খায় । দশ দিনও ঘরে বসে খাওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। সে দেশের নাগরিকদেরও ঘরে অন্তরিন হয়ে থাকতে হবে,বাঁচতে হলে এছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই । আমার মেয়ের ইউনিভার্সিটি অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ । সে সম্পূর্ণ একা একটা ঘরে বলতে গেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছে । ইংল্যান্ডে ২৩শে মার্চ থেকে “লকডাউন ” ঘোষণা করা হয়েছে । উপযুক্ত কারণ ছাড়া বের হতে পারবে না ,আর উচিতও নয়। মেয়েটা পরপর দুইদিন বাজার করতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছিল। লোকে পাগলের মতো কেনাকাটা করছে। দোকানির পরামর্শে খুব ভোরে গিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা করতে পেরেছে শেষ পর্যন্ত । জানি না সামনের দিনগুলো কেমন হবে। সবার জন্য চিন্তা হয়,চোখ বন্ধ করলে প্রিয় মুখগুলো দেখতে পাই। খুব কষ্টে আছি আমরা ,পৃথিবীর মানুষরা। তবুও জীবন চলছে,স্বপ্ন দেখা থামেনি।
দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে। আজ বিরোধী দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া দুই বছর এক মাস সতেরো দিন পর কারামুক্ত হলেন। তাঁকে বরণ করে নেয়ার জন্য দলীয় নেতা কর্মীরা পিজি হাসপাতালেল সামনে ভীড় করেছেন। এখন সেখানে লোকে লোকারণ্য ।যদিও সবাই জানেন এই সময় এতো লোক জড়ো হওয়া বিপজ্জনক । অবশ্য অনেকেই বলেন আমাদের কিচ্ছু হবে না। না হবারই কথা,আমরা যুদ্ধা জাতি।আমাদের মনোবল অসাধারণ পর্যায়ে । সরকার দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ,শপিংমল,রেস্তরাঁ ইত্যাদি বন্ধ ঘোষণা করেছে যাতে সবাই ঘরে থাকেন। আর আমরা এই সুযোগে পিকনিক শুরু করে দিয়েছি। গত দুইটা দিন লাখ লাখ মানুষ নিজ নিজ স্থায়ী ঠিকানায় ফিরে গেছেন। আজ থেকে পাবলিক পরিবহন বন্ধ হয়েছে।বুঝলাম না পাবলিক সব ঢাকা ছাড়ার পর পাবলিক পরিবহন বন্ধ করে কি লাভ হবে !? আমার ধারণা আমাদের নিয়ে সরকারের সব পরিকল্পনা বিফলে যাবে। অবশ্য পাবলিকের দোষ দেই কি করে ? ঘরে বসে থাকলে কে খাওয়াবে? সবার খালি বড় বড় কথা। অন্ন যোগাতে কেউ নাই।
আসলে আমাদের আল্লাহ্ ছাড়া উপায় নাই। তিনি একমাত্র রক্ষাকর্তা। হায় আল্লাহ্ তুমি আমাদের মাফ করো আর তোমার রহমতের ছায়ায় বাংলার মানুষগুলোকে ঠাঁই দাও।
এই দোয়া বিশ্ববাসীর জন্যও।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৬৭ বার

Share Button