» দুর্যোগ সহনীয় জাতি গঠনে কাজ করছে সরকার: ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী

প্রকাশিত: ১৩. ফেব্রুয়ারি. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

কামরুজ্জামান হিমু

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মোঃ এনামুর রহমান বলেছেন, দুর্যোগ সহনীয় জাতি গঠনে সরকার কাজ করছে। বড়- মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে জাপান সরকার এবং জাইকা আর্থিকসহ সকল প্রকার কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। তিনি বলেন, ভৌগলিক অবস্থানের কারনে বাংলাদেশ অত্যন্ত ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। মাঝারি থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে দেশে যে ধ্বংসযজ্ঞ হবে তা কাটিয়ে উঠা কঠিন হবে। তাই, ভূমিকম্প সহনীয় অবকাঠামো নির্মাণের বিকল্প নেই। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে একটি দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে জাপানের মতো একটি ভুমিকম্প দুর্যোগ সহনীয় দেশ উপহার দিতে চায় সরকার । এর অংশ হিসেবে পুরাতন ভবনগুলো সংস্কার করে ভূমিকম্প সহনীয় করে গড়ে তোলা হবে।আমাদের দেশের প্রকৌশলী ও স্হপতিদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষনের ব্যবস্হা নেয়া হবে যেনো ভূমিকম্প সহনীয় ভবন ও অন্যান্য স্হাপনা ণির্মানে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন ।
প্রতিমন্ত্রী আজ ঢাকায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে আয়োজিত ‘নগর দুর্যোগ (ভূমিকম্প, অগ্নিকান্ড ইত্যাদি) ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ, অনুশীলন ও মহড়া’ শীর্ষক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ মহসিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোঃ শাহ্‌ কামাল এবং বিশ্ব ব্যাংকের আরবান রেসিলেন্স প্রকল্পের টিম লিডার স্বর্ণা কাজি। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রকল্প পরিচালক মোঃ আব্দুল মান্নান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন ধরণের দুর্যোগে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতি বছর দুর্যোগে ৭০ হাজারের অধিক মানুষ মারা যায় এবং কমপক্ষে এক বিলিয়ন লোক আক্রান্ত হয়। দুর্যোগের ভয়ংকর প্রভাবে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ২০ বছর পর্যন্ত পিছিয়ে যাওয়ার মত অনেক দুঃখজনক উদাহরণ রয়েছে। বলাবাহুল্য, উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুর্যোগ একটি উল্লেখযোগ্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট দুর্যোগ যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প, নদীভাঙ্গন, অগ্নিকান্ড, ভবনধস, ভূগর্ভস্থ পানিতে উচ্চ আর্সেনিকের উপস্থিতি, জলাবদ্ধতা, পানিতেএবংমাটিতেলবণাক্ততা, মহামারী, এবং বিভিন্ন ধরনের দূষণ প্রায়শই বাংলাদেশের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে দুর্যোগ দারিদ্র বিমোচনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্রিয়াকলাপগুলোর উপরদীর্ঘ-মেয়াদী বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এছাড়া দরিদ্ররা সম্পদহ্রাস এবং কর্মসংস্থানের অভাব, আয়ের নিম্নগামীতা ইত্যাদি কারণে যেকোন ধরণের দুর্যোগের ক্ষেত্রে অধিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ১৯৭০ এবং ১৯৯১ এর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পরে, বাংলাদেশ সরকার দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসের নীতিমালা চালু করেছে এবং বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিহ্রাস করতে শহর এবং উপকূলীয় অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে। ১৯৮০ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ঘটে যাওয়া ২১৯টিরও বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদীশের মোট ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অধিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার এই সব সমস্যা সমাধানে ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে এবং জীবন বাঁচাতে পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতিমধ্যে, বাংলাদেশ সরকার একটি দীর্ঘ-মেয়াদী ডেলটা পরিকল্পনা-২১০০ অনুমোদন করতে যাচ্ছে। এই পরিকল্পনার আওতায়, প্রাথমিকভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে ৬টি “হটস্পটে” আনুমানিক ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারর ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। পরিকল্পনার প্রথম ধাপের ছয়টি হটস্পট হলো উপকূলীয় এলাকা, বরেন্দ্র এবং খরাপ্রবণ অঞ্চল, হাওর বাজলাবদ্ধ এবং বন্যা-প্রবণ এলাকা, পাহাড়ি এলাকা, নদী ও মোহনা অঞ্চল এবং আরবান এলাকাসমূহ।
প্রতিমন্ত্রী বলেন,হারিকেন, সুনামি এবং ভূমিকম্পের আঘাত দমন করার ক্ষেত্রে আমাদের কোন হাত নেই। তবে আমরা যা করতে পারি তাহলো দুর্যোগের প্রভাব কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি এবং সক্ষমতা বাড়াতে পারি। আমাদের কিছু অ্যাকশন প্রোগ্রাম দরকার যাতে শুধুমাত্র পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থাই থাকবেনা বরং আরো দীর্ঘ-মেয়াদী পদক্ষেপসমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তিনি বলেন,ভূমিকম্প বিপর্যয় ঝুঁকির তালিকায় ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০ শহরের মধ্যে স্থান পেয়েছে। ভবনের ঘনত্ব, ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ, দুর্বল ইউটিলিটি পরিসেবা পুরান ঢাকার ঘনবসতি এর অন্যতম কারণ। ঢাকা এবং সিলেট শহরে, বন্যা ও জলাবদ্ধতা, ভূমিকম্প ও আগুনের কারণে দুর্যোগ ও আপদ আসে। অস্থায়ী জনবসতি বা বস্তিবাসীদেরকে তাদের পরিবেশে বিদ্যমান সামাজিক, ফিজিক্যাল এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। ঢাকা শহরে বসবাসকারী ৭ মিলিয়ন মানুষ এবং বৃহত্তর মহানগর অঞ্চলে বসবাসরত ১৫ মিলিয়ন মানুষকে নিয়ে ঢাকায় বিশেষত ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও রয়েছে যাতে সিলেট শহর ও অন্তর্ভুক্ত। সরকার দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমন করতে সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আর তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২ তৈরি করেছে। এবং যাতে ডিডিএম, সিটি কর্পোরেশন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি (সিসিডিএমসি) এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মাধ্যমে ইমারজেন্সি রেসপন্স গ্রহণ করতে পারে, তার জন্য এসওডি তৈরি করা হয়েছে ।

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ডিএনসিসি, ডিএসসিসি, এসসিসি, ডিডিএম, এফএসসিডি, এনডিএমআরটিআই –এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঠিক পরিকল্পনা প্রক্রিয়া, সক্ষমতা তৈরি, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং অনুশীলন এর মাধ্যমে দূর্যোগকালীন দুর্বলতা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতি হ্রাস এবং প্রশমন করতে কার্যকরভাবে সাহায্য করবে। ইউআরপি প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণ, অনুশীলনএবংড্রিলস (টিইডি) প্রোগ্রামে, এই জাতীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম পরিকল্পনা (টিপিপি) এর উদ্দেশ্য হলো আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্প (ইউআরপি) বাস্তবায়নের দ্বারা অভীষ্ট লার্নিং আউটকাম পেতে প্রশিক্ষণ কলাকৌশল এবং কার্যক্রমগুলোকে উপযোগী করে তোলা। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন স্তরে পেশাদার জরুরি ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ ট্র্যাক তৈরি করা এবং জাতীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (এনডিএমটিআরআই) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা হবে।বিশেষজ্ঞ পরামর্শদাতারা এই উদ্দেশ্যে পাঠ্যক্রম তৈরি করেছেন যা এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন হবে। টিইডি প্রোগ্রামের প্রশিক্ষণ কোর্সগুলো ডিডিএম, ডিএনসিসি, ডিএসসিসি, এসসিসি, রাজউক এবং এফএসসিডি’র কর্মকর্তাদের জ্ঞান এবং দক্ষতা উন্নত করবে। আমাদের প্রচেষ্টায় আরো অন্তর্ভুক্ত আছে জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ঝুঁকি এবং দারিদ্র্যহ্রাসের জন্য সম্মিলিত একটি পদ্ধতি যা আমাদেরকে সাধারণ লক্ষ্যে পৌঁছতে সহায়তা করবে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২২৯ বার

Share Button

Calendar

September 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930