» দেশভাগের জন্য কাকে দায়ী করবো ?

প্রকাশিত: ১৯. জুলাই. ২০২০ | রবিবার

সৌমিত্র দেব

আমার এলাকার প্রিয় বড় ভাই মুনিম সিদ্দিকী । আমার সাড়ে পাঁচ লাইনের ফেসবুক স্ট্যাটাসকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে তিনি এতোগুলো বাক্য খরচ করেছেন । কিন্তু তার এতোগুলো জ্ঞানগর্ভ বাক্যের সারমর্ম বুঝতে গিয়ে আমার বিদ্যেয় কুলোলো না । তিনি বলেছেন ” বিহারিরা ভারত ভাগের ভিক্টিম হলেও বাংগালী বাংলাভাগের ভিক্টিম।”

আমি জানি না ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ না হলে বাংলা ভাগ করতে পারতো কোন শালা। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বাংলা ভাগের চেস্টা করে বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারে নি । বাঙ্গালির সংগ্রামের কাছে তাকে নতি স্বীকার করতে হয়েছিল । দুর্ভাগ্যের বিষয়, ভারত ভাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মূলত ভারতের হিন্দু মুসলমান পুঁজিপতিরা । একদিকে টাটা, বিড়লা, গোয়েংকা অন্যদিকে আদমজী, ইস্পাহানি ও বাওয়ানী ।রাজনৈতিক ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল গান্ধী ও জিন্নাহ র মতো গুজরাটি দুই ভাই। ধর্মীয় পরিচয়ে দেশ ভাগ করে তারা হয়েছেন দুই দেশের জাতির পিতা। বাঙালিরা কেউ এভাবে দেশভাগ চায় নি । কিন্তু সেই সময়ে সর্বভারতীয় পর্যায়ে কোন প্রভাবশালী বাঙালি নেতা ছিলেন না। মুসলিম লীগের শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ারদী , অন্যদিকে কংগ্রেসের প্রফুল্ল কুমার রায়, শরত বসু অথবা কমিউনিস্ট পার্টির জ্যোতিবসু সর্বভারতীয় পর্যায়ে পরিচিত হলেও আঞ্চলিক নেতা ছিলেন । তাদের মতামতের তোয়াক্কা করে নি কেউ । একজন বাঙালিকেই সারা ভারত নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছিল। তার সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ যাওয়ার সাহস পেতো না।তার অন্তর্ধানের ঘটনা না ঘটলে হয় তো ভারত ভাগ হতোনা। একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব ছিল অবিভক্ত ভারতের জাতির পিতা হওয়ার । তিনি নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু । কোন কারণে তিনি যদি ভারত ভাগ ঠেকাতে না ও পারতেন, অন্তত বাংলা ভাগ হতে দিতেন না । আমি নির্বোধ নই যে বাংলা ভাগ বা ভারত ভাগের দায় হিন্দু বা মুসলমানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবো । আমার কোন লেখাতেই সেটা দেখাতে পারবেন না। পুঁজির খেলায় গুটি হয়েছে হিন্দু মুসলমান । গুজরাটির খেলায় গুটি হয়েছে বাঙালি, বিহারি, পাঞ্জাবী সহ অগণিত মানুষ । বিদ্বেষের বিষ বাষ্পে আচ্ছন্ন থাকার কারণে আমার লেখার ভুল ব্যাখ্যা করেন । আপনি লিখেছেন,
“কি অসত্য কথা আপনি বলেন যে একাত্তরে এসে এদেশ হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃষ্টানদের হয়। তার মানে আপনি বলতে চান পাকিস্তান শুধু মুসলিমদের দেশ ছিলো হিন্দু খৃষ্টান আর বৌদ্ধরা পাকিস্তানের নাগরিক ছিলো না। আপনার এই দাবির সত্যাসত্য প্রমাণ করতে রেফারেন্স দিন, পাকিস্তানের সংবিধানের কোথায় লেখাছিল পাকিস্তান শুধুমাত্র মুসলিমদের দেশ ছিলো? কৌশল করে আবার বাংগালী পাকিস্তানি বৈষম্য এনে আমার প্রশ্ন এড়িয়ে যাবেন না। আপনি পার্টিশন অব স্প্রিট কি তা জানেন না। বা জানলেও তা গোপন রাখেন। পাকিস্তান যখন সৃষ্টি হয় তখন সে ভারতের মত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠিত হয়। পাকিস্তান এলাকায় বসবাস করা হিন্দু খৃষ্টান বৌদ্ধ আর মুসলিমদের রাষ্ট্রীয় পরিচয় হয় পাকিস্তানি। পাকিস্তানের পতকায় যে সাদা অংশ আছে তা দ্বারা সংখ্যালঘুদের অবস্থানের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল।” আমার বক্তব্য হলো, আপনার সত্যভাষনে আমি মুগ্ধ । মুসলমানের দেশ বানানোর দাবি নিয়েই তো ভারত ভাগ হয়েছিল । পরিস্কার বলা হয়েছিল মুসলমানের জন্য পৃথক আবাস চাই । কতগুলো রেফারেন্স চান ? দিতে পারবো । “ভারতের মত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র” যদি বানাবেন তাহলে আলাদা হবেন কেন? বিহারীরা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাইলে তো ভারতেই থাকতে পারতো ।তাদেরকে কেন এই প্রতারণা করে দেশছাড়া মোহাজের বানান হল ? কতো দেউলিয়া চিন্তাধারা । নিজস্বতা বলে কিছু নেই। অমুকের মতো তমুকের মতো করতে করতে পাকিস্তান এখন বর্তমান অবস্থায় দাঁড়িয়েছে । বাস্তবে পাকিস্তানে অমুসলিমদের ওপরে গণহত্যা হয়েছিল । তাদের জান মালের নিরাপত্তা ছিল না।এর বিষয়ে দলিলের অভাব নেই। বইয়েরো অভাব নেই। পরিসংখ্যান ও যথেষ্ট আছে । আর সেকারণেই এক্তু শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য শতভাগ স্বাধীন সার্বভৌম মানবিক বাংলাদেশ চেয়েছিল ।
এরপরে আরো মারাত্মক কথা বলেছেন ।আপনি আমাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন,
“ভারত ভাগ আর বাংলা ভাগ এক নয়। বাংলা ভাগ করেছেন আপনারা । কারণ আপনারা সংখ্যালঘু হতে চান না, আপনারা যবন ম্লেচ্ছ মুসলিম প্রধানমন্ত্রীকে সালাম দিতে চাননা।” আপনার কাছে আমার প্রশ্ন, এক্তা দেসের প্রধানমন্ত্রীর কি ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য হতে পারে?
তাহলে ভারতে রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে জাকির হোসেন, এপিজে আবদুল কালাম সহ এতোজন মুসলমানকে কি করে মেনে নিচ্ছেন হিন্দুরা ? ওরা পারে যোগ্য লোককে সম্মান জানাতে । আপনারা পারেন না। আপনাকে ইস্লামি মৌলবাদী বলছি না । আপনি একজন উদার মনের মানুষ । আপনি বলুন,পাকিস্তান দূরের কথা আমাদের এই বাংলাদেশেও কি আমরা পেরেছি যোগ্যতার বিচারে একজন অমুসলিমকে রাষ্ট্রপতি , স্পিকার,সংসদ নেতা,উপনেতা,সেনাপ্রধান অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বানাতে ? হিন্দুদের অনেক দোষ নিয়ে এই ফেসবুকেই আমি তুলধুনো করি । কিন্তু এই উদারতাকে অবশ্যই শ্রদ্ধা জানাতে হবে । উদার ও মানবিক গুণাবলী যারই থাকুক জাতি ধর্ম নির্বিশেষে আমি তাকে শ্রদ্ধা জানাতে দ্বিধা করি না ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯৯ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031