শিরোনামঃ-


» নিকষ কালো অম্বরে চাঁদটা মিশে গেল

প্রকাশিত: ০৮. সেপ্টেম্বর. ২০২০ | মঙ্গলবার

মোজাফফার বাবু

নিশি রাতে চাঁদনী পসরে অবাক জোছনা উঁকি দিচ্ছে। বিশ্ব নিখিলে জোসনা চাদর বিছাতে কোন কার্পণ্য করেনি। দিবালোকের মতো অন্ধকার রাতেও পলাশের রং ও কৃষ্ণচূড়ার রুপ মেলে ধরেছে।

যেন এক আলোকিত শিশির ভেজা ভোরে নতুন এক নবজাতকের জন্ম যার মধ্যে বৈষম্য, হিংসা-বিদ্বেষ নেই। যেন এক বংশ পরায়ণ দেব-শিশু পরিস্ফুটিত গোলাপ; বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি মহিমা।

ঘুমটা আসতে চেয়েও আসছে না। শ্বেত শ্বেত মেঘের মিছিলে জোছনার সাথে নিজেকে বিলিয়ে দিতে মন চায়।

জল ছাদের উপর পায়চারি করছি। নিশি রাত্রে পাখি ডাকছে দূর থেকে ট্রেনের হুইসেলের শব্দ আর মাঝে মাঝে ভেসে আসছে হুক্কা হুয়া শিয়ালের ডাক, রাতের নিরাপত্তা প্রহরীর বাঁশি ।

জলছাদের বসুমতিতে আসতে কার্পণ্য করেনি হাসনাহেনা ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। দেওয়াল ঘড়িটার চির চরিত্র রুটিন আজ জানিয়ে দিয়ে গেল রাত একটা বাজার আগমন।

চাঁদটা মেঘের ভেলায় ভেসে চলেছে। এই চাঁদের মাঝে হঠাৎ আবির্ভাব হলো এক ডানা কাটা পরীর যা আমার অতীত, আমার বর্তমান, আমার ভবিষ্যৎ। আমার প্রাণের প্রিয় মাধবী ।পলকহীন ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কতদিন পর দেখা।

সাজো নিশিরাতে অপরূপ সাজে সজ্জিত। সাব্বির পলকহীন ভাবে তাকিয়ে আছে। প্রাণের প্রিয় মাধবীর দিকে। চাঁদের মাঝে মাঝে ভাসমান হাসি হাসছে। আবার কখনো মেঘের ভিড়ে লুকাচ্ছে। মনটা যেন পেছন থেকে পিছনে আরো পেছনের দিকে নিয়ে গেল সেই মধুময় ক্যাম্পসে ।

মাধবী মেরুন রঙের শাড়ি নীল পার কপালে মেরুন রঙের টিপ খোপায় রজনীগন্ধা দিয়েছে । মাধবীকে বেশ মানিয়েছে। চোখ গুলো ডাগর ডাগর কাঁচা হলুদের মত রং এক হারা চেহারা, চাঁদের দেশ থেকে নেমে আসা এক লজ্জাবতী পরী ।

মাধবী বললো- শোন ,নবীন বরণ অনুষ্ঠানে তুমি কিন্তু সাদা পায়জামার সাথে হলুদ পাঞ্জাবি আর কালো শাল ,পড়তে ভুল করো না ! রমনা বটমূলের মেলায় আর টিএসসিতে ঘুরবো আর ফুচকা চটপটি খাব। সন্ধ্যার আগে আগেই ,বাসায় যাব আর আমার মাকে তো চেনো , চোখ দেখলে সব বলতে পারে!

কথাটা মন্দ বলেনি ওর মাকে দেখলে ভয়ে বুকের মধ্যে ধুকপুক ধুকপুক করতো ।

মাধবী-আচ্ছা ভালো কথা ঘোরার সময় ভুলভাল করো না যেন। তোমরা আবার পুরুষ মানুষ খুনসুটি দুষ্টুমি তে পটু।গায়ের সাথে গা লাগানো , হাত ধরা খোপায় বেলি ফুলের মালা দেওয়া।

সাব্বির — দেখ ও সব কিছুই করবো না শুধু নিরব নিভৃতে পথ চলা দুজন দুজনার খুজে পাবো।

মাধবী –নীরব নিভৃতে ঘুরবো মানে শোন তাহলে আমাদের বাসায় একটা রাম ছাগল আছে তার সাথে ঘুরবা, দুজনে চুপ চাপ থাকবা আর আমার সাথে যদি ঘুরতে চাও তাহলে সুখ ও সুখনভোর বহির প্রকাশ খুনসুটি কথা কাটাকটি থাকতে হবে কারন দাম্পত্য জীবন টেকসই এর পরীক্ষা দিতে হবে না। তা না হলে প্রেম দুর্দিনের সময়ে পালিয়ে যাবে।

কত না কথার ফুলঝুরি ঝরতো।সাব্বির সাধারনতো কম কথা বলা নিরব নিভৃতে থাকতে পছন্দ করতো।সেদিনের কথার মালা গুলো জ্বল জ্বল করে ভাষে ।
মাধবী–“কথা বলছো না কেন? রাগ করলে? রাগ করলে না তোমাকে বেশ ভালো লাগে। তুমি তো আবার মাটির দূর্বা দিকে তাকিয়ে থাকো অন্য পুরুষদের মতো চিৎকার-চেঁচামেচি ভাংচুর করো না। আমার না চেঁচামেচি মোটেও পছন্দ না।

জানো জান কাল ভাদ্রে সামান্য বিষয় বাবা-মা যখন হইচই করত আমি বলতাম,” বাসার পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে। দুজন কাগজ কলম দিয়ে বাক্য বিনিময় করো চিৎকার করা যাবে না।”

বাবার চিৎকার থামিয়ে বলতো,” ওরে মা মা যে বড় হয়ে গেছে রে !”
বলে কপালে আদরের চুমু দিতে ভুল তো না। আর মামনি রেডিও কিছুক্ষণ চালিয়ে বন্ধ করে দিত।”

“এই জান তুমি যে কথা বলছো না। একদম চুপ থাকলে আমার ভালো লাগেনা। আমাকে একটু বকাঝকা করো। পুরুষ লোকের এত চুপ মানায় না। আচ্ছা, বাবা ঠিক আছে ভদ্র শালীনভাবে দুষ্টুমি করো।”

বসন্তের আগমনে ক্যাম্পাসে চারিদিকে সবুজ চত্বর কৃষ্ঞচুড়ায় রক্তজারুলে ফাগুনে আগুন দোল খাচ্ছে হলদেটা পাখি যেন তার অবাধ চলচল করছে ,মাঝে মাঝে চটপটি ভেলপুরি খাচ্ছে অনেকে প্রেয়সীর সঙ্গে সুখ ও সুখনভের কথার ডালা মেলেছে ।

সাব্বির আর মাধবীর পরিচয় হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরে। সাব্বির ছিল সব সময় চুপচাপ ঠান্ডা প্রকৃতির ও মেধাবী ক্লাশে প্রথম পাঁচ জনের মধ্যে সে থাকবে,
আর লাজুক প্রকৃতির তাই ওর বন্ধুরা দুষ্টুমি করে বলতো “মেয়ে সাব্বির”। আর দশ জনের মত সে নয়, বই এর সঙ্গে নিবিড় বন্ধুত্ব । ক্লাস, লাইব্রেরী, বই এ ছাড়া কোন সহপাঠীদের কে হাই বলা ,বিনা টাকায় ক্যান্টিনে ফাও খাওয়া।পড়া হয়নি বলে ক্লাস ফাঁকি দিত না দরকার হলে কান ধরে দাড়াবে, এই জন্য মাধবীর প্রথম বর্ষ থেকে সাব্বির কে পচ্ছন্দ করতো ।

বিভিন্ন অজুহাতের মাধ্যমে কাছে যেত যেমন নোটখাতা , কোন বিষয় না বোঝা্‌ , মেলাতে আসতে হবে ইত্যাদি । ব্যস্ততার বা অন্য কোন অজুহাত বা যুক্তি দেখালে , ব্যাচের সবার সামনে চিৎকার চেচামেচি শুরু করে দেবে।তাই সাব্বির মান সম্মান এর ভয়ে মাধবীর কথায় রাজী হয়ে যেত ।

আর মাধবী ভাবতো- আমি ঐশ্বর্য ও অভিজাত পরিবারের মেয়ে,পড়াশোনায় সাহায্য নেবো ঠিকই তার জন্য কিছুই করবোনা এটা যুক্তি সঙ্গত না ।আমি তার দয়া নেবো কেন?
জোরকরে স্মাট ফোন বা টাকা প্যকেট দিতে চায় ,দেখা যেত সাব্বির এসব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ক্লাসে যেত না। দেখা যেত মাধবী গাড়ী নিয়ে বাড়ী হাজির তাও আবার খালি হাতে নয় , গিফ্ট সামগ্রী নিয়ে।

ঐদিকে যেমন বন্ধু বান্ধব নিয়ে লাফাঙ্গা ডিজে পার্টি ড্রিংক করা; ধনীর দুলালিরা যা করে তা থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেললো ।
সেও সাব্বির সঙ্গে মনে মনে পড়াশুনায় প্রতিযোগিতার পাশাপাশি পারষ্পারিক সম্পর্কে নিবিড় হতে থাকে ,
আর মাধবীর মূল্য লক্ষ্য বাস্তবায়ন হলো প্রথম বর্ষের পয়তাল্লিশ রোল থেকে শেষ বর্ষে রোল দশের মধ্যে চলে আসলো ।
এর ফলশুতিতে পড়াশোনার প্রতি তার আকাঙ্ক্ষাটা আরও বেড়ে গেল।মানুষ চেষ্টা করলে কি না পাড়ে।

দেখা গেল বিভিন্নভাবে মাধবীর সাব্বিরের সাথে যোগাযোগ নিবিড় হতে লাগল। যখন মাস্টার্স পাশ করে বেরিয়ে আসলো তখন দেখা গেল সাব্বির এখন পেয়ে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড এবং মাধবী প্রথম হল।
সাব্বিরের কোন কষ্ট নেই কিন্তু মাধবী এই ফলাফল চাইনি। সে মনেপ্রাণে চেয়েছিল সাব্বির ই যেন সবসময় তার উপরে থাক। এবং তাদের মধ্যে ক্রমান্বয়ে সুখ সুখনভ অনুভূতি বেড়ে যায়।
দুজনের পরিবার থেকে বিয়ে ব্যাপারে আলোচনা হয়। এবং যখন বিসিএস পরীক্ষার পর দুজনই চাকরি পেয়ে যায় তখন তারা দুই পরিবারের সম্মতিতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়।
যদিও প্রথমদিকে সাব্বিরের বাবার মেয়ের এভাবে চালচলন দেখে অনীহা প্রকাশ করে কিন্তু যখন দেখে মেয়ে লেখাপড়া ও ভালো করে আরো সুন্দরভাবে এগিয়ে গেল এবং বিসিএস পরীক্ষা পাশ করে চাকরি পেল তখন তিনি আর বাঁধ সাধলেন না ।
মাধবীর একটা গুণ ছিল সে সুখ সুখনভের দিকে যেভাবে তাকিয়ে আছে সেরকম পড়াশোনাটা কেও সামনে এনেছে।সাধারণত লোকেরা বলে ছেলেরাই সব সময় ছেলেরা এগিয়ে যায় ,সেটাকে ভূল প্রমান করেছে ,
একদিকে পরীক্ষার ফলপ্রসু রেজাল্ট তার সাথে অতি দু্র্বল সহপাঠীদের কে বই নোট খাতা সরবরাহ করে পড়াশোনাযলর দিকে লক্ষ্য রাখা ,আর যারা অর্থনৈতিক কষ্টে আছে তাদের সাহায্যের ডালা বাড়াতো কারপন্য করেনি। এসব দেখে ঠান্ডা প্রকৃতির ছেলে সাব্বিরের মনে খুব রেখাপাত করে।

বিবাহ হয়েছিল পারিবারিক ভাবে ছোটখাটো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। মাধবীর বাবা মানে আমার শ্বশুর ছিল বিনয়ী পরহেজগার দয়ালু প্রচার বিমুখ ব্যক্তি ।

অনেকে কাউকে দশ টাকা দিয়ে ঢাক ঢোল পিটিয়ে বা ফোটসেশনর মাধ্যমে নিজেকে জাহির করার রীতিনীতি বিরোধী ছিলেন তিনি নিভৃতচারী হাজী মোহসিন বা বিদ্যাসাগর ,আমার স্ত্রী ঠিকই তার বাবার মতোই হয়েছিল। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করতো না।সবাইকে একই চোখে দেখত।

আবার যখন বিভিন্ন অনুষ্ঠান পরিবারে অনুষ্ঠিত হোত যেমন জন্ম দিন বিবাহ বার্ষিকী সবার আগে সুবিধাবঞ্চিত মহিলাটি দিকে লক্ষ্য রাখতো
সবার আগে তার খাবার সে গুছিয়ে রাখত । এমনকি কাপড়-চোপড়ের দিক থেকেও তাদের মধ্যে যেন শ্রেণীবৈষম্যের কোন পার্থক্য নেই কারণ তারা একই বিধাতার সৃষ্টি , তারা ও মানুষ
এসব কথা শুনে বাবা চুপ যেত বাবা তখন বলত,” ঠিক বলেছ, বৌমা”।

এমনকি দেখা যেটা সে নিজে কাপড়-চোপড় না কিনলেও সবার জন্য কাপড় চোপড় কিনে নিয়ে আসতো।
কোথায় যে চলে গেল সেই সোনালী দিনগুলো আজ বারবার মনে পড়ে? আকাশের ভেলায় ভাসে সূর্য চাঁদ লুকোচুরি খেলে। ডাহুক পাখি ডাকে। ভেসে ওঠে তার কথা।কোথায় গেল সোনাঝড়া রোদ ।

বাড়িতে একদিন অফিসতে এসে দেখি মাধবী ঘরে নেই। সব সময় হইচই আনন্দ-ফুর্তিতে মাতোয়ারা করে রাখত মেয়েটা,কাল ঈদ বাসাটা খাঁ খাঁ বাসাটা চুপচাপ করছে ,ব্যাপারটা কি । ঘরের সুবিধাবঞ্চিত মেয়েটি মিনুকে কে জিজ্ঞেস করলাম,” কিরে তোর আপা মনি কই ?”
মিনুবলে ” আপামনি ছাদে গিয়েছে। ”

আমি একটু যেন নিরুপায় হয়ে আস্তে আস্তে ছাদে গেলাম।

সাদা কালো মেঘের ভেলায় চাঁদটা ভাসছে। সন্ধার মিটিমিটি তারা গুলো জ্বলছে। সাঝ সুন্দর পরিবেশ জাগিয়ে বসেছে ঠান্ডা বাতাস বইছে তারই সাথে অবাধ জৎসনা উপচে পড়ছে। দেখি মাধবী আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন খুজছে -” কি হয়েছে জান। আনমনে কি করছো?”

“তুমি কখন আসলে?” ,

সাব্বির -“এইমাত্র।”

মাধবী বলল– “জানো জান, ঈদের আগের দিন রাতে বাবা ছাদে নিয়ে আসতো। ঈদের চাঁদ টা দেখতে। কত গল্প করত চারদিকে কত বাজি ফুটত?আজও বাজি ফুটছে আকাশে ফানুস উড়ছে। সব ঠিকঠাক আছে শুধু আমার চিরসাথী বটবৃক্ষ বাবাকে যেন কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। তাই ভাবছি।”

” মাধবী পৃথিবীতে মানুষ যাবে আসবে এটাই পৃথিবীর নিয়ম এটাতে কেউ খন্ডাতে পারে না।

মাধবী একটা কাজ ভুল করে আসছি। মিনুর জন্য যে ড্রেসটা আনার কথা ছিল সেটা আনতে ভুলে গিয়েছি ! “

মাধবী বলল – “আমি এখনই ড্রাইভারকে নিয়ে বাইরে যাব।”

আমি বললাম -“এটা তো ঈদের পরের দিন আনলেও চলবে । ঈদের দিনতো মিনু কোথা ও যায় না ।ঈদের পরের দিনই যায়।”
বলার সাথে সাথে মাধবীর চাঁদের মত মুখটা কৃষ্ণ মেঘ হয়ে গেল ।
তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল বলল, “তাহলে আমি আমার জামাটা ওকে দিয়ে দিব । ওরা আসছে পেটের দায়ে ভাতের জন্য আমার বাসায়। ওদের সম্পদ কুক্ষিগত করি আমরাই।
আজকে যারা ত্রিশ -চল্লিশ হাজার টাকা বেতন পায়। ফ্ল্যাট বানায়, প্লট কিনে অবৈধ টাকা নামে বেনামে সুইস ব্যাঙ্কে রাখে ।ছেলে পেলের লেখাপড়ার কোন যোগ্যতাই তাদের নেই, টাকা দিয়ে ডিগ্রী কিনে আনে।
এসব টাকার মালিক ঐ সুবিধাবঞ্চিত পৌড় খাওয়া মানুষরাই ।”

মনেমনে ভাবলাম —“এলিট শ্রেনি ধনীরঘরের আদরের দুলালীর মুখে বায়তুল মোকারামের জনসভায় মঞ্চে , মানবতা ও সাম্যের কথা , অবাক কান্ড ! এ দেখি সুবিধাবঞ্চিত নিষ্পেষিত মানুষের নেতা । “

ব্যাস রেডি ও। চলতেই থাকল আমি চুপচাপ হয়ে গেলাম। একটু পর দেখি ও গাড়ি নিয়ে চলে গেল।

রাত্র ক্রমান্বয়ে গভীর থেকে গভীর হচ্ছে তার সাথে চাঁদের জেসনার আলো ছড়াতে কার্পন্য করেনি। সে যেন এক চঞ্চলা রুপবতী তরুনী আলোয় আলোকিত করেছে এ নিখিল

সেই সাথে দূর থেকে দূরে আরো দূরে প্রসাদের আলো আধাঁর থেকে ভেসে আসছে মরমী গান । “এত সুর এত গান যদি থেমে যায়”– গানের মাঝে কোন প্রমিক হইতো তার মনের মাধুরিকে খুজচ্ছে ।

সত্যি সে গানের কথায় যেন বাস্তব জীবনের চোরা বালুচরে একাকার হয়ে গেল সেই বিভীষিকাময় কালো রাত্রি সেই সমুদ্র সৈকতে।

সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা ভাবলেই , জীবনর সুর ছন্দ হারিয়ে যায়, পায় না কোন গতি। মনেহয় বন্যার বাণের পানির ভিতর ভাসমান কাঠের মতো ভাসছি এ ভাসার নেই কোন শেষ ।
বিবাহের পর পরই সব মেয়ের মতো মাধবী হানিমুনে যেতে চায় সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্সের প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, বালি দ্বীপ।

কিন্তু আমার শৈশব থেকে দূরের জার্নি মোটেই ভাল লাগত না। বিশেষ করে দূরের জার্নি ,শৈশবে মহল্লা বা স্কুলে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে চড়ুই ভাতি বা শিক্ষাসফর কোনটাই ভালো লাগত না।
তার একমাত্র কারণ দীর্ঘ দূরের ভ্রমন জীবন টাকে ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যাম করে রাখতো ,হাটা হাটি করা যাবে না এক জায়গায় বসে থাকো । জীবনটাকে এক রকম যান্ত্রিক বস্তু বানিয়ে ফেলতো !

বিবাহের পর বারবার বলতো,”চলো হানিমুনে যাই । ” প্রতিবার বিভিন্ন অজুহাত দেখাতাম , নিজের কাছে খারাপ লাগতো ,ও এত বার বলছে ।

আর মাধবী আমার জীবনের ঘড়ায় তোলা জল। হানিমুনে আমি স্বাভাবিকভাবেই ওর কথার গুরুত্ব দিলাম । আর সেটি যেন জীবনের একটা কাল হয়ে গেল।

এটাই ছিল আমার দাম্পত্য জীবনের বড় পরাজয় ।ওর জেদের কাছে হার মেনে সাঁতার শেখানো হয়ে ওঠেনি। নাছোড়বান্দা।আমরা কিন্তু হানিমুনে ছবি তুলবো সাগর সৈকতে স্নান করবো, পাড়ে চিকচিক বালুর উপরে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকব।
আর সমুদ্রে সূর্য ডোবার চিত্রটা ধারণ করব। কক্সবাজারের সমুদ্রের পাড়ে খালি পায়ে হাঁটবে। চিকচিক বালুর উপর থেকে ঝিনুক কুড়াবে ।
লাল কালো কাকড়া যেন দলবদ্ধ ভাবে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেবে। আবদ্ধ ভাবে এ যেন সাম্যের বন্ধন। আবার আশেপাশের পাহাড়ী টিলায় শসা বাঙ্গি চাষ করবে।
তাদের সাথে ফটোসেশন ,পাড়ে বসে গল্প করে মাতোয়ারা হবে।
এই রোমাঞ্চকর দিনগুলো উদ্ভাসিত করে জীবনের চলায়। চোখের দৃষ্টি সীমান্তের সামনে মিশে গেছে আকাশ আর সাগর।
কি নিবিড় নিরবিচ্ছিন্ন ওদের বন্ধুত্ব ।প্রকৃতির দৃশ্য যেন উদ্ভাসিত করে তুলে।যেন আজকের সূর্য একবার ডোবার পর বা অনন্তকাল আর ফিরে আসে না।
যে সূর্য একবার অতল গর্ভে হারিয়ে যায় হাজার তপস্যা করলেও সেই দিন সেই ক্ষণ কে আর মানুষ ফিরে পায় না। হাজার চিৎকার করলেও আসবেনা।

আমি বলতাম,” যাবনা সমুদ্রসৈকতে। ওখানে গেলে গভীর পানির গর্ভে নামতেই হয় ওখানে চোরা বালু আছে ।”

আর আমার চিরাচরিত অভ্যাস আমি ওর আবেগ-অনুভূতির ব্যাপারে কখনো ও কে বাধা দেইনি। বারবার বলতাম, “বেশি পানিতে নেমোনা।”

ও বলতো,” হাটু পানিতে গোসল হয় না , চারিদিকে লোকজন সবাই হা-করে চেয়ে আছে “।

আমি যেন অনাগ্রহ থেকে এসেছি ।আর লজ্জা হলো নারীর ভূষন আব্রুর ব্যাপার আছে না , তাই দীঘি সুমুদ্র সৈকতে গলা পানিতে নেমে গোসল করার চেষ্টা করত।

মেরুন রং ওড়না টাইট করে বাঁধা কমলা রং এর সালোয়ার কামিজ কাঁচা হলুদের মত গায়ের রং নিস্তেজ সূর্যের রুপালি আলো মহিত করে ছিল সুমুদ সৈকতকে । আমি যেন পলক হীন ভাবে তাকিয়ে ছিলাম।

হঠাৎ ভাটার কানের ভিতর কালো পাহাড় দানব এল কারেন্টের মতন ওকে টেনে নিয়ে গেল। আমি যেন বিমূর্ত হয়ে গেলাম আমার উচ্ছ্বাস শক্তি সাহস উদ্দীপনা বিশাল সাগরে বিলীন হয়ে গেল। হঠাৎ করে ভাটার অকাল গ্রাসে কোথায় যেন হারিয়ে ফেললাম।

আমি ওকে বারংবার বলেছি কূলে গোসল কর কিন্তু সে আমার কোন কথাকে গ্রাহ্য করেনি , ও নাছোড়বান্দা। এত জেদ শেষমেষ আমি ওর কথা রাজি হয়ে যুক্তি মেধা-মননের কাছে পরাজিত হলাম।জীবনের সব কূল দড়িয়ায় স্মিত হয়ে গেল ।

কর্ণকুহরে বেজে উঠলো,” আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও।” চারদিকে লোকজন সমাগম হয়ে গেল আর আমার মাধবী কোথা থেকে কোথায় চলে গেল।

আমি দিকপাল এর মতন সমুদ্রের দিকে চেয়ে আছি। আমি যেন নিস্তব্ধ নিথর হয়ে আছি।

সকল প্রকার চেষ্টা ফেলানী জাল খুলে উপকূলে সরকারিভাবে ডিঙি নৌকায় বহু চেষ্টা করেও লাশটা খুঁজে পেলাম না। ওর শেষ মুখটা আমার আর দেখা হলো না।

চাঁদের মাঝে মাঝে জ্বলজ্বল করে ভেসে আছে মাধবীর ছবি আমাকে যেন কি বলছে।
বলতে চেয়েও বলতে পারছেনা-আর একা থেকো না।
নতুন সংসার করো নতুন সংসারে মাধবীর প্রতিচ্ছবি ভাসবেনা।
“নতুন সংসার কি করা যায়? “আমি যেন সমুদ্রের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।

সাগরের মত বহমান জীবন চলতেই থাকবে।” নতুন আবার ঘর সংসার করো তাই কি হয়।
চলছে জীবন চলুক না এভাবে।সৃষ্টির অপূর্ব সৃষ্টি চাঁদের মাঝে মাঝে আছে আমার প্রিয়তমা। তাইতো মাঝরাতে আমি তোমাকেই খুঁজি। বারবার খুঁজি। বার বার খুঁজি।

হঠাৎ দেখি নিশি রাতে চাঁদের জোসনা উঁকিঝুঁকি মারছে। রাতকানা পাখি ডাকছে টিপটিপ করে আধারের মাঝে জোনাকিপোকার বাতি জ্বলছে। পৃথিবীটাকে উদ্ভাসিত করে তুলেছে।
তার সাথে জুটি ধরেছে হিমেল বাতাস। সারা মন জুড়ে মাধবীর মিষ্টি পরশ।

পুলকিত করছে। আলতো পায় নিশি রাতে ছাদের ওপরে কে যেন আসছে!

হঠাৎ যেন মনের মধ্যে ধুপছায়া খেলা করলো এত রাতে কে ,কার পায়ের আওয়াজ কোন অশনি সংকেত না তো! । না সে আর কেউ না আমার কান্ডারী আমার বটবৃক্ষ আমার বাবা।

ঠান্ডা কাশি আছে বৃদ্ধ মানুষটি হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছে তার খোকা কে ,তার ভিতর জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে ,একটা সাজানো গুছানো সংসার অবেলায় সৈকতে ডুবে গেল, সদাহাস্যজল গোলাপের কলি ঝরে গেল কি ছিল তার অপরাধ ?

অন্তর কুড়ে কুড়ে খায় নিরব নিভৃতেতে কাঁদে খোকাকে বুঝতে দেয়না জামা গায়ে দেওয়া। “খোকা”, “খোকা” বলতে বলতে ছাদে আসছে । “
রাত অনেক চল ঘুমাবি। আমি তোর মাথায় বিলি দেবো চল খোকা চল । এটা তোর সহ্য হবে না এটা কাল ঠান্ডা ,তোর জ্বর হবে।”

হঠাৎ কালো মেঘের ভীড়ে চাঁদ টা আবছায়াই মিশে গেল !

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৮৫ বার

Share Button