» নীতিকথা

প্রকাশিত: ০২. এপ্রিল. ২০১৮ | সোমবার

নাজমীন মরতুজা

আরে মিয়া রাখেন তো আপনার নীতিকথা,
নীতিকথার ভাত আছে নাকি ?

আমরা কমবেশী সকলেই জানি ,এই নীতিকথার কোন খাওয়া নাই আমাদের মত গরীব দেশের ।
আসলে এই “নীতিকথা “ এ গুলো কি ? আমরা অনেকেই জানি আবার অনেকেই জানি না ।

নীতিকতা : নীতি কথা বা ফেবল / প্যারাব্ ল , লোক সাহিত্যের অন্তগর্ত হলেও এর উৎপত্তি তুলনায় অনেক উন্নত সমাজে। আমরা জানি যে প্রাচীন সমাজেও কতকগুলো সুনির্দিষ্ট নীতিবোধ থাকে , যা লঙ্ঘন করা অমার্জনীয় অপরাধ বলে পরিগণ্য । তবে আজকাল উন্নততর সমাজে অনেক কিছুই সামাজিক বিধানের জটিলতাকে আশ্রয় করে , নীতি বোধের অনুশাসনকে এড়িয়ে যাওয়া যায় । আমরা চলতে ফিরতে কত কিছুই লক্ষ্য করি বাসে উঠলে নীতি কথা লিখে রেখেছে , বাসের গায়ে , যেমন নবীজির শিক্ষা করো না ভিক্ষা , চিডিয়াখানায় গেলে লেখা দেখি , জীবে দয়া করে যেজন সেজন সেবিছে ইশ্বর । এক অর্থে দেখতে গেলে পশুপাখি সম্পর্কীয় কথা ,রুপকথা , ব্রতকথা , সবকিছুর মধ্যেই প্রবহমান াথাকে একটা করে প্রচ্ছন্ন নীতিউপদেশ।
আর এই নীতিকথা গুলো সরাসরি কোন পর্দার আড়াল নেই । সোজাসুজি নীতি উপদেশটি উপস্থিত করা হয় । নীতিকথার মধ্যে খুব বিখ্যাত হচ্ছে – ঈশপের ফেবলস , হিতোপদেশ , পণ্চতন্ত্র, জাতক এবং বাইবেল , , বাইবেলের কিছু কিছু গল্প( প্যারাবল )
ফেবল্ হচ্ছে সেগুলো যে গুলো পশুপাখির রুপকে মানুষের করণীয় উচিত- অনুচিত গুলো বর্ণিত হয় । আর প্যারাবল গুলো সচরাচর পশুপাখির সম্পর্কবিহীন এবং এগুলোর মর্ধ্যে সূক্ষ্ম একটু ধর্মসুলভতার স্পর্শ থাকে । জাতক শ্রেনীর গল্পগুলো সে অর্থে অনেকাংশে প্যারাবল এর সমধর্মী ।
আমার তো মনে হয় প্রাচীনগ্রীসের ঈশপের নাম শোনেনি এমন লোক সংখ্যা খুব কম , তাঁর নীতি কথা পড়ুক আর না পড়ুক নাম শুনে থাকবেন । তার নীতিকথা গুলো প্রচলিত হয়েছিল আঠাশ শতাব্দী আগে । আমার জানা মতে লোককথার তাত্ত্বিকগণ থিয়োডোর বেনফে কাস্ক্যাঁ প্রমাণ করেছেন যে পণ্চতন্ত্রের কাহিনীগুলো ঈশপের ফেবলসের চেয়ে বেশী প্রাচীন । যদিও অনেক ইতিহাস পড়ে জেনেছি পন্চতন্ত্রের করটক দমনকের গল্প আরব বণিকদের মাধ্যমে নাকি পশ্চিমদিকে যাত্রা করে । খৃষ্টপূর্ব আমলেই পহ্লবী ভাষায় কলিলা- ওয়া- দিমনা নামে ঐ গল্পের রুপান্তরিত পাঠ দেখতে পাওয়া গেয়েছিল । এভাবেই শুনেছি ধীরে ধীরে গ্রীস দেশে আমাদের ভারতীয় পণ্চতন্ত্রের কাহিনী পরিভ্রমণ করতে গিয়ে স্থিত হয় ঈশপের নামে । আজ আমার ছোট মেয়ের স্কুলে গিয়ে এক অভিভাবকের হাতে দেখলাম ঈশপের ফেবলস বই .. একটু আগ্রহ হলো কথা বলার , জিজ্ঞেস করলাম পড়া শেষ , সে খুব সহাস্যে উত্তর করলো হুম সেই কবেই পড়া শেষ তবুও বার বার পড়ি , এখন পড়ছি ছেলের জন্য , ওকে পড়ে শোনাই , আমি খুব মুগ্ধতা প্রকাশ করলাম , দুর থেকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ও তোমার ছেলে , সে বললো জ্বি । ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম কেবল স্কুলে পা দিয়েছে ,সেন্ডেল ঠিক করে পড়তে শিখেনি , এই বয়সে নীতিকথার বীজমন্ত্র তার মাথায় পোতা হচ্ছে , সে আদর্শবান নীতিবোধে পুষ্ট হবে না তো কে হবে ? তাকে আমার পরিচয় দিয়ে বল্লাম আমি একজন লোক গবেষক , সে অবাক হয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো … বল্লাম তুমি কি জাতক পন্চতন্ত্রের নাম শুনেছো ? সে তাকিয়েই থাকলো আমার দিকে -নীতিকথার মধ্যে সবচাইতে সম্বৃদ্ধ জাতক , তারকারণ হলো জাতকের গল্পগুলোর মধ্যে “কথাবত্থু” এবং সমাধান দুই ভাগে বিভক্ত । কথাকত্থুর মধ্যে রুপকথা আকারে থাকে , আর সমাধানে রুপক বিমুক্ত । তাই সহজে মৌলিক সত্যটি মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে ।
আর “পন্চতন্ত্র “ যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল লোকশিক্ষা । তাই এর ব্যপ্তির গন্ডিটা ছিল অনেক বড় । পৃথিবীর লোক কথার সর্বশ্রেষ্ঠ সংকলন হলো পণ্চতন্ত্র । ২০০ খৃষ্টাব্দ পূর্ব থেকে এই পণ্চতন্ত্র গুলো সংগৃহিত হয়েছিল ।
এ গুলো পাঁচটি তন্ত্রে বিভক্ত । ৫০ টি ভাষায় অনুদৃত হয়েছে জানা মতে । একসময় বলা হতো পণ্চতন্ত্র হলো বিশ্বের নীতিকথার অন্যতম উৎস ।
আমরা এখন নীতি কথা পড়িও না নীতি কথার ধার ধারি না … এফ বি তে একদিন আঙুল উচিয়ে একটা নীতি কথা পড়তে গেলাম – সেখানে লেখা “ ভাই কিছু মানুষের জন্য যদি কলিজা কাইটা পিরিচে আইনা দেন তবুও বলবে , কম হইছে “ অনেক ক্ষণ হাসলাম এমন নীতি কথার চিরকুট দেখে । নীতিকথার ভাত নাই এই কথা সত্য নয় কিন্তু , কথিত আছে কৃতদাস ঈশপ সম্ভ্রান্ত পুরমহিলাদের গল্প শুনিয়ে জীবিকার্জন করতেন , তারমানে নীতিকথার মূল লক্ষ হিসেবে জনশিক্ষাকেই দেখি । আমাদের রাজবাড়ির গৃহশিক্ষক বিষ্ণুশর্মার গল্প( পিলপের নীতিকথা) সম্বন্ধে একই কথা বলা যায় । বাইবেল , সামারিটানের, বীজবাপক, নীতিকথার বই এদেশের বাচ্চাদের জন্য স্কুল লাইব্রেরীগুলোতে সংগ্রহ করে রেখেছেন । আমি ভেবে পাই না এমন উন্নত দেশে কি দরকার এসব পশুচারণজীবি , কৃষিজীবী মধ্যবর্তী স্তরের মানুষের কাহিনী পড়ার । কিন্তু এটা সত্যি যে প্যারাবল গুলি আদিতে ধর্মানুষঙ্গবিহীন থাকলেও ঘটনার অনিবার্য পরিণতিতে তারা ধর্মাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে ।
আমাদের দেশে এই সব নীতিকথার রুপক গল্প গুলির নাম হয়ত ভুলতেই বসেছি নিজেরা, পরবর্তী প্রজন্মকে কি গল্প শোনাবো .. মটুপাতলু, ডোরেমন, নীতিকথার গল্পবলা মানে ক্ষেত হয়ে যাবে । কিন্তু একসময় আমরা জানি যে নীতি কথাগুলোর প্রচার করার দরকার হয়ে পড়েছিল সমাজবিধান গড়ে ওঠার সময় থেকেই সামাজিক নীতিগুলোর প্রচার করা দরকার হয়েছিল। তাই তো ফেবলস, প্যারাবল, কথাবত্থু, সমাধান , হিতোপোদেশ, যে ভাবেই কথাগুলো আসুক না কেন সকল কিছুর আদি উৎসপ্রাথমিক সমাজ বিধানের , সংহতিবিধানের মধ্যে অবলীন । মানুষ যত আদিম ছিল , ততই তার মধ্যে সামাজিক নীতিবোধগুলি দৃঢ়তর সংস্কাররূপে শিকড় গেড়ে রাখতো। তাই উন্নত সমাজে নীতি কথা জাতীয় কাহিনীর প্রয়োজন খুব কম , কেন না সেখানে সামাজিক নীতিবোধজাত অনুশাসনগুলো মানুষের মনে সহজাত সংস্কাররুপেই আজন্মকাল সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে । নীতিবোধ যেখানে প্রায় সহজাত বলেই নীতিকথার মাধ্যমে সেগুলো আবার শেখানোর প্রয়োজন ঘটেনি। নীতিকথা লোককথার অন্তর্গত হয়েও সামাজিক ভাবে অনেক বেশী পরিমার্জিত ।
আমি আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধী থেকে বলতে পারি বাংলার রুপকথা পড়ে শিখেছি – বিধীনিষেধ ভঙ্গ করা মানে শাস্তি পাওয়া , সেটা আইনত হোক বা প্রকৃতির কাছেই হোক । বিপর্যয় বিপদ আপদকে ধৈর্যের সাথে মানিয়ে নিলে সুখশান্তি লাভ হয় ।
তবে এটাও চরম সত্যি যে বলয় ভেদে নীতিকথার মানদণ্ডও বদলে যায় কখনো কখনো ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২০৭ বার

Share Button

Calendar

November 2020
S M T W T F S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930