» নুসরাতের মৃত্যু এবং আমাদের বিচার ব্যবস্থা

প্রকাশিত: ১৪. এপ্রিল. ২০১৯ | রবিবার


মো. আসাদুল হক

নুসরাত জাহান রাফির মৃত্যুতে দেশের অধিকাংশ মানুষের ভেতর জন্ম নিয়েছে ক্ষোভ। গত ২৭ মার্চ নুসরাতের মা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। ছাত্রীর স্বজনদের অভিযোগ এ ঘটনায় মামলা প্রত্যাহার করতে রাজি না হওয়ায় গত ৬ এপ্রিল পরীক্ষার হল থেকে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় অধ্যক্ষের লোকজন। পরবর্তীতে ১০ এপ্রিল রাত ৯.৩০মি. এ নুসরাত চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ভাবতে পারেন একজন জীবন্ত মানুষের গায়ে আগুন লাগানো কতটা পৈশাচিক?

অভিযোগটির ব্যাপারে যদি রাষ্ট্র যথাযথ পদক্ষেপ না নিতে পারে তবে এধরনের ঘটনায় সাধারন মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারাবে এটাই স্বাভাবিক। আসলে পূর্বের বিচারহীনতাই এমন নতুন ঘটনার তৈরি করে, তনু ধর্ষণ এবং হত্যা মামলা সহ এমন হাজারো ঘটনার ব্যাপারে আইনি উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি বা বিচার না থাকাই নতুন এসব ঘটনার জন্য দায়ী।

২০১৭ এর মার্চের ১৭ তারিখে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কনেস্টেবল হালিমা এবং এপ্রিলের ০২ তারিখ ময়মনসিংহের গৌরীপুর থানার ব্যারাকে নিজ কক্ষে শরীরে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। এখানে ১৫ দিনের মত সময় সে বেঁচে ছিলেন বিচারের আশায়। দায়িত্বপ্রাপ্ত ওসি তার অভিযোগ না নেয়ার কারনেই তিনি আত্নহত্যা করেছেন বলে তার ডাইরীতে লেখেন তিনি। (সূত্র-বিবিসি বাংলা, ১৭মে ২০১৭) ভেবেই দেখুন পুলিশ পেশায় থেকে যে বিচার চাইতে পারে না সেখান নুসরাতের মত সাধারন মেয়েরা কি করে বিচার পাবে।

কেন ধর্ষণ/যৌন নিপীড়নের ঘটনা বেড়েই চলছে? কেনই বা হারকিউলিস তৈরি হচ্ছে দেশে? কেনই বা হারকিউলিসকে বাহবা দিচ্ছে আমাদের মানুষ?

এসব প্রশ্নের একটিই উত্তর, বিচারহীনতা। এখন প্রশ্ন হল বিচারহীনতার পেছনের মূল কারন কি?

এর পেছনের প্রথম কারন হতে পারে ধর্ষনকারীর প্রভাব। এসব কাজ সাধারনত তারাই করে থাকে যারা নিজেদের তুলনামূলক বেশি ক্ষমতাবান ভেবে থাকেন। এমন একটি ঘটনাও পাওয়া দুষ্কর হবে যেখানে ধর্ষিতার পরিবার তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষমতার অধিকারী ধর্ষনকারীর চেয়ে।
পরবর্তী যে বিষয়টি দায়ী বলে আমি মনে করি তা হল- বিচার চাওয়ার প্রতি মানুষের অনীহা। এ অনীহার পেছনের দুটি কারন রয়েছে ১. বিচার চেয়ে কি হবে? ভিকটিম এর পরিবার হয়ত ভাবছে যা হওয়ার তা তো হয়েছেই এখন আর এ নিয়ে কথা বাড়িয়ে কি লাভ! এমন ধারণার কারণেই বিচার এর প্রতি অনীহার তৈরি হচ্ছে। ২. লোকলজ্জার ভয়ে বিষয়টি সামনে আনতে না চাওয়া। তৃতীয়ত পুলিশের অসহযোগিতামূলক আচরন- আমাদের দেশে এমন বহু ঘটনার উদাহরন দেয়া যাবে যেখানে ধর্ষণের পর পুলিশ অভিযোগই নিতে চায়নি। যেমন- উপরে উদাহরণ দিলাম কনেস্টেবল হালিমার, পুলিশ সদস্য হয়ে সে অভিযোগ করতে পারছিলেন না অন্য সহকর্মীর বিরুদ্ধে।

ধর্ষণের বিচার কি তবে ধর্ষীতার মৃত্যুর মাধ্যমেই হয়ে থাকে? ধর্ষিতা হওয়াই যেন সবচেয়ে বড় অপরাধ!! “ধর্ষণ হবে আবার বিচারও চাইবে?” এ যেন এক হাস্যরসে ভরা করুন শ্লোকে পরিনত হয়েছে।

তা যে কারনেই হোক না কেন, বিশ্বব্যাপী অন্তত ৫০ ভাগ নারী মনে করেন পুলিশের কাছে যৌন নিপীড়নের ব্যাপারে অভিযোগ করা নতুন বিড়ম্বনার কারন এবং প্রতি ৩ জনের একজন কোন না কোনভাবে যৌন নিপীড়নের স্বীকার, অ্যাকশন এইডের সম্প্রতি একটি জরিপ থেকে বেড়িয়েছে এমন তথ্য।

আমাদের এসব তথ্য জেনে বসে থাকলেই হবে না, এসব তথ্যকে বিশ্লেষন করে মূল কারনগুলো শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে এসব অপ্রীতিকর ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

নুসরাত এর এ ঘটনার আইনগত সর্বোচ্চ প্রতিকার হতে পারে মৃত্যুদন্ড, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০, এর ধারা ৪ এর উপধারা ১ এ বলা আছ- ৪৷(১) যদি কোন ব্যক্তি দহনকারী, ক্ষয়কারী অথবা বিষাক্ত পদার্থ দ্বারা কোন শিশু বা নারীর মৃত্যু ঘটান বা মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অনূর্ধ্ব এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷

আইনটি অনেক সুন্দর হলেও এর প্রয়োগ ব্যাবস্থাপনার দিকে যদি আমরা নজর দেই তবে দেখতে পাব যে পুরো বিষয়টি আইনগত পদ্ধতিতে প্রমান করা একটা লম্বা সময়ের ব্যাপার, পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর চার্জ গঠন তারপর শুনানি- সাক্ষ্য গ্রহন এবং যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর রায় প্রকাশ, নিম্ন আদালতের এসব প্রক্রিয়া শেষে আপিলের বিধান রয়েছে, এ পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে যে পরিমান সময় লাগে এবং বার বার আদালতে এসে এবং বিভিন্নভাবে অর্থ খরচ করে অধিকাংশ সময়ই ভিকটিমের পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়, এবং ঘটনার পরবর্তী বেশ কিছুদিন ঘটনাটি আলোচনার শিরোনামে থাকলেও কিছুদিনে ই ভুলে যায় মানুষ। এ সবকিছু মিলিয়ে ই আসলে বিচারহীনতার একটা ধারনা মানুষের ভেতরে জন্ম নিচ্ছে। তাছাড়া অনেক অপরাধের বিচার হলে ও তা জনসন্মুখে তেমনভাবে প্রচার করা হয় না।

যাইহোক নুসরাত জাহান রাফির ঘটনাটি পত্রিকা মারফত উচ্চ আদালতের নজরে আনায় উচ্চ আদালত এ বিষয়টিতে পর্যবেক্ষন করলেই হস্তক্ষেপ করবে বলে আশস্ত করেছেন বলে শোনা গেছে। আশা করছি এ হস্তক্ষেপ নুসরাতের পরিবারকে ন্যায়বিচার পেতে সাহায্য করবে।

নুসরাতে বিদেহী আত্নার প্রতি শান্তি কামনা করছি। এ ছাড়া অবশ্য কি ই বা করার আছে? অধ্যক্ষ সহ দোষীরা কিছুদিন থাকবেন রিমান্ডে, তারপর চার্জগঠনের পর বিচার শুরু হবে এবং আমাদের আইন একসময় আসামীর অধিকার রক্ষায় তাকে জামিন দিবে এবং এর হাজিরা চলবে যুগ থেকে যুগ পর্যন্ত। আবার ও নতুন কোন নুসরাতের মৃত্যু, হয়ে যাবে আমাদের লেখার নতুন আলোচ্য বিষয়।

লেখক:
মো. আসাদুল হক
ছাত্র, আইন অনুষদ, ইস্টার্ণ বিশ্ববিদ্যালয়

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৯৯ বার

Share Button

Calendar

September 2019
S M T W T F S
« Aug    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930