» নেবুচাদনেজারের পুঁথি

প্রকাশিত: ১১. সেপ্টেম্বর. ২০২০ | শুক্রবার

গালিব ফেরদৌস
আমি সেদিন দাদুর সঙ্গে শাহবাগের সুফিয়া কামাল জাতীয় গ্রন্থাগারে গিয়েছিলাম। জাতীয় গ্রন্থাগার তিনতলা একটি ভবন। নিচতলায় ছোটদের বই, দুইতলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বই, পত্রিকা আর গ্রন্থাগারিকদের অফিস, আর তিনতলায়ও বিভিন্ন লেখকদের কবিতা, গল্প, উপন্যাসের বই কাঠামোবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে। আমরা তৃতীয় তলায় গেলাম প্রথমে। সেখানে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমার ছোটমামার একটা বই পেয়ে গেলাম। আমার ছোটমামা এখন কানাডা প্রবাসী। তার প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে বইটি রচিত। বইটি নাম “প্রবাসে পরবাসী মন।” দাদুকে বইটা দেখাতেই তিনিও অবাক হলেন। এরপর দাদু আমাকে দ্বিতীয় তলায় নিয়ে গেলেন পত্রিকা পড়ার জন্য। দৈনিক পত্রিকাগুলো সব একটা সেলফে রাখা। সেখান থেকে কয়েকটা পত্রিকা নিয়ে দাদু পড়ার টেবিলে এসে বসলেন। কিছুক্ষন পর একটা পত্রিকা হাতে নিয়ে করে পত্রিকার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “জানিস বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র সরকারি পত্রিকা “দৈনিক পাকিস্তান” স্বাধীনতার পর “দৈনিক বাংলা” নামধারন করে। মানে ১৯৭১ সালে “দৈনিক পাকিস্তান” পত্রিকা হয়ে যায় “দৈনিক বাংলা”। পরে ক্ষমতাসীন সরকারের বদনাম প্রচার করার জন্য ১৯৯৭ সালে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়।”
আমি বললাম, “দারুন তো।”
দাদু আবার যোগ করলেন, “বাংলাদেশের প্রথম জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা হল “দৈনিক আজাদ”। সেটা ১৯৩৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতার পরে ঐ পত্রিকাটিও বন্ধ হয়ে যায় সম্ভবত ১৯৯২ সালে। ঐসব পত্রিকার পুৃরোনা সংখ্যাগুলো সব বাংলা একাডেমীতে পাওয়া যায়। গবেষকরা এদেশের পুরোনো তথ্য জানতে চাইলে বাংলা একাডেমীতে যায় পুরোনো পত্রিকার গুদামে। এই বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৫ সালে। তার এক বছর আগে মানে ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই ঢাকার এই জাতীয় গ্রন্থাগার। এটির এখন ৬৪টি ব্রাঞ্চ। মানে ঢাকাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য ৬৩টি জেলায় ১টি করে ব্রাঞ্চ। যাহোক এই লাইব্রেরী নিয়ে আমার জীবনে একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল।”
আমি বললাম, “কি সেটা?”
দাদু বললেন, “পাশে এসে বস ঘটনাটা আস্তে বলি। এটা লাইব্রেরি; বেশি জোরে কথা বলা যাবে না। অন্যদের পড়াশুনায় অসুবিধা হবে।”
আমি এতক্ষণ দাদুর উল্টোদিকের চেয়ারে বসে ছিলাম। নিরবতা পালনের গুরুত্ব উপলব্ধি করে আমি দাদুর পাশে গিয়ে বসলাম।
দাদু স্বভাবজাত কাশি দিয়ে গল্প বলা আরম্ভ করলেন।
“খুলনা পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে বয়রায় যে লাইব্রেরিটি ছিল সেটার নাম ছিল“সৈয়দ হাসান আলী লাইব্রেরী”। এটি প্রতিষ্ঠা করে তৎকালিন মুসলিম লীগ নেতা পাকিস্তানের খাদ্যমন্ত্রী সৈয়দ হাসান আলী। স্বাধীনতার পর লাইব্রেরিটি জাতীয়করন করা হয়। এখানে মোট ৩০,০০০ বই সংরক্ষিত আছে। এই লাইব্রেরিতে একটা গোপন চেম্বার আছে যেখানে পৃথিবীর সব অপ্রতুল বই এবং পুঁথি সংরক্ষিত করে রাখা থাকে। যাহোক আমি একদিন সৈয়দ হাসান আলী পাবলিক লাইব্রেরির গোপন চেম্বারে গিয়ে প্রাচীন বই ঘাটতে ঘাটতে একটা পুঁথি পেয়ে যায়। ফার্সি ভাষায় লেখা। সম্ভবত সেটা খ্রিষ্টপূর্ব একাদশ শতকের তৎকালিন পারস্যের রাজা নেবুচাদনেজারের লেখা। এই নেবুচাদনেজার ছিল অ্যাকাইমেনিদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন পারস্যের তথা বর্তমান ইরানের তৎকালিন মহাপরাক্রমশালী রাজা। তার পরবর্তী উত্তরপুরুষদের মধ্যে আরও কিছু মহাপরাক্রমশালী রাজা জন্মেছে। তারমধ্যে ছিল রাজা সাইরাস, তার পুত্র রাজা জারজেস, তার পুত্র রাজা দারিউস ইত্যাদি। এই অ্যাকাইমেনিদ রাজবংশ খ্রিষ্টের জন্মের পূর্ব পর্যন্ত খ্রিষ্টপূর্ব একাদশ শতক থেকে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক পর্যন্ত আধিপত্যের সাথে পৃথিবী শাসন করেছে। যাহোক আমি ফার্সি ভাষা খুব ভালো জানতাম। কারণ তৎকালিন অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতির মতো এই উপমহাদেশীয় মুসলিমদের আরবি, ফার্সি, উর্দু এমনিতেই জানতে হতো। নেবুচাদনেজারের পুঁথিটা ফার্সি ভাষায় লেখা। তাই পুঁথিটা পড়তে আমার তেমন অসুবিধা হল না। পুঁথিটা পড়ে আমি যা জানতে পারলাম তা কল্পনায় বিশ্বাসযোগ্য নয়। মমি তৈরির কৌশল, কৃত্রিম উপায়ে বাতি জ্বালানোর কৌশল, কৃত্রিম উপায়ে স্বর্ন তৈরির কৌশল সবই লেখা ছিল ঐ পুঁথিতে। তাছাড়া নেবুচাদনেজার খ্রিষ্টপূর্ব একাদশ শতকে ইরাকের মেসোপটেমিয়া সভ্যতার ব্যবিলন শহর দখল করার ইতিহাসও এতে লেখা ছিল। তৎকালিন ইরাকের রাজা সারগনকে পরাজিত করে তিনি ইরাকের অধিপতি হন। পুঁথিটা সেই পারস্য থেকে বাংলাদেশে এল কেমন করে প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। পরে লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিককে ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করতেই সে পুঁথিটা ঐ লাইব্রেরিতে আসার বিশদ ইতিহাস আমাকে জানাল। ব্যাপারটা মোটামুটি এরকম , ১৪৯৮ সালে পর্তুগালের নাবিক ভাষ্কো দা গামা প্রথম ইউরোপীয়ান হিসেবে ভারতবর্ষ আবিষ্কারের পর থেকে দলে দলে ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে ইউরোপীয়ানরা এই উপমহাদেশে আসতে থাকে বাণিজ্য করতে। তারমধ্যে অন্যতম ছিল পর্তুগীজ বা ফিরিঙ্গি মানে পর্তুগালের অধিবাসীরা, ডাচ বা ওলন্দাজ মানে নেদারল্যান্ডের অধিবাসীরা যে দেশের পূর্বনাম ছিল হল্যান্ড। এছাড়া ডেনিশ বা দিনেমার মানে ডেনমার্কের অধিবাসীরা, ফরাসী বা ফ্রেঞ্চ মানে ফ্রান্সের অধিবাসীরা, ব্রিটিশ তথা ইংলিশ, স্কটিশ মানে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ডের অধিবাসীরা এই উপমহাদেশে বানিজ্য করতে এসেছে। তারা এদেশে বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন জায়গায় বানিজ্য কুঠি স্থাপন করেছে। ভাষ্কো দা গামা ১৪৯৮ সালে কেরালার কালিকট বন্দর দিয়ে ভারতে আসার পথ আবিষ্কার করার পর অনেকে তখন বিভিন্ন ইউরোপীয় পন্য নিয়ে আসতো এদেশে। এদেশে আনারস, পেঁপে, পেয়ারা এসব ফল প্রথম আনে পর্তুগীজরা। স্পেনের টমেটোও পর্তুগীজদের হাত ধরে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। মূলত ভাষ্কো দা গামায় এসব ফলের বীজ সঙ্গে করে এনে এদেশের মানুষের কাছে বিক্রি করে। ডাচরা নিয়ে আসে আলু। ব্রিটিশরা নিয়ে আসে নীলের বীজ মানে তুতে গাছ। এই নীল চাষকে কেন্দ্র করে ১৮৬০ সালে এই বাংলায় নীল বিদ্রোহ হয় যেটা পরবর্তীতে ব্রিটিশদের এই উপমহাদেশ থেকে মূলোৎপাটন করতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। যাহোক সেই সময় মূলত ১৬০২ সালের পর এই উপমহাদেশে ডাচদের আগমনের পর অন্যান্য ইউরোপীয়ানদের মতো ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক ওলন্দাজ সাহেব জোহান ক্রিস্টোফার ফেব্রিসিয়াস ১৬৬৪ সালে খুলনার রায়েরমহলে একটা বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন। এদেশের কৃষকদের দিয়ে তিনি প্রচুর তুলার চাষ করাতেন এবং তুলার এক চেটিয়া ব্যবসা করতেন। পরে তো এই তুলার চাষ বৃহত্তর যশোরেও ছড়িয়ে পড়ে। এখন তো বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি তুলা উৎপাদন হয় যশোরে এবং এই কারনে বাংলাদেশের একমাত্র তুলা গবেষণা ইনস্টিটিউট যশোরে অবস্থিত। এখানে বলা দরকার রায়েরমহলে তুলা চাষ বন্ধ হয়ে যায় ব্রিটিশরা এদেশ থেকে চলে যাওয়ার পর। যাহোক জোহান ক্রিস্টোফার ফেব্রিসিয়াস প্রতিষ্ঠিত রায়েরমহলের ডাচদের সেই কুঠি পরে ১৮৩৪ সালে ডাচদের থেকে ব্রিটিশরা দখল করে নেয়। সিপাহী বিদ্রোহের পরের বছর ১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে ব্রিটিশ ভারত সরকার ভারত থেকে বিলোপ করলে খুলনার রায়েরমহলের ঐ বাণিজ্য কুঠিটি কোম্পানির হাত থেকে বদলে ভারত সরকারের অধীনে চলে আসে। পরে দীর্ঘদিন কুঠিটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়েছিলো । পরবর্তীতে ১৮৮৪ সালে লর্ড রিপনের আমলে জন অস্টিন নামক এক ভদ্রলোককে এই কুঠির দায়িত্ব দেয়া হয়। এই সাহেব রায়েরমহলের সেই ওলন্দাজদের তৈরি বানিজ্য কুঠিতেই থাকতো। ১৯৩০ সালে প্রফুল্ল চাকী নামে এক বিপ্লবী বোমা হামলা করে খুলনা থেকে কোলকাতা যাওয়ার পথে অস্টিন সাহেবকে মেরে ফেলে। পরে প্রফুল্লর ফাঁসি হয়ে যায়। ঐ জন অস্টিন সাহেবের একটা স্টিলের ট্রাংক ছিল। সেটা পরে প্রফুল্লর সাগরেদরা উদ্ধার করে এবং এই লাইব্রেরিতে দিয়ে যায়। তাতে এই নেবুচাদনেজারের পুঁথিটা ছিল অন্যান্য জিনিসের সাথে। জিনিসটার গুরুত্ব উপলব্ধি করে সৈয়দ হাসান আলী পাবলিক লাইব্রেরীর তৎকালিন গ্রন্থাগারিক এটাকে খুব যত্ন সহকারে গোপনীয়তার সাথে উঠিয়ে রাখেন এই লাইব্রেরীর একটা গোপন চেম্বারে।”
এই বলে দাদু গল্প বলা শেষ করলেন। আর আমি তাকিয়ে দেখি আমাদের টেবিলের আশেপাশে যারা বসে ছিল তারা প্রত্যেকে এক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

২৮.০৫.২০২০

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২০২ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031