» নেহরু সম্পর্কে আরো ভাবতে হবে

প্রকাশিত: ১৫. নভেম্বর. ২০২০ | রবিবার

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী
আজকের এই দিনে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ইংরেজ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, ১৩১ বছর পূর্বের ১৪ নভেম্বর ১৮৮৯ সালে। এই বিস্ময়কর ভারতবর্ষে জওহরলাল নেহরু ইতিহাসের এক প্রতিধ্বনি। যে প্রতিধ্বনি আজও কান পাতলেই শোনা যায় পৃথিবীর শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতে। নেহরু গণতন্ত্রের অপর এক নাম। তাঁকে পণ্ডিত বলা হয় কারন তিনি প্রাচীন ভারতবর্ষের নানাবিধ জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, আবার তিনি আধুনিক ভারতের স্বপ্নদ্রষ্ট্রা। তিনি প্রাচীন ও আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার মাঝে সৃষ্ট জ্ঞান আহরন করেছিলেন। হয়েছেন পণ্ডিত। কন্যা শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর শৈশবে পিতা নেহরুর কাছ থেকে প্রাপ্ত চিঠিপত্রে থরে থরে পান্ডিত্বের নানা চিহ্ন লক্ষ করা গিয়েছে। নেহরু ছিলেন অত্যন্ত পণ্ডিত ব্যাক্তি যিনি একাধারে করেছেন লেখালেখি ও রাজনীতি। নেহরুর গুনাগুন সম্পর্কে ভারতবাসীর আরো ভাবতে হবে। আজ তার মৃত্যুর ৫৬ বছর কাল পার হয়ে গেলো, আজও ভারত তার ভিত্তিতেই দাড়িয়ে জাগ্রত এক জাতিসত্বার অপূর্ব নিদর্শন। গনতন্ত্র অনন্য এক উদাহরন ভারতের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে। তার ভিত্তি স্থাপন করেছেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু।
নেহরু বেঁচে ছিলেন পঁচাত্তর বছর। সতেরো বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাজ করেছেন। আধুনিক ভারতের পথ চলা শুরু হয়েছিল পণ্ডিত নেহরুর শাসনামলে। রাজতন্ত্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতের ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলো। সাম্রাজ্যবাদী সমাজে জন্মগ্রহণ করেছেন নেহরু। বিদ্যালাভ করেছেন তাদের শিক্ষাব্যাবস্থায়। হাল ধরেছেন রাজনীতিতে। ন্যাশনাল কংগ্রেসের শীর্ষ স্থানে থেকে ইংরেজ শাসকদের শেষ পরিনতি রচনা করেছেন। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে ভারতের জনগনের প্রয়োজন দুটো স্বাধীনতা। বিশ্বযুদ্ধের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা, আর ভারত স্বাধীন করা। এসময় ভারতবর্ষের ভাইসরয় ওয়াভেল নিখিল-ভারতের নেতাদের সিমলায় নিমন্ত্রণ করেন। যেখানেই রচিত হয়েছিলো ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ভাগ্য। তার দুবছর পরে ভারত স্বাধীন হলো, আবার ভারত দ্বিখন্ডিত হলো। সিমলায় উপস্থিত ছিলেন মাহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, মো: আলী জিন্নাহ, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, বল্লভভাই প্যাটেল সহ মুসলিম লীগ ও ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। সিমলায় রাজনৈতিক শাসকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল সাহেব। সেদিন ছিলো ১৪ জুন, ১৯৪৫ সাল। সপ্তাহে একদিন গান্ধী কারো সাথে কথা বলতেন না। তিনি ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল সাহেবের সাথে সেদিন কথা বলেননি। সেদিনটিই ছিলো গান্ধীর কথা না বলার দিন। তাই গান্ধী সেদিন তার সম্মতি জানিয়েছিলেন চিরকুটে লিখে। তবে মুখে নিরব ছিলেন। জিন্নাহ সাহেব জাতিসত্বার রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টিতে দৃঢ় ছিলেন সেদিনও। নেহরুর ইচ্ছা ছিলো যে কোন ভাবেই শুধুই স্বাধীনতা। ভারতের স্বাধীনতা। ইংরেজ শাসক গোষ্ঠীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া। সিমলাতেই স্বাধীনতার বীজ বপিত হয়েছিল। যেহেতু গান্ধী কথা বলেননি সে কারণেই নেহরুর ভূমিকা প্রধান ছিলো। দুই বছর পরে ভারত স্বাধীন হলো। জওহরলাল নেহরু হলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।
মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাজ করেছেন। ১৯৬৪ সালে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। সতেরো বছর প্রধানমন্ত্রী থাকা কালীন সময়ে ভারত এক নতুন রাষ্ট্রের যাত্রায় অবতীর্ণ হলো। নেতৃত্ব দিলেন নেহরু। পেছনে পরে থাকলো হাজার হাজার বছরের পুরোনো সিন্ধু সভ্যতা। আধুনিক ভারতের এই যাত্রাকালে প্রতিষ্ঠিত হলো গনতন্ত্রের যাত্রা। যা আজও চলমান। ভারত শিখলো গনতন্ত্র। নেহরুর মৃত্যুর পরই ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়। ১৯৬৫ সালে। বাংলাদেশের তখনো জন্ম হয়নি। বাংলাদেশের সেই যুদ্ধে কোনো প্রভাবও পরেনি। বাংলাদেশ তখন পাকিস্তানের প্রদেশ। পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধের প্রভাব ছিলো না। তবে পূর্ব পাকিস্তানের সমাজে ১৯৪৭ সাল থেকেই স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর সাথে প্রাদেশিক নেতাদের বিরোধ কখনোই স্বাভাবিক ছিলো না। বৈষম্য একটি প্রধান কারণ ছিল। পন্ডিত জওহরলাল নেহরু যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ১৯৫৩ সালের ১৪ জুন পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ জেলায় আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল যে পরের বছর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তফ্রন্ট গঠিত করা হবে। নেহরু এসময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছিলো, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলো। শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী হয়েছিলেন। পদত্যাগও করেছিলেন কয়েক মাস পরে। যুক্তফ্রন্ট ভাঙ্গার মধ্য দিয়েই সরকার ভেঙে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আওয়ামী লীগ নানা ছক আঁকে এসময়। নেহরুর মৃত্যুর পর পরই ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা পেশ করেন। অনেকেই এখানে বলে থাকেন এবং মনে করেন ভারতের কারনেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। সেটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। পন্ডিত জওহরলাল নেহরু যদি চাইতেন তাহলে শেখ মুজিবুর রহমান অনেক আগেই স্বাধীনতার ডাক দিতে সামর্থ হতেন। সেটা ঘটেনি। নেহরু কোনদিনও পূর্ব পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন বোধ করেননি। তিনিতো ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক সমাধান চেয়েছিলেন পাকিস্তানের সঙ্গে বিভিন্ন বিরোধ মীমাংসার। সেখানে ভারত কোনদিনও হস্তক্ষেপ করেনি। জুলফিকার আলী ভুট্টোর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভ পরবর্তীতে হয়েছিলো। তবে প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি মুজিবুর রহমানের সাথে বিরোধে জড়িয়েছিলেন। নেহরু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়ে অবহিত ছিলেন। সেসময় তিনি চাইলে মুজিবুর রহমানকে উসকে দিতেও পারতেন। কিন্ত শেখ মুজিব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছিলেন। শোষন-নিপিড়নের মধ্য দিয়েই ধারাবাহিক ভাবে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের সম্পর্ক দিনে দিনে খারাপ হয়েছিলো। এখানে ব্যাক্তির স্বার্থও যেমন ছিলো না তেমনি ছিলো না কোনো গোষ্ঠীর আকাঙ্খা পূরণের লিপ্সা। অর্থনৈতিক বৈষম্য সুস্পষ্ট ছিলো দুই অঞ্চলে। জওহরলাল নেহরু বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনেও কোনো হস্তক্ষেপ করেননি। তিনি জানতেন বাংলাদেশের জনগন মাতৃভাষার সপক্ষেই অবস্থান করবে। বাংলাই হবে বাংলাদেশের মানুষের কথিত ও পঠিত ভাষা। ভারতের সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক যোগসূত্র যারা খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টা করেন আজও তাদের বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে হবেই। ১৯৫২ সালে জিন্নাহ বেঁচে ছিলেন না। কিন্ত জওহরলাল নেহরু তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানকে বিভক্ত করার ইচ্ছা থাকলে নেহরু তখনও করতে পারতেন। ভারতে নেহরু যে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভারতে সেই গণতন্ত্র আজও রয়ে গিয়েছে। ভারতের গণতন্ত্র তার বিবেক দিয়েই পরিচালিত হয়েছে। নেহরুর মৃত্যুর পর তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী সেই গণতন্ত্র আরোও সুসংহত করেছেন। এজন্যই জওহরলাল নেহরুকে আমাদের জানতে হবে, তাকে ভাবতে হবে। ভারতের গনতন্ত্রের মূল্যায়ন করতে গেলেই জওহরলাল নেহরুকে আবিষ্কার করা যাবে। ভারতবাসীর কাছে নেহরু এক পবিত্র আদর্শ। যিনি ব্রাক্ষ্যের আশির্বাদে আবির্ভূত হয়েছিলেন, আর মর্তে তার প্রতিফলন ঘটেছিলো। তিনি ভারতের কথা ভেবেছিলেন ও ভারতবাসীর কথা ভেবেছিলেন। ভারতের গণতন্ত্র নেহরুর শিল্পকর্ম।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯৯ বার

Share Button

Calendar

November 2020
S M T W T F S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930