» পবিত্র আশুরা: মুসলমানদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়

প্রকাশিত: ৩০. আগস্ট. ২০২০ | রবিবার

আজ রোববার ১০ মহররম। পবিত্র আশুরার দিন। ‘আশুরা’ আরবি শব্দ আশারা থেকে। আশারা অর্থ দশ আর আশুরা অর্থ দশম। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় মহররম মাসের দশম দিবসকে আশুরা বলা হয়। ১০ মহররম বিশ্বের মুসলমানদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়।

মহান আল্লাহ এই দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এই দিনেই পৃথিবী ধ্বংস হবে। আশুরার দিন আল্লাহ পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম আ:-কে সৃষ্টি করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন নবীর জীবনে এ দিনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। ৬১ হিজরির ১০ মহররমের এ দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর নাতি ও মা ফাতেমার সন্তান ইমাম হোসাইন রা: ও তার পরিবারের সদস্যরা কারবালার ময়দানে শহীদ হন। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে থেকে নির্ভীকভাবে শাহাদতের অমীয় সুধা পান করে পৃথিবীর বুকে চির অমর হয়ে আছেন হজরত ইমাম হোসাইন রা:। সেজন্য মুসলিম উম্মাহর জন্য এ দিনটি একইসাথে শোকাবহ ও তাৎপর্যময়।

বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে যথাযোগ্য মর্যাদায় পবিত্র আশুরা পালিত হবে। নফল রোজা, নামাজ, জিকির-আজকারের মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দিনটি পালন করবেন। হজরত মুহাম্মদ সা: আশুরার দিনসহ দু’দিন রোজা রাখার কথা বলেছেন। দেশব্যাপী বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন এ দিন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। পুরান ঢাকার হোসেনী দালানসহ বিভিন্ন স্থান থেকে শিয়া সম্প্রদায়ের উদ্যোগে অন্যবার তাজিয়া মিছিল বের করা হলেও এবার করোনা মহামারীর কারণে তাজিয়া মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আশুরা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। আজ সরকারি ছুটি রয়েছে। পত্রিকা অফিসগুলোতেও ছুটি থাকবে। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন প্রিন্টমিডিয়া বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়াও বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে।

পবিত্র আশুরার দিনে মহান আল্লাহ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। এই দিন হজরত নূহ আ:-এর আমলের প্লাবন শেষ হয় এবং নূহ আ:-এর জাহাজ তুরস্কের ‘জুদি’ নামক পর্বতে গিয়ে থামে। আশুরার দিন হজরত ইব্রাহিম আ: জালিম বাদশাহ নমরুদের অগ্নিকুণ্ডু থেকে নিরাপদে মুক্তি পান।

এই দিন হজরত ইউনুস আ: মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। আশুরার দিনে হজরত আইয়ুব আ: দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পান। এই দিন আল্লাহ জালিম বাদশা ফিরাউনকে দলবলসহ পানিতে ডুবিয়ে মেরেছেন এবং মুসা আ: ও তাঁর অনুসারীরা ফেরাউনের হাত থেকে নাজাত লাভ করেন। আশুরার দিন হজরত সুলাইমান আ: তাঁর হারানো রাজত্ব ফিরে পান। এই দিনে হজরত ইয়াকুব আ: হারানো ছেলে হজরত ইউসুফ আ:-কে ফিরে পেয়েছিলেন। এই দিনে হজরত ঈসা আ: জন্মগ্রহণ করেন এবং এই দিনেই তাঁকে দুনিয়া থেকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়।

দশই মহররম কারবালা প্রান্তরে বিশ্ব নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর দৌহিত্র হোসাইন রা:-এর শাহাদতের ঘটনা মুসলিম জাতির ইতিহাসে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় ঘটনা। এই ঘটনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। মুসলিম উম্মাহ অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে কারবালার ঘটনা স্মরণ করে আবেগ আপ্লুত হয়। হজরত হোসাইন রা: অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে সেদিন কারবালা প্রান্তরে পরিবার-পরিজন নিয়ে শাহাদতবরণ করেছিলেন।

রাসূলের সা: প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং তাঁর সাহাবিদের প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা খেলাফত অক্ষুণ্ন রাখার জন্য তিনি শাহাদতবরণ করেন। ইসলামী খেলাফতের ব্যাপারে কোনো ধরনের আপস না করার কারণেই কারবালার ঘটনা ঘটেছিল। কারবালার ঘটনা আমাদেরকে অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে সংগ্রাম করার শিক্ষা দেয়। ইবাদত : ইসলামের প্রাথমিক যুগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল। দ্বিতীয় হিজরি সনে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার বিধান নাজিল হলে আশুরার রোজা ঐচ্ছিক হিসেবে বিবেচিত হয়। আশুরা দিবসে রোজা পালনের জন্য রাসুলুল্লাহ সা: নির্দেশ দিয়েছেন।

সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন, রমজানের পর সর্বাধিক উত্তম রোজা হলো মহররম মাসের রোজা আর ফরজের পরে সর্বাধিক উত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ। (সহিহ মুসলিম ১/৩৫৮)।

হাদিসের প্রায় সব কিতাবে মহররম মাসের ফজিলত এবং আশুরার রোজা সম্পর্কে একাধিক হাদিস রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা: এরশাদ করেন, আশুরার দিন রোজা রাখার কারণে আল্লাহ তায়ালা বান্দার বিগত এক বছরের গুনাহগুলো মাফ করে দেন। (সহিহ মুসলিম ১১৬২)।

প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ: হজরত ইবনে আব্বাস রা:-এর বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যাতে রাসুলুল্লাহ সা: এরশাদ করেন, তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখ। তবে এতে যেন ইহুদিদের সাথে সামঞ্জস্য না হয়ে যায় সেজন্য এর সাথে মিলিয়ে হয় আগের দিন কিংবা পরের দিনসহ রোজা পালন কর। (তিরমিজি ৭৫৫)।

পরিশেষে মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করি মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে এই আশুরার সকল তাৎপর্য পূর্ণ দান করেন আমিন এবং তাঁহার হুকুম আহকাম মোতাবেক জীবন চলার পথে পথ পরিচালিত করেন আমিন। মৃত্যুর সময় যেন আমাদের ভাগ্যে কালিমা নছিব হয় সেই সাথে প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ সাঃ এর চেহারা মোবারক যেন দেখতে পারি সেই তৌফিক দান করুন আমিন।

লেখকঃ মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার | বিশেষ প্রতিবেদক রেডটাইমস | সাবেক কাউন্সিলর বিএফইউজে-বাংলাদেশ ও সদস্য ডিইউজে |

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯৮ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031