পরম নির্ভরতায় আমি ওর ঘাড়ে মাথা রাখি

প্রকাশিত: ১:২০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০১৮

পরম নির্ভরতায় আমি ওর ঘাড়ে মাথা রাখি

 

জেসমিন চৌধুরী

বাংলাদেশের সময়ের হিসাবে শরীর চলছে এখনো। আজ ভোর পাঁচটায় ঘুম ভেঙ্গে গেল, কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে উঠে পড়লাম। দেশ থেকে নিয়ে আসা বেল দিয়ে শরবত বানালাম। বাসমতি চালের জাউ আর ঘরে ভেজানো ছোলা ভাজা। তারপর সবাইকে ডেকেডুকে তুলে নাশতা খেতে বসালাম।

কতদিন পর নিজের রান্নাঘরে নিজের হাতে বানানো নাশতা নিজের ছেলেমেয়ে এবং সংগীর সাথে খাওয়া। মনে হলো পৃথিবীর সব সুখ আজ আমার মুঠোয়। এই সুখ বিতরণ না করে থাকা যায়? তাই ফেসবুকে সীমাবদ্ধ উপস্থিতির প্রতিশ্রুতি ভেংগেই একখানা সুখ বিতরণের ছড়া পোস্ট করে অপুকে নিয়ে মুভি দেখতে বসলাম। নিজের এই নিরবচ্ছিন্ন সুখের মধ্যে কাঁটার মত বিঁধছিল দেশ থেকে মাথায় করে নিয়ে আসা কিছু কষ্টের গল্প- পরকীয়ার কারণে ভেঙ্গে যাওয়া কিছু সম্পর্ক, পরকীয়া অথবা অন্যান্য কারণে আস্থা ও ভালোবাসার অভাব নিয়ে টিকে থাকা কিছু বৈবাহিক সম্পর্কের গল্প।

ইচ্ছে হলো এই বিষয়ে কিছু লিখি। কিন্তু নিজেকে দেয়া প্রতিশ্রুতিও বারবার ভাঙ্গা ঠিক না, তাই লিখতে বসলাম না, কিন্তু ভাবনাগুলো মাথায় ঘুরতেই থাকল। আমি বেশিরভাগ সময় ভালোই থাকি, কিন্তু চারপাশের মানুষের কষ্ট দেখে নিজের এতো বেশি ভালো থাকা নিয়ে একধরণের অপরাধবোধেও ভুগি।

এইসব ভাবনা ভাবতে ভাবতে হঠাত দেখি অপু কার সাথে ল্যান্ডফোনে কথা বলছে। এর আগে কখনো ওর ফোনালাপে আমি আড়ি পাতিনি, কিন্তু আজ চায়ের ময়লা কাপগুলো রান্নাঘরে নিয়ে যেতে যেতে হলের কাঠের শেলফে রাখা ফোনের দ্বিতীয় সেটটায় চোখ পড়াতে লোভ সামলাতে পারলাম না। নিঃশব্দে রিসিভারটা ধরে কানে লাগিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেলাম, অপর পাশে এক সুললিত নারীকণ্ঠ আহ্লাদী সুরে কথা বলছে। কিছুক্ষণ আগে যে সুখের বাজার নিয়ে ছড়া লিখেছি মুহুর্তের মধ্যে এক ভয়ংকর সাইক্লোন এসে তার প্রতিটি স্থাপনা উড়িয়ে নিয়ে গেল। যে পুরুষের ভালোবাসায় প্রতিটি মুহুর্ত বুঁদ হয়ে থাকি, যার এতোটুকু স্পর্শের জন্য দিবানিশি উন্মুখ হয়ে থাকে আমার দেহের প্রতিটি লোমকূপ, সে তাহলে শুধু আমাতেই মগ্ন নয়?

‘একটা চুমু দাও।’
‘সকালে তো একটা দিয়েছি।’
‘ওটা ছিল সকালেরটা, দুপুরেরটা দাও।’
‘তোমাকে তো বলেছি শুধু সকাল আর রাতে একটা করে পাবে, দিনের বাকি সবগুলো চুমু জেসমিনের জন্য।’
‘জেসমিন, জেসমিন!! অসহ্য! কী আছে ওর মধ্যে?’
‘ও আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসে।’
‘আর আমি বুঝি বাসি না?’
‘খামাখা রাগারাগি করো না তো! আমি দু’জনকেই ভালোবাসি কিন্তু ওকেই আমার বেশি প্রয়োজন।’

এ আমি কী শুনলাম! এও কি সত্যি হতে পারে? কী পরম নির্ভরতা ছিল আমার ওর প্রতি! কী অবচলিত বিশ্বাস! ও কী করে পারল! কী করে ভুলে গেল একসাথে কাটানো যাদুময় সব মুহুর্তের কথা? নর্থ ওয়েলসের বিচে আশি মাইল বেগের বাতাস উপেক্ষা করে নীল শামুক কুড়ানো, রিভার মার্সির পাশ ঘেঁষে প্রবল বর্ষনে হেঁটে যাওয়া, ডানাম মাসির বনে পাতার ছাদের নিচে জড়াজড়ি করে তুমুল শিলাবৃষ্টি থেকে বৃথা আশ্রয়ের চেষ্টা, সেইল ওয়াটার পার্কের ঝরা পাতা ঢাকা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পিছলে যেতে যেতে আবার উঠে দাঁড়ানো, তারপর পাগলের মত হাসিতে ফেটে পড়া– সব ভুল? সবই ভুল? আমি তো ওকে বলেছিলাম কাউকে ভালো লাগলে আমাকে বলে দিতে, আমি নীরবে দূরে সরে যাব। তবু সে পারল? সে সত্যিই পারল? নাকি সরে যাব এই ভয়েই কিছু বললো না?

আমার মাথাটা ঘুরতে শুরু করলো। চারপাশ অন্ধকার হয়ে এলো, সিঁড়ির ব্যানিস্টার ধরে সামলে নেবার চেষ্টা করতে করতে নকল কাঠের মেঝেতে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলাম। সাথে সাথেই অসময়ের ঘুমটা ভেঙ্গে গেল, পাশে বসেই নিশ্চিন্তে মোবাইল ফোনে কিছু একটা পড়ছে লোকটা।

‘একটা মজার কৌতুক বলি তোমাকে। আগের ফোনগুলোই ভালো ছিল, টিপতে হতো। নতুনগুলো শুধুই টাচ! বোরিং! হা হা হা!’

আমার নাকমুখ চিরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। না, সবকিছু ঠিক আছে তাহলে! ঘুমিয়ে পড়ার আগ মুহুর্তের পরকীয়া সংক্রান্ত ভাবনাগুলো উলটে গিয়ে দেখা দুঃস্বপ্নের ভারটা তবু যেন কাটতে চায় না। আমি বুক ভরে শ্বাস নেবার জন্য হাঁসফাঁস করতে থাকি।

‘এই অপু ভয়ানক একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি।’
‘তাই নাকি?’
‘শুনো না, স্বপ্নটা তোমাকে নিয়ে।’

এবার ফোন রেখে সে মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুরু করে। অনেক চেষ্টা করেও স্বপ্নে অনুভব করা কষ্টের সবটুকু আমি বুঝিয়ে বলতে পারি না। বারবার শুধু বলতে থাকি, ‘ভীষণ কষ্ট লাগছিল, ভীষণ।’

আমোদপ্রিয় মানুষটা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে, ‘আমি কত খারাপ লোক দেখেছ? জেগে জেগে তো তোমাকে অনেক কষ্ট দেইই, আবার ঘুমের মধ্যেও… চিন্তা করতে পার কত খারাপ একটা মানুষের সাথে থাকো তুমি?’

এতোক্ষণে আমার শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কিন্তু অন্যরকম একটা কষ্টে আবার মন ভারি হয়ে উঠে। কয়েক সেকেন্ডের এই দুঃস্বপ্নে আমি এতোটা কষ্ট পেয়েছি অথচ অনেক নারীপুরুষকে বাস্তবিকই দিনের পর দিন এই কষ্ট সহ্য করতে হয়, সমাধানের কোনো পথ খুঁজে পায় না তারা।

পরম নির্ভরতায় আমি ওর ঘাড়ে মাথা রাখি। ভাবি, এমন একটা মানুষের সাথে থাকার সৌভাগ্য যেন সব নারীর/ সব পুরুষের হয়। যে মানুষটাকে পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করা যায়, যার উপর অবিচলিত আস্থা রাখা যায়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

http://jugapath.com