» পাহাড়ের রাণী দার্জিলিং-পাহাড় কন্যা মিরিক

প্রকাশিত: ১৬. ফেব্রুয়ারি. ২০১৮ | শুক্রবার

 

আনোয়ার চৌধুরী

স্বপ্নের শহর দার্জিলিং দেখার ইচ্ছে অন্য অনেকের মতো আমিও লালন করছিলাম দীর্ঘ দিন থেকে। অবশেষে সে সুযোগ আসে ২০১৪ সনের মে মাসের শেষ সপ্তায়। নর্দাণ ইউনিভার্সিটি,জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় ও বিসিএস প্রশাসন একাডেমীর যৌথ প্রযোজনায় সে স্বপ্ন আলোর মুখ দেখে। বিষয়টি একটু খোলাসা করে বলি। আমরা বিভিন্ন পদ মর্যাদার ৩৩ জন সরকারী কর্মকর্তা নর্দাণ ইউনিভার্সিটির  কোর্সে ভর্তি হই ২০১৩-২০১৪ শিক্ষা বর্ষে। কোর্স পরিচালনার দায়িত্ব ছিল বিসিএস প্রশাসন একাডেমীর উপর। কোর্সের সাথে এক সপ্তাহের একটি বৈদেশিক শিক্ষা সফর (ষ্টাডি ট্যুর) যুক্ত ছিল। ট্যুরের অর্থ সংস্থান হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের জেডিসিএফ তহবিল থেকে। বিদেশ মানে ইন্ডিয়া। তাও আবার দিল্লী আগ্রা কিংবা কাশ্মীর নয়। পাশের বাড়ী পশ্চিমবঙ্গ! এ যেন বাড়ীর কাছে আরশী নগর! অনেকে মন খারাপ করে। এটা বিদেশ হলো? অনেক চেষ্টা তদবির করেও রেক্টর শফিক আলম মেহেদী সাহেবের মন গলানো যায়নি। তিনি সিদ্ধান্তে অনঢ়। পশ্চিমবঙ্গেই যাবেন। তিনিই টিম লিডার। তাই তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া ছাড়া বিকল্প নেই। কি আর করা। তথাস্থু। তবে ভ্রমণ তালিকায় দার্জিলিং, কালিম্পং,মিরিক,মংপু, দীঘা ইত্যাদি নাম দেখে অনেকে আবার উৎফুল্ল হয়। ইট পাথরের শহর দেখার চেয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা অনেক বেশী আনন্দদায়ক হবে। নির্ধারিত দিনে জেট এয়ারে যাত্রা শুরু হলো ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে। কোলকাতার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু এয়ারপোর্টে নামলাম পড়ন্ত বিকেলে। সফরের অংশ হিসেবে একদিন একরাত কোলকাতা শহরে কাটিয়ে চলে যাই বাগডোগরা এয়ারপোর্ট হয়ে কালিম্পং শহরে। কালিম্পং থেকে দার্জিলিং ও মিরিক। তখন কে জানতো এটিই হবে দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো এক স্মৃতিময় সফর!

প্রায় ৩ দিন কালিম্পং ভ্রমণ শেষ করে আমরা যাত্রা করি দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে। সকাল সকাল নাস্তা খেয়ে চেপে বসি সুমো টাটা জীপে। প্রতিটিতে ৫ জন করে বসি। আমাদের গাড়ীতে ছিলেন কোর্স ডাইরেক্টর ইমদাদুল হক,উপসচিব হায়াতুল্লাহ,উপসচিব অশোক দেবনাথ ও উপসচিব সোহেল আহমেদ। অপরুপ সৌন্দর্যের লীলা ভ’মি কালিম্পং ছেড়ে যাচ্ছি পর্যটকদের আরেক তীর্থভ’মি পাহাড়ের রানী খ্যাত দার্জিলিং শহরে। সকলের মনেই উচ্ছ্বাস। পাহাড়ী আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে সামনের দিকে সকলের দৃষ্টি। তবে আশেপাশের সৌন্দর্য্য উপভোগও চলে সমান তালে । বেশ কিছু দূর সামনে গিয়ে পাই একটি সুন্দর জায়গা। গাইডের নির্দেশে সব গাড়ী থেমে যায়। গাড়ী থেকে নেমে সকলের ভাষা ছিল ’ওয়াও ! এত সুন্দর জায়গা’। সত্যিই এমন সুন্দর জায়গা আর দেখিনি। জায়গাটির বিভিন্ন নাম রয়েছে। ত্রিবেনী সঙ্গম,লাভার’স ভিউ পয়েন্ট,ভিউ পয়েন্ট ইত্যাদি। এখানে দুই পাহাড়ী নদী তিস্তা ও মহারঙ্গিতের ¯্রােতধারা মিলিত হয়েছে। দুই নদীর পানির রঙ আলাদা। অনেকটা যেন আমাদের চাঁদপুরের নিকট পদ্মা মেঘনার মিলন স্থলের পানির মতো। রঙ্গিত নদীর পানির রঙ দেখতে অনেকটা নীলাভ সবুজ আর তিস্তার পানি স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো। আমরা প্রায় ৫ হাজার ফুট উচুতে একটি সমতল পাহাড় চূড়ায় স্থাপিত ট্যুরিস্ট পয়েন্টে নামলাম। ওখান থেকে নীচে তাকালে দুই নদীর মিলন স্থল দেখা যায়। নদীর মিলনস্থলটি অনেকটা সমতল। নদীটির মিলনস্থলের একপাশে সিকিম রাজ্য অন্য পাশে দার্জিলিং। এক সময় ছিল দুটি স্বাধীন দেশের সীমানা পৃথককারী নদী। ১৯৭৪ সনে স্বাধীন রাষ্ট্র সিকিম ভারতের সাথে একীভুত হলে সিকিম ভারতের একটি অঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে। এখন নদীটি দুই রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীতে রয়েছে চমৎকার রিভার রাফটিং এর ব্যবস্থা। প্রায় ১৫ কিলোমিটার ব্যাপী রাফটিং এরিয়া বিস্তৃত। যারা অনেকটা সাহসী এবং সৌখিন তারাই খর¯্রােতা নদীতে রাফটিং পছন্দ করে। রাফটিং সেন্টারের কর্মীরা এসে অনুরোধ করে রাফটিং করার জন্য। আমাদের সে সুযোগ এবং প্রস্তুতি কোনটাই ছিলনা বলে শুধু শুনেই ক্ষেমা দিতে হয়। ট্যুরিস্ট পয়েন্টে আরো অনেক পর্যটকের ভিড়। সকলেই জুস/চা/কফি/¯œ্যাকস ইত্যাদি খেয়ে তৃপ্তি লাভ করে। আপেল,কমলা, বেদানা,আঙ্গুর ছাড়াও নানা রকম পাহাড়ী ফল ফলারির সমাহার দেখে মন ভরে যায়। অনেক হস্তজাত শিল্পের দোকানও আছে। আছে নানা রঙের স্যুভেনীর। কেউ কেউ সামান্য কেনাকাটাও করেন। কালিম্পং, দার্জিলিং কিংবা শিলিগুড়ি যাওয়ার পথে এখানে সকল পর্যটকই যাত্রা বিরতি করে এবং অনেক পর্যটক দীর্ঘক্ষণ বসে প্রকৃতির রুপ মাধূর্য উপভোগ করে। ছবি তোলা এবং ভিডিও করায় মেতে উঠে সকলে। স্মৃতিকে ধরে রাখার অদম্য প্রয়াস। এই মনোরম পরিবেশে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে গাড়ীতে উঠি।

সামনে কিছুটা পথ এগুতেই পড়ে তিস্তা ব্রিজ ও তিস্তা বাজার। তিস্তা নদীর পূর্ব পাড়ে কালিম্পং সাব-ডিভিশন এবং পশ্চিম পাড়ে দার্জিলিং সদর মহকুমা । বৃটিশরা ক্ষর¯্রােতা তিস্তা নদীর উপর একটি চমৎকার ঝুলন্ত ব্রিজ নির্মাণ করে। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় ব্রিজটি চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে এটি পরিত্যবক্ত হয় এবং বর্তমান স্থানে নব্বইয়ের দশকে একটি নতুন ব্রীজ স্থাপন করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ব্রিজের অপর পাড়ে ছোট্ট শহর তিস্তা বাজার। তিস্তা নদীর তীর ঘেঁষে এর অবস্থান বলেই নদীর নামে শহরটির নামকরণ করা হয়েছে বলে মনে হলো। এটি আমাদের দেশের উপজেলা শহরের মতো। পাহাড়ের পাদদেশে অনেকটা সমতল এলাকায় এর অবস্থান। এটিকে সড়ক পথের জংশন শহর বলা যায়। শিলিগুরী-গ্যাংটক জাতীয় মহাসড়ক এবং দার্জিলিং-কালিম্পং জাতীয় মহাসড়ক এখানে মিলিত হয়েছ্ ে। আমরা অল্প সময়ের জন্য নামি ।

তারপর আবার শুরু হয় যাত্রা গহীন বনের ভিতর দিয়ে দার্জিলিং শহরের দিকে। পথিমধ্যে তিন জায়গায় যাত্রা বিরতি করি । তিস্তা বাজার থেকে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর গাড়ী বহর থামে একটি উচূ পাহাড়ী এলাকায় । জায়গাটির নাম লামাহাট্টা(খধসধ ঐধঃঃধ)। ছোট্ট হিল ষ্টেশন এবং পর্যটন কেন্দ্র। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্য মন্ত্রি মমতা ব্যানার্জী ২০১২ সনে এ পর্যটন কেন্দ্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন যা উদ্বোধন ফলক দেখে বুঝা গেল। লামা নেপালী শব্দ যার অর্থ বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং হাট্টা অর্থ কুঠির বা বাসস্থান। কথিত আছে এক সময় এ এলাকায় অনেক নেপালী বৌদ্ধ ভিক্ষু বসবাস করতো এবং তাদের উদ্যোগে অনেক বৌদ্ধ বিহার ও মনাস্টেরী (গড়হংঃবৎু)স্থাপিত হয়। তখন থেকে এ স্থানের নাম হয় লামাহাট্টা। ৫,৭০০ফুট উপরে অবস্থিত লামাহাট্টা মূলত: এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে জন্য বিখ্যাত। পূর্বে এটি ছিল নিছক একটি পাহাড়ী গ্রাম। একদিন মুখ্য মন্ত্রি এ পথ দিয়ে দার্জিলিং যাচ্ছিলেন । মনকাড়া প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে খানিকটা সময় কাটান এখানে। তখন জায়গাটি মুখ্যমন্ত্রির হৃদয়ে দাগ কাটে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন এখানে একটি ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার স্থাপনের। এলাকাবাসীও সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে। স্বেচ্ছায় শ্রম দেয় জমি দেয় । গড়ে উঠে বিভিন্ন ধরনের রিসোর্ট,হোটেল,রেষ্টুরেন্ট ও পার্ক। তবে এখানকার জীব-বৈচিত্র্য যেন নষ্ঠ না হয় এবং ইকো-ট্যুরিজমের সকল বৈশিষ্ট্য যাতে প্রতিফলিত হয় এবং পরিবেশের যাতে বিন্দুমাত্র ক্ষতি না হয় সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। রাস্তার পাশে স্থাপিত ইকো-পার্কে রয়েছে শত শত পাহাড়ী ও বাহারী ফুল গাছ। নানা রঙের নানা আকারের ও নানা গন্ধের। পাহাড়ী ফুলের বুনো গন্ধে গোটা পরিবেশটাকেই অন্য রকম লাগে। ১০ রুপি দিয়ে আমরা পার্কে প্রবেশ করি। পার্কের ভিতর আঁকাবাঁকা করে অনেকগুলি ওয়াকওয়ে তৈরী করা হয়েছে পর্যটকদের সুবিধার্থে । ওয়াকওয়ের পাশে আছে কাঠ ও বাঁশের তৈরী বেশ কয়েকটি অবকাশ কেন্দ্র। আছে কাঠের তৈরী একটি সুউচ্চ টাওয়ার। ওরা বলে ’মাচান’। ওখানে উঠে কাঞ্চনজংগার বরফের চুড়া, গোটা দাজিলিং শহর ,সিকিমের নামচি এলাকা এবং নীচে বহমান রঙ্গিত নদীর ¯্রােতধারা দেখার অপূর্ব ব্যবস্থা আছে- এমনটাই জানালেন পর্যটনকর্মী রুহা ভুটিয়া নামের ফুটফুটে তরুনীটি। আমরা মাচানে উঠতে না পারলেও উচু অবকাশ কেন্দ্রে বসে প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য উপভোগ করেছি প্রানভরে। পার্কের একপাশে পত পত করে উড়ছে ‘প্রার্থনা পতাকা’র সারি। স্থানীয় লোকদের বিশ^াস পতাকার মধ্যে দিয়ে যে বাতাস বয়ে যাচ্ছে তা এলাকার প্রকৃতি এবং মানুষের মনকে পবিত্র করছে। তবে এমন শান্ত,¯িœগ্ধ ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশ মনকে কলুষ মুক্ত করে এতে কোন সন্দেহ নেই।

এখানকার অধিবাসীরা মূলত: উপজাতি। শেরপা, ইয়ালমু,তামাং,ভুটিয়া এবং ডুকপা উপজাতীয়দের প্রাধান্য রয়েছে। তাদের হাস্যেজ্জ্বল মুখ এবং চেহারার সারল্য যে কাউকেই মুগ্ধ করে। এখানকার আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র এবং প্রাকৃতিক বনভ’মি দার্জিলিংগামী সকল পর্যটককেই নামতে বাধ্য করে। আমরাও তাই গাড়ী থেকে নেমে এর সৌন্দর্য উপভোগ করি। আমাদের মাথার উপর দিয়ে সারি সারি মেঘের দলা উড়ে যায় । চারিদিকে কেবল কেবল মেঘ আর মেঘ। হাত বাড়ালেই প্রকৃতিকে ছোঁয়া যায়। প্রকৃতি যেন সারাক্ষণ করমর্দন করছে জীবজগতের সাথে, এক অনির্বচনীয় মিতালী। এক সপ্নিল পরিবেশ। সুন্দর ইকো-পার্ক মন কেড়ে নেয় সহজেই। আমরা হেটে হেটে পার্কের সৌন্দর্য উপভোগ করি ছবি তুলি। রাস্তার দুই পাশে ধুপি, পাইন,ওক ও নানা রকমের বিশাল উচুঁ গাছপালার বাগান। পর্যটকদের জন্য আছে আপ্যায়নের সুব্যবস্থা। এভারেস্ট হাট নামে একটি চমৎকার রিসোর্ট আছে। রিসোর্টের স্থাপত্য শৈলী দেখার মতো। তাশি শেরপা নামে এক নেপালী পর্বতারোহী ও তার স্ত্রী সুশিলা শেরপা এ রিসোর্ট পরিচালনা করে। অবশ্য জিটিএ(এযড়ৎশযধ ঞবৎরঃড়ৎরধষ অফসরহরংঃৎধঃরড়হ) পরিচালিত হোটেলও আছে। আমরা রাস্তার পাশের ষ্টল থেকে চা/কফি খেয়ে নেই। কিন্তু এখানকার বিখ্যাত ’থোকপা’র(ঞযঁশঢ়ধ) স্বাদ গ্রহন না করেই বিদায় নিতে হলো । পর্যটনকর্মী জানান পার্কের অল্প দূরে পাহাড়ের চুড়ায় আছে এক সুন্দর প্রাকৃতিক লেক। পাহাড় চুড়ায় লেক? তারা জানায় ওটা সাধারন কোন জলাধার নয় পবিত্র লেক। লেকের জলের স্পর্শে মানুষের পাপ মোচন হয়। কিন্তু সময়ের অভাবে পাপ স্খলনের সুযোগ গ্রহন করতে পারিনি। রাস্তার পাশে ঢালুতে নানা রকম দোকানপাট হরেক রকম পণ্য সামগ্রীতে ঠাসা। সস্তায় কেনাকাটার সুযোগ রয়েছে। আমরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে দার্জিলিং এর পথ ধরি। এখান থেকে দার্জিলিং শহরের দূরত্ব ২৩ কলোমিটার।

পাহাড়ী পথ দীর্ঘ সময় অতিক্রম করে পৌছাই ঘোম(এযড়ড়স) শহরে। ঘোম দার্জিলিং হিমালয়ান রেল পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ ষ্টেশন। শুধু ভারত নয় দুনিয়া জুড়ে এর খ্যাতি। এটি উপমহাদেশের সর্বোচ্চ এবং পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম রেল ষ্টেশন। এর উচ্চতা ৭,৪০৭ ফুট। এ ষ্টেশনটি এক সময় বিশে^র দ্বিতীয় উচ্চতম রেল ষ্টেশন ছিল। কিন্তু ২০০৬ সনে চীনে ছরহমুধহম ৎধরষ ংঃধঃরড়হ স্থাপিত হলে এর অবস্থান ৩য় স্থানে নেমে আসে। বর্তমানে দ্বিতীয় উচ্চতম রেল ষ্টেশন হলো সুইজারল্যান্ডের ঔঁহমভৎধঁনধযহ ৎধরষ ংঃধঃরড়হ । ঘোম ট্রয় ট্রেনের জন্যও বিখ্যাত। এখান থেকে টয় ট্রেন ছাড়ে নিয়মিত। দার্জিলিং থেকে এর দূরত্ব ৬কিলোমিটার এবং নেপাল সীমান্তের দূরত্ব মাত্র ১১ কিলোমিটার। ঘোম শহর পশ্চিমবঙ্গ, নেপাল ভুটান ও সিকিমের সাথে সড়ক পথে যুক্ত। এটি একটি সড়ক পথের জংশন শহর। আমরা গাড়ী থেকে নেমে দৃষ্টি নন্দন রেল ষ্টেশনটি ঘুরে ফিরে দেখি। এমন সময় টয় ট্রেন এসে থামে। জীবনে প্রথম টয় ট্রেন দেখি। ট্রেনের কামরা খুব বড় নয়। ন্যারো গেজ রেল পথ দিয়ে চলাচল করে। কয়লার ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেনটি চলে। খুব ধীর গতিতে চলে। গতিবেগ নাকি ঘন্টায় সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটারের বেশী নয়। অনেকটা আমাদের চিটাগাং ইউনিভার্সিটির শাটল ট্রেনের মতো। টয় ট্রেনে চড়ে গোটা দার্জিলিং শহর দেখা যায় । বৃটিশ আমলে নির্মিত ষ্টেশনের আদি রুপটি এখনো অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে। ১৮৮১ সনে উধৎলববষরহম ঐরসধষধুধহ জধরষধিু(উঐজ) চালু করার সময় এই ষ্টেশন নির্মাণ করা হয় । উঐজ ১৯৯৯ সনে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ঘোম ষ্টেশন ও টয় ট্রেন দেখার জন্য প্রতিদিন শত শত পর্যটক দার্জিলিং আসে। ঘোম ষ্টেশনে থেকে একটু সামনে গিয়ে আমাদের গাড়ী বহর আবার থামে । নেমে দেখি রাস্তার পাশে অনেক দোকানপাট। দোকানের ভিতর ও সামনের খোলা জায়গায় নানা রকম শীতের কাপড়ের পশরা সাজিয়ে বসেছেন নেপালী মহিলারা। ওলের তৈরী মাফলার, টুপি,স্যুয়েটার,কার্ডিগান এবং নেপালী চাদর ও শালের প্রাচুর্য দেখে আমরা বিমোহিত। ঢাকার তুলনায় দাম কম এবং গুনেমানে ভালো হওয়ায় সকলেই ইচ্ছেমত কেনাকাটা করে নেয় স্বল্প সময়ে। ট্রেন লাইন এবং সড়ক পথ অনেক ক্ষেত্রেই সমান্তরালভাবে চলে। কোথাও আবার ক্রস করতে হয়েছে।

ঘোম থেকে যাই বাটাশিয়া লুপ ও দার্জিলিং ওয়ার মেমোরিয়্যাল(উবৎলববষরহম ডধৎ গবসড়ৎরধষ) দেখতে। জায়গাটি দার্জিলিং শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে। বাটাশিয়া লুপ তৈরী হয় ১৯১৯ সনে টয় ট্রেনের নিরাপদ চলাচলের সুবিধার্থে। কেননা ঘোম ষ্টেশন থেকে ট্রেন যখন দার্জিলিং শহরের দিকে ধাবিত হয় তখন সেটিকে সরাসরি ১০০০ ফুট নীচে নামতে হয়। ট্রেনের গতি স্বাভাবিক রাখতে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে এ লুপ তৈরী করা হয়। এটি একটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময় হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিদিন প্রচুর মানুষ আসে বাটাশিয়া লুপ দেখতে। এটার অন্যতম আকর্ষন এখানকার দৃষ্টিনন্দন বৃহৎ ফুলের বাগান এবং ওয়ার মেমোরিয়্যাল। এখানেও টয় ট্রেন থামে। আমরা থাকা অবস্থায় একটি ট্রেন এসে থামে। আমরা ট্রেনে উঠে কিছুক্ষণ কাটিয়ে নেমে যাই।

ওয়ার মেমোরিয়্যাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় দার্জিলিং সৈনিক বোর্ড ১৯৭৬ সনে। উদ্বোধন হয় ১৯৯৫ সনে । ১৯৪৭ সনে ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে এ এলাকার যে সকল গুর্খা সৈন্য দেশ মাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে তাদের স্মরণে এই স্মৃতি সৌধটি নির্মিত হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে গুর্খা,পাঞ্জাবী ও শিখদের সামরিক জাতি(গধৎংযধষ জধপব) হিসেবে খ্যাতি দীর্ঘদিনের। বৃটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে গুর্খা রেজিমেন্ট কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখে। দুদুটি বিশ্বযুদ্ধে তারা বীরত্বের পরিচয় দেয়। ফলে বৃটিশ সেনাবাহিনীতে তাদের তাদের গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পায়। স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনীতেও তাদের অবস্থান অতি উচ্চে। আমরা ঘুরে ফিরে স্মৃতি সৌধটি দেখি। এখান থেকে দার্জিলিং শহরটিকেও ভালো করে দেখা যায় । খোলা জায়গায় বেঞ্চ স্থাপন করা আছে দর্শণার্থীদের বসার জন্য। আমরা নান্দনিক দৃশ্যকে ক্যামেরাবন্দি করি। স্মৃতি সৌধটি বাটাশিয়া লুপ গার্ডেনের একেবোরে কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। ৩৭ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৪ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট মূল বেদীটি ওভাল আকৃতির। বেদীর মধ্যস্থলে ৩০ ফুট উচ্চতার গ্র্যানাইট নির্মিত ত্রিকোনাকৃতির একটি সুউচ্চ স্তম্ভ রয়েছে। স্তম্ভের নীচে রুল অব অনার স্থাপন করে ৭৬ জন বীর যোদ্ধার নামাঙ্কিত করা হয়েছে। স্তম্ভের পাশে রাইফেল কাঁধে একজন গুর্খা সৈনিকের দন্ডায়মান স্ট্যাচু রয়েছে। নিজ জাতির বীরদের প্রতি সন্মান দেখানোর এই উদ্যোগ নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে।

ওয়ার মেমোরিয়্যাল থেকে আমরা প্রথমে সোজা চলে যাই গান্ধী রোডে এবং সেখান থেকে নেহরু রোডের মাথায় দার্জিলিং শহরের প্রানকেন্দ্র ‘মল’(গধষষ) এলাকায়। নীচু থেকে পায়ে হেটে বেশ কিছুটা পথ উপরে উঠতে হলো। কেননা ‘মল’ এলাকায় মোটর যানের প্রবেশ বারণ করা আছে। নেহরু রোড, জাকির হুসেন রোড, সি.আর দাশ রোড,ও মল রোড(মল রোডকে অবশ্য বর্তমানে ভানুবখত স্মরণীও বলা হয়) এই চারটি রাস্তার মিলন স্থলে এলাকাটি অবস্থিত বলে এটি চৌরাস্তা নামেও পরিচিত। শুধু মল বা চৌরাস্তা হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে। মূলত: এটি একটি খোলা চত্তর। পাহাড়ের উপর একখন্ড সমতল ভুমি। এটির নির্মাতা দার্জিলিং এলাকার তখনকার রাজকীয় বৃটিশ কর্মকর্তা ও টি প্লান্টারগন। সাহেবরা পরিবার পরিজন নিয়ে এখানে বৈকালিক ভ্রমণ করতেন এবং গোটা দার্জিলিং শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতেন। স্বাস্থ্য সচেতন সাহেবরা প্রাতঃকালীন জগিংয়ের কাজটাও এখানেই সারতেন। বিখ্যাত ইংরেজ লেখক মার্ক টোয়েন(গধৎশ ঞধিরহ) ১৮৯৬ সনে এ এলাকা সফর করে বিমোহিত হন। এখনো নাকি সকাল বেলা প্রচুর স্থানীয় লোক এখানে জগিং করতে আসে। এটাকে শহর মিলন কেন্দ্র বা সামাজিক মিলনকেন্দ্রও বলা যায় । এখানে বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠির স্থানীয় লোকজন ও দেশী-বিদেশী পর্যটকের ভিড় সারাক্ষণই লেগে থাকে। এখানে বসে মানুষ আড্ডা দেয়, গল্প গুজবে মেতে থাকে, নান্দনিক প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করে, ঘন্টার পর ঘন্টা বিশ্রাম করে, চা খায়, ঘোড়ায় চড়ে কিংবা নির্মল বায়ু সেবন করে অলসভাবে সময় কাটায়। এখানকার খোলা জায়গায় ঝাকে ঝাকে কবুতর বসে আছে। পর্যটকরা নানা রকম খাবার ছিটিয়ে দেয় আর ওরা মনের আনন্দে খাবার খায়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কবুতরের খাবার বিক্রি করে। ৫ রুপি দিয়ে ছোলা জাতীয় খাবার কিনে হাতের তালুতে রাখতেই এক ঝাঁক কবুতর আমার হাতে ,কাঁধে, মাথায় বসে পড়ে। নিমিষেই খাবারগুলো খেয়ে উড়ে চলে যায়। জায়গাটি কুলি-মজুর, সাহেব-বিবি, সাদা-কালো দেশী-বিদেশী সকলের জন্য উন্মুক্ত। নেই কোন জাত পাতের বাছ বিচার। এখান থেকে একদিকে চির সবুজ বিস্তৃত পাহাড় চুড়া ও নীচের গভীর উপত্যকা এবং অন্যদিকে বরফাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। অর্থাৎ এর চারদিকই সৌন্দর্যমন্ডিত ও ঐশ^র্যময়। মল এলাকার পাশে এমন কিছু ঐতিহ্যবাহী দোকানপাট,হোটেল রেষ্টুরেন্ট, বাঙলো ও দালানকৌঠা রয়েছে যার বেশ কয়েকটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। নীচের উপত্যকায় অনেক দৃষ্টিনন্দন কটেজ রয়েছে। সৌখিন ও বিত্তশালী লোকেরাই নাকি এসকল কটেজে থাকার সুযোগ পায়। দার্জিলিংকে বা এর সংস্কৃতিকে জানতে হলে এ খোলা চত্তরে সমবেত মানুষের আচার আচরণ ও তাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করলেই সহজে বুঝা যাবে। খোলা চত্তর থেকে নীচের গভীর খাদে কেউ যাতে পড়ে না যায় সেজন্যে রেলিং দিয়ে আটকানো আছে । এখানে অনেক তাগড়া টাট্টু ঘোড়া রয়েছে যা চড়ে বাচ্চারা খুব আনন্দ পায়। তবে অনেক তরুণ/তরুণী এমনকি বয়স্ক পর্যটকরাও ঘোড়ায় চড়ে আনন্দ উপভোগ করে। পেশাদার নেপালী ঘোড়চালকরা এ ধরনের আনন্দদানে খুবই পটু বলে মনে হলো। মলের এক পাশে সুন্দর সন্দর বৃহৎ পাইন গাছ দাঁড়িয়ে আছে মাথা উচুঁ করে । যেন আকাশ ছুঁতে চায়। তবে গাছগুলি ছায়া বৃক্ষ(ঝযধফড় ঞৎবব) হিসেবেও কাজ করে। অন্য পাশে রয়েছে অনেক ঐতিহ্যবাহী দোকানপাট,আবাসিক হোটেল ও শপিং সেন্টার। মলের এক জায়গায় একটি সুন্দর ঝর্ণাধারা বা ফোয়ারা রয়েছে যা লোহার পাতদিয়ে ঘেরা। সেটিও বাচ্চাদের জন্য বেশ আনন্দদায়ক বটে। অন্যপাশে একটি পুলিশ বুথ যা নাকি দিবারাত্রি ২৪ ঘন্টাই খোলা থাকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় এবং পর্যটকদের সাহায্য করার জন্যে। পুলিশ বুথ আরেকটি কল্যাণমূলক কাজ করে থাকে যা দেখে মনে হলো দার্জিলিং এর পুলিশ সত্যিই মানুষের বন্ধু। সেটি হলো পুলিশ বুথের মধ্যে একটি বড় বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্থাপন করা আছে জনসাধারনের তেষ্ঠা মিটানোর জন্য। প্রচুর মানুষ এখান থেকে তৃষ্ণা নিবারণ করে।

মলের উত্তর পাশে বেশ কিছু বেঞ্চ স্থাপন করা আছে যাতে পর্যটকরা সেখানে বসে কাঙ্খিত কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পায়। কিছু বেঞ্চ আবার সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য সংরক্ষিত। দেখে ভালো লাগলো যে কম বয়সী কেউ সেখানটায় বসছেনা। সকলেই আইন বা প্রচলিত শিষ্টাচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। উত্তর পাশটা পুরোটাই খোলা থাকায় দূর পাহাড়ের সীমানায় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। তবে সকলের সে সৌভাগ্য হয়না। আমাদেরও হয়নি। যা দেখেছি তা কেবল অস্পষ্ট বরফের স্তুপ। একদম রোদেলা আকাশ না হলে তা স্পষ্ট দেখা যায়না। তবে সান্তনা পেয়েছি এই কথা শুনে যে অনেক বিখ্যাত ব্যাক্তিও নাকি একাধিকবার দার্জিলিং ভ্রমণ করে অধরা কাঞ্চনজঙ্ঘার রুপ দেখার সুযোগ পাননি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছয়বার এসেও নাকি সে সুযোগ পাননি। দার্জিলিং শহরের আবহাওয়ার কোন স্থিরতা নেই। এই রোদ এই বৃষ্টি ধাচের। আমরা মল এলাকায় অবস্থানকালে বেশ কয়েকবার বৃষ্টি হয়েছে । কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই আবার থেমে যায়। অনেকটা আমাদের গ্রাম এলাকার ‘ছাগল দৌড়ের বৃষ্টি’র মতো।

আমরা মল এলাকা থেকে খানিকটা দূরে রঙ্গমঞ্চের পাশের সড়কে নির্ধারিত স্থানে গাড়ী রেখে শহর দেখতে বের হই। উদ্দেশ্য শহর দেখা এবং সাথে কেনাকাটা দুটোই । সময় কম বলে সব কিছু দ্রুত করার প্রবনতা ছিল সকলের। তাছাড়া গাইডও সময় বেঁেধ দেয়। ফলে অনেক কিছু দেখতে হয়েছে অনেকটা ইরৎফং ঊুব ঠরবি আদলে । শহরটি বেশ পুরনো। বৃটিশ শাসক ও টি প্লান্টারগন এ শহরের নির্মাতা। দালান কোঠায় বৃটিশ-ভারতীয় স্থাপত্য রীতির ছাপ লক্ষ্য করি। রাস্তা ঘাট খুব প্রশস্ত নয়। অবশ্য অধিকাংশ পাহাড়ী শহরেই রাস্তাঘাট সরু থাকে সঙ্গত কারনেই। চত্তর থেকে নেমে নেহেরু রোড ধরে সামনে যেতেই দুপাশে অসংখ্য শপিং সেন্টার ও দোকানপাট পেয়ে যাই। নানা রকম পণ্যে দোকানপাট একেবারে ঠাঁসা। ওলের তৈরী নেপালী শাল,চাদর,সোয়েটার,টি শার্ট,মাফলার,ক্যাপ ইত্যাদি কিনে সকলেই যার যার পছন্দ মতো। কেউ কেউ শাড়ী, থ্রিপিস, জুতা ইত্যাদিও কিনে। দাম বাংলাদেশের তুলনায় কম। দোকানীরা দেখলাম বাঙলা,ইংরেজী,হিন্দি,নেপালী ভাষায় খুবই পারঙ্গম। ক্রেতাদের প্রতি বেশ মনোযোগী । মালামালের গুনাগুন বর্ণনায় মহিলা বিক্রেতারা খুবই চোস্ত। তাদের নিকট ক্রেতাকে হার মানতেই হয়। পণ্য না কিনে বের হওয়ার যেন সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে নেপালী ললনাদের দক্ষতা পুরুষদের তুলনায় বেশী মনে হয়েছে। তবে তাদের ব্যবহার মার্জিত।

চৌরাস্তার কাছেই একটি বৃহৎ লাইব্রেরী, নাম ঙীভড়ৎফ ইড়ড়শ ধহফ ঝঃধঃরড়হবৎু ঈড়.। পাহাড়ী স্থাপত্য রীতিতে তৈরী দ্বিতল বিল্ডিং। পিচ ঢালাই ছাদ। প্রায় পৌনে এক শতাব্দী পুরোনো এ লাইব্রেরীটি দার্জিলিং শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান । এ এলাকায় জ্ঞান চর্চায় অসামান্য ভ’মিকা পালন করে যাচ্ছে সেই বৃটিশ আমল থেকে। উৎসাহী হয়ে ভিতরে গিয়ে দেখি দেশী-বিদেশী বই পত্রে ঠাঁসা। এলাকার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইংলিশ মিডিয়াম হওয়ার কারনে বইপত্রের অধিকাংশই ইংরেজী ভাষার। তবে কিছু বই পত্র হিন্দি, নেপালী এবং বাঙলা ভাষারও আছে। বই ক্রেতার যথেষ্ঠ ভিড় লক্ষ্য করি। লাইব্রেরীটি দার্জিলিং অঞ্চলের বইপ্রেমী এবং মননশীল পাঠকদের মনোযোগের কেন্দ্রভ’মি হিসেবে খ্যাত। পর্যটন এবং হিমালয়ান অঞ্চলের বিশেষ করে নেপাল, ভুটান, দার্জিলিং ,সিকিম এবং তিব্বতের ইতিহাস, জনবসতি, সভ্যতা, সংস্কৃতি, যুদ্ধ বিঘ্রহ ও সমাজ সম্পর্কে প্রকাশিত অসংখ্য বই রয়েছে এখানে। এতদাঞ্চলের ভৌগলিক ইতিহাসের উপরও যথেষ্ট বইপত্র আছে জানালেন ফ্রন্ট ডেস্কে বসা মি. রোহিত গুরং। গৎং.গধুধ চৎরসষধহর নামে এক বিদগ্ধ নেপালী ভদ্র মহিলা এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। তবে তিনি তখন ছিলেননা। আমি মি. রোহিতের সাথেই কিছুক্ষণ কথা বলি।

মল এলাকায় দার্জিলিং শহরের আরেকটি প্রাচীণ ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হলো ঐধনরন গঁষষরশ ধহফ ইৎড়ঃযবৎং। ১৮৯০ সন থেকে তারা এখানে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এখানে মূল্যবান এ্যান্টিকস সামগ্রি বিক্রয় হয়। সৌখিন পর্যটক বিশেষ করে ইউরোপীয় পর্যটকরা এ্যান্টিকস এর সমজদার ক্রেতা জানালেন বিক্রেতা শাহনেওয়াজ খান । তাছাড়া সোনা,রুপা ও বিভিন্ন ধাতুর তৈরী ট্র্যাডিশনাল জিনিসপত্রও বিক্রয় হয় প্রচুর।
ঙীভড়ৎফ ইড়ড়শ ঝঃড়ৎব এর পাশেই রয়েছে কয়েকটি বিখ্যাত টি ষ্টল। তারমধ্যে ঘধঃযসঁষষ’ং ঞবধ ঝঃড়ৎব, ঘধঃযসঁষষ’ং ঝঁহংবঃ খড়ঁহমব এবং এড়ষফবহ ঞরঢ়ং ঞবধ খড়ঁহমব প্রভৃতিতে হরেক রকম দার্জিলিং টি’র স্বাদ নেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। দার্জিলিং বেড়াতে এসে বিখ্যাত দার্জিলিং ব্ল্যাক টি’র এর স্বাদ গ্রহন করতে না পারলে জীবনই নাকি বৃথা! আবার পাশেই আছে একটি বিখ্যাত শপ খরভব ্ খবধভ যেখানে অর্গানিক টি ও মধু বিক্রি হয়। এগুলি স্থানীয় কৃষকরা উৎপন্ন করে। বিদেশী পর্যটকরা এগুলো কিনে দেদারসে। দার্জিলিং টি’র স্বাদ গ্রহন করতে আমরাও ঘধঃযসঁষষ’ং ঝঁহংবঃ ঞবধ খড়ঁহমব এ ঢুকি। এখানে এক কাপ দার্জিলিং ব্লাক টি’র দাম ২৫ রুপি। খুব বেশী বলা যাবেনা। অবশ্য এটি ছিল সর্বনি¤œ মূল্যের। উন্নত মানের এক চায়ের দাম ২০০ রুপি পর্যন্ত জানালেন টি বয় তেজবাহাদুর। এটা সর্বজন বিদিত যে দার্জিলিং এর ব্ল্যাক টি(ইষধপশ ঞবধ) পৃথিবীর সেরা ও জনপ্রিয় চা হিসেবে স্বীকৃত। পৃথিবীর অন্য কোথাও এ চা উৎপন্ন হয়না। এর কদর দুনিয়া ব্যাপী। কাপ তো নয় স্বচ্চ গ্লাস। গ্লাসে চায়ের রঙ দেখেই মন ভরে যায়। স্বাদে গন্ধে সত্যিই অতুলনীয়। খুব তৃপ্তি পাই চা পান করে। ব্লাক টি এবং গ্রীন টি’র কথাই আগে জানা ছিল। কিন্তু এখানে এসে জানলাম হরেক রকমের চায়ের কথা। ব্লাক টি, গ্রীন টি, ইয়েলো টি, হুয়াইট টি,আইস টি, হারবাল টি,লেমন টি,মিল্ক টি, স্পাইস টিসহ আরো কতো নাম। ঝঁহংবঃ খড়ঁহমব নাম কেন হলো জানতে চাই ম্যানেজার বাবুর কাছে। তিনি বলেন উত্তর খুব সহজ। পড়ন্ত বিকেলে এ লাউঞ্জ থেকে দূর পাহাড়ে অস্তগামী সূর্যের লালাভ আভা দেখার বিরল সুযোগ পায় চা পিপাসীরা। ফলে ঐ সময় প্রচুর লোক এখানে আসে চা পান করতে। এখান থেকে সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায় বলে এমন নাম রাখা হয়েছে। লাউঞ্জের শেষ প্রান্তে জানালার পাশে বেতের চেয়ার ও কাচের টেবিলে দার্জিলিং টি এর স্বচ্চ কাপ সামনে রেখে বসলে এমনিতেই মন ভালো হয়ে যায়। মৃদুলয়ে নেপালী সঙ্গীতের মূর্চনায় এক অনির্বচনীয় পরিবেশ তৈরী হয়। তাছাড়া উনুনে কিভাবে নেপালী ও ভুটিয়া মহিলারা চা তৈরী করছে তাও দেখা যায়। নামের কারনে অনেকে ভাবতে পারে কেবল সন্ধ্যার সময় বুঝি এটি খোলা থাকে। না সকাল ৮.০০টা থেকে রাত ৮.০০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। দার্জিলিং শহরের মানুষ নাকি অনেকটা সন্ধ্যা রাতেই ঘুমিয়ে যায় কিন্তু উঠে বেশ দেরী করে। আলস্য নাকি আয়েশীপনা ?

চা পানের পাশাপাশি প্যাকেটজাত ও কৌটাজাত চা বিক্রির ব্যবস্থাও আছে পাশের ঘধঃযসঁষষ’ং ঞবধ ঝঃড়ৎব এ। এ যেন রকমারী চায়ের ভান্ডার । ৫০ রকমের দার্জিলিং টি বিক্রি হয় এ দোকানে। দাম প্রতি কেজি ৩৫০ রুপি থেকে ৩০ হাজার রুপি পর্যন্ত! শুনে তো চোখ ছানা বড়া। ৩০ হাজার রুপি এক কেজি চায়ের দাম! তবে এধরনের চায়ের স্বাদ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদেশীরাই গ্রহন করে। চা পিয়াসী সৌখিন ও বিত্তবান বিদেশী পর্যটকরা দামী চা এখান থেকেই কিনে থাকে। প্যাকেটজাত চায়ের বিভিন্ন কৌটা ওয়াল কেবিনেটে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তাছাড়া বড় বড় জারে বিভিন্ন জাতের খোলা চা রাখা হয়েছে। জারগুলো স্বচ্চ হওয়ায় বাহির থেকে ভিতরে রাখা চা পাতা খুব সুন্দর দেখায়। ক্রেতারা ইচ্ছে করলে গুনাগুন পরীক্ষা করতে পারে, ঘ্রান নিতে পারে। এ জন্যে কর্মীরা সদা প্রস্তুত। সঙ্গীদের অনেকেই বিভিন্ন জাতের চা কিনে অল্প বিস্তর। কৌটায় ভরা খুব উন্নত জাতের চায়ের দাম অবশ্য আমাদের নাগালের বাহিরে ছিল। কেবল রেক্টর মহোদয় কয়েক কৌটা কিনলেন। চা পাতা বিক্রির সাথে সাথে স্থানীয়ভাবে তৈরী চা পানের আকর্ষনীয় আনুসাঙ্গিক সামগ্রী যেমন টি-পট,কাপ,গ্লাস,ছাকনী, চামুচ,চা গরম রাখার ঢাকনাও বিক্রি করা হয় এখানে। মেটালিক ও সিরামিকের তৈরী এসকল পণ্য দেখার মত। এগুলো কাঁেচর কেবিনেটে নান্দনিকভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। উন্নত চা পান করতে হলে কাপও সে রকম হওয়া চাই। এগুলি শোপিচ হিসেবেও রাখার মতো। কেউ কেউ কিনলেন বেশ কয়েকটি। আবার বেশী পরিমান দামী চা কিনলে দামী টি-পট গিফট হিসেবেও দেয়। তো ঘধঃযসঁষষ’ং ঞবধ ঝঃড়ৎব এর যাত্রা ১৯৩১ সনে। এর আদি দোকান খধফবহ-খধ জড়ধফ এর মাথায়। শৈলেস কুমার সারদা বর্তমান কর্ণধার। এটি তাদের পৈত্রিক ব্যবসা। এর সাথে তাদের পারিবারিক সুনাম শুধু নয় গোটা দার্জিলিং টি’র সুনাম জড়িত। এজন্যে মান রক্ষায় তারা খুব সচেতন জানালেন বড় চেয়ারে বসা ম্যানেজার গোচের বাবুটি।

মল এলাকায় আরেকটি বিখ্যাত রেষ্টুরেন্ট হলো এষবহধৎু’ং জবংঃধঁৎধহঃ । বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত শতবর্ষী এ রেষ্টুরেন্টটি বর্তমানে হেরিটেজ রেষ্টুরেন্টের মর্যাদা প্রাপ্ত। তখন বিলেতি সাহেবরাই ছিলেন মূল খদ্দের। বড়লোকদের রেস্টুরেন্ট হিসেবে পরিচিত ছিল এবং এখনো সে ঐতিহ্য বহাল আছে। বিদেশী পর্যটকদের নিকট এটি খুবই আকর্ষনীয় । এখানে তৈরী কেক, পেষ্ট্রি ও অন্যান্য বেকারীজাত পণ্য বিত্তবান ট্যুরিষ্টদের নিকট খুবই জনপ্রিয়। এটির গ্রাউন্ড ফ্লোরে বেকারী এবং ক্যাফে আর প্রথম ফ্লোরে রেষ্টুরেন্ট। ভিতরে ঢুকে দেখলাম প্রচুর বিদেশী পর্যটক খাবার নিয়ে ব্যস্ত। অনেকেই বসার জায়গা পাচ্ছেনা। কর্মচারীরা সদা ব্যস্ত ক্রেতাদের মনোরঞ্জনে। আমরা অবশ্য খেতে যাইনি। ঐতিহ্যবাহী রেষ্টুরেন্টটি শুধু দেখতে গিয়েছিলাম। বৃটিশ স্থাপত্য রীতিতে তৈরী বিল্ডিংটি এর আভিজাত্য অদ্যাবধি ধরে রেখেছে। বুক-লেট দেখে জানা যায় এ রেষ্টুরেন্টের মালিকানা এবং ব্যবস্থাপনায় হাত বদল হয়েছে অনেকবার। কিন্তু খাবারের মান কখনো নীচে নামেনি। মূল মালিক ছিল একজন ইতালিয়ান নাগরিক। তিনি নিজ নামে রেষ্টুরেন্টের নাম রাখেন ভাদো(ঠধফড়),তারপর নাম হয় প্লিভা(চষরাধ)। ভারতের স্বাধীনতার পর পাটনা ভিত্তিক একটি ব্যবসায়ী পরিবার এটি কিনে নেন এবং পরিচালনার ভার দেন এক অভিজ্ঞ আর্মেনিয়ান ব্যবস্থাপকের হাতে। ১৯৫৯ সনে দার্জিলিং শহরের স্থানীয় বাসিন্দা গৎ.অ.ঞ.ঊফধিৎফং নামে একজন লোক এটি ক্রয় করেন যিনি ১৯৪৫ সন থেকে এ রেষ্টুরেন্টের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি রেষ্টুরেন্টের নাম দেন এষবহধৎু’ং জবংঃধঁৎধহঃ।তারপর অ.ঞ.ঊফধিৎফং এর পুত্র ঔ.ই.ঊফধিৎফং এর হাত বদল হয়ে এখন পরিচালনায় আছেন পৌত্র অলড়ু ঊফধিৎফং । মি. অজয় কিছু নতুন আইটেম সংযোজন করে এর পরিসর বাড়িয়েছেন। কফি শপ, পাব(ঢ়ঁন),বাজ(নধুু) ইত্যাদি সংযোজন করে এর শ্রী বৃদ্ধি করেছেন বলে বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনাও বৃদ্ধি পেয়েছে যথেষ্ট মাত্রায় । গ্লেনারীর বেকারী সামগ্রী এখনো দার্জিলিং শহরের নামী দামী হোটেল যেমন রিহফধসবৎব,গড়ঁহঃ ঊাবৎবংঃ, ঙনবৎড়র, ইবষষবাঁব প্রভৃতিতে সরবরাহ করা হয়। সান্ধ্যকালীন নৃত্য ও মৃদু সঙ্গীতের মূর্চণায় ভোজন রশিকদের রসনা বিলাসের সাথে সাথে চিত্তেরও খোড়াক জোগায়।

মল এলাকার পাশে একটি বিখ্যাত আবাসিক হোটেল হলো ঐড়ঃবষ ইবষষবাঁব। তাছাড়া বৃটিশ স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত পাহাড়ের উপর বিখ্যাত হেরিটেজ হোটেল রিহফধসবৎব ও দেখার মতো স্থাপনা। বৃটিশ আমলে নির্মিত এই পাঁচ তারকা হোটেলে মূলতঃ বৃটিশ টি প্লান্টারগনই থাকতেন। এখনো নাকি অধিকাংশ বোর্ডার বিদেশী পর্যটকরাই। আমরা নীচে দাঁিড়য়ে এর নান্দনিক সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। মল এলাকা থেকে একটু নীচের দিকে গেলেই চৌরাস্তার মাথায় আরেকটি দর্শণীয় স্থান হলো ভানু ভবন বা ভানুভক্ত আচারিয়া রঙ্গমঞ্চ। এটি গোর্খা রঙ্গ মঞ্চ ভবন নামেও পরিচিত। এটি মূলত: একটি অডিটরিয়াম। সাদা রঙের ভবনটির উপরের সামনের অংশে একটি সোনালী গম্বুজ । গম্বুজের শীর্ষে ঐতিহ্যবাহী নেপালী ছোরা হাতে একটি মনুষ্য মূর্তি দন্ডায়মান। এটি ভানুভক্ত আচারিয়ার ভাস্কর্য। এখানে নানা রকম অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অডিটরিয়ামটি দার্জিলিং শহরের শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার প্রানকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। নেপালী ভাষার প্রধানতম কবি ভানুবখত আচারিয়ার সন্মানে এর নামকরণ করা হয়েছে। তার জন্মদিবস উদযাপনের সময় নাকি এখানে সপ্তাহ ব্যাপী মেলা বসে। কবি ভানুবখত দার্জিলিং এলাকার নেপালীদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। তিনি মহাকাব্য রামায়ন সংস্কৃত ভাষা থেকে নেপালী ভাষার অনুবাদ করেছিলেন। তার জন্ম ১৮১৪ সনে নেপালের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে। তিনি আনুষ্ঠানিক কোন প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া না করেও সংস্কৃত ও নেপালী ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনিই প্রথম ব্যাক্তি যিনি সংস্কৃতের পরিবর্তে নেপালী ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেন। তাকে আধুনিক নেপালী ভাষা ও সাহিত্যের জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নেপালী ভাষার উৎকর্ষ সাধন সে ভাষায় কাব্য চর্চায় অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরুপ তাকে ’আদি কবি’ খেতাব দেওয়া হয়েছে। দার্জিলিং, কালিম্পং,ডুয়ার্স ও কার্সিয়াং এলাকায় তার জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী সারম্বরে উদযাপন করা হয়। রঙ্গমঞ্চের পাশেই তার আরেকটি পিতলের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। এক সময় রাজ রোষে পড়ে কবিকে দীর্ঘদিন কারাভোগ করতে হয় । নিজের মুক্তির জন্য রাজ আমাত্য বরাবরে জেলখানা থেকে কাব্যিক ভাষায় তিনি যে চিঠি লিখেছিলেন পরবর্তীকালে তা এক অমর কাব্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবে অন্য অনেকের মতো জীবদ্দশায় তিনি বা তার সৃষ্টিকর্ম কোন খ্যাতি বা স্বীকৃতি পায়নি। ১৮৬৮ সনে তিনি পরলোক গমন করেন। দার্জিলিং এর নেপালী ভাষাভাষীদের নিকট তিনিই তাদের জাতীয় কবি। সকল প্রেরণার উৎস। আমরা রঙ্গ মঞ্চের ভিতরে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সংস্কার কাজ চলমান থাকায় প্রবেশ দ্বার থেকেই এর নান্দনিক সৌন্দর্য উপভোগ ক তে হয়। এর নানা প্রাসঙ্গিক তথ্য রিসিপশনে বসে থাকা কর্মকর্তার কাছ থেকেই জেনে নিই। রঙ্গ মঞ্চের বিপরীত দিকে উচুঁ পাহাড়ে সেন্ট. এ্যান্ড্রুজ চার্চ(ঝঃ. অহফৎব’িং ঈযঁৎপয) এবং দার্জিলিং জিমখানা ক্লাব বিল্ডিংও দেখার মতো। সরু পাহাড়ী পথটিও বেশ সুন্দর। মল এলাকা থেকে সামান্য দূরেই রয়েছে রাজ ভবন বা সামার প্যালেস যেখানে একসময় বাঙলার বড় লাট(এড়াবৎহড়ৎ এবহবৎধষ) বাস করতেন। গ্রীস্মকালে কলিকাতা শহরে প্রচন্ড গরম পড়তো। বিলেতি বড় লাট সে গরম সহ্য করতে না পেরে দার্জিলিং শহরে ছুটে আসতেন শীতল আবহাওয়ায় অবকাশ যাপনের জন্য। সরকারী কাজ কর্ম করতেস এখানে বসেই। অনেক বিত্তবান ও প্রভাবশালী ব্যাক্তিরাও এখানে বাড়ী তৈরী করে বসবাস করতেন । নিরাপত্তাজনিত কারনে লাঠ ভবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ায় আমরা কেবল কারুকার্য খচিত সুবিশাল সিংহ দরজা দেখেই তৃপ্তি পেয়েছি। এক সময় এ ভবনের মালিক নাকি ছিলেন কুচবিহারের মহারাজা। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল গ্রীস্মকালে এখানে বসবাস করেন।
রঙ্গমঞ্চ থেকে একটু নীচের দিকে যেতেই একটি সুন্দর ভবনের দেয়ালে উবংযনধহফযঁ গঁংবঁস লেখা দেখে চমকিত হই। আবার রাস্তার নামও সিআর দাশ রোড। ভবনের আদি নাম স্টেপ এ্যাসাইড(ঝঞঊচ অঝওউঊ) ভবন। ভবনের মূল মালিক ছিলেন গৎ.ডধৎহংবর নামে এক স্কটিশ ভদ্রলোক। তার নিকট থেকে ক্রয় করেন কলিকাতার অধিবাসী ঝরৎ ঘ.ঘ. ঝরৎপধৎ। তিনি ছিলেন বিখ্যাত বাঙ্গালী রাজনীতিবিদ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সময়টা ১৯২৫ সালের জানুয়ারী মাস। দেশবন্ধুর শরীরটা ভালো যাচ্ছিলনা। মে মাসের দিকে তিনি স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য দার্জিলিং যাত্রা করেন। সঙ্গে স্ত্রী ও কণ্যা। মে মাসের ১৬ তারিখে পৌছলেন শৈল শহর দার্জিলিং । উঠলেন বন্ধুর বাড়ী ঝঞঊচ অঝওউঊ হাউজে। বন্ধু এন.এন.সরকার তার প্রতিনিধি অনুপলাল গোস্বামীকে সবকিছু ঠিকঠাক করে রাখার জন্য আগেই নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিলেন এবং দেশবন্ধুকে দেখাশুনার দায়িত্ব তার উপরেই অর্পিত হয়। দার্জিলিং শহরের চমৎকার আবহাওয়ায় দেশবন্ধু দ্রত সেরে উঠছিলেন। স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ায় পাহাড়েরর আকাঁবাঁকা পথে রোজ সকাল সন্ধ্যা হেটে বেড়িয়ে তিনি বেশ পুলকিত হন। এরিমধ্যে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু হয়ে যায়। তিনি তখন স্বরাজ পার্টির কর্ণধার। আবার কংগ্রেসের সাথেও সম্পর্ক গভীর। লক্ষ্য একটাই ভারতের স্বাধীনতা অর্জন। ইতিমধ্যে বিখ্যাত সমাজকর্মী ও নারী আন্দোলনের নেত্রী অহহরব ইবংধহঃ চলে এলেন দার্জিলিং শহরে দেশবন্ধুর সাথে দেখা করতে। লেবার পার্টি কর্তৃক বৃটিশ পার্লামেন্টে উত্থাপিত একটি গুরুত্বপুর্ন বিল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন দেশবন্ধুর সাথে। তারপর জুন মাসের প্রথমদিকে আসেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। উঠলেন ঝঞঊচ অঝওউঊ হাউজেই দেশবন্ধুর অতিথি হয়ে। থাকলেন প্রায় সপ্তাহখানেক । দেশবন্ধুর আতিথেয়তার মুগ্ধ হলেন গান্ধীজী। রাজনৈতিক আন্দোলনের ভবিষ্যত কর্মপন্থা ও কৌশল নিয়ে দুই নেতা দীর্ঘ আলোচনা করেন। দার্জিলিং এর মোহনীয় ও কোলাহল মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে দুনেতার মধ্যে ঘনিষ্টতা আরো বৃদ্ধি পায়। পূর্বের অনেক মতভিন্নতার অবসান ঘটে। পরস্পরের জানাশুনা আরো গভীর হয়। দেশবন্ধু গান্ধীজীর নিকট থেকে চরকা(ঝঢ়রহরহম) শিখেন ভালোমতো। মুগ্ধচিত্তে গান্ধীজী ফিরে গেলেন কোলকাতায়। পরে অনেকবার স্মৃতিকাতর হয়ে গান্ধীজী ঝঞঊচ অঝওউঊ ভবনে দেশবন্ধুর সাথে সময়কাটানোর স্মৃতিচারণ করেছেন। কিভাবে দেশবন্ধুর দিলখোলা হাসিতে বাসগৃহটির পরিবেশ আনন্দময় হয়ে উঠতো তার চমৎকার বর্ননা দিয়েছেন। বর্ননা দিয়েছেন তাঁর আন্তরিক আতিথিয়েতার। গান্ধীজীর ভাষায় ‘ উবংযনধহফযঁ ধিং ধং শরহফ ধং যব ধিং হড়নষব.ঐড়ংঢ়রঃধষরঃু ধিং ঃযব নধফমব ড়ভ যরং পষধহ. ও ৎবধষরুবফ ঃযরং ভঁষষু রহ উধৎলববষরহম.”

এদিকে দার্জিলিং শহরের মনমাতানো আবহাওয়ায় দেশবন্ধুর শরীর ও মন অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠে। তিনি মনে মনে দার্জিলিং শহরকে ভালোবেসে ফেলেন। সিদ্ধান্ত নেন কোলকাতার ব্যস্ত রাজনৈতিক ও ওকালতির জীবন থেকে দূরে সরে মাঝে মধ্যেই খানিকটা সময় এখানে কাটাবেন। তবে বারে বারে অন্যের অতিথি হওয়া বিসদৃশ। মনস্থ করলেন এ শহরে একটি বাড়ী কিনবেন। ঘনিষ্টদের জানালেন তার অভিপ্রায়। শুরু হলো বাড়ী খোঁজা। পেয়েও গেলেন মনের মতো একটি বাড়ী। শহরের অকল্যান্ড রোডে। হাউজের নাম কধঃযষববহ ঈড়ঃ । বাড়ীটি দেশবন্ধুর বেশ পছন্দ হলো। দরদাম চ’ড়ান্ত হলো। কিন্তু গধহ ঢ়ৎড়ঢ়ড়ংবং এড়ফ ফরংঢ়ড়ংবং প্রবাদ বাক্যটি যেন তাঁর জীবনে অক্ষরে অক্ষরে সত্যে প্রমানীত হলো। ১৪ জুন তারিখে তিনি হঠাৎ অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। ১৬ জুন ১৯২৫ সন তারিখ বিকেল ৫.৩০টায় ঝঞঊচ অঝওউঊ ভবনের দুতলার শয়ন কক্ষে বঙ্গ ও ভারতবাসীকে কাঁদিয়ে দেশবন্ধু চিরবিদায় গ্রহন করেন। ভারতের স্বাধীনতার স্বাপ্নিক স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি। গান্ধীজী ছিলেন খুলনায়। আসাম সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। খবর পেয়ে কেঁদে ফেলেন। আসাম যাত্রা বাতিল করে দেশবন্ধুর অন্তষ্টিক্রিয়ায় অংশ গ্রহনের জন্য কোলকাতায় রওয়ানা দেন। শোক বার্তায় বললেন ” …. ওহফরধ যধং ষড়ংঃ ধ লবষি নঁঃ বি সঁংঃ ৎবমধরহ রঃ নু মধরহরহম ংধিৎধল”

পরে দেশবন্ধুর স্মৃতি বিজরিত এ ভবনটির মালিক হন স্যার এন.এন. সরকারের এর পুত্র শ্রীযুক্ত জ.ঘ. ঝরৎপধৎ । অত্যন্ত অমায়িক ভদ্রলোক ছিলেন তিনি । ১৯৫২ সনে স্মৃতি বিজরিত ঝঞঊচ অঝওউঊ ভবনে দেশবন্ধুর স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য গঠন করা হয় উবংযনধহফযঁ গবসড়ৎরধষ ঝড়পরবঃু,সভাপতি হন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল(এড়াবৎহড়ৎ) হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি। অনেক বড়মাপের রাজনীতিবিদ এবং ব্যারিষ্টার হওয়া সত্বেও সিআর দাশ অত্যন্ত সাধারন জীবন যাপন করতেন। গরীব ও অবহেলিত মানুষের তিনি ছিলেন অকৃত্রিম বন্ধু। সাধারন মানুষের কল্যাণেই জীবন উৎসর্গ করেছেন। ভারতবাসীর হিত সাধনই ছিল তাঁর জীবনের পরম লক্ষ্য। এজন্যেই তিনি খেতাব পেয়েছিলেন ‘দেশবন্ধু’। সুতরাং তাঁর জীবন দর্শন ও আদর্শ প্রচার এবং সে মোতাবেক কাজ করার জন্যই গঠন করা হয় স্মৃতি সংস্থাটি। সুহৃদ শ্রীযুক্ত জ.ঘ. ঝরৎপধৎ মহাশয় দানপত্রমূলে বাড়ীটি রেজিষ্ট্রি করে দিলেন উবংযনধহফযঁ গবসড়ৎরধষ ঝড়পরবঃু এর অনুকুলে। দুতলায় যে কক্ষে দেশবন্ধু শয়ন করতেন সেখানে স্থাপন করা হয় মিউজিয়াম। তাঁর ব্যবহার্য দ্রব্যাদি, আলোকচিত্র এবং আসবাবপত্র এখানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। মিউজিয়ামের একজন বাঙ্গালী কর্মী অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন এবং অকথিত ইতিহাস বর্ননা করেন সাবলিলভাবে। নীচতলায় স্থাপন করা হয়েছে উবংযনধহফযঁ গধঃবৎহরঃু ঈষরহরপ ধহফ ঈযরষফ বিষভধৎব ঈবহঃৎব” । এখানে প্রতিদিন গরীব নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয় । মনে মনে ভাবলাম সত্যিই দেশবন্ধুর আত্মা শান্তি পাবে। তাঁর নামাঙ্কিত বাঙলা ভাষায় লেখা একটি নেমপ্লেট সাটানো রয়েছে গেটের এক পাশে । তাছাড়া ভবনের পাশের রাস্তাটির নামকরণ করা হয়েছে ঈ.জ. উধংয জড়ধফ হিসেবে। একটি ফলকে দেখতে পাই মিউজিয়ামটি উদ্বোধন করেন কোলকাতা হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মঞ্জুলা বসু ২০০৭ সনের নভেম্বর মাসে।

ঝঞঊচ অঝওউঊ ভবনের গল্প এখানেই শেষ নয় । আরেকটি চমকপ্রদ ও শিহরণ জাগানো ঘটনার সাথে এ ভবন জড়িত । সেই কিংবদন্তির কথা হয়তো দুই বঙ্গের সকল বয়স্ক মানুষই জানেন। কিন্তু ঘটনার সুত্রপাত যে এখানেই তা হয়তো অনেকেই জানেনা। ভাওয়াল সন্নাসীর মামলার গল্প এক সময় বাঙলার হাটে ঘাটে শুনা যেতো। ভাওয়ালের রাজ কুমার রামেন্দ্র নারায়ন রায় অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তার স্ত্রী বিভাবতী স্বামীর স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য তাকে নিয়ে শৈল নিবাস দার্জিলিং শহরে গমন করেন । তারা উঠেন এই ঝঞঊচ অঝওউঊ ভবনে। বোধ করি ভবন মালিক এন.এন.সরকার মহাশয়ের সাথে তাদের বন্ধুত্ব থাকতে পারে। দীর্ঘ দিন চিকিৎসার পর সুস্থ্য হয়ে উঠলেও হঠাৎ একদিন প্রচার হলো রাজকুমার মারা গিয়েছেন। মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন রাজকুমারের স্ত্রী বিভাবতী স্বয়ং। তারিখটা ছিল ১৯০৯ সনের ৮ মে। সৎকারের জন্য রাত্রি বেলা মৃতদেহ ঝঞঊচ অঝওউঊ থেকে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় পাহাড়ী এলাকার শ্মশানে । গভীর রাতে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টির মাঝে সৎকারস্থল থেকে হঠাৎ মৃতদেহ উধাও হয়ে যায়। সৎকার কাজে নিয়োজিত লোকেরা ভয়ে পালিয়ে আসে। কিন্তু বিষয়টি তারা গোপন রাখে। রানীকে জানায় যথারীতি দাহ কার্য সম্পন্ন হয়েছে। রানী কিছুদিন পর ভাওয়ালে ফিরে আসেন এবং বিশাল জমিদারীর দায়িত্ব গ্রহন করেন।

এ ঘটনার ১২ বছর পর হঠাৎ একদিন ঢাকা শহরের বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বাকল্যান্ড বাঁধে এক সন্নাসীকে বসে থাকতে দেখা যায় । অনেক প্রবীণ এবং সমসাময়িক লোক তাকে ভাওয়ালের রাজকুমার রামেন্দ্র নারায়ন হিসেবে চিহ্নিত করে এবং অনেক চেষ্টার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ভাওয়াল রাজবাড়ীতে। কিন্তু রানী তা মানতে নারাজ। তিনি তাকে গ্রহন করতে অস্বীকার করেন । তিনি জানান রাজকুমারতো মারা গেছেন এক যুগ আগে। এ লোক মিথ্যেবাদী । সে জমিদারী দখল করতে চায়। কিন্তু রাজবাড়ীর অনেকেই অনেক পরীক্ষা নীরিক্ষা করে বলে তিনিই রাজকুমার রামেন্দ্র নারায়ণ। তারপর শুরু হলো মামলা। মামলা গড়ালো ঢাকা জজকোর্ট থেকে কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত। বঙ্গদেশ ও ভারতবর্ষের সেরা আইনজীবিরা উভয় পক্ষে লড়েন। অবশেষে কলকাতা হাইকোর্ট চুড়ান্তভাবে রায় দেন যে তিনিই মৃত বলে প্রচারিত রাজকুমার রামেন্দ্র নারায়ন রায়। প্রশ্ন উঠে তাহলে ঝঞঊচ অঝওউঊ ভবনে যে ব্যাক্তি সেদিন মারা গিয়েছিলো তিনি কে? বিজ্ঞ আইনজীবিদের জেরা এবং আদালতের অনুসন্ধানে সত্য বেড়িয়ে আসে। রানী বিভাবতি স্বামী রমেন্দ্র কুমারকে পছন্দ করতেননা মোটেও। এমনকি তার সাথে অন্য কারো অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিও প্রচার পেয়েছিল। এক ডাক্তারের সহায়তায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বিষ খাইয়ে তিনি কুমারকে হত্যা করেন। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে? রাজকুমার আসলে মারা যাননি। বিষের তীব্রতার কারনে দীর্ঘ কোমায় চলে গিয়েছিলেন। রানী ভেবেছিলেন পথের কাটা দূর হয়ে গিয়েছে। তাই মৃত্যুর কথা প্রচার করে অচেতন কুমারকে দাহ করার জন্য শ্মশানে পাঠিয়েছিলেন। ভাড়াটে সৎকার কর্মীরা প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টিতে টিকতে না পেরে শবদেহ শ্মশানে রেখেই চলে এসেছিল। পরে বৃষ্টির পানিতে মৃত দেহ ভিজে ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে পায়। পাশ দিয়ে চলে যাওয়া নাগা সন্ন্যাসীরা তাকে নিয়ে গভীর মমতায় সেবা যতœ করে সুস্থ করে তোলেন। দীর্ঘদিন পরে ঢাকায় ফিরে আসেন রাজকুমার অনেকটা সন্নাসীর বেশে। পরে অবশ্য রানী সব স্বীকার করেন। এভাবেই রহস্য উন্মোচিত হয়। এ মামলা ইতিহাসে ‘ভাওয়াল সন্যাসী মামলা’ হিসেবে খ্যাতি পায়। সারা ভারতবর্ষে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ কাহিনী নিয়ে তৈরী হয় অনেক লোকগাথা। রাজকুমারের স্মৃতি রক্ষার্থে ভবনের নীচতলার একটি কক্ষে তার নামে আরেকটি মিউজিয়াম স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে বলে জানালেন কর্মীটি।
দার্জিলিং শহরে আরো একজন বিখ্যাত বাঙ্গালী পরলোক গমন করেছিলেন। তিনি হলেন অবিভক্ত বাঙলার শিক্ষামন্ত্রি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ধনবাড়ীর নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী। তিনি থাকতেন তাঁর নিজ বাসভবন ঊফবহ ঈধংঃষব। ১৯২৯ সনের এপ্রিল মাসে নবাব বাহাদুর উক্ত বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মরদেহ সেখান থেকে নিয়ে এসে ধনবাড়ীতে সমাহিত করা হয়। তিনি ছিলেন প্রজাহিতৈষী ও শিক্ষানুরাগী জমিদার। অবহেলিত পুর্ববঙ্গের শিক্ষা বিস্তারে তিনি অসামান্য অবদান রাখেন। ১৯০৬ সনে তিনি ও নবান সলিমুল্লাহ ঢাকার শাহবাগে মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্স আহবান করেন। নিজ জমিদারী বিক্রি করে বিপুল পরিমান অর্থ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করে যান। শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা পুর্ববঙ্গের অবহেলিত মানুষ কথনো ভুলবেনা।
দার্জিলিং শব্দটি মূলত: তিব্বতি ভাষা থেকে আগত যার অর্থ ’বাজ পড়ার স্থান বা যেখানে বাজ পড়ে’। বহু পূর্বে এলাকাটি কয়েকটি গ্রামের সমষ্টি ছিল। শহর হিসেবে গড়ে তুলার মূল কারিগর বৃটিশ রাজ। ১৯৪৭ সনে ভারতের স্বাধীনতার পূর্বে এলাকাটি বিভিন্ন সময়ে সিকিম,নেপাল, ভুটান ও বৃটিশ রাজ কর্তৃক শাসিত হয়েছে এবং এর মালিকানা নিয়ে অনেক যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছে। বার বার হাত বদল হয়েছে। উনিশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত দার্জিলিং ও এর আশেপাশের পাহাড়ী এলাকা সিকিম রাজ কর্তক শাসিত হতো । অন্যদিকে শিলিগুড়ি ও আশেপাশের সমতল এলাকা(ঞবৎধর ৎবমরড়হ) নেপালের রাজার অধীন ছিল। এ অঞ্চলে লেপচা ও কিরাতি জাতিগোষ্ঠির সংখ্যাধিক্য ছিল। সিকিমের রাজার উপাধী ছিল চোগিয়াল (ঈযড়মুধষ) । চোগিয়ালের সাথে নেপালী গোর্খাদের যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই থাকতো। অষ্টাদশ শতকের শেষ দুই দশকে গোর্খারা সমগ্র দার্জিলিং অঞ্চল দখলে নেয়ার চেষ্টা করে অসংখ্যবার। উনিশ শতকের শুরুতে গোর্খারা অনেকটা সফল হয়। তারা সিকিম রাজকে তাড়িয়ে তিস্তা নদের পূর্ব পাড়ে নিয়ে যায় এবং তেরাই অঞ্চল দখল করে নেয়। অন্যদিকে বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডয়া কোম্পানী গোর্খাদের এই অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে সচেষ্ঠ হয়। ফলে দুপক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। ১৮১৪ সনে এ্যাংলো-গোর্খা যুদ্ধ বাঁধে। যুদ্ধে গোর্খারা পরাজিত হয়ে ১৮১৫ সনে ইংরেজদের সাথে এক চুক্তি করতে বাধ্য হয় । সেটি ঝঁমধঁষর ঞৎবধঃু নামে খ্যাত হয়। চুক্তির শর্ত মোতাবেক সিকিমের কাছ থেকে দখলকৃত সমগ্র অঞ্চল ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে দিয়ে দিতে হয়। ১৮১৭ সনে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এলাকাটি চোগিয়ালকে ফিরিয়ে দেয় এবং তার সার্বভৌমত্তের নিশ্চয়তা প্রদান করে।
১৮২৮সনে একটি বৃটিশ প্রতিনিধি দল নেপাল-সিকিম সীমান্ত পরিদর্শণের সময় দার্জিলিং অবস্থান করে এবং এলাকাটি তাদের খুব পছন্দ হয়। তারা সেখানে বৃটিশ সৈন্যদের জন্য একটি সেনাটরিয়াম(ঝধহধঃড়ৎরঁস) স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। ১৮৩৫ সনে এক চুক্তিবলে চোগিয়ালের কাছ থেকে তারা এলাকাটি লীজ নেয়। বেশ কিছুদিন সম্পর্কের উষ্ণতা থাকলেও এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় । সে প্রেক্ষাপটে ১৮৪৯ সনে চোগিয়াল কোম্পানীর ডাইরেক্টর অৎঃযঁৎ ঈধসঢ়নবষষ এবং উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ঔড়ংবঢ়য উধষঃড়হ ঐড়ড়শবৎ কে বন্দী করে। এতে ইংরেজরা ভীষন ক্ষেপে যায়। দুপক্ষের মধ্যে রণ দামামা বেজে উঠে। কিন্তু অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত কোম্পানীর সৈন্যদলের সাথে সিকিমরাজ টিকতে পারেনি। ১৮৫০ সনে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রায় ১৭০০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল দখল করে নেয়। ১৮৬৪ সনে ভুটানরাজের সাথে সিঞ্চুলা চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে কালিম্পংসহ পাহাড়ী অঞ্চলও ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে চলে যায়। ১৮৬৫ সনে আরেকটি যুদ্ধের ফলে চোগিয়ালকে তার দখলে থাকা অবশিষ্ট অংশটুকু বৃটিশদের হাতে তুলে দিয়ে একটি চুক্তি করতে বাধ্য করে। এভাবে ছলে বলে কলে কৌশলে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সমগ্র দার্জিলিং অঞ্চল নিজ দখলে নিয়ে যায়। ১৮৬৬ সাল নাগাদ ৩২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে দার্জিলিং জেলা বর্তমান রুপ ধারন করে। বর্তমানে দার্জিলিং সদর, কালিম্পং,কার্সিয়াং ও শিলীগুড়ি এই চারটি মহকুমা নিয়ে দার্জিলিং জেলা গঠিত। প্রথম তিনটি মহকুমায় নেপালীরা এবং শিলীগুড়িতে বাঙ্গালীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।

দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্যে এর চমৎকার আবহাওয়ায় আকৃষ্ট হয়ে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এখানে একটি সেনাটরিয়াম(ঝধহধঃড়ৎরঁস),স্বাস্থ্য নিবাস ও সেনা ছাউনী স্থাপন করে। তারপর ইংরেজ চা-কর (ঞবধ ঢ়ষধহঃবৎ)গন বানিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরু করে। তারা এটিকে একটি স্বাস্থ্য নিবাস ও হিল ষ্টেশন হিসেবে গড়ে তুলে। অৎঃযঁৎ ঈধসঢ়নবষষ ছিলেন মূলতঃ কোম্পানীর শৈল্য চিকিৎসক। তিনি সেনা কর্র্মকর্তা জড়নবৎঃ ঘধঢ়রবৎ কে নিয়ে এখানে একটি হিল ষ্টেশন(ঐরষষ ঝঃধঃরড়হ) স্থাপন করেন। ঈধসঢ়নবষষ এর একান্ত চেষ্টায় অঞ্চলটি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যায় এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে জীবিকা ও বসবাসের জন্য লোকজন আসতে থাকে। ১৮৫০ সনেই দার্জিলিং শহরে পৌরসভা(গঁহরপরঢ়ধষরঃু) স্থাপন করা হয়। ১৮৬৪ সনের পর থেকে দার্জিলিং তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির গ্রীস্মকালকালীন রাজধানী হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। শুধু রাজকর্মচারী নয় অন্যান্য বৃটিশ নাগরিকরা পরিবার পরিজন নিয়ে সমতল এলাকার গ্রীস্মকালীন তীব্র গরম থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য দার্জিলিং শহরে আশ্রয় নিতো। কালক্রমে এটি একটি পর্যটন ও ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠে। ইংরেজ টি প্লান্টার ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে এসে ব্যবসা বানিজ্যে নিয়োজিত হয়। সৌন্দর্য পিয়াসী অনেক বিত্তবান, সৌখিন ও পদস্থ লোক দৃষ্টিনন্দন বাড়ী ঘর নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। বৃটিশ নাগরিকদের সন্তান সন্ততিদের লেখা পড়ার সুবিধার্থে স্কটিশ মিশনারীগন বেশ কিছু উচুঁমানের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল গড়ে তুলে। কালক্রমে এটি উত্তর পূর্ব ভারতের একটি উৎকৃষ্ট শিক্ষা কেন্দ্র (ঈবহঃৎব ড়ভ ছঁধষরঃু ঊফঁপধঃরড়হ) হিসেবে পরিচিতি পায়। তদানিন্তন বৃটিশ ভারতের অনেক বিখ্যাত ব্যাক্তির মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশুনা এখানেই সম্পন্ন হয়। সেই ধারা এখনো অব্যাহত আছে। বর্তমানে ভারত ছাড়াও সিকিম, ভুটান,নেপাল ও বাংলাদেশের প্রচুর শিক্ষার্থী সেখানে পড়াশুনা করছে। ১৮৮১ সনে উধৎলববষরহম ঐরসধষধুধহ জধরষধিু চালু হলে সারা ভারতের সাথে দার্জিলিং এর যোগাযোগ ব্যবস্থার অভ’তপূর্ব উন্নতি হয় এবং ব্যবসা বানিজ্য ও উন্নয়নের দ্বার আরো সম্প্রসারিত হয়।

বৃৃটিশ শাসন আমলে দার্জিলিং ঘড়হ-জবমঁষধঃরহম উরংঃৎরপঃ’ হিসেবে এবং অর্থনৈতিকভাবে কম উন্নত জেলা হিসেবে বিশেষ সুবিধা ভোগ করতো। প্রদেশের অন্যান্য জেলায় প্রচলিত অনেক আইন কানুন ও রীতিনিিত এ জেলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিলনা। ১৯১৯ সনে এ জেলাকে ইধপশধিৎফ ঞৎধপঃ’ হিসেবে ঘোষনা করা হয়। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এ জেলা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। দার্জিলিং জেলার চা বাগানগুলোতে অসহযোগ আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া বৃটিশ বিরোধী বিপ্লবী ও সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনও বেশ শক্তিশালী ছিল। ১৯৩৪ সনে এখানে বাঙলার গভর্ণর ঝরৎ ঔড়যহ অহফবৎংরড়হ কে গুলি করে বিপ্লবীরা। কিন্তু অল্পের জন্য তিনি রক্ষা পান। এতে বৃটিশ শাসনের ভিত কেঁপে উঠে। চল্লিশের দশকে চা শ্রমিক ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে বৃটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী শ্রমিক আন্দোলন ব্যাপক সারা পায়।

১৯৪৭ সনে ভারতের স্বাধীনতার লাভের পর দার্জিলিংকে পশ্চিম বাঙলার সাথে জুড়ে দেয়া হয়। এখানকার জনসমষ্টির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নেপালী বংশদ্ভুত গোর্খা নৃ-গোষ্ঠির লোক। আদিবাসী নৃতাত্বিক গোষ্ঠিগুলির মধ্যে আছে লিম্বু,রাই,মাগার,গুরং,তামাং,লেপচা,ভুটিয়া,শেরপা এবং নেওয়ার প্রভৃতি। তবে যথেষ্ট সংখ্যক মাড়োয়ারী, বিহারী, বাঙালী, এ্যাংলো ইন্ডিয়ান,চাইনীজ এবং তিব্বতি জনগোষ্ঠির লোকজনও রয়েছে। স্বাধীনতার ঊষা লগ্নে গোর্খা তথা নেপালী অধ্যুষিত এই এলাকাকে পশ্চিমবঙ্গের সাথে এভাবে মিশিয়ে দেয়াকে ভুমিপুত্ররা সহজে মেনে নেয়নি। গোর্খারা মনে করে দার্জিলিং কখনো বাঙলার অংশ ছিলনা। বাঙলার সাথে সেটে দিয়ে তাদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে ব্যাপকভাবে। ফলে ১৯৫০ থেকে ১৯৮৮ সন পর্যন্ত নেপালী ভাষার স্বীকৃতি এবং পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য গোর্খারা অনেক সহিংস আন্দোলন করে। গড়ে তুলে গোর্খা ন্যাশন্যাল লিবারেশন ফ্রন্ট(এঘখঋ)। নেতৃত্ব দেয় সুভাষ ঘিসিং নামে এক গোর্খা রাজনীতিবিদা। ১৯৮৬-১৯৮৮ সময়ে সহিংসতা ব্যাপক আকার ধারন করে। বনধ্ ডেকে গোটা অঞ্চল অচল করে দেয়। নিরাপত্তা রক্ষীসহ প্রায় ১২০০ লোকের প্রানহানী ঘটে। কেন্দ্রীয় সরকারের টনক নড়ে। অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপে ১৯৮৮ সনে দার্জিলিং সদর, কালিম্পং,কার্সিয়াং ও শিলিগুড়ি মহকুমার অংশ বিশেষ নিয়ে উধৎলববষরহম এড়ৎশযধ ঐরষষ ঈড়ঁহপরষ(উএঐঈ) নামে একটি স্বায়ত্বশাসিত নির্বাচিত প্রশাসনিক ইউনিট (ঊষবপঃবফ ইড়ফু) প্রতিষ্ঠা করা হয়। আংশিক দাবী মেনে নেয়ায় আন্দোলন অনেকটা প্রশমিত হয়। কিন্তু এ ব্যবস্থায় গোর্খাদের মূল দাবী পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য গঠন অর্জিত হয়নি। ফলে কিছুদিন পর আবার আন্দোলন শুরু হয় বিমল গুরং এর নেতেৃত্বে এড়ৎশযধ ঔধহসঁশঃর গড়ৎপযধ(এঔগ) নামক একটি রাজনৈতিক দলের ব্যাণারে । মমতা ব্যাণার্জী ক্ষমতায় এসে তাদের অধিকাংশ দাবী মেনে নেয়। ২০১২ সনে অধিকতর স্বায়ত্বশাসন ও ক্ষমতা দিয়ে গঠন করা হয় জিটিএ (এযড়ৎশযধষধহফ ঞবৎরঃড়ৎরধষ অফসরহরংঃৎধঃরড়হ)। এই প্রথম গোর্খাল্যান্ড দাবীটির প্রাথমিক স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে তারা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের অধীনে এক ধরনের স্বায়ত্ব শাসন ভোগ করছে। জেলার পর্যটন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ,স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিষয়াদির দেখভাল করে ু জিটিএ। কিন্তু পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য প্রতিষ্ঠার মূল দাবী থেকে তারা সরে আসেনি।

কেনাকাটা সেরে সবাই যার যার মতো দল বেধে লাঞ্চ খাওয়ার জন্য হোটেল/রেষ্টুরেন্ট খুঁিজ। বাঙ্গালী হোটেলও পাওয়া যায় বেশ কয়েকটি। ’শীতারাম হোটেল এন্ড রেষ্টুরেন্ট’ এর মালিক মালদহবাসী গৌরব দাশ। বাংলাদেশী পরিচয় পেয়ে সাদরে আমন্ত্রণ জানান। সাদা ভাত, সবজি, মুরগী ও ডাল দিয়ে আমরা আহার পর্ব সারি। মান এবং দাম দুটোই ছিল সন্তোষজনক। তারপর সকলে একত্রিত হই রঙ্গমঞ্চের পাশে যেখানে আমাদের গাড়ীগুলো রাখা হয়েছিল। একে একে সকলে গাড়ীতে চড়ে বসে।

এবার যাত্রা শুরু হলো মিরিক শহরের উদ্দেশ্যে । চালকের সামান্য উদল বদল হয়েছে। পাহাড়ী উঁচু নীচু ও আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ী চালনায় নেপালী চালকরা খুবই পারদর্শী । তারা শুধু চালকই নয় একই সাথে গাইডেরও দায়িত্ব পালন করেছে অধিকাংশ সময়। আমাদের চালক মহিম শেরপার বাড়ী কার্সিয়াং মহকুমার শহরতলীতে। নেপালী বংশদ্ভ’ত তরুন চালকটি ইংরেজী, হিন্দী, নেপালী ও বাঙলা বলতে পারে সমানতালে। লেখাপড়া করেছে ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত ইংলিশ মেডিয়াম স্কুলে। একটি ট্যুরিষ্ট কোম্পানীর গাড়ী চালায়। বেশ রাজনীতি সচেতন। গোর্খাল্যান্ডের স্বপ্নে বিভোর এই তরুণ দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করে পাহাড়ে একদিন গুর্খাদের স্বশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। জানিনা তার স্বপ্ন কবে বাস্তবায়িত হবে। তবে একজন ট্যাক্সী চালকের স্বজাতির প্রতি সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে।

দার্জিলিং শহরের সীমানা পার হতেই শুরু হয় ধুম বৃষ্টি। পাইন গাছের ঘন বনের মধ্য দিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার ফুট উচু আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে চলছে আমাদের গাড়ী বহর। কি অপরুপ দৃশ্য! ¯্রষ্ঠা যেন নিজের হাতে সাজিয়েছেন এখানকার প্রকৃতিকে। তবে নীচে তাকালে শরীর হিম হয়ে যায়। গভীর গিরি খাদ। একটু এদিক সেদিক হলে আর রক্ষা নেই। কিন্তু সদা হাস্যময় চালক মহিম শেরপা নির্বিকার। কারন এ পথ তার চিরচেনা। তিনি ভুমিপুত্র। আমাদের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে অভয় দেন। মাঝে মাঝে নেপালী ভাষায় গুন গুন করে মৃদু লয়ে গানও গেয়ে যাচ্ছে! কখনো কখনো গাড়ী যেন হাজার হাজার ফুট নীচে নমে যাচ্ছিল আবার রুদ্ধ শ^াসে হাজার ফুট উপরে উঠে যাচ্ছে! আবার প্রচন্ড বাঁক নিয়ে কোথায় যেন গাড়ী সমেত হারিয়ে যাচ্ছে! এ যেন উঠানামার এক বিস্ময়কর খেলা! এ খেলায় মহিম খুব পারদর্শী খেলোয়াড়। প্রায় ঘন্টখানেক চলার পর গাড়ী বহর থামলো প্রশস্ত একটি সমতল খোলা স্থানে রাস্তার গা ঘেঁষে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যেই আমরা নেমে পড়ি। রাস্তার একপাশে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট চায়ের দোকান(ঞবধ ঝঃধষষ)। চেহারা সুরতে খুবই সাধারন মানের । দোকানগুলোতে চায়ের সাথে চকলেট, বিস্কিট টোস্ট, চানাচুর,আচার, জেলী,কোল্ড ড্রিংকসসহ নানা রকম মুখরোচক খাবার রয়েছে। দোকানের মালকিন অধিকাংশই নেপালী মহিলা। সদা হাসিমুখে কাস্টমারের মনোযোগ আকর্ষণ করতে তাদের জুড়ি নেই । নেপালী এবং হিন্দী এ দু ভাষাতেই কথা বার্তায় চোস্ত। মাটির চুলার উপর ধুমায়িত চায়ের কেটলী দেখে আনন্দে মন ভরে যায়। গরম চায়ের মৌ মৌ গন্ধে এবং চারিদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পরিবেশটা কেমন যেন আকর্ষনীয় হয়ে উঠে মুহূর্তের মধ্যে। সকলে আনন্দে বিভোর। নেপালী দোকানীরা খুব দ্রুত সকলের হাতে চায়ের পেয়ালা পৌছে দেয়। বৃষ্টি ভেজা বিকেলে চা নয় যেন অমৃত! সঙ্গে দার্জিলিং টোষ্ট। এই পরিবেশে এমন সুস্বাদু চা এক কাপ খেলে কি চলে! তাই অনেকেই একাধিক কাপের স্বাদ গ্রহন করে। চা দোকানের পাশে খোলা জায়গায় পসরা সাজিয়ে বসে আছে বেশ কয়েকজন স্থানীয় বিক্রেতা। পণ্যের তালিকায় আছে স্থানীয় পাহাড়ী ফলমুল, বিভিন্ন ধরনের আচার ও টক,ঝাল মিষ্টি জাতীয় খাবার এবং বিয়ারসহ নানা রকম কোমল পানীয়। আছে বিচি কলার মতো একধরনের পাহাড়ী কলা। রাস্তার পাশেই একটি জায়গায় বেশ কয়েকটি পাথর বাঁধানো সমাধি দেখতে পাই। ইংরেজী ভাষায় নামধামও লেখা আছে। বৃটিশ আমলে বিভিন্ন যুদ্ধে তারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তবে সংরক্ষণ ব্যবস্থা খুব ভালো নয়। আমরা দাঁিড়য়ে পাহাড়ী দৃশ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করি। ছবি তোলার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আমাদের গাইড জানালেন জায়গাটির নাম সীমানা ভিউ পয়েন্ট। ওরা উচ্চারণ করে ‘ছিমানা ভিউ পয়েন্ট’। হিন্দী শব্দ ‘ছিমানা’ অর্থ বর্ডার বা সীমান্ত। কেউ কেউ এটাকে গলটিয়ার ভিউ পয়েন্টও বলে। এটি ভারত- নেপাল সীমান্তে অবস্থিত। রাস্তাটি দুটি দেশের সীমানা নির্দেশক। আমরা যেখানে দাঁিড়য়ে ছিলাম তা নেপাল। শুধু রাস্তার পিচঢালা অংশটুকু ভারতের। পাশের খোলা জায়গাটি নেপালের। দোকানপাট সবই নেপালের অংশে। তবে দুদেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য ও জনগনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। নেই কোন সীমানা। দুপাশেই সুউচ্চ পাহাড়। দুপাশের জনগোষ্ঠীই নেপালী বংশদ্ভ’ত। তারা পরস্পর আতœীয়। বিয়ে শাদি চলে সমানে জানালেন একজন উৎসাহী বিক্রেতা। ভেবে রোমাঞ্চ অনুভব করি! পাসপোর্ট -ভিসা ছাড়াই নেপাল ভ্রমণ করছি! মিরিক ও দার্জিলিংগামী সকল পর্যটকই নাকি এখানে থামে। স্বাদ নেয় চায়ের এবং উপভোগ করে ভারত ও নেপালের অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে। এখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফাচ্ছাদিত চ’ড়া দেখা যায় আকাশ পরিস্কার থাকলে। দেখা যায় নেপালের ঘন সবুজ পাহাড়। এখানেই নেই কোন পাইক পেয়াদা নেপাল কিংবা ভারতের। নেই কোন বাড়তি উৎপাত। কোলাহল মুক্ত শান্ত ¯িœগ্ধ পরিবেশ। আমরা নেপালের এই অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ক্যামেরাবন্দি করতে ভ’ল করিনি।

আমাদের চলার পথে আরেকবার স্বল্প সময়ের জন্য থামি ভারত-নেপাল বর্ডার এলাকায়। জায়গাটি বেশ জমজমাট। রাস্তা ঘেঁষে উভয় দেশের সীমান্ত প্রহরী দাঁিড়য়ে আছে। দুদিকেই মার্কেট। তবে সীমান্তের ভিতরে নেপাল অংশে এ মার্কেটের বিস্তৃতি এক কিলোমিাটারেরও বেশী বলে আমাদের নতুন চালক শের বাহাদুর থাপা জানালো। জায়গাটির নাম পশুপতিনগর । পশুপতিনাথ মন্দির এবং পশুপতিনাথ মার্কেটের জন্য এলাকাটি বিখ্যাত। এখানে ইলেকট্রনিকস সামগ্রী,হস্তজাত শিল্প,নেপালী শাল,চাদর, শাড়ী, কসমেটিকস,পারফিউম,জেকেট ইত্যাদির রমরমা বাজার। দামে সস্তা। এজন্যে দার্জিলিং কিংবা মিরিকগামী পর্যটকরা এখানে নেমে কেনাকাটা খানিকটা সেরে নেয়। অধিকাংশই ব্যাংকক অথবা চীন থেকে আমদানীকৃত। তবে স্থানীয় পণ্যও কম নয়। ভালো জিনিসের পাশাপাশি অনেক নকল জিনিসও নাকি বিক্রি হয় বেশুমার। কোনটা আসল কোনটা নকল তা বুঝার জো নেই। তাই অতিচালাক নেপালী মহিলা বিক্রেতারা সুযোগ বুঝে বিদেশী পর্যটকদের দু নম্বরী জিনিস গচিয়ে দেয় অনেক সময়। আমাদের গাড়োয়ান এখান থেকে জিনিস কিনতে নিষেধ করে। ভারত- নেপাল সীমান্তে এর অবস্থান। ভারত এবং নেপালের নাগরিকদের এ সীমান্ত অতিক্রম করতে কোন পাসপোর্টের দরকার হয়না। কিন্তু অন্যান্য দেশের নাগরিকদের সে সুযোগ নেই। আমাদের কেউ কেউ নামে। কয়েকজন সীমান্ত প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নেপালের বাজারে ঢুকে যায়। কিন্তু গোল বাধে ফেরার সময় । নেপালী বংশদ্ভ’ত আমাদের চালকদের সহায়তায় সীমান্ত প্রহরীদের অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ছাড়া পায়। তারা নাকি অল্প সময়ের মধ্যে কিছু কেনাকাটাও করেছে। এখান থেকে সড়ক পথে কাঠমন্ডু যাওয়া যায় । এজন্যে এটিকে ভারত- নেপালের গেটওয়েও বলা হয়।

মিরিকের পথে শেষবার থামি একটি চা-বাগান এলাকায়। জায়গাটি একটু ঢালু। রাস্তার দুপাশেই চা বাগান। একপাশে পাহাড়ী নদী ও সুন্দর লেক। জায়গাটি অনেকটা দুটি চা বাগানের মিলনস্থলে। একটি বাগানের নাম টিংলিং টি এস্টেট এবং অপরটির নাম সৌরিনী টি এস্টেট। এ জন্যে এটি টিংলিং ভিউ পয়েন্ট(ঞরহম ষরহম ারবি ঢ়ড়রহঃ) এবং সৌরিনী ভিউ পয়েন্ট (ঝড়ঁৎবহব ারবি ঢ়ড়রহঃ) এ দুনামেই পরিচিত । এখানকার চারপাশে কেবল চা বাগান। যে দিকে চোখ যায় কেবল সবুজ চা গাছ ও শ্যাডো ট্রি। দার্জিলিং জেলার অন্য কোথাও নাকি এমন সুন্দর ও বড় আকারের চা বাগান নেই। পাহাড়ের চুড়ায় ও ঢালে চা বাগান যেন ঢেউ খেলে যাচ্ছে অবিরত। এই নয়নাভিরাম দৃশ্য দু চোখকে সতেজ করে তোলে। চারিদেকের দৃশ্য দেখার জন্য একটি গ্যালারী স্থাপন করা হয়েছে। হবিগঞ্জের অধিবাসী হিসেবে এধরনের দৃশ্যের সাথে আমি খুবই পরিচিত। কেননা আমার নিজ উপজেলা মাধবপুর এলাকায়ও অনেক চা-বাগান রয়েছে। এমনকি দেশের সর্ব বৃহৎ চা বাগান ‘সুরমা টি এস্টেটও’ আমার এলাকায় অবস্থিত। তারপরও এখানকার সুবিস্তৃত ও খোলামেলা বাগানের সৌন্দর্যের মধ্যে একটি বিশেষ দ্যোতনা আছে। আমরা অনেকেই এ নান্দনিক দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছি।

রাস্তার পাশে একটি আধুনিক রেষ্টুরেন্ট কাম চা বিক্রয়কেন্দ্র। ছোটখাটো দোকানটি বেশ সাজানো গোছানো। একটি অংশে টি স্টল অপর অংশে দার্জিলিং চায়ের বিক্রয় কেন্দ্র। হরেক রকম দার্জিলিং টি নানা আকৃতির প্যাকেট ও কৌটায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বিক্রেতা খুব স্মার্ট। প্রত্যেকটি চায়ের গুনাগুন সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলেন। কোন চা আমরা খেতে চাই তা দেখিয়ে দিলেই সেটি পাঠিয়ে দেন কেটলীর কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির নিকট । তিনি ধুমায়িত ফুটন্ত পানিসমেত কাপে কেবল চা ঢেলে দুধ ও চিনি মিশিয়ে আমাদের হাতে তুলে দেন। সঙ্গে মজদার দার্জিলিং টোস্ট ও বিস্কিট । আহ কি মজা! মনে পড়ে ১৯৯৭ সনে একটি স্টাডি ট্যুরে গিয়ে সিলেটের লাক্কাতুরা টি এস্টেটের ম্যানাজারের বাঙলোতে অনেকটা এমন চায়ের স্বাদ পেয়েছিলাম। পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য দোকানের সামনে চেয়ার পাতা আছে। একপাশে আছে ওয়াশ রুম । আমরা একটু ফ্রেশ হয়ে নেই এখানে। অনেকেই এখান থেকে উন্নত মানের দার্জিলিং টি’র দামি প্যাকেট কিংবা কৌটা কিনতে ভ’ল করেনি। তবে দাম খুব বেশী। ভালো জিনিসের স্বাদ নিতে হলে কড়িতো ফেলতেই হবে। দার্জিলিং টির মর্যাদা সারা বিশে^ই মশহুর। মিরিকের পথে বেশ কয়েকটি কমলা লেবুর সবুজ বাগান দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। গাছে ঝুলন্ত কমলার দৃশ্য সত্যিই দেখার মতো। মিরিকের আশেপাশে নাকি আরো অনেক কমলা বাগান আছে। পরে জানতে পারি পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কমলা উৎপাদন হয় মিরিক অঞ্চলে এবং এখানকার কমলা গুণে মানে উৎকৃষ্ট। সারাদেশে এখান থেকে কমলা সরবরাহ করা হয়।

অবশেষে প্রায় ৩ ঘন্টা জার্ণি শেষ করে ৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পৌছলাম মিরিক শহরে। আরেক বিস্ময়কর সৌন্দর্য্যরে লীলাভুমি। আমরা সরাসরি পৌছে যাই শহরের কৃষ্ণনগর এলাকায় পূর্ব নির্ধারিত হোটেল জগজিৎ এর লবিতে। কৃষ্ণনগর এলাকাটি মিরিক শহরের প্রানকেন্দ্র। পর্যটকদের জন্য এখানে পর্যাপ্ত আবাসিক হোটেল ও রেষ্টুন্টে রয়েছে। তবে হোটেল জগজিৎ এর সুনাম আছে। আগে বুকিং না করলে সিট পাওয়া নাকি বেশ কঠিন। চেক ইন এর আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কাঠের তৈরী সিড়ি বেয়ে তিনতলা হোটেলের কক্ষে প্রবেশ করি। একটি আলাদা রুচির দেখা মেলে সেখানে। কক্ষের দেয়াল কাঠ দিয়ে আবৃত করা। মনে হয়েছে পুরো রুমটিই কাঠের তৈরী। ইট পাথরের চেয়ে কাঠের ওয়ালের কক্ষটি যেন অনেক বেশী পরিবেশ বান্ধব। হোটেলের নীচেই রেষ্টুরেন্ট। সেখানে বৈকালিক নাস্তা সেরে দল বেধে বেরিয়ে পড়ি মিরিক শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

মিরিক কার্সিয়াং মহকুমার একটি ছোট্ট পাহাড়ী শহর। আয়তন মাত্র ৩৩৫ একর। মিরিক একটি লেপচা শব্দ যার অর্থ আগুনে পুড়ানো স্থান । এমন অদ্ভ’ত নাম কেন হলো গাইডও তা বলতে পারেনি। ভাষা নেপালী, ইংলিশ ও হিন্দি । তাছাড়া বাঙলারও কিছুটা প্রচলন আছে। মিরিকে পর্যটক আসার ইতিহাস খুব বেশী দিনের নয়। বৃটিশ শাসনের এক পর্যায়ে এলাকাটিতে ইংরেজ সাহেবদের নজর পড়ে। তারা এখানে চা চাষ শুরু করলে অনেকগুলি চা বাগানের পত্তন হয়। সাহেবরা বাগানের ভিতরেই বসবাস করতেন সুন্দর বাঙলো বানিয়ে। বর্তমান শহর এলাকায় একটি ছোট্ট বাজার ছিল। লেক এলাকাটি ছিল গাছ গাছালি সমেত স্যাত স্যাতে জলা ভ’মি। বর্তমান বাগান এলাকায় ছিল সাহেবদের পলো খেলার সুন্দর মাঠ। সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্য মন্ত্রি সিদ্ধার্থ শংকর রায় এখানে একটি পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহন করেন। নিকটবর্তী থারবো চা বাগান থেকে ৩৩৫ একর ভুমি অধিগ্রহন করেন পর্যটন কেন্দ্র স্থুাপনের জন্য। তাঁর সেই উদ্যোগকে সাফল্যের চুড়ায় নিয়ে যান উত্তরসূরী মুখ্য মুন্ত্রি জ্যোতি বসু। তবে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চমৎকার আবহাওয়া ও সহজগম্যতার কারনে অল্প দিনের মধ্যেই অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ফলে সারা বছরই পর্যটকদেরে ভিড় লেগে থাকে। পর্যটক বান্ধব শহর হিসেবে এর যথেষ্ট খ্যাতি রয়েছে দেশে-বিদেশে। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৫৮০০ ফুট। শীতের সময় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রীতে এমনকি শুন্যতে নেমে আসে। অনেক সময় বরফে ঢেকে যায়। গরমকালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রীর মতো। আমরা কোন গরম অনুভব করিনি। রাতে হালকা চাদর গায়ে দিতে হয়েছিল। দার্জিলিং ও কালিম্পং এর মতো এখানেও হোটেলে এসি কিংবা ফ্যানের প্রয়োজন পড়েনা।

মিরিকের অন্যতম আকর্ষণ বাগান ও বনবেষ্টিত বিখ্যাত সুমেন্দু লেক। বলা যায় একে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে মিরিক শহরের পর্যটন। এটি একটি কৃত্রিম লেক। আমরা হোটেল থেকে হেঁটেই লেক এলাকায় পৌছাই। এ এক অপরুপ সৌন্দর্য্যরে লীলাভুমি । লেকের দৈর্ঘ্য খুব বেশী নয়। সাকুল্যে সোয়া কিলোমিটার। লেকের চারদিকে আছে ৩.৫০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে। প্রচুর মানুষ হাটে লেকের চারদিকে। সেখান থেকে দূর পাহাড়ে পৃথিবীর তৃতীয় য় উচ্চতম পর্বত শৃংঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় যদি রৌদ্রাজ্জ্বল দিন থাকে। তবে মেঘলা আকাশ হলে তা সম্ভব হয়না। সেদিন প্রকৃতি আমাদের প্রতি সুপ্রসন্ন ছিলনা। লেকের উপর ৮০ মিটার দীর্ঘ একটি আর্চ ব্রিজ রয়েছে যার নাম রেইনবো ব্রিজ বা ইন্দ্রানী পুল। পুলের উপর দিয়ে পর্যটকরা খুব সহজেই এপার থেকে ওপারে যেতে পারে। লেকের মধ্যে আছে প্যাডেল বোটিং এর ব্যবস্থা । অনেক নৌকার আকৃতি রাজ হাসের মতো দেখতে। দেখলাম সৌখিন পর্যটকরা বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে বোটিং করছে। লেকের গভীরতা বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম। কোথাও মাত্র ৩ ফুট আবার কোথাও ২৫ ফুট। ওয়াকওয়ে দিয়ে শিশু/কিশোরদের আনন্দ দানের জন্য আছে টাট্টু ঘোড়ায় চড়ার ব্যবস্থা। অনেকেই ঘোড়ায় চড়ে পুরো এলাকা চক্কর দিচ্ছে। সাদা কালো লাল ও মেরুন রঙের তাগড়া ঘোড়া দেখতে খুবই সুন্দর। পেশাদার চালকরা খুব বিনয়ের সাথে ঘোড়ায় চড়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। এখানেও ‘সেল’ আছে। অর্থাৎ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে কম টাকায় ঘোড়ায় চড়া যায়। ঘোড়ায় চড়ে ব্রিজও পার হওয়া যায়। দার্জিলিং এর মল এলাকায়ও ঘোড়ায় চড়ার ব্যবস্থা দেখেছিলাম। লেকের মধ্যখানে আছে একটি ভাসমান ঝর্না বা ফোয়ারা। লেকের এক পাশে আছে একটি নান্দনিক ফুল,ফল ও মসলার বাগান । বাগানে যে কত রঙ-বেরঙের ফুল ফোটে আছে তার কোন গনা গুনতি নাই। কমলা লেবু ও এলাচ বাগানের দৃশ্যও মন কেড়ে নেয়। অন্যপাশে লম্বা বৃক্ষের ঘন বন। ঈৎুঢ়ঃড়সবৎরধ ঋড়ৎবংঃ যা স্থানীয়ভাবে ধুপি ফরেষ্ট(উযঁঢ়র ঋড়ৎবংঃ) নামে পরিচিত । ধুপি এক ধরনের জাপানী গাছ যা দেখতে খুব সুন্দর। লেক থেকে অল্প দূরেই পাহাড়ের উপর সুন্দর ও কারুকার্য খচিত একটি প্রাচীন মন্দির কমপ্লেক্স রয়েছে যা দেবীস্থান নামে খ্যাত। এখানে অনেকগুলি মন্দির আছে যেখানে হিন্দু ধর্মের পূজনীয় অনেক দেব-দেবীর বিগ্রহ স্থাপন করা আছে। পাথরের তৈরী গনেশ,শিব,হনুমান ও দুর্গাদেবীর বিগ্রহ। সিংহবাহিনীর উপর উপবিষ্টা দুর্গা দেবীর পাথরের মূর্তি দেখতে খুবই আকর্ষণীয়। প্রাচীন এই মন্দির হিন্দুধর্মাবলম্বীদের নিকট খুবই পবিত্র। অনেকেই পূণ্য লাভের আশায় দেবী দর্শণে আসেন। সকাল-সন্ধ্যা ভক্ত ও পুরোহিতদের সমাগমে প্রাঙ্গনটি সর্বদা সরগরম থাকে।

লেকের পূর্ব পাশে আছে ছোট ছোট দোকান যেখানে নানা ধরনের আকর্ষনীয় স্যুভেনীর পাওয়া যায়। দাম একটু বেশী মনে হলো। ‘দি পার্ক’ নামে এখানে একটি চমৎকার হোটেল দেখতে পাই। ইন্ডিয়ান ও চায়নীজ খাবারের জন্য এ হোটেলের নীচতলার রেষ্টুরেন্টের সুনাম আছে। পাশেই ‘ডে সেন্টার’ (উধু ঈবহঃৎব)। এটি জিটিএ(এড়ৎশযধষধহফ ঞবৎরঃড়ৎরধষ অফসরনরংঃৎধঃরড়হ) কর্তৃক পরিচালিত হয়। খুব রিলাক্স মুডে সময় কাটানোর উপযুক্ত স্থান। জায়গাটি সমতল। সেখানে অনেকগুলো ছোট ছোট রেষ্টুরেন্ট ও খাবারের দোকান। সামনের খোলা চত্তরে রঙ-বেরঙের প্লাস্টিকের চেয়ার সাজিয়ে রাখা আছে পর্যটকদের বসার জন্য। ভোজন রশিকদের রসনা বিলাস ও সময় কাটানোর ভালো ব্যবস্থা আছে সেখানে। এখানকার রেস্টুরেন্টের মিরিক টি খুবই জনপ্রিয়। আমরা চায়ের স্বাদ গ্রহন করি কয়েকজন মিলে। সন্ধ্যার পর নাকি জমজমাট আড্ডা হয় সেখানে ।

সন্ধা ঘনিয়ে আসলে আমরা হোটেল জগজিৎ এর দিকে হাটা শুরু করি। রাস্তার দু’দিকে বেশ কিছু ছোট শপিং সেন্টার রয়েছে। ঠিক শপিং সেন্টার নয় সারি সারি দোকানপাট। সাজানো গোছানো। টি শার্ট,গেঞ্জি, তোয়ালে,আন্ডার গার্মেন্টস, জুতা স্যান্ডেল,কসমেটিকস, পারফিউম, দার্জিলিং টি ইত্যাদি কেনেন অনেকে। দাম খুব কম বলা যাবেনা। তবে গুনগত মান ভালো।

রাতে জগজিৎ হোটেলের শাহী ডিনার খেয়ে সকলে অপার তৃপ্তি লাভ করে। বাঙ্গালী, নেপালী ,উত্তর ভারতীয় ও কয়েক পদের মোগলাই খাবার সত্যিই মজাদার ছিল। এক কাপ ব্লাক কফি খেয়ে শয়ন কক্ষে চলে যাই বিস্তর ক্লান্তি নিয়ে। হোটেল থেকে দেয়া নেপালী ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকা পড়ার কোশেশ করে লাভ হয়নি। টেলিভিশন দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি বুঝতেই পারিনি। ভোর বেলা পাখির কলরবে ঘুম ভেঙ্গে যায়। অন্য রকম এক অনুভুতি যেন পরশ বুলিয়ে যায় শরীর ও মনে। পর্দা সরিয়ে প্রকৃতির আলতো রুপ দেখে মন ভরে যায়। রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি শৈল নিবাস মিরিকের নান্দকি সৌন্দর্য উপভোগ করতে। অনেকের হাতেই ক্যামেরা । কেবল ক্লিক ক্লিক শব্দ। রাস্তার দুপাশে পাইন,ওক ও নাম না জানা বিশাল বৃক্ষরাজির সারি। রাস্তা কেবল উপরে উঠছে এবং একটু পর পরই বাঁক নিচ্ছে। উচুঁ পাহাড়ী পথে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর অনেকেই রণে ভঙ্গ দিল। ফেরার পথে নামতে খুব আরাম। কাঞ্চনজঙ্ঘার আবছা ছবি তুলতে সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। হঠাৎ বেরসিক বৃষ্টি এসে হানা দেয়। বৃষ্টিতে ভিজেই হোটেলে ফিরি।

মিরিকে দেখার মতো আরো অনেক দর্শণীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সুমেন্দু লেক থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্ব দিকে পাহাড়ের উপর বিখ্যাত বোকার মনাষ্টেরী (ইড়শধৎ গড়হংঃবৎু) যা এতদাঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থান ও জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত। নব্বই দশকের শেষ দিকে বৌদ্ধদের আধ্যাত্মিক গুরু দালাইলামা এটি ভিজিট করেন। প্রায় ৫৮০০ ফুট উপরে উঠে কোন কিছু দেখার মতো শারিরীক ও মানসিক অবস্থা তখন ছিলনা। তাছাড়া দার্জিলিং ও মিরিক ভ্রমণকালে সময়ও ছিল সীমিত এবং ট্যুর অপারেটরের কর্মকর্তাদের দ্বারা অনেকটা নিয়ন্ত্রিত। আর সেজন্যেই দুই শহর ও সংলগ্ন অন্যান্য দর্শণীয় স্থান যেমন কাউলে দারা ভিউপয়েন্ট(শধষিব উধৎধ) রামেতি দারা ভিউপয়েন্ট দারা (জধসববঃধুউধৎধ), দেওসী দারা ভিউপয়েন্ট (উবড়ংর উধৎধ), রাই ধাপ(জধর উযধঢ়), মানেভঞ্জন (গধহবুনযধহলধহ), সুইস কটেজ(ঝরিংং পড়ঃধমব), থারবো টি এস্টেট,টাইগার হিল, তেনজিং রক গার্ডেন, জুলজিক্যাল পার্ক, লয়েডস বোটানিক্যাল গার্ডেন, রঙ্গিত ভ্যালী রোপওয়ে, হিমালয়ান আর্ট গ্যালারী,লেভং রেসকোর্স ইত্যাদি দেখা হয়নি। গাইডদের নিকট থেকে কেবল বর্ননা শুনেই তৃপ্ত থাকতে হয়েছে।

জগজিৎ হোটেলের রেষ্টুরেন্টে নাস্তা খেয়ে বিদায় জানাই মিরিক শহরকে। যাত্রা করি শিলিগুড়ী শহর হয়ে বাগডোগরা এয়ারপোর্টের দিকে। আবার সেই উচুনীচু পাহাড়ী পথ, চা বাগানের গা ঘেঁষে চলমান রাস্তা এক অনির্বচনীয় আনন্দের খোরাক যোগায়। অনেক সময় সমতল ভুমির উপর দিয়েও চলেছি,দেখেছি সুবিস্তৃত ফসলী মাঠ।। কয়েকবার অতিক্রম করেছি ছোট অখচ খর¯্রােতা নদী। প্রায় ৫৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে আড়াই ঘন্টা ভ্রমন শেষে পৌছাই বাগডোগরা বিমান বন্দরে। সেখান থেকে উড়াল দিয়ে নামলাম কোলকাতার নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। আবার শুরু হলো অবিভক্ত বাঙলার রাজধানী কলিকাতা শহরের সৌন্দর্য উপভোগের অভিযান।
দার্জিলিং এবং মিরিক দুজায়গাতেই দেখলাম প্রচন্ড স্বাদেশিকতা বা নেপালী জাত্যাভিমান। দুই শহরের কোথাও ওয়েষ্ট বেঙ্গল বা পশ্চিমবঙ্গ শব্দটি দেখিনি। সরকারী-বেসরকারী অফিসে, রাস্তাঘাট ও দোকানপাটে কিংবা বিলবোর্ডে ওয়েষ্ট বেঙ্গল শব্দের পরিবর্তে জিটিএ(এড়ৎশযধষধহফ ঞবৎরঃড়ৎরধষ অফসরহরংঃৎধঃরড়হ) শব্দের ব্যবহার সর্বত্রই দৃষ্টি গোচর হয়। বাঙলা ভাষায় কোন প্রতিষ্ঠানের নাম কিংবা কোন সাইন বোর্ড বা বিল বোর্ড চোখে পড়েনি। প্রথমে সুভাষ ঘিসিং ও হালে বিমল গুরংদের নেতৃত্বে পাহাড়ে স্বায়ত্ব শাসনের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই নাকি তারা প্রচন্ড বাঙলা বিদ্ধেষী হয়ে যায়। দার্জিলিং ও মিরিকের সরকারী ভাষা তিনটি। সেখানে বাঙলা নেই আছে হিন্দি,ইংরেজী ও নেপালী। অনেক নামী দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলির অধিকাংশই ইংলিশ মিডিয়াম । অবশিষ্টগুলি নেপালী ভাষায়। বাঙলা ভাষায় কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় কিনা তা জানা গেলনা। সুমেন্দু লেকের পাশে বসে চা পানের সময় আলাপ হয়েছিল রোসাং তামাং নামে এক বয়স্ক ভদ্রলোকের সাথে। নেপালী বংশদ্ভ’ত ব্যাক্তিটি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তাঁর কাছ থেকেই জানলাম দার্জিলিং,মিরিক, কার্সিয়াং, কালিম্পং, ডুয়ার্স, শিলিগুড়ি, মংপু শহরে অনেকগুলি নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কলেজ আছে। আছে অনেকগুলি বোর্ডিং স্কুল। যেগুলোর পড়াশুনার মান খুব উন্নত। ভারতের অন্যান্য অঞ্চল বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ,বিহার, সিকিম, আসাম,মেঘালয়, মনিপুর এবং পাশর্^বর্তী রাষ্ট্র নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশ থেকেও প্রচুর ছাত্র আসে এখানে পড়াশুনার জন্য। আলাপচারিতায় তিনি জানান পাহাড়ী অঞ্চলে বাঙ্গালীদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। তারা ব্যবসা বানিজ্য গুটিয়ে শিলিগুড়ি কিংবা নর্থ বেক্সগল বা কোচ বিহারের দিকে স্থায়ী হচ্ছেন। কারন একটাই বাঙ্গালীদের প্রতি পাহাড়ীদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এটি একদিনে হয়নি। পাহাড়ীদের দীর্ঘদিনের শোষন বঞ্চনা ও অবহেলার জন্য পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীরাই বহুলাংশে দায়ী। তার মতে দার্জিলিং জেলা কখনো বাংলার অংশ ছিলনা। এটি সর্বদাই ছিল নেপালী, ভুটানী ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড়ী নৃ-গোষ্ঠির আবাস ভুমি। এতদাঞ্চলের জনগনের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে পশ্চিমবঙ্গের ভাষা ও সংস্কৃতির কোন মিল নেই । সম্পূর্ণ পৃথক জাতিস্বত্ত্বার অধিকারী তারা। চতুর ইংরেজ সরকার দেশ ভাগের সময় দার্জিলিংকে অন্যায়ভাবে পশ্চিমবঙ্গের সাথে জুড়ে দেয়। সেই থেকে পাহাড়ীদের মনে অসন্তোষ দানা বাঁেধ। আশি ও নব্বই দশকে এর বিস্ফোরণ ঘটে। আশার কথা বিলম্বে হলেও কেন্দ্রীয় সরকার তাদের দাবীর যৌক্তিকতা স্বীকার করে নিয়েছে। অপ্রতুল হলেও এক ধরনের স্বায়ত্ব শাসনের ব্যবস্থা করেছেন যা তাদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। রাজ্য সরকার বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রি মমতা ব্যাণার্জী তাদের দাবী দাওয়ার প্রতি অনেকটা সহানুভুতিশীল। তার বিশ^াস সেদিন বেশী দূরে নেই যেদিন তারা ভারতীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকেই কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল বা ইউনিয়ন টেরীটরির মর্যাদা লাভ করবে। সকল জাতিগোষ্ঠি আত্মপরিচয় নিয়ে বেচে থাকুক এটাই কামনা করছি। বিদায় মিরিক বিদায় দার্জিলিং !

 

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯৫৪ বার

Share Button

Calendar

December 2018
S M T W T F S
« Nov    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031