» পিতাহি পরমং তপ

প্রকাশিত: ২৬. জুন. ২০২০ | শুক্রবার

সৌমিত্র শেখর

ভেতর থেকে বেশ শূন্যতা অনুভব করছি কয়েক দিন হলো: আর একা একাই জপছি– ‘পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমং তপ । / পিতোরি প্রিতিমা পন্নে প্রিয়ন্তে সর্ব দেবতাঃ ।।’ এই ‘পিতা-প্রণাম মন্ত্র’ আমি কোনো বই থেকে শিখিনি। শুনতাম, উচ্চকণ্ঠে প্রতিদিন সকালে বাবা এটাও আওড়ে তবে বিছানা ছাড়ছেন। শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে। অনেকের পিতার মতো তিনিই আমার ‘হিরো’। এখনো তাঁরই দেখানো পথে চলি।

এই মানুষটির একটি রোম্যান্টিক মন ছিল, সাহিত্য-শিল্পকলায় আগ্রহ ছিল, আদর্শনিষ্ঠ জীবনকামনা ছিল। পাকিস্তান আমলে চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সত্ত্বেও নিকটাত্মীয়দের সব রকমের টান অস্বীকার করে শুধু দেশের টানে জন্মভূমিতে থেকে গিয়েছিলেন, একা। সেদিন হঠাৎ অধ্যাপক ড. মনিরা কায়েসের পিএইচ. ডি. অভিসন্দর্ভে দেখি তাঁর নাম লেখা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীদের সঙ্গে। ১৯৬১-তে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ পালনে সরকারি নিষেধাজ্ঞার পর পত্রিকায় অল্প কিছু লেখা যে বের হয়েছিল, তার একটি আমার পিতার। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান ‘লোকসংস্কৃতির সন্ধানে’ বইতে বাবার অনেকগুলো প্রবন্ধের তালিকা দিয়েছেন। দরজি আবদুল ওয়াহাব ‘ময়মনসিংহের চরিতাভিধান’ গ্রন্থে বাবার জীবনতথ্য সংযোজন করেছেন। হাসান আজিজুল হক আমার পিতার লেখা উপন্যাস নিয়ে দারুণ কথা উল্লেখ করেছেন বইটির ভূমিকায়। পরে এই বাবাই ধীরে ধীরে এসব থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। আজ ভাবি, আমি আমার বাবাকে দেখেছি, কিন্তু পাইনি। পাওয়া মানে, আমার জিজ্ঞাসার আলোকে পাওয়া। মাধ্যমিক পাশের পর উচ্চমাধ্যমিকটা রাজনীতি আর সংগঠনের কাজে বেশ অপচয় করেছি। বাবা এই অপচয়টাই মেনে নিতে পারেননি। তাই খানিকটা মানসিক দূরত্ব তৈরি হয় আমাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে চলে আসার পর মনের দূরত্ব কমে কিন্তু স্থানের দূরত্ব? বাবাকে আর পাওয়া হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হতে-হতেইতো তিনি চলে গেলেন; ক্যান্সার ছিনিয়ে নিয়ে গেল। মাত্র তিন মাসেই চলে গেলেন তিনি। রোদছাতা হঠাৎ দমকা হাওয়ায় উড়ে গেলে যেমন হয়, আমারও হয়েছিল তেমনি। রোদ হলেও চলতো, কিন্তু আমফান এসেছিল সেদিনও। আমার জন্য আগাম কোনো আবহাওয়া-বার্তা ছিল না। ছাত্রত্ব যায়নি, আয়-রোজগার কিচ্ছু করি না তখনো। ‘মাথায় আকাশ ভাঙ্গা’ কাকে বলে, আমি সেদিন অনুভব করেছিলাম।

বাবার কাগজপত্র খুলে অনেক কিছু পাই, শুধু ব্যাংকে টাকা ছাড়া। দেখি, বিশ শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি শিক্ষা আর সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। সেরপুরের (তখন এই বানানে লেখা হতো) সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কৃষ্টিপ্রবাহ’ (দেখুন, কী মিষ্টি নাম!) প্রতিষ্ঠাতাদের একজন তিনি। সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। বেশ কিছু পত্রিকা সম্পাদনার হিসেব পাই। তাঁর নিজের লেখা ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘সর্বহারা’ নাটক, আরো কিছু কিছু। পরেতো ‘দিলরুবা’সহ কিছু প্রথম শ্রেণির পত্রিকায় কিছু কবিতা ছাপাও দেখেছি তাঁর। আমি যখন স্কুলের ছাত্র তখন বাবার অভিনীত নাটক মঞ্চে দেখেছি। তাঁর স্ক্রিপ্টে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী হওয়ার দৃষ্টান্ত আছে প্রচুর। কী চমৎকার ছিল বাবার হাতের লেখা! আমি তাঁর স্টাইলে লেখার চেষ্টা করতাম। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়ার পর বাবা পাশের সোনালী ব্যাংকে আমার নামে সেভিংস্ একাউন্ট খুলে দিয়েছিলেন। একাউন্ট নম্বর: ৮৪। বলেছিলেন সঞ্চয়ী হতে। বৃত্তির টাকা জমতো, তাছাড়া ২/৩ মাস পর পর ১০ টাকা করে দিতেন, জমা দিয়ে আসার জন্য। অফিসে যাওয়া হাতেখড়ি আমার সেই ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই। এই অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছিল, বাবার মৃত্যুর পর পেনশন তোলা বা অন্য কাজ করার ক্ষেত্রে।

মানুষটি সারাজীবন মফসসলেই কাটিয়ে দিলেন, নগর তাঁকে টানেনি। ঢাকায় রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই) কিংবা রাজশাহীর কবি-অধ্যাপক আতাউর রহমানের মুখে বাবার কথা শুনে মনে হতো, এক দিন মফসসল থেকেই তিনি কেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। যে স্কুলে পড়েছিলেন সেই স্কুলের শিক্ষক হয়েই রইলেন। পরে অবশ্য প্রধান শিক্ষক পদে ছিলেন। সরকারি চাকরিসূত্রে এজেলা-ওজেলাও করতে হয়েছে তাঁকে। ছোটো থেকেই অনেকগুলো পত্রিকা পড়ার নেশা ছিল আমার, একটি-দুটি হলে চলতো না। অনতিদূরে পাবলিক লাইব্রেরিতে তিনিই আমাকে প্রথম নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাকে বলতেন, কোনো চায়ের স্টলে বসে যেন পত্রিকা না পড়ি। পড়তে হলে বইয়ের দোকান (আমরা বলতাম ‘লাইব্রেরি’) বা ঔষধের দোকানে বসতে। বাবাকে কোনোদিন চায়ের স্টলে আড্ডা দিতে দেখিনি। কোনো কোনো সন্ধ্যা কাটাতে বসতেন রামশ্রী ঔষধালয়, সরস্বতী লাইব্রেরি, পারভীন ক্লিনিক, দি নিউ প্রেস এসব দোকানে । ছোটো শহর– সবইতো প্রকাশ্য ছিল! পরে যখন আমি মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে চায়ের স্টলে বসে পত্রিকা পড়া, রাজনীতির আলাপ করা, সংগঠনের কর্মী খোঁজায় মনোযোগী হয়ে পড়ি– বাবার সঙ্গে মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে। আজ ভাবনা আসে; কিন্তু এর কোনো সমাধান নেই।

ভবিতব্যই বুঝি এই: হারিয়ে খোঁজা! আমি খুঁজছি আমার বাবাকে, আমার সন্তান খুঁজবে আমাকে, তাকে খুঁজবে তার সন্তান। ভবিতব্যকে রোধ করার শক্তি অর্জন বেশ কঠিন। এটা সবার থাকে না। অন্তত আমার ছিল না। তাই, আমি সাধারণ। পিতাকে খুশি করতে পারিনি তাঁকে ‘অতিক্রম’ করে! এক বুক ব্যর্থতা নিয়ে তবুও তাঁকেই, আমার পিতা সুনীল বরণ দে-কেই শরণ করি, বলি: ‘পিতাহি পরমং তপ’।

২১শে জুন, ২০২০

সৌমিত্র শেখরঃ অধ্যাপক , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৮৯ বার

Share Button