» পীযূষ দা, সম্প্রীতির নিবেদিত মানুষ

প্রকাশিত: ১৯. সেপ্টেম্বর. ২০২০ | শনিবার

 

রেজা সেলিম
বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য অভিনয়শিল্পী পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম : ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৫০) যখন থেকে তাকে চিনি তখন তার বয়স ২৮-২৯ হবে। আমি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসি ১৯৭৭ সালে, ততোদিনে চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে আমার পরিচয় ও সখ্য গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতা উত্তর নাট্য আন্দোলনের স্রোত ঢাকা ও অন্যান্য জেলার মতো চট্টগ্রামেও যথেষ্ট বেগবান হয়েছিল। ‘থিয়েটার-৭৩’, ‘তির্যক নাট্যদল’ ও ‘অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়’ এই তিন প্রধান নাট্য সংগঠনে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের অনেকেই আমার শৈশবকালের পরিচিত ও অগ্রজসম ছিলেন, আমার সমসাময়িক অনেক বন্ধু ও নাট্যকর্মী হিসেবে নানাভাবে এসব দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমি উঠতি বয়সী সামান্য সাহিত্যকর্মী হিসেবে আড্ডা বা নানা আয়োজন-উপলক্ষে এদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলাম। আর সে সময়টাই যেন ছিল সবাইকে ভালবাসার, একে অপরের সঙ্গে সহমর্মী, বুদ্ধির চর্চায় একে অপরের পরিপূরক এক উন্মাতাল সময়। যদিও ’৭৫-এর রাজনৈতিক নৃশংসতার কারণে আমাদের কলেজ জীবন বিশেষ স্বস্তিদায়ক ছিল না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের কয়েক মাসের মধ্যেই চট্টগ্রাম কলেজের ভর্তি পর্ব শুরু হয়। দেশব্যাপী কারফিউ, চাপা ক্ষোভ ও অল্প-বিস্তর রাজনৈতিক সচেতনতা সবই ছিল আমাদের বয়সীদের জন্য বিপজ্জনক। এ সময় আমার দুই সহপাঠিনী অনিতা দাশগুপ্তা ও অমিতা দাশগুপ্তা দুই সহোদরা, যাদের বড় ভাই এ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত (তখন চট্টগ্রামের তরুণ সাংবাদিক), তাদের দেওয়ানজী পুকুর লেনের বাড়ির বৈকালিক আড্ডায় আমাদের সম্পৃক্ত করে। সে সূত্রে আমার সঙ্গে যাদের পরিচয় ও পরবর্তীতে শ্রদ্ধাপূর্ণ অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠে তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হক, সুচরিত চৌধুরী, আমার শিক্ষক অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন আহমদ, উদীচীখ্যাত সাংস্কৃতিক কর্মী অমিত চন্দ্র, নাট্যকর্মী সদরুল পাশা, নাট্যকর্মী ও কবি শিশির দত্ত যাদের চিন্তা-চেতনা ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রভাব আমার জীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। সেসব আড্ডা-আলোচনা থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তী বাংলাদেশের একটি অসহায় চালচিত্র আমাদের মানস-জগতে সংগঠিত হয়, আমরা বুঝতে পেরেছিলাম এই পাথর সহজে নেমে যাবার নয়।

তখনকার চট্টগ্রামের নাট্যমঞ্চে সদরুল পাশার অসামান্য কীর্তি রয়েছে যা এখনও তার বন্ধুরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। তিনিও চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র ছিলেন। এই কলেজ থেকেই তার নাট্যচর্চার শুরু অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন আহমদ এবং অধ্যাপক জিয়া হায়দারের সঙ্গে। একদল তরুণের সমাগমে উজ্জীবিত হয় চট্টগ্রামের নাট্যাঙ্গন, যার নেতৃত্বে ছিলেন সদরুল পাশা। ‘থিয়েটার-৭৩’-এর মাধ্যমে সূচনা হয় চট্টগ্রামের থিয়েটার চর্চার। এর পরের বছর ১৯৭৪ সালে তিনি ও শিশির দত্তগড়ে তুলেন ‘অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়’। অদম্য ও সাহসী এই মানুষটি তার কর্মনিষ্ঠা এবং নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমে চট্টগ্রামের থিয়েটারকে জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন। বিশেষ করে ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮, চট্টগ্রামের মঞ্চ নাটকের স্বর্ণযুগ যার নায়ক সদরুল পাশা। দুর্ভাগ্যবশত মাত্র ৪১ বছর বয়সে ১৯৯৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

’৭৭ সাল থেকে আমার ঢাকাবাস শুরু হলে এই সদরুল পাশার মাধ্যমেই আমি ঢাকার নাট্যাঙ্গনের সঙ্গে পরিচিত হই। তিনি প্রায়ই ঢাকায় এলে আমাকে নিয়ে বেইলি রোডে যেতেন বা যেতে বলতেন। তার একজন অনুজসম ভক্ত-অনুরাগী ছিলাম বলে এক ধরনের প্রশ্রয়ী সম্পর্ক ছিল। আমার সহপাঠী আমিরুল ইসলাম টিপু সে সময় ঢাকা থিয়েটারের কর্মী, তার মাধ্যমে পাশা ভাই ঢাকায় এসেছেন খবর পাঠাতেন। বেইলি রোডের এই আড্ডায়ই পীযূষ বন্দ্যোপাধায়ের সঙ্গে পরিচয় ও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আর একজন প্রশ্রয়দাতা গুরুজনের সঙ্গে সম্পর্ক হলো। পীযূষ দার সঙ্গে এই যে সম্পর্ক সেখানে কেউ বলার নেই যে আমাদের বয়সে নয় বছরের ব্যবধান ছিল। যেমন সদরুল পাশার সঙ্গে ছিল পাঁচ বছরের। পাশা ভাই বলতেন, ‘আমরা সমসাময়িক, এখানে বয়সের ব্যবধান হিসাব কর না’। দু’জনের মধ্যেই একটি কাকতালীয় সম্পর্ক আছে, পীযূষ দার জন্মতারিখ ২৩ সেপ্টেম্বর, আর সদরুল পাশার মৃত্যুতারিখ ২৪ সেপ্টেম্বর। পাশা ভাই পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়তে গেলে ৮২-৮৩ সাল থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ দুর্বল হয়ে যায়। এর পরে হয়তো দু’জনেরই পেশাগত ব্যস্ততায় আমাদের এই সম্পর্ক প্রায় হারিয়েই যায়।

কিন্তু পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় আমার চেতনা জগতে থেকে গেলেন ও আজও আছেন। একাধারে তিনি নাট্যজন, আমাদের চোখে যুব-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধাও বটে, কারণ এরশাদ আমলে স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের সময় ১৯৮৫ সালে পীযূষ দার নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ যুব ঐক্য’ গড়ে ওঠে। এরশাদ সরকারের পতনের আগে-আগে যখন আন্দোলন তুঙ্গে, তার সঙ্গেই লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে শাহবাগের কন্ট্রোল রুম থেকে কারফিউ পাস নিয়ে সেই ঐক্যের সভায় আমিও গেছি। পীযূষ দার পরামর্শে শহরের অবস্থা প্রদক্ষিণ করতে কারফিউ পাস নিয়ে আমি আর আমার সহকর্মী স্বপন সেনগুপ্ত মোটরসাইকেলে সারা ঢাকা শহর পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট করেছি। এমনই নেতৃত্ব গুণ ও সম্মোহনী বৈশিষ্ট্য তার যা শত প্রতিকূলেও উপেক্ষা করা যায় না। সে সময় সকল যুব সংগঠন সঙ্গে নিয়ে আরও অনেকে মিলে পীযূষ দা গড়ে তুলেন ‘যুব সংগ্রাম পরিষদ’ যা এরশাদ সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার ছাত্র ছিলেন, সাংবাদিকতা করেছেনও। কিন্তু সব ছাপিয়ে তিনি সংগঠক ও অনুপ্রেরকের ভূমিকাই রেখেছেন বেশি। থিয়েটার আন্দোলনে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা তার জীবদ্দশাতেই আলোচনা হলে ভাল, আমরা তো মরে গেলে পাতার পর পাতা লিখি আর টেলিভিশনে চোখের পানি ফেলি। কিন্তু বেঁচে থাকতে সব স্বীকার করি না। তিনি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাকালীন স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ছিলেন, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনেরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। গ্রাম থিয়েটার আন্দোলনে সারা দেশ ঘুরে বেরিয়েছেন তৃণমূলে নাট্য আন্দোলন সংগঠনে। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সম্প্রীতি সংগঠনে গড়ে তুলেছেন ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ নামের একটি অনবদ্য প্রতিষ্ঠান।

সংগঠক ছাড়াও তিনি একজন নাট্যকার ও আবৃত্তিশিল্পী। আশির দশকের শুরুতে ‘সকাল সন্ধ্যা’ নামের টিভি সিরিয়ালে ‘শাহেদ’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা পান। বাংলাদেশের আদর্শ মধ্যবিত্ত পরিবারের চিত্র ফুটিয়ে তুলে এই ধারাবাহিক নাটকটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। তার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের শুরু মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আগামী’ দিয়ে। এরপর তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘একাত্তরের যীশু’ চলচ্চিত্রে পাদ্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। এছাড়া ২০১১ সালের আরও দুটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ ও ‘গেরিলা’য় অভিনয় করেন। পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত অন্যান্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- আগামী, মহামিলন, উত্তরের খেপ, কিত্তনখোলা, মেঘলা আকাশ, আধিয়ার, আমার আছে জল, মৃত্তিকা মায়া, আমি শুধু চেয়েছি তোমায় ও বুনো হাঁস।

একজন নগণ্য অনুজসম বন্ধুকর্মী হিসেবে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তৃণমূল সংস্কৃতির সন্ধানে যোগ দিয়েছি বহু সময়, যার বেশ কয়েকটি আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল ও শিক্ষণীয়। খুলনার নাট্য ও সংস্কৃতি জগতের অকৃত্রিম কর্মী স্বপন গুহের আমন্ত্রণে ১৯৯৭ সালের ২ মে আমরা মোংলার হলদিবুনিয়া গ্রামে যাই সেখানকার এক নিবেদিত সংগঠক সুভাষ বিশ্বাসের আয়োজন ‘শেকড়ের সন্ধানে’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে। সেই অনুষ্ঠানে গ্রামের কুলবধূরা কেমন করে তাদের নিজেদের আদি সংস্কৃতি ধরে রেখেছে তা দেখে আমরা অভিভূত হই বটে কিন্তু পীযূষ দা স্বপন গুহকে অনুপ্রাণিত করেন এই চর্চার মাধ্যমগুলো (পটগান, অষ্টক ও হালুই গান) নিয়ে কাজ করতে যার জন্য তিনি নিজেও স্বপন গুহের সংগঠন ‘রূপান্তর’-এর কর্মীদের নিয়ে অবিরাম কর্মশালা করেন। এই প্রাথমিক প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে রূপান্তরের দুই সংগঠক স্বপন গুহ ও রফিকুল ইসলাম খোকনের উদ্যোগে ও কার্যকরী নেতৃত্বে ‘পটগান’ বাংলাদেশের লোক সংস্কৃতিচর্চায় পুনরুজ্জীবনের উদ্ভাবনী স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়া দুর্গাপূজায় ফরিদপুরের ঢাকিদের নিয়ে ঢাক বাদ্যের সমাবেশ পীযূষ দারই উদ্ভাবন। আমি নিজেও তার অনুপ্রেরণায় সাতক্ষীরা জেলার তালায় ‘৯৭ সালে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের ঢুলীদের নিয়ে সম্মেলন ও ঢোল-বাদনের অনুষ্ঠান করেছি।

আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই অগ্রজের ৭০তম জন্মদিন ২৩ সেপ্টেম্বর। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার বাংলাদেশে এমন মানুষের খুব প্রয়োজন যারা দিনশেষে একই চিন্তায় সকলের সঙ্গে একমত হতে পারেন। কারণ পীযূষ দা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভুবনে ‘তিমির হননের নেত্রী’ (তার লেখা ‘স্মৃতি সুখের, দুঃখেরও’, সারাবাংলা, ১৭ মে ২০২০)। আর সেই ভুবনের কারিগর যারা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নবিভোর মানুষ- তাদের নিয়ে পথে চলেন পীযূষ দা, মঞ্চে উচ্চারণ করেন সাহসী বাঙালীর শব্দমালা, রাজপথে চলেন বীরের মতো, সংস্কৃতিকে মনে করেন সাধনা, যার কাছে ভালবাসা স্নেহের পরিপূরক, যিনি কেবল ফরিদপুরের ননী গোপাল আর সান্ত¡না বন্দ্যোপাধায়ের প্রথম সন্তান নন, যিনি আমার বন্ধু মানস বন্দ্যোপাধ্যায় বা শুক্লা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই নন, যিনি কালে কালে সারা দেশের হয়ে গেছেন, হয়ে গেছেন সকল বাঙালীর ভক্ত হৃদয়ের মানুষ, সেই মানুষটির জন্যেই আমরা তার সত্তরতম জন্মদিনে প্রার্থনা করি- আমরা ওই সর্বশক্তিমানের কাছে পীযূষ দার জন্যে একটি দীর্ঘ জীবন চাইছি।

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম গবেষণা প্রকল্প

rezasalimag@gmail.com

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৪৭ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031