» পুষ্টিহীনতা রোধে খাদ্য নিরাপত্তা

প্রকাশিত: ০৪. জুন. ২০১৯ | মঙ্গলবার


জিনাত আরা আহমেদ

দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, কমেছে দারিদ্র্। তারপরও জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। সুস্থ্য ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরিতে পুষ্টিহীনতা মারাত্মক চ্যালেঞ্জ, যা খাদ্য নিরাপত্তার সাথে জড়িত। একসময় খাদ্য নিরাপত্তার অর্থ ছিল জনসংখ্যা অনুপাতে যথেষ্ঠ পরিমাণ খাদ্য মজুদ থাকা। কিন্তু বর্তমানে জাতিসংঘের ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের সংজ্ঞানুসারে খাদ্য নিরাপত্তা হলো দেশের সব মানুষের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর, পছন্দমাফিক ও প্রয়োজনীয় খাবার যথেষ্ঠ পরিমাণে প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধার নিশ্চয়তা। 

কৃষিতে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নতি চোখে পড়ার মতো। সে হিসেবে খাদ্যের উৎপাদন ও মজুদ জনসংখ্যানুপাতে আশাব্যঞ্জক। খাদ্য সংকটের কথাও মানুষ ভুলতে বসেছে। তারপরও লক্ষণীয় বিষয় গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে বাংলাদেশের পুষ্টি পরিস্থিতি সিরিয়াস (গুরুতর) শ্রেণিতে। বাংলাদেশ খর্বকায় শিশুর হার কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সেটা অর্জন করতে  খর্বত্ব  হ্রাসের পরিমাণ বছরে পাঁচ দশমিক তিন শতাংশ হওয়া উচিৎ, তার অনেক পেছনে আমরা আছি। লক্ষ্যণীয় বিষয় পৃথিবীতে প্রায় তিনজনের একজন ভুগছে অদৃশ্য পুষ্টিহীনতায়, অর্থাৎ পুষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি। অথচ এসডিজি’র দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো সব মানুষের জন্য বিশেষ করে দরিদ্র ও ক্ষুধার ঝুঁকিতে থাকা মানুষ এবং শিশুদের জন্য সারা বছর নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করা। এছাড়া ২০২৫ সালের মধ্যে অনূর্ধ্ব ৫ বছর শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি এবং মানসিক বিকাশের অন্তরায়সমূহ দুর করা এবং বয়ঃসন্ধিকালের মেয়েদের, গর্ভবতী মায়েদের, দুগ্ধদানকারী মায়েদের এবং সব বয়স্ক মানুষের পুষ্টির প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের অপুষ্টি দুর করা।

পুষ্টিহীনতা তথা নিরাপদ খাদ্যের অনিশ্চয়তা টেকসই উন্নয়নের অন্তরায়। বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও দেশের সব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা প্রধান বাধা। চারপাশে ভেজাল আর বিষাক্ত খাদ্যের দাপটে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা ধরনের ঘাতক ব্যাধিতে। শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যহত হচ্ছে। আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হয়েছি এবং ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হব। কিন্তু ব্যাধিগ্রস্ত ও অপুষ্ট মানুষের কাঁধে ভর করে এটা অর্জন করা কঠিন।

আমাদের পুষ্টিহীনতার পিছনে জীবনাচরণ অন্যতম বিষয়। এক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব রয়েছে। এখনো আমাদের খাদ্য তালিকায় শষ্যজাতীয় খাবারের প্রাধান্য রয়েছে। অথচ খাবারে ভিটামিন এ, জিঙ্ক ও আয়রনের ঘাটতিতে বাড়ছে রক্তস্বল্পতা, অন্ধত্ব এবং সংক্রামক রোগ, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যহত হচ্ছে, ঝুঁকিতে থাকছে অন্তঃস্বত্ত্বা নারী। পুষ্টিহীনতা রোধে বয়স  অনুযায়ী  সঠিক খাবার যথাযথ পরিমাণে থাকাটা জরুরি বিষয়। ভ্রূনাবস্থা থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে সুষম পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। কারণ এ সময়েই শিশু বিকাশের সব শর্ত তৈরি হয়ে যায়। শৈশব, কৈশোর ও বয়ঃসন্ধিকালের সঠিক বৃদ্ধি এবং পরবর্তীতে সুস্থ্য জীবনযাপনের জন্য যথাযথ মাত্রায় পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। কিন্তু পর্যাপ্ত খাবারের নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই এসব বিষয় ভাবেনা। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে অনেকেই সন্তানদের জন্য সঠিক খাবার নির্বাচন না করে ফাস্টফুড এবং বাজারের অস্বাস্থ্যকর খাবার কিনে আনেন। অথচ আজকের কিশোরী কিংবা তরুণীরাই আগামী দিনে সন্তানের মা। তাদের পুষ্টির ওপরই নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য।

সঠিক পুষ্টির মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। আমাদের খাদ্য গ্রহণে পুষ্টিমান বিবেচনায় না রাখাটা অসচেতনতার ফসল। হোটেলগুলোতে প্রচুর তেল, ঝাল মসলাযুক্ত খাবারের চাহিদা এটাই প্রমাণ করে আমরা কতটা অপরিনামদর্শী। আমাদের দেশের হল এবং মেসে থাকা বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী ও ব্যাচেলররা যে খাবার গ্রহণ করে তার মান খুবই নিম্ন পর্যায়ের। সহজপাচ্য, ভেজালহীন, পুষ্টিমানযুক্ত খাবারের অভাবে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কিভাবে আগামী দিনে জাতিকে নেতৃত্ব দেবে তা ভাববার বিষয়। 

খাদ্য আর পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য অপচয় রোধে সচেতনতা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। ফসল উৎপাদন থেকে আহার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে খাদ্য অপচয় যে কতভাবে হয় তা বর্ণনাতীত। এক সমীক্ষায় জানা গেছে, বিশ্বের জনগণ প্রয়োজনের তুলনায় ১০ শতাংশ খাবার বেশি খায় আর ফেলে দেয় আরো ৯ শতাংশের মতো। অকারণে খাদ্য অপচয় করা অনেকের কাছেই একটা সাধারণ ব্যাপার। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের বর্জ্যরে প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ অপচয়কৃত খাদ্য থেকে আসে। তাছাড়া ফসল উৎপাদন থেকে সংগ্রহ পর্যন্ত অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে যে অপচয় হয় তা উদ্বেগজনক।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৬৯৭ বার

Share Button

Calendar

September 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930