শিরোনামঃ-


» পূজা শব্দের নতুন অর্থ ও হরিজন সংঘ

প্রকাশিত: ০৯. অক্টোবর. ২০২০ | শুক্রবার

সৌমিত্র দেব

পূজা একটি সংস্কৃত হতে আসা বাংলা শব্দ । সনাতন হিন্দুদের পালনীয় একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে , হিন্দুধর্মে দেবতা, বিশিষ্ট ব্যক্তি অথবা অতিথিদের পূজা করার রীতি প্রচলিত রয়েছে। স্থান ও কালভেদে বিভিন্ন প্রকার পূজানুষ্ঠান এই ধর্মে প্রচলিত। যথা, গৃহে বা মন্দিরে নিত্যপূজা, উৎসব উপলক্ষে বিশেষ পূজা অথবা যাত্রা বা কার্যারম্ভের পূর্বে কৃত পূজা ইত্যাদি। পূজানুষ্ঠানের মূল আচারটি হল দেবতা ও ব্যক্তির আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য তাঁদের উদ্দেশ্যে বিশেষ উপহার প্রদান। পূজা সাধারণত গৃহে বা মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়। পূজার বিভিন্ন প্রকারভেদও রয়েছে। সে সব নিয়ে বিশদ আলোচনা আমার এই রচনার উদ্দেশ্য নয় । পূজা শব্দের একটি নতুন অর্থ আমি পেয়েছিলাম ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী অগ্নিপুরুষ নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামীর কাছে ।
আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে সিলেট শহরের চালিবন্দরে উমেশ চন্দ্র – নির্মল বালা ছাত্রাবাসে অগ্রজপ্রতীম দীপংকর মোহান্তের সঙ্গে গিয়েছিলাম । সেই ছাত্রাবাসের অধ্যক্ষ ছিলেন নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী । পাকিস্তান হওয়ার পর অনেক হিন্দু বিপ্লবী এ দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেলেও নিকুঞ্জ বাবু যান নি । বরং তিনি এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে এক সর্বজন শ্রদ্ধেয় আসন লাভ করেছিলেন । পাকিস্তান আমলে বিরূপ রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখেও পিছু হটে যান নি । এর যোগ্য সম্মান তিনি পেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ হবার পর । ১৯৭৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরাগান্ধী তাঁকে দিল্লীতে সংবর্ধনা দেন । এর পর থেকে বয়সের কারণে এই চিরকুমার হয়ে ওঠেন সকলের কমন দাদু । কিন্তু আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল সত্যিকার দাদু নাতির । কারণ, আমার ঠাকুরদাদা প্রমোদ চন্দ্র দেব এক সময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন । নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধা । আমার দাদুর অনেক গল্প আমি তাঁর কাছে শুনেছি । সেই নিকুঞ্জ দাদু একদিন এক মজলিশে বলেছিলেন পূজার নতুন অর্থ হলো পূ-তে পূন
আর জা -তে জাগরণ । পূজা উদযাপনের মধ্য দিয়ে হিন্দুরা পুনরায় জেগে ওঠেন । আসলে তারা কতটা জাগেন , বলতে পারি না , কিন্তু যুগ যুগ ধরে শোষিত দলিত , নিষ্পেষিত হিন্দু মেথর সমাজ যে নতুন করে জেগে উঠছে সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে ।
নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী মহাত্মা গান্ধীর অনুসারী ছিলেন । অহিংসার এই বরপুত্র ভালবেসে মেথরদেরকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন । গাল ভরা একটা নাম দিয়েছিলেন- হরিজন । প্রতিটি শহরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখেন এই হরিজনেরা । আর আমরা ওদেরকে দূরে রাখি । ওদের ছোঁয়া পেলেই আমাদের জাত যায় । তাই হিন্দু হয়েও মন্দিরে প্রবেশের অধিকার পায় না হরিজন সমাজ । আমাদের ছেলেবেলায় মৌলভীবাজার শহরে বিভিন্ন পাড়ায় হরিজনদের বস্তি দেখেছি । এখন আর সেগুলো নেই । ফরেস্ট অফিস রোডে আমার বাসার পাশেই ছিল মেথর পট্টি । সেখানে এখন মুক্তিযুদ্ধের কমপ্লেক্স ও স্মৃতিসৌধ । এর পাশে নদীর পাড়ে এখনো তাদের কিছুটা অস্তিত্ব আছে । কাশিনাথ রোডের বস্তি এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না । ক্লাব রোড থেকে উচ্ছেদ করে শহর থেকে দূরে মাতারকাপনে তাদেরকে নতুন করে বস্তি বানিয়ে দেয়া হয়েছে ।
আমার ছোটবেলার পূজার স্মৃতি খুব আনন্দের । আমাদের বাসার পাশেই ছিল সড়ক বিভাগের ডাকবাংলো । বাংলোর সঙ্গে ছিল বিশাল মাঠ । আমরা সেই মাঠে খেলতাম । আমার বাবা ছিলেন সড়ক বিভাগের বড় বাবু ।তাই অফিসের সবাই আমাকে স্নেহ করতেন । পূজা শেষে বিসর্জনের সময় সারা শহরের সব মণ্ডপের মূর্তি প্রসেশন করে এই ডাক বাংলোর মাঠে নিয়ে আসা হতো । পাশেই মনু নদী । বিসর্জন হতো সেখানে । সে ছিল এক অপূর্ব দৃশ্য । মাঠের সেই আনন্দে ভাগ বসাতে হরিজনদেরকেও কেউ বাধা দিতো না ।
কিন্তু এখন আর সেই মাঠ নেই । নতুন প্রজন্মের শিশুরা জানবে না যে এখানে এক সময় খেলা হতো । দেবতা বিসর্জন হতো । তবে হরিজন সমাজের কিছু তরুণ হরিজন সংঘ নাম দিয়ে এখনো পূজার আয়োজন করে । এই পূজাকে কেন্দ্র করেই যেন আরেক বার জেগে ওঠে তারা । আমি তাদেরকে অভিনন্দন জানাই । এই দলিত শ্রেণীর অধিকার বাস্তবায়নেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সার্থক হতে পারে । এদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই বঙ্গবন্ধু বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব  দিয়েছিলেন  ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৯২ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031