» প্রণব মুখোপাধ্যায় আর নেই

প্রকাশিত: ৩১. আগস্ট. ২০২০ | সোমবার

রেডটাইমস ডেস্ক

প্রণব মুখোপাধ্যায় আর নেই। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম ও একমাত্র বাঙালি রাষ্ট্রপতি । ছিলেন বাংলাদেশের বন্ধুও । মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

তিন সপ্তাহ দিল্লির আর্মি হসপিটাল রিসার্চ অ্যান্ড রেফারেলে চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার সন্ধ্যায় মৃত্যু হয় ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে সব পক্ষের শ্রদ্ধা পাওয়া এই রাজনীতিবিদের।

বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পাওয়ার পর গত ১০ অগাস্ট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন প্রণব। অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে তার শরীরে করোণাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। এক পর্যায়ে তিনি চলে যান গভীর কোমায়। সেখান থেকে আর ফিরতে পারেননি।

তার ছেলে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় সন্ধ্যায় এক টুইটে বলেন, দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আজ সবাইকে জানাতে হচ্ছে, আর আর হাসপাতালের চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা আর সমগ্র ভারতবাসীর দোয়া ও প্রার্থনার পরও আমার বাবা শ্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় এইমাত্র মারা গেলেন।

২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রণব মুখোপাধ্যায় ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষায় ছিলেন ‘আ ম্যান অব অল সিজনস’।

তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক টুইটে বলেন, ভারতরত্ন প্রণব মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে ভারত আজ শোকগ্রস্ত।

পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় কংগ্রেসে কাটানো প্রণবের পদধূলি নেওয়ার ছবি শেয়ার করে বিপরীত রাজনৈতিক দর্শনের দল বিজেপির নেতা মোদী লিখেছেন, দেশের উন্নয়নের গতিপ্রকৃতিতে তিনি এক অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে গেছেন। একজন অসাধারণ পণ্ডিত, এক গৌরবময় রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতির সব মহল আর সমাজের সব শ্রেণিতে তিনি শ্রদ্ধা পেয়েছেন।

একাত্তরে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভার সদস্য থাকাকালে তখনকার কংগ্রেস নেতা প্রণব যেমন মুক্তিকামী বাঙালির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমনি তিনি বাংলাদেশের বন্ধু ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েও। তার স্ত্রী রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী শুভ্রা মুখোপাধ্যায় ছিলেন বাংলাদেশের নড়াইলের মেয়ে।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধু হিসেবে ২০১৩ সালের ৪ মার্চ প্রণবের হাতে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের তখনকার রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান।

বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এক শোকবার্তায় বলেছেন, প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতির জন্যই এক ‘অপূরণীয় ক্ষতি’।

প্রণব মুখার্জি ছিলেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে প্রণব মুখার্জির ভূমিকা আমাদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনমত তৈরিতে তার ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

২০১৩ সালের ৪ মার্চ প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’২০১৩ সালের ৪ মার্চ প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ‘পরম সুহৃদ’ প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ‘অসামান্য অবদানের’ কথা স্মরণ করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে একজন ‘অভিভাবক ও পারিবারিক বন্ধুকে’ হারানোর কষ্টের কথা বলেছেন তার শোকবার্তায়।
“১৯৭৫ এর ১৫ অগাস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ভারতে নির্বাসিত থাকাকালীন প্রণব মুখার্জি আমাদের সবসময় সহযোগিতা করেছেন। এমন দুঃসময়ে তিনি আমার পরিবারের খোঁজখবর রাখতেন এবং যে কোনো প্রয়োজনে আমার ছোট বোন শেখ রেহানা ও আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। দেশে ফেরার পরও প্রণব মুখার্জি সহযোগিতা এবং উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি আমাদের অভিভাবক ও পারিবারিক বন্ধু। যে কোনো সঙ্কটে তিনি সাহস যুগিয়েছেন।”

শেখ হাসিনা বলেন, “প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে ভারত হারালো একজন বিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক নেতাকে আর বাংলাদেশ হারালো একজন আপনজনকে। তিনি উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন।”

প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে বুধবার রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় রাজনীতির ‘প্রণবদা’ অনন্য ছিলেন পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ নেওয়া আর বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষমতায়। ভারতীয় রাজনীতির বন্ধুর পথেও সবসময় তিনি ছিলেন শান্ত, স্থিতধী; বহুপক্ষীয় রাজনৈতিদক দর্শনে যার ছিল অসীম শ্রদ্ধা, যার প্রজ্ঞা, জ্ঞান, দক্ষতা আর স্মৃতিশক্তির প্রশংসা ছিল সব মহলে।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সামনের সারিতে থাকা এই রাজনীতিবিদ পার্লামেন্টেই কাটিয়েছেন ৩৭ বছর। ভারতের ইতিহাসে কংগ্রেসই সবচেয়ে বেশি সময় দেশ শাসন করেছে, আর প্রণব মুখোপাধ্যায় পালন করেছেন সরকারের বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং অর্থমন্ত্রীর গুরু দায়িত্ব।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিত এ বাঙালি রাজনীতিক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংকের বোর্ড অব গভর্নরসেও ছিলেন।

কিন্তু যে দায়িত্ব পাওয়ার প্রত্যাশা তার সবসময়ই ছিল, যেজন্য তার নামও উচ্চারিত হয়েছিল একাধিকবার, সেই প্রধানমন্ত্রিত্ব কখনোই ধরা দেয়নি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাতে।

কেউ কেউ বলেন, তৃণমূলের চেয়ে জাতীয় রাজনীতিতেই তিনি বেশি সক্রিয় থেকেছেন- এটা ছিল প্রণবের দুর্বলতা।

১৯৮৪ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নিহত হওয়ার পর প্রথমবার প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবিদার হিসেবে প্রণবের নাম সামনে আসে। আর দ্বিতীয়বার তার নাম উচ্চারিত হয় ২০০৪ সালে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে কংগ্রেস নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর। কিন্তু শিকে ছেঁড়েনি।

ইন্দিরার পুত্রবধূ কংগ্রেসনেত্রী সোনিয়া গান্ধী ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব তুলে দেন মনমোহন সিংয়ের হাতে। পরে এক সময় তিনি বলেছিলেন, নিজেকে ‘বঞ্চিত’ মনে করার যৌক্তিক কারণ প্রণব মুখোপাধ্যায়ের আছে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য যোগ্যতার দিক দিয়ে তিনি আমার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তবে তিনি এটাও জানতেন, এ বিষয়টা মোটেও আমার হাতে ছিল না।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৩৫ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031