» প্রতিহত নয়, পরিহার করাই বজ্রপাতে প্রাণরক্ষার একমাত্র উপায়

প্রকাশিত: ১৫. জুলাই. ২০২০ | বুধবার


রেজাউল করিম সিদ্দিকী

বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধানের ফলে বিদ্যুতের স্ফুলিংগ ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হওয়াকে বজ্রপাত বলা হয়। বজ্রপাতের ফলে যে উচ্চমাত্রার বৈদ্যুতিক বিভব সৃষ্টি হয় তার প্রভাবে তার পতনস্থলে অগ্নিকাণ্ডসহ গাছপালা ও জীবজন্তুর প্রাণহানি ঘটতে পারে। বাংলাদেশে মার্চ থেকে মে এবং অক্টোবর থেকে নভেম্বর এই সময়ের মধ্যে বজ্রপাতের হার সবচেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বজ্রপাতের ফলে প্রাণহানির সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকার বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

বজ্রপাত প্রতিহত করা বা একে থামানোর মতো কোনো প্রযুক্তি এখনো পর্যন্ত মানুষের হাতে নেই। তবে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করে এর থেকে জানমালের ক্ষয় ক্ষতি কমানো যেতে পারে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ঝড় বৃষ্টির পাশাপাশি বজ্রপাতেরও পূর্বাভাস দেওয়া হয়ে থাকে। তাই নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানতে হবে এবং বজ্রপাতের সম্ভাবনা থাকলে ঘরে অবস্থান করতে হবে।

বজ্রপাতের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এই যে এটা সম্ভাব্য কোনো স্থানের সবচেয়ে উঁচু এবং সংকীর্ণ বা সরু বস্তুতে আঘাত করে। তাই বজ্রপাতের সময় উঁচু গাছ বা বৈদ্যুতিক খুটির নীচে আশ্রয় নেওয়া বা অবস্থান করা যাবে না। এ সময় বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় থাকলে দ্রুত ঘরের ভিতরে অবস্থান নিতে হবে। কোনো ধাতব বস্তু যেমন জানালার গ্রিল বা ধাতব রেলিং স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এমনকি এসময় ল্যান্ডলাইন টেলিফোন স্পর্শ করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।

বজ্রপাতের সময় কোনো কারণে ঘরের বাইরে অবস্থান করলে কানে আঙ্গুল দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে পড়তে হবে, তবে শুয়ে পড়া যাবে না। এসময় ভেজা ও চামড়ার জুতা পরিহার করে বিদ্যুৎ অপরিবাহী রাবারের জুতা ব্যবহার করতে হবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে খালি পায়ে থাকা যাবে না। বজ্রপাতের সময় পানিতে অবস্থান করলে দ্রুত স্থলভাগে চলে আসতে হবে। এসময় কয়েকজন মিলে একসাথে অবস্থান না করাই ভালো।

পরস্পরের থেকে কমপক্ষে ১০-১৫ ফুট দূরত্বে অবস্থান নিতে হবে। গাড়িতে অবস্থান করলে খুব দ্রুত সম্ভব হলে গাড়িটিসহ কংক্রিটের ছাদের নীচে আশ্রয় নিতে হবে। এসময় গাড়ির কোনো ধাতব অংশ বা কাঁচ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

বজ্রপাতের সম্ভাবনা দেখা দিলে সকল বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম যেমন বৈদ্যুতিক লাইট, ফ্যান, টিভি, কম্পিউটার, ফ্রিজ, এসিসহ সকল যন্ত্রের সুইচ অফ করে এগুলো প্লাগ খুলে ফেলতে হবে। তারযুক্ত ইন্টারনেট সংযোগ ও ক্যাবল টিভির তার খুলে রাখতে হবে। বসত বাড়ির ডিজাইন করার সময় দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা নকশা প্রণয়ন করতে হবে। বাড়িতে ধাতব আর্থ সংযোগ বিশিষ্ট বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করতে হবে।

ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক থেকে বাংলাদেশ অত্যন্ত দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। ঝড় বৃষ্টির জলোচ্ছ্বাস বন্যা খরা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এদেশের মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, অধিকমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ, বায়ুমন্ডলে সি এফ সি গ্যাসের নির্গমন, ওজোন স্তর ক্ষয় হওয়া প্রভৃতি কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ ও তীব্রতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্রতীরবর্তী জেলাগুলো অবস্থান একটি উল্টানো ফানেল আকৃতির হওয়ায় বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট যেকোনো ঘূর্ণিঝড় প্রাকৃতিক নিয়মেই বাংলাদেশের উপকূলবর্তী জেলাগুলোতে আঘাত হানে। উপরন্তু দুর্বল অবকাঠামো এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কারণে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে এদেশের মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা অধিক পরিমাণে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতে প্রাণহানি বৃদ্ধি এই আশঙ্কারই বাস্তব প্রতিফলন। বজ্রপাতের ন্যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে তাই আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।

এজন্য বেশি করে বৃক্ষরোপণ করতে হবে। শিল্পায়ন ও অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রমে পরিবেশ সুরক্ষার দিকটি বিবেচনা করতে হবে সর্বাগ্রে। একই সাথে দুর্যোগের সাথে সহনশীল জনবসতি গড়ে তুলতে হবে। বজ্রপাতের ন্যায় অপ্রতিরোধ্য দুর্যোগের হাত থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য সমাজের প্রতিটি স্তরে পর্যাপ্ত জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। বজ্রপাতকে যেহেতু প্রতিহত করা বা থামিয়ে দেওয়া সম্ভব নয় তাই এর আঘাত থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে হবে নিজেদেরকেই। বজ্রপাতের সম্ভাবনা দেখা দিলে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে হবে। বজ্রপাতে প্রাণহানি রোধ করতে সরকার সম্ভব সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ঝড়-বৃষ্টির পাশাপাশি বজ্রপাতের পূর্বাভাসও দিয়ে থাকে। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস মোতাবেক আমাদের সম্ভাব্য সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। বজ্রপাতের হাত থেকে মানুষের প্রাণহানি প্রতিরোধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিভিন্ন জেলায় সড়ক-মহাসড়কের পাশে তাল বীজ বপন করার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলার সড়ক মহাসড়কের দুই পাশে রোপণ করা হয়েছে কয়েক লক্ষ তালগাছ। উল্লেখ্য যে তালগাছ শাখা-প্রশাখা বেহেন ও লম্বা হবার কারণে আশপাশের অন্যান্য স্থাপনার চেয়ে উঁচু হয়ে থাকে। আর যেহেতু বজ্রপাত সম্ভাব্য স্থান এর সবচেয়ে উঁচু শহর অবস্থিত আঘাত করে তাই এসব তালগাছে বজ্রপাতের আশঙ্কা অধিক পরিমাণে। একথা ঠিক যে এসব তালগাছ একসময় বড় হয়ে দিগন্ত-এর ধরবে পাতা আর বজ্রপাতের আঘাতে লাগবে এর গায়ে। ফলে আশপাশের জনবসতি রক্ষা পাবে সম্ভাব্য প্রাণহানি থেকে। তবে এটা সময়সাপেক্ষ কিন্তু কার্যকরী উপায়। এসময়ের মধ্যে আমাদের প্রয়োজনীয় সাবধানতা অবলম্বন করে নিজেদেরকে রক্ষা করতে হবে।

আর এদেশ যেহেতু ভৌগলিক অবস্থানগত কারণ একটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত, বজ্রপাতে তাই মৃত্যুহার এদেশে বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে এটাই স্বাভাবিক। তাই প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা এবং সম্ভাব্য সকল সাবধানতা অবলম্বনই হবে এই দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পাবার একমাত্র হাতিয়ার।

সরকার ইতোমধ্যে বজ্রপাতকে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর আঘাতে মৃত ব্যক্তির পরিবারকে প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে সরকারের পক্ষ হতে। অন্যান্য দুর্যোগের ন্যায় আবহাওয়া অধিদপ্তর বজ্রপাতের পূর্বাবাসও দিয়ে আসছে নিয়মিত। বজ্রপাতের হাত থেকে মানুষের প্রাণহানি প্রতিরোধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিভিন্ন জেলায় সড়ক মহাসড়কের পাশে তালবীজ বপন করার কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলার সড়ক মহাসড়কের দুই পাশে রোপন করা হয়েছে কয়েক লক্ষ তাল গাছ। উল্লেখ্য যে তালগাছ শাখাপ্রশাখাবিহীন ও লম্বা হবার কারণে আশপাশের অন্যান্য স্থাপনার চেয়ে উুঁচু ও সরু বস্তুকে আগে আঘাত করা। তাই এসব তালগাছ এক সময় বড়ো হয়ে দিগন্তে মেলে ধরবে পাতা, আর বজ্রপাতের আঘাত এসে লাগবে এর গায়ে। ফলে আশপাশের জনবসতি রক্ষা পাবে সম্ভাব্য প্রাণহানির থেকে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৬১ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031