» প্রথম জাতীয় হাছন উৎসব ও কিছু কথা

প্রকাশিত: ৩১. ডিসেম্বর. ২০১৮ | সোমবার

সৌমিত্র দেব

হাছন রাজাকে নিয়ে বহু উৎসব অনুষ্ঠান হয়েছে সুনামগঞ্জ ও সিলেটে। তিনি নিজেই তার জীবদ্দশায় উৎসব অনুষ্ঠানকে উৎসাহিত করতেন। তার গানের দল ছিল। তাদের নিয়ে সব সময় আনন্দে মেতে থাকতেন। তার মৃত্যুর পর থেকে উত্তরসূরিরা তাকে স্মরণ করে অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। পাকিস্তান আমলেও এর ধারাবাহিকতা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে হাছন রাজাকে নিয়ে অনুষ্ঠান কিছু আলাদা মাত্রা পায়। তাকে নিয়ে সংগঠন গড়ে ওঠে। বিশেষ করে নব্বই-এর দশক থেকে হাছন রাজাকে নিয়ে প্রতি বছর অনেক অনুষ্ঠান হয়। সুনামগঞ্জ শহরে একাধিকবার হাছন উৎসব হয়েছে। হয়েছে শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। শাবিপ্রবির এরকম একটি উৎসবে ১৯৯৯ সালে আমিও কবিতা পড়তে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। সেখানে সুনামগঞ্জ পৌরসভার তখনকার জনপ্রিয় চেয়াম্যান ও হাছন রাজার প্রপৌত্র মমিনুল মউজদিন-এর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেছিলেন, সম্ভব হলে সিলেট বিভাগের প্রতিটি জেলায় হাছন উৎসবের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু তা আর হয় নি ।তারপর বহু বছর সঙ্গে কোন যোগাযোগ ছিল না। এরই মধ্যে হাছন রাজাকে নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। কিন্তু উৎসবের নাম গন্ধ নেই । একদিন খবর পেলাম মমিনুল মউজদিন সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
তার কিছু দিন পর পরিচয় হলো মমিনুল মউজদিন-এর ছোট ভাই দেওয়ান সামারীন-এর সঙ্গে। তিনি বিলেত প্রবাসী। জানালেন মমিনুল মউজদিন-এর অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি দেশে এসেছেন। কি ছিল স্বপ্ন? হাছন রাজাকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জকে একটি সমৃদ্ধশালী জনপদ করার কথা ভেবেছিলেন মউজদিন। আর সে কারণে সুনামগঞ্জ শহরের প্রবেশ মুখে তৈরী করেছিলেন হাচন রাজা নামে একটি তোরণ। হাছন উৎসবের আয়োজন করেছিলেন একাধিকবার। সেই ধারাটিকে অব্যাহত রাখতে চান দেওয়ান সামারীন। আর সেজন্য কামনা করেন আমার সহযোগিতা।এভাবেই হাছন রাজার পরিবারের সঙ্গে আমি ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ি। হাছন রাজাকে নিয়ে সুনামগঞ্জে তার বাড়িতে একটি জাদুঘর তৈরি করেন সামারীন। আমি একাধিকবার সেখানে গিয়েছি। তখনই জানতে পেলাম , হাছন রাজার উত্তর পুরুষদের আর একটি অংশ যারা সিলেটের বিশ্বনাথ এলাকার বাসিন্দা তারাও হাছন স্মরণে অনেক কাজ করছেন। এদের মধ্যে প্রধান ভূমিকা নিয়েছেন দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। তিনি হাছন রাজা চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সিলেট শহরে গড়ে তুলেছেন ‘রাজাস মিউজিয়াম’। এছাড়া হাছন রাজার সম্পর্কে সর্ববৃহৎ পুস্তকটিও তিনি সম্পাদনা করেছেন।
হাছন রাজার উত্তরসূরিদের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব রচিত হয়েছে, টের পাই। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ ও বিশ্বনাথ শুধু ভৌগোলিক নয় মানসিকভাবেও তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। অথচ হাছন রাজা তার রামপাশা ও লক্ষ্মণশ্রী কোনটিকেই আলাদাভাবে দেখিননি। তাদের মধ্যকার দূরত্ব ঘোচানোর উদ্দেশ্যে বিশ্বনাথ ও সুনামগঞ্জের দুই পক্ষকে মিলে হাছন রাজা সম্পর্কিত একটি গ্রন্থ রচনায় উদ্বুদ্ধ করি। দেওয়ান সমশের রাজা ও দেওয়ান সামারীন মিলে রচনা করেন একটি গ্রন্থ “লোকের রাজা হাছন রাজা”। বইটি সম্পাদনার দায়িত্ব নেই আমি। প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয় জাতীয় প্রেসক্লাবে।
এতে উদ্বোধক ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এডভোকেট সুলতানা কামাল। ওই গ্রন্থ সম্পাদনা এবং অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে বুঝতে পারি দেওয়ান সামারীন সাংগঠনিকভাবে খুবই অগোছালো একজন মানুষ। তবু তার হাছন রাজা বিষয়ক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা অব্যাহত রাখি।
২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে দেওয়ান সামারীন বলেন, হাছন রাজাকে নিয়ে এবার উৎসব করব সিলেট শহরে। এতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বহু ব্যক্তি অংশ নেবে। সেই অনুযায়ী সিলেট শহরে আমি একটি প্রেস কনফারেন্স করি। ২০, ২১, ২২ ডিসেম্বর তিন দিন ব্যাপী জাতীয় হাছন উৎসব হবে। কিন্তু ডিসেম্বর মাস চলে আসার পরেও দেওয়ান সামারীনের ঘুম ভাঙ্গে না। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, সিলেট শহরে এই উৎসব করায় অনেক অসুবিধা আছে। তখন আমি তাকে বলি তাহলে জাতীয়ভাবে সেটা ঢাকায় করা হোক।
তিনি বলেন, ঠিক আছে। সেই অনুযায়ী আমি জাতীয় জাদুঘরে উৎসবের জন্য ২১ ডিসেম্বর বুকিং নেই। যেহেতু জাতীয় উৎসব সে কারণে সিলেট বিভাগের মন্ত্রীদের কথা না ভেবে অন্য জেলার একজন মন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করার কথা ভাবি। সম্মতি দেন পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। কাজ অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার পর দেওয়ান সামারীন বলেন, তিনি এই মুহূর্তে হাছন উৎসবের কথা ভাবছেন না।
বাধ্য হয়ে তাছাওয়ার রাজার সাথে কথা বলি। তিনি আগ্রহী হয়ে উঠেন। হাছন রাজা ফাউন্ডেশন ও অন লাইন সংবাদ মাধ্যম রেডটাইমস-এর যৌথ উদ্যোগে জাতীয়ভাবে প্রথম হাছন উৎসবের কাজ শুরু হয়। উৎযাপন পরিষদের আহবায়ক হন দেওয়ান তাছাওয়ার রাজা এবং সদস্য সচিব আমি। ২০ ডিসেম্বর ২০০৯ প্রায় সকল জাতীয় দৈনিকে পরের দিন হাছন উৎসব হবে এই সংবাদ ছাপা হয়। শিরোনাম ছিল-“ঢাকায় হাছন রাজা”।
দৈনিক প্রথম আলো ঐদিন আমার একটি মিনি সাক্ষাৎকারও প্রচার করে। পরের দিন অনুষ্ঠান হয়। তিল ধারণের জায়গা ছিলো না জাদুঘরের মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানের পরের দিনও প্রচুর সংবাদ ছাপা হয়। তার পরের দিনও প্রতিটি দৈনিকের সাপ্তাহিক বিনোদন পাতায় ছাপা হয় জাতীয় হাছন উৎসবের খবর। এই উৎসবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল হাছন রাজার গানের বিশুদ্ধ শিল্পী অশীতিপর বৃদ্ধ গায়ক আব্দুল লতিফকে আজীবন সম্মাননা ও স্বর্ণপদক প্রদান।
এছাড়া হাছন রাজাকে নিয়ে যেসব ব্যক্তি ও সংগঠন কাজ করেছে তাদেরকেও সম্মানান দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী দীর্ঘ ও সুললিত ভাষণ দেন। মূল প্রবন্ধ পাঠ করি আমি। সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী। এছাড়া আলোচক হিসেবে ছিলেন, অধ্যাপক নুসরাত সুলতানা ও ড. গোলাম মোস্তফা। বাংলা একাডেমীর মহা পরিচালক শামসুজ্জামান খান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মৃদুল কান্তি চক্রবর্তী নির্ধারিত আলোচক হলেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি। ভবিষ্যতে হয় তো আরো জাকজমকের সঙ্গে হাছন উৎসব পালিত হবে । কিন্তু প্রথমবারের এই আনন্দ আমাদের মনে চিরকাল রয়ে যাবে।

হাছন রাজার দার্শনিক গান

গানের রাজা হাছন রাজা। তার বেশিরভাগ গানেই আছে দর্শন। এখানে তার বেশ কিছু দার্শনিক গান তুলে ধরা হলো।


বিচার করি চাইয়া দেখি সকলেই আমি।
সোনা মামি। সোনা মামি গো। আমারে করিলায় বদনামি ॥
আমি হইতে আল্লা রছুল, আমি হইতে কুল।
পাগলা হাছন রাজা বলে তাতে নাই ভুল ॥
আমা হইতে আসমান জমিন আমি হইতেই সব।
আমি হইতে ত্রিজগৎ, আমি হইতে রব ॥
আমি আউয়াল, আমি আখের জাহের বাতিন।
না বুঝিয়া দেশের লোকে ভাবে মোরে ভিন ॥
আমা হইতে পয়দা হইছে, এই ত্রিজগৎ।
গউর করি চাইয়া দেখ হে, আমার ও মন ॥
আক্কল হইতে পয়দা হইল মাবুদ আল্লার।
বিশ্বাসে করিল পয়দা, রছুল উল্লার ॥
মম আঁখি হইতে পয়দা, আসমান জমিন।
কর্ণ হইতে পয়দা হইছে, মুসলমানী দিন ॥
আর পয়দা করিল যে, শুনিবারে যত।
সবদ, সাবদ, আওয়াজ ইত্যাদি যে কত।
শরীরে করিল পয়দা, শক্ত আর নরম।
আর পয়দা করিয়াছে, ঠান্ডা আর গরম ॥
নাকে পয়দা করিয়াছে খুশবয় আর বদবয় ॥
আমি হইতে সব উৎপত্তি হাছন রাজা কয় ॥
মরণ জিয়ন নাইরে আমার ভাবিয়া দেখ ভাই।
ঘর ভাঙ্গিয়া ঘর বানানি এই দেখিতে পাই ॥
পাগল হইয়া হাছন রাজা কিসেতে কি কয়।
মরব মরব দেশের লোক মোর কথা যদি রয় ॥
জিহ্বায় বানাইয়ি আছে মিঠা আর তিতা।
জীবনের মরণ নাইরে দেখ সর্বদাই জিতা ॥
আপন চিনিলে দেখ খোদা চিনা যায়।
হাছন রাজায় আপন চিনিয়ে এই গান গায় ॥


হাছন রাজায় বলে ও আল্লা ঠেকাইলায় ভবের জঞ্জালে।
বেভুলে মজাইলায় মোরে এই ভবের খেলে ॥
বন্ধের সনে প্রেম করিবার বড় ছিল আশা।
ভবের জঞ্জালে ফেলে করিলে দুর্দশা ॥
স্ত্রী হইল পায়ের বেড়ি পুত্র হইল খিল।
কেমনে করিবায় হাছন বন্ধের সনে মিল ॥
স্ত্রীপুত্রের মায়ায় রইলায় ভবেতে মজিয়া।
মরণ পরে স্ত্রী-পুত্র না পাইবায় খুঁজিয়া ॥
(আর) বাপ মইলা, ভাই মইলা আর মইলা মাও।
এর কিনা বুঝলায় হাছন এ সংসারের ভাও।
(আর) দিন গেল হেলে দুলে রাত্রি গেল নিন্দে ॥
ফজরে উঠিয়া হাছন হায় হায় করি কান্দে ॥
(আর) কান্দিয়া হাছন রাজায় কয় আরপীন নগর বইয়া।
দিবা নিশি আছি কেবল বন্ধের চরণ চাইয়া।


মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে।
কান্দে হাছন রাজার মন মনিয়া রে ॥
মায়ে বাপে বন্দী কইলা, খুশী র মাঝারে।
লালে ধলায় বন্দী হইলাম, পিঞ্জিরার মাঝারে ॥
উড়িয়া যায় রে ময়না পাখী, পিঞ্জিরায় হইল বন্দী।
মায়ে বাপে লাগাইয়া, মায়া জালের আন্দি ॥
পিঞ্জিরায় সামাইয়া ময়নায় ছটফট করে।
মজবুত পিঞ্জিরা ময়নায় ভাঙ্গিতে না পারে ॥
উড়িয়া যাইব শুয়া পক্ষী, পড়িয়া রইব কায়া।
কিসের দেশ কিসের খেশ, কিসের মায়া দয়া ॥
ময়নাকে পালিতে আছি দুধ কলা দিয়া।
যাইবার কালে নিষ্ঠুর ময়নায় না চাইব ফিরিয়া ॥
হাছন রাজায় ডাকব তখন ময়না আয়রে আয়।
এমন নিষ্ঠুর ময়নায়, আর কি ফিরিয়া চায় ॥


লোকে বলে, লোকে বলে রে, ঘর বাড়ী ভালা না আমার।
কি ঘর বানাইব আমি শূন্যের মাঝার ॥
ভালা করি ঘর বানাইয়া কয়দিন থাকব আর।
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার ॥
এই ভাবিয়া হাছন রাজায় ঘর দুয়ার না বান্ধে।
কোথায় নিয়া রাখবো আল্লায় এর লাগিয়া কান্দে ॥
হাছন রাজায় বুঝতো যদি, বাঁচব কত দিন।
দালান কোঠা বানাইত করিয়া রঙ্গীন ॥


আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে,।
আরে দিলের চড়ে চাহিয়া দেখ বন্ধুয়ার স্বরূপ রে।
কাজল কোঠা ঘরের মাঝে, বসিয়াছে কালিয়া।
দেখিয়া প্রেমের আগুন উঠিল জ্বলিয়া ॥
কিবা শোভা ধরে (ওরে) রূপে দেখতে চমৎকার।ৎ
(আর) বলা নাহি যায় বন্ধের রূপের বাহার ॥
ঝলমল ঝলমল করে (ওরে) রূপে বিজলীর আকার।
মনুষ্যের কি শক্তি আছে, চক্ষু ধরিবার ॥
হাছন রাজায় রূপ দেখিয়া, হইয়া ফানা ফিল্লা।
হু হু হু হু ইয়াহু ইয়াহু, বল আল্লা আল্লা।


আমি যইমুরে যাইমু আল্লার সঙ্গে।
ও আমি যাইমুরে যাইমু আল্লার সঙ্গে ॥
হাছন রাজায় আল্লা বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে ॥
আল্লার রূপ দেখিয়ে হাছন রাজা, হইয়াছে ফানা।
নাচিয়ে নাচিয়ে হাছন রাজায় গাইতেছে গানা ॥
আল্লার রূপ, আল্লর রঙ, আল্লারও ছবি।
নুরের বদন আল্লার, কি কব তার খুবি ॥
হাছন রাজা দিলের চক্ষে আল্লাকে দেখিয়া।
নাচে নাচে হাছন রাজা প্রেমে মাতয়াল হইয়া ॥
উন্মাদ হইয়া নাচে, দেখিয়া আল্লার ভঙ্গী।
হুস-মুস কিছু নাই, হইছে আল্লার সঙ্গী ॥
আদম ছুরত আল্লার জানিয়ায় বেসক।
খলকা আদমা আলা ছুরতেহি হক ॥
রূপের ভঙ্গী দেখিয়ে হাছন রাজা হইছে ফানা।
শুনে নারে হাছন রাজায়, মুল্লা মুন্সীর মানা।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৭৮ বার

Share Button

Calendar

January 2019
S M T W T F S
« Dec    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031