প্রসঙ্গ কোটা : যা কিছু ব্যক্তিগত

প্রকাশিত: ১২:০১ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০১৮

প্রসঙ্গ কোটা : যা কিছু ব্যক্তিগত

অদিতি ফাল্গুণী

বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম বর্ষে নন হজক্যান্স লিম্ফোমা রোগের তৃতীয় স্টেজে যখন শণাক্ত হই, তখন পুরো আট মাস জুড়ে পনেরো দিন ধরে টানা আর্ট কোর্স কিমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আমার ডান পা চিরতরে কিছুটা দুর্বল হয়ে যায়। তারপর থেকে স্বাভাবিক ভাবেই চারপাশের মানুষের ব্যবহারে নানা বদল দেখেছি। অদ্ভুত বিষয় হলো নিজের কাছেই মানুষের মন্দ কথা যা বা যতটা না খারাপ লেগেছে তার চেয়ে ঢের বেশি খারাপ লেগেছে অন্যের গায়ে পড়ে, অযাচিত করুণা বর্ষণ। এ্যাকশন এইডে যখন চাকরি হলো, দুই খুব প্রগতিশীল বড় ভাই আর বড় বোন বললেন, ‘তুমি কি ওখানে ডিজএ্যাবিলিটি সেক্টরে চাকরি করবে?’
তাতে আমি কিন্ত ক্রাচ ব্যবহার করি না। খানিকটা টেনে হাঁটি অসুখের পর থেকে যা নিয়ে আমার আদৌ কোন মাথা ব্যথা নেই- ওটুকুর জন্যই মাথা ভারি করে তাঁরা ভেবেছিলেন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ পেতে নিশ্চিত আমি ডিজএ্যাবিলিটি সেক্টরেই পেয়েছি (যেহেতু তারা তখনো এবং পরেও কোন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ পান নি)।

‘না- আমি জেন্ডার সেক্টরে কাজ করব।’
‘ও-’ তারা একটু চুপসে গেলেন যেন।

এ্যাকশন এইড যখন ছেড়ে দিচ্ছি, তখন এক ভদ্রমহিলা একদিন অফিসে এসে সব শুনেই বললেন, ‘আপনাকে একজনের ফোন নম্বর দিচ্ছি। উনি ডিজএ্যাবিলিটি সেক্টরে কাজ করেন।’

আমি শুনে মনে মনে মুচকি হাসলাম। এর পরবর্তী কাজটি করেছিলাম জাতিসঙ্ঘের পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রকল্পে। মাত্র চার মাসে ঘুরেছিলাম তিনটি পার্বত্য জেলার ১৮টি গ্রামে যা সেসময় ঢাকা অফিসের কোন ‘সুস্থ’ কর্মকর্তা অত কম সময়ে ঘোরেন নি। ২০১৫-এর জুলাইয়ে ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে শেষ কাজের পর একটি সার্জারির কারণে কিছুদিন বিশ্রামে ছিলাম। বাসা থেকেও চাইছিল না কঠিন পরিশ্রম আর দৌড়-ঝাঁপের উন্নয়ন খাতে আবার যোগ দিই। Autonomous এক প্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের কাজে বেশ কিছুটা সময় যখন মাঝে কাটালাম- দেখলাম ৯০ ভাগ বাঙালীরই মোহন ‘নিরিবিলি-নিশ্চয়তা’ কত প্রিয়! মেয়েদের জন্য ত’ দরকার ‘নিরিবিলি’ কাজ। সংসার করতে পারবে- ঢাকার বাইরে যেতে হবে না, ঘুরতে হবে না- রিল্যাক্সড। তোমার বয়স হচ্ছে, অদিতি। এই কাজই ভাল। হোক না টাকা কম। আরে তুমি না লেখক? নিরিবিলি- নিরিবিলি। তুমি মেয়ে। তুমি কিন্ত খানিকটা অসুস্থ্। রিল্যাক্স- রিল্যাক্স। রিল্যাক্স————রিল্যাক্স একসময় অসহ হয়ে উঠলো। কাজ খোঁজা শুরু করলাম। খুব অবাক হয়ে গেলাম যখন বিশ্ববাজারের এক কাজ হলো। তবে দেশটা যুদ্ধউপদ্রুত। বিমানযাত্রার দিন বাড়ির সবার প্রবল প্রতিরোধ। যাওয়া হলো না। এখন খানিকটা ক্ষীণ সূতোর উপর ঝুলছে সবকিছু। তবে এই ধাক্কায় আবার অ-নিরিবিলি আর দৌড়ঝাঁপের কাজের ভুবনে ঢোকার সুড়ঙ্গ পথটা খুলে গেল। আহা আমার মধ্যবিত্ত নিরিবিলি বাড়ি যেখানে আমার আগে কন্যা সন্তানরা শিক্ষকতা আর সরকারী কাজ ছাড়া কিছু করেনি- তারা চাইছে আবার আমি ফিরি ‘নিরিবিলি-নিশ্চয়তা’র পৃথিবীতে। আমার পূর্ব পুরুষ বা পূর্ব নারী কেউ কি ছিল তৈমুর লঙের ঘোড়সওয়ার দলের সহিস বা সেই দলের জিপসি নাচিয়ে মেয়ে? যে সব প্রতিবন্ধকতার ভেতর ‘কোটা’কে ফিরিয়ে দেয়? নিরিবিলি নিশ্চয়তাকে ফিরিয়ে দেয়? আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত যে পাহাড়ে ট্রেক করার স্বপ্ন দেখতো? ইন ফ্যাক্ট বড় দুই সার্জারির পরও বান্দরবানের রুমা আর থানচির পাহাড়ি পথে দু’মাইল হেঁটেছিলাম একদল মারমা ছেলে-মেয়ের সাথে…২০০২ সালে।

তারপরও কোটা থাকুক- জন্মগত যে প্রতিবন্ধী সে কি করবে? তার হয়তো লাগবে। লাগবে প্রবল বাংলা ভাষী রাষ্ট্রে সাঁওতাল-ত্রিপুরা-গারোর। আবার যে চাকমা অরণ্য ছেড়ে ঢাকার নাগরিক মধ্যবিত্ত হয়ে গেল, তার সন্তানের কোটার দরকার হবে না। ভারতে যেমন মধ্যবিত্ত হবার পরও নিম্নবর্ণের সন্তানও কোটা পেতেই থাকে সেটা আল্টিমেটলি প্রতিযোগিতায় সমান হবার আগুনটাই ভেতরে নিভিয়ে দেয়। সেটাও ঠিক না। মেয়ে হিসেবে বা কোন দূর্ঘটনা বা অসুখে দৈহিক শক্তি যদি কিছু কমেও যায়- তবু কেউ চেয়ার ছেড়ে দিলেই বসতে হবে? যতটা সময় পারা যায়, ততটা সময় অবশ্যই নয়। কোটা- কোটা- স্টিফেন হকিন্স- তাকে কোটা অফার করার দু:সাহস কার হবে? ভারতে আমার অঙ্কোলজিস্ট ছিলেন ড: আদভানি যিনি দশ বছর বয়স থেকে পোলিও রোগে হুইল চেয়ারড হয়েও বিশ্বের সেরা দশ জন ক্যান্সার স্পেশালিস্টের একজন ছিলেন। তার হুইল চেয়ার কে লিফটে ঠেলে নিয়ে যাবে সেটা নিয়ে টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে তরুণ ডাক্তারদের ভেতর ঠান্ডা লড়াই চলতো।

….তারপরও কোটা থাকুক মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবির দৌহিত্রীর জন্য, তারামন বিবির বংশধরদের জন্য।

ছড়িয়ে দিন