» প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা পূরণে এলএনজি

প্রকাশিত: ০৬. নভেম্বর. ২০১৮ | মঙ্গলবার

মো: রুবেল হোসাইন

প্রাকৃতিক গ্যাস বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি সম্পদ। দেশের মোট বাণিজ্যিক জ্বালানি ব্যবহারের শতকরা প্রায় ৭১ ভাগ এ গ্যাস পূরণ করছে। কিন্তু চাহিদার সাথে যোগানের তফাৎটা অনেক। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ২৭টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এ ক্ষেত্রগুলোতে ১৯৬০ সাল থেকে শুরু করে ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত গ্যাস উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১৫.২২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট এবং জানুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত উত্তোলনযোগ্য নিট মজুদের পরিমাণ ১২.৫৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলার সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী মোট গ্যাস মজুদের পরিমাণ ৩৯.৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট এবং উত্তোলনযোগ্য প্রমাণিত এবং সম্ভাব্য মজুদের পরিমাণ ২৭.৭৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এ গ্যাস সম্পদ আমাদের কতদিন চাহিদা পূরণ করতে পারবে? ভবিষ্যতে এ গ্যাস যখন আমাদের শেষ হয়ে যাবে তখন আমাদের বিকল্প উপায় কী হবে? এ চিন্তা থেকেই পরিকল্পনা এবং প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণ চাপ ও তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। রেফ্রিজারেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে তাপমাত্রা কমিয়ে মাইনাস ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনলে তা তরলে পরিণত হয়। এই তরল প্রাকৃতিক গ্যাসকেই বলা হয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সংক্ষেপে এলএনজি। সরকার এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প গ্রহণ করে এবং তা ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের আওতাধীন করে।

পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি এলএনজি রপ্তানি করে কাতার ও ইন্দোনেশিয়া আর সবচেয়ে বেশি আমদানি করে জাপান। এলএনজি বাণিজ্য মূলত কয়েকটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং এর ক্রেতা মূলত প্রথম বিশ্বের ধনী দেশ। বাংলাদেশ আজ একইসাথে এলএনজি রপ্তানি ও আমদানি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ করছে। আবার সেই টার্মিনাল হবে গভীর সাগরে, ভাসমান একটি টার্মিনাল। দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সরকারের এ উদ্যোগ খুবই যুগোপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এলএনজিতে মিথেনের পরিমাণ ৮৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। আমাদের দেশে যে এলএনজি আমদানি করা হবে সে গ্যাসের মান নিশ্চিতকরণে তিনটি টিম কাজ করবে। এগুলো হলো- ক্রেতা, পেট্রোবাংলার পক্ষে একটি; এলএনজি এদেশে বিক্রেতার পক্ষে একটি এবং অন্যটি ক্রেতা ও বিক্রেতার সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন কমিটি।

দেশে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ এর চাহিদা মিটাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদাও বাড়ছে। প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিদ্যুৎক্ষেত্রে গ্যাসের চাহিদা ৬০৭ বিলিয়ন ঘনফুট। শিল্পখাতে ১৯১ বিলিয়ন ঘনফুট ও গৃহস্থালির ব্যবহারের জন্য ১৩৩ বিলিয়ন ঘনফুট চাহিদা রয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট মিটাতে প্রথমবারের মতো এলএনজি আমদানি করতে কাতারের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি করে বাংলাদেশ ২০১৭ সালের জুলাই মাসে। ঐ চুক্তিতে বলা হয় যে, বছরে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করবে বাংলাদেশ।

এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ এগিয়ে চলছে। কাতারের সাথে এলএনজি আমদানির যে চুক্তি করা হয় সেই চুক্তি অনুযায়ী কাতার থেকে এলএনজিবাহী এক্সিলেন্স নামক জাহাজটি কক্সবাজারের মহেশখালীতে পৌঁছায় এপ্রিলে। আর এ চালানের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো এলএনজি যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। ২৭৭ মিটার দীর্ঘ ও ৪৪ মিটার প্রস্থবিশিষ্ট জাহাজটি বাংলাদেশের জন্য বহন করে নিয়ে আসে ১ লাখ ৩৬ হাজার ঘনমিটার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস।

জাহাজটি উপকূল থেকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে ভাসমান টার্মিনাল হিসেবে। ১৫ বছর পর্যন্ত বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি জাহাজ ভাড়া পাবে তারপর এটি বাংলাদেশের নিজস্ব মালিকানায় চলে আসবে। গ্যাস সঞ্চালনের জন্য এরই মধ্যে মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পর্যন্ত ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ৯১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পাইপলাইনের কমিশনিং সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন চলছে সীতাকুণ্ডু পর্যন্ত আরো ৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের কাজ।

এলএনজি আমদানির বিষয়টি অত্যন্ত প্রতিক্ষিত এবং বহুল আলোচিত । আমাদের দেশে যে গ্যাস সম্পদ আছে তা অফুরন্ত নয় । এ সম্পদ শেষ হওয়ার আগেই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন কারণ বিদ্যুৎখাতসহ ব্যবসাবাণিজ্য ত্বরান্বিত রাখা জরুরি। চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইতোমধ্যে ২৬৫টি শিল্প কারখানাকে এলএনজি সরবরাহের চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে এবং আরো ৩৫৭টি শিল্পকারখানার আবেদন পেট্রো-বাংলার কাছে পাঠানো হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের সক্ষমতা স্পষ্ট প্রতীয়মান। পেট্রোবাংলার মতে দেশে দৈনিক ৩৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ২৭৫ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ ছিল। এ ঘাটতি পূরণের জন্য দ্রুতই সদ্য এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই কক্সবাজারের মহেশখালিতে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২৯ বার

Share Button

Calendar

February 2019
S M T W T F S
« Jan    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728