শিরোনামঃ-


» প্রান্তিক মানুষের আস্থার প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার

প্রকাশিত: ০৭. জুলাই. ২০২০ | মঙ্গলবার


শহিদুল আলম মজুমদার

তৃণমূল থেকে উন্নয়নই হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের দর্শন। তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন ও অবাধ তথ্য প্রবাহ জনগণের ক্ষমতায়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। বিশেষ করে অনগ্রসর জনগণের মাঝে তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রার মানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনায়ন করা সম্ভব। তৃণমূল পর্যায়ে ব্যপক জনগোষ্ঠীর মাঝে তথ্যসেবা পৌঁছে দিয়ে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করে ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে ‘ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র (ইউআইএসসি)’ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। 

স্বপ্নের শুরুটা ছিল ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জননেত্রী শেখ হাসিনা’র নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্য দিয়ে। একই বছরের ১২ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে তাঁর কন্যা একবিংশ শতাব্দীর প্রযু্ক্তিনির্ভর বেগবান বৈশ্বিক উন্নয়নের সঙ্গে সংগতি রেখে দারিদ্র্য বিমোচন করে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে  দিন বদলের সনদ হিসেবে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কার্যালয় থেকে এবং নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)’র প্রশাসক হেলেন ক্লার্ক ভোলা জেলার চর কুকরি মুকরি থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র (ইউআইএসসি) স্থাপন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। যার বর্তমান নাম ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি)। ‘জনগণের দোড়গোড়ায় সেবা’ (Service at Doorsteps)-এ স্লোগানকে সামনে রেখে ইউডিসির যাত্রা শুরু হয়। ইউডিসি’র মূল লক্ষ্য হলো তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের তথ্যসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, যাতে এইসব প্রতিষ্ঠান ২০২১ সালের মধ্যে একটি তথ্য ও জ্ঞান-ভিত্তিক দেশ প্রতিষ্ঠায় যথাযথ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি এসব কেন্দ্র সরকারি-বেসরকারি তথ্য ও সেবা সমূহ জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যেতে, প্রযুক্তি বিভেদ দূর করতে ও সকল নাগরিককে তথ্য প্রবাহের আধুনিক ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখতে পারে।

ইউডিসির মাধ্যমে সহজে, দ্রুত ও কমখরচে সরকারি ও বেসরকারি সেবা পাবার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের জীবন মানের ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। ইউডিসি প্রতিষ্ঠার ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি অবাধ তথ্যপ্রবাহ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে, যেখানে মানুষকে আর সেবার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে না, বরং সেবাই পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের দোরগোড়ায়।

প্রথম দিকে কেউ কেউ অবাধ তথ্য প্রবাহের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের বিষয়টিকে ঠিক মতো বিশ্বাস করেনি, বরং কারও কারও মনে এটি নিয়ে সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বিষয়টিকে আস্থার সঙ্গে নিয়ে এ ঘোষণার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেছিল। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিষয়টি ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং তৃণমূল থেকে উঠে আসা একটি বিষয়। 

ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও শিল্পাঞ্চলে বর্তমানে ৫৮৭৫টি ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এ সকল সেন্টার স্থাপনের ফলে গ্রামীণ জনগণের অবাধ তথ্যপ্রবাহে অংশগ্রহণসহ দ্রুততম সময়ে তথ্য ও সেবা পাওয়ার পথ সুগম হয়েছে। জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হলেও উন্নয়নের পথ পরিক্রমায় বিগত ১০ বছরে এটি এখন হয়ে উঠেছে প্রান্তিক মানুষসহ সকল নাগরিকের সেবার আস্থার প্রতিষ্ঠান। 

তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় অতিদ্রুত ত্বরান্বিত হতে থাকে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া। একজন দরিদ্র কৃষক ইউডিসি থেকে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পাওয়ার মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায়িত হচ্ছে; এতে তার কৃষি উৎপাদন এবং আয় উপার্জন-দুটোই বাড়ছে। একজন সাধারণ নাগরিক উপজেলা বা জেলা অফিসে না গিয়েও জমির পর্চার নকলের জন্য আবেদন করতে পারছেন, যা তার সময়, শ্রম ও অর্থের সাশ্রয় ঘটাচ্ছে। একজন গ্রামের শিক্ষার্থী তার নিজ

গ্রামে বসেই এসএমএসর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারছেন। একজন অভিবাসী শ্রমিক ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে ইংরেজি শিখতে পারছেন। গ্রামে বসেই আত্মীয়-স্বজন প্রবাসীদের সাথে ও পরিবার-পরিজনের সাথে সকল ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসেও একজন সাধারন মানুষ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা নিতে পারছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্থানীয় দুর্যোগ পূর্বাভাস জানতে পারছেন।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থার পরিবর্তন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যাপার। এটি রাতারাতি একদিনেই সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পরিবর্তন করতে হয়। এক সময়ে মানুষ ইউনিয়ন পরিষদ খুব বেশি ব্যবহার করতো না। কেবলমাত্র গ্রাম্য সালিশ-বিচারের কাজে ইউনিয়ন পরিষদ মাঝে-মধ্যে ব্যবহৃত হতো। মানু্ষের ধারনাই ছিল, ইউনিয়ন পরিষদ নিয়মিত খোলা হয়না। ইউডিসি এ ধারনাকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে মানুষের প্রবেশ গম্যতা বেড়েছে। ইউডিসি স্থাপনের ফলে ইউনিয়ন পরিষদের সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছে। এভাবে ইউডিসি গ্রামীণ মানুষকে বিভিন্ন সেবা ও সরকারি তথ্য প্রদানের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদকে ‘কার্যকর ও জনগণের প্রতিষ্ঠান’-এ পরিণত করেছে।

ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার স্থাপনের ফলে সাধারণ নাগরিকগণ এখন সহজে, কম খরচে ও ঝামেলা মুক্তভাবে ১০০টি সরকারি ও ১৭০টি বেসরকারিসহ মোট ২৭০টি সেবা ইউডিসি থেকে পাচ্ছে। ইউডিসি থেকে এ পর্যন্ত মোট সেবার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫১.৬৬ কোটি। প্রতিমাসে গড়ে ৭৫ লক্ষের অধিক সেবা গ্রহণ করছে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ। ডিজিটাল সেন্টারে মোট উদ্যোক্তার সংখ্যা- ১১ হাজারের অধিক। এ পর্যন্ত ডিজিটাল সেন্টার হতে এজেন্ট ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে ৪ হাজারের অধিক সেবা গ্রহণ করছে। মোট লেনদেনের পরিমাণ ৮,০৭১ কোটি টাকার বেশি। মোট রেমিট্যান্স উত্তোলন ৭৫৬.৬২ কোটি টাকার অধিক। মোট উপকারভোগী ১২.৬৪ লক্ষের বেশি। ডিজিটাল সেন্টার হতে প্রদত্ত গ্রামীণ ই-কমার্স প্লাটফর্ম ‘একশপ’ এর মাধ্যমে মোট আয় ১২ কোটি টাকার অধিক। মোট ক্রেতা ৪.৫ লক্ষ জনের বেশি। মোট পণ্য ডেলিভারি ৬.২৫ লক্ষ টি। গ্রামীণ উৎপাদনকারী ১,৪৩৪ জন উক্ত সেবা গ্রহণ করছে।

পৃথিবীর অনেক দেশই পরীক্ষামূলকভাবে টেলি সেন্টার, ওয়ান-স্টপ-সার্ভিস এবং ইনফরমেশন সেন্টার চালু করেছে; কিন্তু এমন কোনো দেশের কথা জানা নেই যারা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে একযোগে উদ্বুদ্ধ করে সারাদেশে তথ্য কেন্দ্র স্থাপন এবং কেন্দ্রসমূহকে গণমুখী করতে পেরেছে। এর উদাহরণ একমাত্র বাংলাদেশ। ইউডিসি স্থাপনের মাধ্যমে জনগণের দোড়গোড়ায় সরকারি-বেসরকারি সেবা পৌঁছানো, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজ একসাথে সংঘটিত হয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় যা ছিল অচিন্তনীয় এবং বলতে বাঁধা নেই যে এটি বিশ্ব বাস্তবতায়ও অকল্পনীয়।

জনগণের দোরগোড়ায় সেবা এ স্লোগানকে সামনে রেখে ইউডিসির যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা আজ সফলতা অর্জন করেছে। জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে আস্থা ও নির্ভরতার প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপিত ইউডিসি। তাই ২০২১ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ হবে জ্ঞান চর্চা এবং এলাকার সকল প্রকার উন্নয়ন কর্মকান্ডের কেন্দ্র বিন্দু। অপরদিকে এর মাধ্যমে দেশে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চালু হয়েছে এবং অনিয়ম-দুর্নীতি নির্মূলে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে দেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৮৬ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031