» ফুটপাত বাণিজ্য ও নির্বিকার প্রশাসন

প্রকাশিত: ০২. আগস্ট. ২০১৮ | বৃহস্পতিবার

রমিজ উদ্দীন

সড়ক দুর্ঘটনার দেশ,বাংলাদেশ। সড়ক দূর্ঘটনা এদেশে এক মহামারী আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন গড়ে ২৬ জন মানুষ সড়ক- মহাসড়কে দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে মৃত্যু বরণ করে এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়ে আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে, যাপন করে এক অভিশপ্ত জীবন।
সড়ক দুর্ঘটনা আর পাবলিক ভোগান্তির একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করা। কিছু অসাধু ব্যক্তি বা সংগঠন শহরের রাস্তা-ঘাট ও ফুটপাত দখল করে গড়ে তুলেছে অবৈধ ব্যবসার এক বিশাল সা¤্রাজ্য। এ সা¤্রাজের ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্য করা যায় চট্টগ্রাম শহরে। এ শহরে অসাধু এ চক্রের প্রভাব প্রতিপত্তি অত্যন্ত ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। এখানে প্রশাসন নিজেই এ অসাধু চক্রের এক সদস্য হিসাবে কাজ করে। সাথে রয়েছে অসাধু রাজনীতিবীদদের ছত্রছায়া।

চট্টগ্রাম শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো যেমন- জিইসি, বহদ্দারহাট, ২নং গেইট, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, ইপিজেড, সিমেন্টক্রসিং , নিউ মার্কেট, কোতোয়ালী, লালদীঘি, টেরীবাজার, আন্দরকিল্লা, চকবাজার, পাঁচলাইশ ও মেহেদীবাগ সহ এসব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ভাসমান হকার্সরা প্রশাসনের সহায়তায় রাজনীতিবীদদের ছত্র-ছায়ায় রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে দীর্ঘদিন যাবৎ অবৈধ ব্যবসা পরিচালনার ফলে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনে এক চরম বিশৃংখলা ও ভোগান্তি বিরাজ করছে।
সাধারণ মানুষ ফুটপাতে হাটার সুযোগ পায় না, ফলে তারা যানবাহন চলাচলের রাস্তায় হাঁটা-চলা করতে বাধ্য হয়। ফলে বিভিন্ন ছোট বড় দূর্ঘটনা ঘটে থাকে এবং সাধারণ মানুষের জান মালের বিরাট ক্ষতি হয়।

বিভিন্ন সময়ে পত্রকিায় প্রকাশিত সংবাদরে ভিত্তিতে বলা যায় যে, অসাধু ব্যক্তি বা সংগঠন, প্রশাসন কে দৈনিক, সাপ্তহিক বা মাসিক মাসোহারা প্রদান করে থাকে নিবিঘেœ এসব অবৈধ ব্যবসা পরিচালনার জন্য। আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু অসাধু সদস্য নিজে স্ব-শরীরে গিয়ে বা নিয়োগ প্রাপ্ত লোক মারফত এসব মাসোহারা বা চাঁদা গ্রহন করে। দীর্ঘদিন যাবৎ চলে আসা এ সিস্টেমে কালান্তরে যোগ দিয়েছে অনেক শ্রমিক সংগঠন ও ভুঁইফোড় রাজনৈতিক সংগঠন। এ সংগঠন গুলো রাজনীতিবীদদের সহায়তায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনের সাথে বার বার মিটিং করে মাসোহারার সময় ও পরিমাণ নির্ণয় করে অনেক দর কষাকষি ও তর্কবির্তকের মাধ্যমে। এ সব ভাসমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জড়িত সংগঠনগুলো দখলকৃত রাস্তা ও ফুটপাতের পরিমাণ নির্ধারণ পূর্বক দৈনিক একটি চাঁদা আদায় করে দোকান বা জায়গা ভাড়ার নামে। এ টাকার একটি অংশ চলে যায় শ্রমিক নেতাদের পকেটে, রাজনৈতিক নেতাদের পকেটে আর বাকী অংশ প্রশাসনের পকেটে, এ যেন অন্যায় অসাধু ব্যবসার এক মহা মিলন-মেলা।

রাজনৈতিক নেতারা আবার এইসব অবৈধ ব্যবাসায়ী বা সংগঠন গুলো কে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করে, মিছিল মিটিং এ যোগদানে বাধ্য করে। যখন ঢাকা থেকে বড় কোন রাজনৈতিক নেত্রীবৃন্দ চট্টগ্রামে আসেন, তখন প্রচুর লোক সমাগমের উদ্দেশ্যে এদের কে ব্যবহার করা হয়। যেহেতু রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা ব্যবসা করে, সেহেতু রাজনৈতিক নেতাদের আদেশ মানতে বদ্ধপরিকর।

আবার অনেক সময় চাঁদার ভাগ বাটোয়ারা বা লেনদেনের কোন সমস্যা হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা উচ্ছেদের নামে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করে, যা অনেক সময় রক্তাক্ত সংঘাতের রূপ নেয়। এরপর কয়েকদিন থমথমে অবস্থা বিরাজ করে এবং পরবর্তীতে আবার রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে সবকিছু নরমাল হয়ে যায় এবং পারস্পরিক যোগসাজশে চলতে থাকে অবৈধ ব্যবসার এ মিলন-মেলা।

কিভাবে চলছে এ অবৈধ ব্যবসা উন্মুক্ত ভাবে সিটি কর্পোরেশন, সি.ডি.এ এবং পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায়, এ প্রশ্ন সাধারণ ভুক্তভোগী মানুষের।

দীর্ঘদিন যাবৎ চলতে থাকা এ অবৈধ ব্যবসার অবৈধ চক্র এতটাই শক্তিশালী যে, গতবছর সিটি কর্পোরেশন তাদের কে বিকাল ৫ টা থেকে ফুটপাত ও রাস্তায় ব্যবসা করার বৈধতা দেয়, যা আইনগত ভাবে কতটুকু বৈধ-জানা নেই।
সম্প্রতি লক্ষ করা গেছে ভাসমান এসব হকার্সরা দুপুরের পর থেকে দ্রব্য সামগ্রীর প্রসার সাজিয়ে বসে পড়ছে কোন রকম তোয়াক্কা না করে।

এসব কারণে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সাধারণ মানুষ, এসব এলাকার মার্কেটের স্থায়ী বৈধ ব্যবসায়ীগণ। পাশাপাশি এ কারণে তৈরী হচ্ছে দীর্ঘ যানজট, নষ্ট হচ্ছে শ্রম ঘন্টা ও জ্বালানী তেল, গ্যাস। বিশাল এক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে দেশ ও দেশের মানুষ। ধ্বংস হচ্ছে দেশীয় সম্পদ আর এতে সমগ্র দেশের মানুষের কাছে এবং পুরো পৃথবিীর কাছে নান্দনিক, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্যে ভরপুর চট্টগ্রামের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। চট্টগ্রাম হারাচ্ছে তার সম্ভাবনা, হারাচ্ছে তার গৌরব,হারাচ্ছে একটি পরিবেশ বান্ধব, পর্যটক বান্ধব ও বৈদেশিক ব্যবসা বান্ধব শহর হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ।

চট্টগ্রাম কে ও চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ কে এ সংকট থেকে রক্ষা করতে হলে, সমস্যার মূল জায়গায় যেতে হবে, আর উপরোল্লেখিত আলোচনা থেকে এ সংকটের মূল জায়গাটা আশা করি চিহ্নিত হয়েছে।

প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাব যদি না থাকে, তবে সহজে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে, বেদখলীয় রাস্তা ও ফুটপাতগুলো অবৈধ দখলমুক্ত করা যাবে, কমে আসবে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও পাবলিক ভোগান্তির পরমিান, স্বস্তি পাবে সাধারণ মানুষ আর নান্দনিক চট্টগ্রাম ফিরে পাবে তার হারানো ঐতিহ্য, হয়ে উঠবে বসবাসের আদর্শ নগরী ও বিদেশী বিনিয়োগের একটি নর্ভিরযোগ্য শহর হিসাবে।

আর এ জন্য প্রয়োজন যুগোপযোগী কঠোর আইন প্রণয়ন এবং আইনের শতভাগ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রসাশন কে নির্লোভ, আত্মসংযমি ও সেবা মূলক মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে, শতভাগ দূর্নীতিমুক্ত হতে হবে। আর রাজনৈতিক নেতাদের কে সততার সাথে কাজ করতে হবে। দেশপ্রেম শিখতে হবে, দেশ কে ও দেশের মানুষ কে ভালোবাসতে হবে।

পরিশেষে একটি স্বনির্ভর চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশ দেখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে লেখাটা এখানেই শেষ করছি।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪৭০ বার

Share Button

Calendar

July 2019
S M T W T F S
« Jun    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031