শিরোনামঃ-


» বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা প্রথম এলিজি কবিতার কবি কি আসাদ মান্নান?

প্রকাশিত: ১৭. আগস্ট. ২০২০ | সোমবার

বিশেষ প্রতিনিধি

১৯৭৫ সালে ১৬ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার প্রতিবাদে কবিতা লিখেছিলেন সেই সময়ের তরুণ কবি আসাদ মান্নান । সেটা ছিল ক্ষোভ ও আবেগ থেকে লেখা । কিন্তু এর পরে তিনি রচনা করেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম এলিজি কবিতা । তিনি রেডটাইমসকে বলেন , এ কবিতাটি অনেকটা কথাশিল্পী আবুল ফজল সাহেবের ‘‘ মৃতের আত্মহত্যা” গল্পের মতো রূপকধর্মী প্রতীকী কবিতা। এখানে আছে অনেক অলঙ্কার । উপমা রূপক প্রতীক। ১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে লেখা এ কবিতার জন্য আমি ‘‘ বাংলাদেশ পরিষদ সাহিত্য পুরস্কার” লাভ করি।

এটিই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখা প্রথম এলিজি কবিতা সেই কবিতাটির জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পুরষ্কারও লাভ করেছিলেন কবি ।
সত্তর দশকের অন্যতম কবি আসাদ মান্নান বলেন, আমার
রুচি ও স্বভাবের বিপরীতে এভাবে কথাগুলো বলবো কখনো ভাবতে পারিনি। কাউকে আঘাত করতে নয়, বরং শক্তি ও সাহস জোগাতে সবিনয়ে কথাগুলো বলছি। এতে কেউ যদি মনঃক্ষুণ্ন হয়ে থাকেন করজোড়ে ক্ষমা চাই। জাতির পিতার জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনের ক্ষেত্রে আমরা যাতে তথ্য বিভ্রাট না ঘটাই সে- জন্যে আমার এ সামান্য নিবেদন।


বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার বহু কবিতা আছে। আছে কিছু ব্যক্তিগত আবেগ স্মৃতি। বঙ্গবন্ধু ও কবিতাকে বুকে ধারণ ও লালন করে ১৯৯৪ সালে ৭ই মার্চ আমি কীভাবে উদযাপন করেছিলাম সে প্রসঙ্গে আমার একান্ত ভাবনা ও উদ্যোগের অন্যত্র বলেছি কিছুটা — এ ক্ষেত্রে সাক্ষী আছেন কবি – কলামিস্ট প্রিয় বন্ধু জাফর ওয়াজেদ। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখা আমার প্রথম কবিতা ‘সহসা আগুন জ্বলে যমুনার জল’ (১৯৭৫) কবিতা সম্পর্কে -এখানে সামান্য আলোকপাত করেছি। কারও অবস্থান বা অবদানকে খর্ব করতে কিংবা নিজের আত্মপ্রচার করার জন্য নয়। সত্য ও সুন্দরকে সমুন্নত রাখতে জীবনের অপরাহ্নে এসে কেন জানি আমার মন বলছে কথাগুলো আগামপ্রজেন্মর জন্য বলা দরকার। আমার বলার কিছু নাই– যদি কেউ দ্বিমত করেন করতে পারেন– স্বাগত জানাবো।
যদিও লিখা হয়েছিল প্রকাশের কয়েক মাস আগে, এ কবিতা বা এলিজি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘অন্তরে অনির্বাণ’ নামক একটি বিশেষ স্মারক সংকলনে– ১৯৭৭ সালে ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখে। প্রকাশকঃ বাংলাদেশ পরিষদ, তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়। এটি সম্পাদনা করেছিলেন বাংলাদেশ পরিষদ,ঢাকা কেন্দ্রের তৎকালীন পরিচালক( পরবর্তী কালে সরকারের অতিরিক্ত প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ) জনাব তোফাজ্জল হোসেন; যিনি ছিলেন একাধারে বিশিষ্ট ভাষা সংগ্রামী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, কবি, গীতিকার, মুক্ত চিন্তার অধিকারী একজন অসম্প্রদায়িক মনের মানুষ–ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছিলেন ‘একুশে পদক’। তাঁরই পুত্র হচ্ছেন কবি তারিক সুজাত ।
‘বাংলাদেশ পরিষদ’ তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, পাকিস্তান আমলে যা পরিচিত ছিল ‘পাকিস্তান কাউন্সিল’ নামে। অনেকটা বৃটিশ কাউন্সিলের আদলে তৈরি এ প্রতিষ্ঠানটি। বিভাগীয় শহরেও দপ্তর ছিল । মনে আছে কবিতাটি আমি প্রথমে পাঠ করেছিলাম জাতীয় পর্যায়ের একটি প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে –বাংলাদেশ পরিষদ মিলনায়তনে। এ অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট কবি-লেখকদের মধ্যে কবি আহসান হাবীব ,মিজানুর রহমান শেলী ও অন্য ২ জন বিচারকসহ সামরিক সরকারের উপদেষ্টা , সচিব ও বহু পদস্থ কর্মকর্তা এবং আমন্ত্রিত অতিথিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি কথা সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদ তাঁর অসুস্থতাজনিত কারণে অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি; তবে তিনি তরুণ কবি-লেখকদের শুভেচ্ছো জানিয়ে একটি বাণী পাঠিয়েছিলেন বলে মনে পড়ছে, যা পাঠ করা হয়েছিল। সাহিত্য পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান বলে কথা! আমি এসেছি চট্টগ্রাম থেকে। কবিতা, প্রবন্ধ, ছোট্ট গল্প ও একাঙ্কিকা প্রতিযোগিতায় যে ৪ জন জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষস্থান লাভ করে তারাসহ ৪ টি ক্ষেত্রে ঢাকা বিভাগীয় ও ঢাকা জেলার শীর্ষস্থান লাভকারী মোটট ১২ জন প্রতিযোগীকে অানুষ্ঠানিক পুরস্কার প্রদান করা হয়। এত বছর পর কেন জানি মনে হলো আমাদের মহান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বর্ষে প্রকৃত তথ্যকে সামনে আনা দরকার। দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর ধরে কবিতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত থাকা সত্ত্বেও বলতে সংকোচ করছি যে, প্রচার ও মিডিয়ার প্রতি উদাসীন থাকলে বাস্তবে যা ঘটে তা-ই ঘটেছে আমার এ এলিজি কবিতার ভাগ্যে। সত্য বলার সময় কি সমাগত? নীরব থাকা কি উচিৎ হবে না? কয়েকজন অগ্রজ কবি ও বন্ধুর তাগিদে আজ একটা ঘটনা বহুদিন পর হঠাৎ মনে পড়ল।

২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ তারিখ বাংলাদেশ পরিষদের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে আমি ও মাহমুদ কামাল– দুই কবিবন্ধু– বিকেলে যাই বাংলা একাডেমিতে — ওখানে সীমিত পরিসরে গ্রন্থ মেলা হচ্ছে । বাংলা একাডেমিতে সেদিনই আমার প্রথম যাওয়া। ওখানেই আমার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে দেশের নবীন-প্রবীন বিশিষ্ট কবিদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে যাদের নাম স্মরণে আসছে তারা হলেন সর্বকবি আসাদ চৌধুরী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, সমুদ্র গুপ্ত, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্, জাফর ওয়াজেদ, হালিম আজাদ, কামাল চৌধুরী, ওয়াহিদ রেজা, আলমগীর রেজা চৌধুরী,আহমেদ আজিজসহ আরও অনেক। মনে আছে, হালিম আজাদই সবাইকে আমন্ত্রণ জানালেন পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে “ড্যাফোডিল” আয়োজিত অনুষ্ঠানে কবিতা পড়ার জন্য। আমাকেও অনুরোধ করলেন।
সে সময় কবি মুহম্মদ নূরুল হুদাকে ঘিরে থাকতেন একদল তরুণ কবি। হুদা ভাই সদলে সেই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন । দলে আমি আর মাহমুদ কামালও ছিলাম। সে কী আনন্দ!

অনুষ্ঠানে স্মৃতি থেকে আমি এ কবিতাটি পড়েছিলাম। বেশ সাড়া পাই শ্রোতাদের কাছ থেকে।
৭৫ পরবর্তী সময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অজস্র কবিতা লেখা হয়েছে, এবং আগামীতেও হবে।
কিন্তু একটা কথা বলা দরকার এ কবিতাটির জন্য আমি সরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সেরা কবিতার পুরস্কার নিয়েছিলাম ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখে। এ কবিতাটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখা আমার ‘‘দ্বিতীয় কবিতা প্রথম এলিজি” । প্রথম কবিতাটি লিখেছিলাম ১৯৭৫ সালে ১৬ আগস্ট। রাগে ক্ষোভে প্রচণ্ড আবেগ ঢেলে। কবিতাটি প্রথম ছাপা হয় কবি মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরী সম্পাদিত সংকলন ‘এপিটাফ’-এ ১৯৭৮ সালে ১৫ আগস্ট। অতি কাঁচা হাতের কাঁচা কবিতা। কিছুটা দীর্ঘ। সবিনয়ে সেই কবিতার কয়েকটা পঙক্তি উদ্ধৃত করছিঃ-
‘‘স্বদেশেী কুত্তার পিঠে বিদেশী শকুন
বেশ্যার ছেলের হাতে ইতিহাস খুন
আগুন লেগেছে তাই যমুনার জলে
আগে আগে হনুমান রাম পিছে চলে
সীতাকে হরণ করে রাক্ষস রাবণ
টুঙ্গিপাড়ায় হবে বঙ্গভবন।”


কিন্ত ‘সবুজ রমণী এক দুঃখিনী বাংলা’ কোনো স্লোগানধর্মী বিবৃতি সর্বস্ব সরল কবিতা নয়; এটি একটি খাঁটি কবিতা, বিশুদ্ধ এলিজি– রূপকাশ্রয়ী একটি নান্দনিক প্রতীকী কবিতা । সত্যের খাতিরে আরও এখানে একটা প্রাসঙ্গিক তথ্য নিবেদন করছি যে, কবিতাটি ‘বিধবা রমণী এক দুঃখিনী বাংলা” শিরোনামে প্রতিযোগিতার জন্য জমা দেওয়ার সময় বাংলাদেশ পরিষদের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের তৎকালীন আবাসিক পরিচালক প্রয়াত কথাশিল্পী ও বিশিষ্ট অনুবাদক ফখরুজ্জামান চৌধুরীর পরামর্শে ‘বিধবা’ শব্দটি ‘ সবুজ’ শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়ে। জামান ভাইয়ের যুক্তি তখনকার প্রেক্ষাপটে ফেলে দেয়ার মত ছিল না। : সামরিক শাসনামলে এই কবিতা বিপদজনক বিবেচিত হবে ; কাজেই তিনি এ কবিতা নিতে পারবেন না। জামান ভাইয়ের কাব্যবোধ ও রুচি অত্যন্ত উঁচু মানের । তিনি বিধবা শব্দে আপত্তি জানিয়ে তার পরিবর্তে অন্য শব্দ বসাতে বললেন। আমি তাৎক্ষণিক ‘সবুজ’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করে তাঁর দপ্তরের প্রধান সহকারী আমিন ভাইকে টাইপ করে দিতে অনুরোধ করি। তিনি টাইপ করে দিয়েছিলেন। প্রতিযোগিতার থীম ছিল ‘একুশের চেতনা ও স্বদেশ ভাবনা’। ফখরুজ্জান চৌধুরী কবিতাটি পড়ে বলেছিলেন এটি সেরা কবিতা হবে। তার পরামর্শ অনুযায়ী কবিতাটি সংশোধন করে জমা দিয়েছিলাম। প্রতিযোগিতার শিরোনাম পরিবর্তন না করে ১৭ তম ‘চরণে’ মূলানুগ করে কবিতাটি আমার একান্ত সুহৃদ ও বন্ধুদের শেয়ার করছি। আশা করি তারাও কবিতাটি বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করবেন। কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদও দিচ্ছি, যা অনুবাদ করেছেন কবি ও কথাশিল্পী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর মোহীত উল আলম। প্রিয় মোহীত ভাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

সবুজ রমণী এক দুঃখিনী বাংলা।। আসাদ মান্নান

একটি দরোজা খুলে আমি গান শুনতে পেলে পৃথিবীর বুকে
ধূপের বিমিশ্র হাসি জননীর ঠোঁট ছুঁয়ে রক্তে ভেসে যায়;
মায়ের চোখের মতো কী নরম শব্দ এক আমার সম্মুখে
কেবল লাফিয়ে ওঠে–আমি তার জন্মদাতা –কেবল পালাই;
রাত্রির গুহায় শুয়ে অন্ধকার চারিদিকে দেখে চোখ মেলে,
সবুজ রমণী এক–নামহীন, জেগে আছে মেটে দীপ জ্বেলে।

একটি দরোজা খুলে বাতাসের বন্ধু হয়ে লোকালয় ছেড়ে
গভীর অরণ্যে দেখি– তসবি হাতে ধ্যানে মগ্ন বুড়ো চিতাবাঘ
হরিণ শিশুর খুরে স্বাধিকার বেঁধে দিলে তার লেজ নেড়ে
শিয়াল সাঁতার কেটে গঙ্গাজলে ভুলে যায় সব অনুরাগ;
স্বর্ণের আংটির মতো দরোজা সে খুলে দিয়ে হাত ইশারায়
দ্রুত পায়ে কাছে আসে– নামহীন, চোখে মুখে বুকে চুমু খায়।

সমস্ত দরোজা বন্ধ হয়ে গেলে নক্ষত্রের জামার মতন
একটি ক্যানারি পাখি উড়ে আসে জনকের ফসলের মাঠে;
লোবান জলের মধ্যে কিছু প্রেম ক্রন্দনের করে আয়োজন।
একটি দরোজা খুলে শুয়ে পড়লে অপরূপ অন্ধকার খাটে
বিধবা রমণী এক ভালোবেসে নাম লেখে আমার কপালে:
দুঃখিনী অবলা বাংলা– জন্ম তার কোনো এক একাত্তর সালে।

English Version :

The Green Lady is a Sad Bangla
Asad Mannan

When I open a door and hear music, it is on the earth
The unmixed smile of incense, touches the mother’s lips, dripping with blood;
The image of a word as soft as mother’s eyes dances in front of me,
It just jumps up, I give birth to it, and it flits away.
Lying in a cave at night, deciphering things around in the dark, my eyes meet—
The green lady is the one—nameless, awoke with a lighted lamp.

Opening a door and leaving the locality to befriend the wind,
I discern in the deep forest—a senile leopard busy meditating
With a string of holy beads in its paw.
While a deer wagged its tail as it tugged its fawn’s hooves into freedom.
And the fox swims in the Ganges being disregardful of all affections,
She opens the door ornate like a gold ring, and waves her hand at me,
And quickly approaches on her feet to plant nameless kisses on my eyes, face and chest.

When all the doors close up, as a star wears a robe,
A canary bird on fluttering wings lands on our father’s paddy field.
Some arrange for a show of inconsolable tears sprinkled with incense water
When I open a door and lie down on a nice little cot,
The widow scribbles her name on my forehead in love:
My helpless grief-stricken motherland—born in one seventy-one.

[Translated by Poet Mohit ul Alam]

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪০৯ বার

Share Button