শিরোনামঃ-


» বঙ্গবন্ধুর একটি অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

প্রকাশিত: ২৫. সেপ্টেম্বর. ২০২০ | শুক্রবার

 

নির্মলেন্দু গুণ

বঙ্গবন্ধু, আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার
আশায় ২৫ মার্চের সন্ধ্যায় অনেকের মতো
আমিও আপনার বাড়িতে এসেছিলাম।
কিন্তু ঐ দিন দেশ-বিদেশের সাংবাদিক ও
দলীয় কর্মীদের সঙ্গে কথা বলার জন্য
আপনি ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসেননি।
বাড়ির ভিতরের কোনো একটি কক্ষে
আপনি আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোপন-আলোচনায় ব্যস্ত
ছিলেন। ফলে ঐ কালসন্ধ্যায় আমি
আপনার দর্শন পাইনি।

: হ্যাঁ, ইয়াহিয়া সাহেব আমার সঙ্গে চলমান
আলোচনার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা
না করেই, আমাকে কিছু না জানিয়েই
গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন।
আলোচনার মাঝপথে ইয়াহিয়া খানের ঐ
হঠাৎ চলে যাওয়াটা আমাদের জন্য ছিল
একটা অশনি সংকেত।
আমার ধারণা হয়েছিল– ইয়াহিয়া খান
এবং ভুট্টো সাহেবরা আর আমাদের সঙ্গে
উর্দু, পাঞ্জাবি বা ইংরেজী ভাষায় নয়,
বাংলায় তো নয়ই,– তারা এবার আমাদের
সঙ্গে অস্ত্রেও ভাষায় কথা বলবেন।
যে অস্ত্রের ভাষায় ৬ দফার বিরুদ্ধে কথা
বলতে শুরু করেছিলেন ইয়াহিয়া খানের
পূর্বসূরী ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান।

: ঠিক তাই। আপনার বাড়ি থেকে বের হয়ে
যাবার কিছুক্ষণ পরই, রাত ১১ টার দিকে
অপারেশন সার্চ লাইটের সশস্ত্র আক্রমণ
শুরু হয়। আমি তখন আজিমপুরে ইডেন
কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম–
ছেলেরা গাছ কেটে রাস্তায় বেরিকেড তৈরি
করছিল। তখনই ঢাকার আকাশে শুরু হয়
গুলীর বজ্রবৃষ্টি। শুরু হয় পাকবাহিনীর
নির্বিচার গণহত্যা। অপারেশন সার্চ লাইট।
ওরা আক্রমণ চালায় পিলখানা ও
রাজারবাগে। জগন্নাথ হল ও সার্জেন্ট
জহুরুল হক হল থেকে ভেসে আসতে থাকে
এমনসব ভয়ংকর ও ভয়াবহ শব্দ, যা
আমরা পূর্বে কখনও শুনিনি।
টিএসসিতে তাঁবু খাটিয়ে ওরা নিকটবর্তী
রোকেয়া হল ও শামসুন্নাহার হলেও
প্রবেশ করেছিলো।

: আমি জানতাম, আলোচনায়
আমাকে ৬ দফা থেকে চুল পরিমাণ টলাতে
ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তানের মাথামোটা সামরিক
জান্তা ও তাদের সহযোগী ভুট্টো জাতীয়
সংসদ নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগের
কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে–
আমার নিরস্ত্র মানুষের ওপর হিংস্র হায়েনার মতো
ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমি চাইছিলাম,
বিশ্ববাসী তা দেখুক, জানুক।
আর্মি ক্রেকডাউন শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের
মধ্যেই আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা
ঘোষণা করলাম।
আমার ঐ স্বাধীনতার ঘোষণাটি প্রচার
করার জন্য আমি প্রস্তুত রেখেছিলাম
ইপিআর-এর একাধিক সদস্যকে। তারা
ট্রান্সমিটার নিয়ে আমার গ্রীন সিগন্যালের
অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলো।
ঐ ঘোষণাপত্রে আমি বলেছিলাম– “আজ
হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন”।
আমি বলেছিলাম “পাকিস্তানী দখলদার
বাহিনীর শেষ-সৈন্যটিকে বাংলার মাটি
হইতে বিতাড়িত না-করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত
বিজয় অর্জন না-করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে
যাও”।
তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকসেনারা
আমার বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং আমাকে
গ্রেফতার করে।
আমি জানতাম ওরা সর্বক্ষণ আমাকে
গুলীর মুখেই রেখেছিলো–। ওরা কিন্তু
আমাকে গ্রেফতার করতে চায়নি, ওরা
আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলো। ওরা
ভেবেছিলো আমি বাড়ি ছেড়ে পালাবো এবং
পালানোর সময় বত্রিশ নম্বরের
আশেপাশেই ওরা আমাকে গুলী করে হত্যা
করবে এবং বিশ্ববাসীকে বলবে আওয়ামী
লীগের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই শেখ
মুজিব উগ্রপন্থী আওয়ামী লীগারদের হাতে
নিহত হয়েছেন। তাতে বিশ্ববাসী বিভ্রান্ত
হতো। আমার জনগণও বিভ্রান্ত হতো।
আমি পাকিস্তানীদের এই পরিকল্পনাটি
বাস্তবায়িত হতে দেইনি।

আমি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের
নেতা, পূর্ববাংলার মানুষ আমাকে প্রাণের
মূল্যে ভালোবাসে। আমি কেন পালাবো?

: আমি আপনার ঐ বিচক্ষণ সিদ্ধান্তকে
সমর্থন করেছি।
নদীপথে পালাতে গিয়ে নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা
ভগবান গোলায় ধরা পড়েছিলেন।
আপনার কি মনে পড়েছিলো ঐ ঘটনাটির
কথা?

: আপনি কবি। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ।
আপনি ঠিকই ধরেছেন। হ্যাঁ, আমি
বাংলার শেষ-নবাবের জীবনের ভুলগুলি
থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলাম।

: বঙ্গবন্ধু, তখনও আপনি বঙ্গবন্ধু হননি
যদিও, আপনাকে আমি বঙ্গবন্ধু বলে
সম্বোধন করতেই ভালোবাসি, আনন্দ বোধ
করি।
১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তিসনদ ৬ দফা
ঘোষণা করার পর, ১৯৬৭ সালে আমি
আপনাকে উৎসর্গ করে একটি দীর্ঘ কবিতা
(প্রচ্ছদের জন্য) লিখেছিলাম।

: আপনি কি দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত
আপনার কবিতাটির কথা বলছেন?

: হ্যাঁ, ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর ঐ কবিতাটি
দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীতে
প্রকাশিত হয়েছিলো। আপনি তখন
বাঙালির মুক্তির সনদ “আমাদের বাঁচার
দাবি ৬-দফা কর্মসূচী” প্রদান করার জন্য
ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ছিলেন।
আপনিসহ আওয়ামী লীগের প্রায় তিরিশ
হাজার নেতাকর্মী তখন কারারুদ্ধ।
আপনার কাছে আমার কবিতাটি
পৌঁছেছিল বলে শুনেছি।
আপনি কি আমার ঐ কবিতাটি
সত্যিই পড়েছিলেন?

: হ্যাঁ, আপনার ঐ কবিতাটি আমি
পড়েছিলাম। একাধিক বার পড়েছিলাম।
খুব কঠিন কবিতা ছিলো ওটা। আমি খুবই
খুশি হয়েছিলাম। আমি বুঝেছিলাম আমার
দেয়া ৬ দফার মধ্যে পূর্ব বাংলার মানুষের
স্বাধীনতার যে-স্বপ্নবীজ আমি বপন
করেছি– একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন তরুণ
কবির চিত্তভূমিতে সেই স্বপ্নবীজ অংকুরিত
হয়েছে। আপনার কবিতার ছন্দটাও আমার
খুব ভালো লেগেছিলো।

: ধন্যবাদ বঙ্গবন্ধু।
আপনাকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়ে
প্রথম কবিতাটি লিখতে পেরে আমি খুব
আনন্দিত ও গর্বিত বোধ করি।
আমার প্রশ্ন, আপনি কেমন করে
বুঝেছিলেন যে, ঐ ৬ দফাই অনিবার্যভাবে
এক পর্যায়ে স্বাধীনতার এক দফায় পরিণত
হবে?

: আমি জানতাম। আমার ৬ দফা কর্মসূচীটি
ছিলো এমন যে, পাকিস্তানী স্বৈরশাসকরা
এই ৬ দফা গিলতেও পারবে না, আবার
উগলে ফেলে দিতেও পারবে না। আমি
চতুর শিয়ালকে কলসীতে দুধ খেতে
দিয়েছিলাম। গিললে ৬ দফা ভিত্তিক যে শাসনতন্ত্র তৈরি
হবে তাতে শুধু পূর্ব পাকিস্তান নয়, পশ্চিম
পাকিস্তানের চারটি প্রদেশও পূর্ব বাংলার
মতো স্বায়ত্বশাসিত প্রায়-স্বাধীন রাষ্ট্রে
পরিণত হবে।
এই ভয়েই পাকিস্তানীরা ছয় দফা ভিত্তিক
শাসনতন্ত্র গিলতে পারবে না।
আমি জানতাম নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও
তারা আমাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে
না। তারা অস্ত্রের ভাষায় কথা বলবে।
বলবেই।

: তারা আমার দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর
সশস্ত্র আক্রমণ চালাবে। তারা ৬দফার কবর
রচনা করবে, আর আমরা পাকিস্তানের
কবরের ওপর সৃষ্টি করবো আমাদের
‘মুক্ত ভূমন্ডল’– প্রোথিত করবো সবুজের
মাঝে লাল সূর্যখচিত স্বাধীন বাংলাদেশের
পতাকা।

: ধন্যবাদ প্রিয় বঙ্গবন্ধু, আপনার ৬ দফা
কর্মসূচী নিয়ে আমারও এরকমই ধারণা
ছিলো। ঐ কর্মসূচীর মধ্যেই নিহিত ছিলো
পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার বীজমন্ত্র।
১৯৭০ এর জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যা
গরিষ্ঠতা পাওয়াটা খুবই জরুরী ছিলো
আপনার দীর্ঘলালিত স্বপ্ন-পূরণের পথে
অগ্রসর হওয়ার জন্য।
আপনি কী বুঝেছিলেন, ১৯৭০ এর জাতীয়
নির্বাচনে আপনি ১৬৭ টি আসন পাবেন?

: হ্যাঁ, বুঝেছিলাম। আমি ছয় দফার পক্ষে
প্রায় ৬০টি জনসভা করেছি দেশের বিভিন্ন
প্রান্তে। আমি তাদের বুঝাতে পেরেছিলাম,
৬ দফাই হচ্ছে বাঙালির মুক্তিসনদ।
পূর্ব বাংলার বিপন্ন মানুষের সামনে এর চেয়ে
উত্তম কোনো বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচী
অন্য কারও ছিলো না।
তখন ভাসানী সাহেব বলেছিলেন, “ভোটের
আগে ভাত চাই”।
আমি বলেছিলাম– “ভাতের জন্যই ভোট
চাই”।
বাংলার মানুষ আমার কথা মেনে নিয়ে,
নির্বাচনে ভোট দিয়ে আমাকে তাদের নেতা
বানিয়েছেন। আমার ৬ দফার পক্ষে
পূর্ব বাংলার জনগণ রায় দিয়েছে।
রেসকোর্স ময়দানে জাতীয় সংসদের
নির্বাচিত সদস্যদের শপথ-গ্রহণ অনুষ্ঠানে
আমি বলেছিলাম– “ছয় দফার প্রশ্নে যদি
কেউ আপোষ করে, সে আমি হলেও, এই
রেসকোর্স ময়দানে আপনারা তাদের জ্যান্ত
কবর দেবেন।”

: আমার মনে আছে বঙ্গবন্ধু। আমি ঐ
শপথানুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম।

: আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ
এনে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা আমার
গলায় যে ফাঁসিটি পরাতে চেয়েছিলো, ঐ
ফাঁসির রজ্জুটাকে আমি বর্বর পাকিস্তানের
গলায় পরিয়ে দিয়েছি।

আজ আর কোনো কথা নয়, কবি। আমার
অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে।
আপনারা কবিরা জাতিকে স্বপ্ন দেখান।
সুন্দরের স্বপ্ন। স্বাধীনতার স্বপ্ন। আমরা
রাজনীতিবিদরা কবিদের সুন্দরের স্বপ্নকেই
বাস্তবে পরিণত করি। আমরা এখন
স্বাধীনতা পেয়েছি। এই স্বাধীনতার সুফল
বাংলার মানুষের ঘরে-ঘরে পৌঁছে দিতে না
পারলে, রক্তমূল্যে পাওয়া এই স্বাধীনতা
অর্থহীন হয়ে যাবে।

: ধন্যবাদ বঙ্গবন্ধু। আপনি আমার মতো
একজন সামান্য কবিকে অনেক সময়
দিয়েছেন। সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি
গর্বিত।

: না, না, এরকম বলবেন না। আপনি বয়সে
ছোট হতে পারেন, কিন্তু সামান্য কবি আপনি
নন। কীটস বা সুকান্ত তো অল্পবয়সে মারা
গিয়েছেন– কিন্তু কবি হিসেবে তারা তো
গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁদেরই সমগোত্রীয় কবি আপনি।
আপনি আপনার “হুলিয়া” কবিতায়
আমার নেতৃত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ
করেছিলেন–“শেখ মুজিব কি ভুল
করছেন?”
সামান্য কবি হলে আপনি না আমাকে
উৎসর্গ করে কবিতা লিখতে পারতেন, না
আমাকে নিয়ে এরকম সংশয় প্রকাশ করতে
পারতেন আপনার কবিতায়।

: আমাকে লজ্জা দেবেন না, বঙ্গবন্ধু। এখন
আর আপনাকে নিয়ে আমার মনে কোনো
সংশয় নেই।
আপনি এখন সকল সংশয়ের ঊর্ধ্বে।

: বঙ্গবন্ধু হো হো করে হাসলেন। পাইপে
অগ্নিসংযোগ করে সোফা থেকে উঠে
দাঁড়ালেন।
আমিও আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম।
তাঁর করস্পর্শ লাভের আশায় আমি তাঁর
দিকে বাড়িয়ে দিলাম আমার হাত।
তিনি আমার হাত ধরে দরোজার দিকে
অগ্রসর হতে-হতে বললেন–

: কবি, আমার জীবদ্দশায়, আমাকে নিয়ে
আপনিই প্রথম কবিতাটি
লিখেছিলেন। ঐ সময়ে “বিচ্ছিন্নতাবাদী”
শেখ মুজিবুর রহমানকে সমর্থন জানিয়ে
কবিতা লেখাটা আপনার জন্য বিপজ্জনক
হতে পারতো। তারপরও আপনি লিখেছেন।
আমি আপনার পবিত্র সাহসের প্রসংশা
করি।
আমার মৃত্যু কখন, কীভাবে হবে, আমি
জানি না।
তবে আমার মৃত্যু যেভাবেই হোক, যখনই
হোক–আমি জানি, আমার মৃত্যুর পরও
আপনিই আমাকে নিয়ে প্রথম কবিতাটি
লিখবেন।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১০৬ বার

Share Button