» বঙ্গবন্ধুর শেষ রাত

প্রকাশিত: ১৫. আগস্ট. ২০২০ | শনিবার

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শেষ রাত ছিলো ১৪ আগষ্ট, ১৯৭৫। আকাশ ভরা তারা ছিলো এদিন বাংলার আকাশে। গভীর রাত পর্যন্ত তিনি ব্যাস্ত ছিলেন। রাত আটটার মধ্যে ফিরে এসেছিলেন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে । তিনি জানতেন না যে এই রাতে রচিত হবে ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়।

মৃত্যু নিয়ে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন ভাষণে কখনো বলেছেন, ‘আমি মৃত্যুকে ভয় পাইনা’। ‘আমি মুসলমান। মুসলমান একবারই মরে, দুইবার মরে না’। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুকে ভয় পেতেন না। ভয় পেলে নিশ্চয়ই মৃত্যুর সামনে দাড়িয়ে বলতেন না ‘তোরা কি চাস’। তারপরই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর গুলি চালায় নরঘাতকেরা। নির্মম হত্যাকাণ্ডের এই রাতে পাশবিক হত্যাযজ্ঞ চলতে থাকে শেখ রাসেলেকে হত্যা করা পর্যন্ত। রাসেল বলেছিলো, ওরা কি আমাকেও মারবে! প্রেসিডেন্টের নব নিযুক্ত নিরাপত্তা প্রধান কর্নেল শাফায়াত জামিল বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার সবশেষ প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে ব্যার্থ হয়েছিলেন, তাকেও প্রান হারাতে হয়েছিলো।

শেখ মুজিবুর রহমান এতটুকু আশঙ্কা করেননি এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সেই রাতে। । বঙ্গবন্ধুর সাথে যারা দেখা করেছেন, শেখ কামালের সাথে যারা দেখা করেছেন তাদের অনেকের সাথেই আমার তৈরী হয়েছিলো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের ভিত্তিতে বিগত বিশ বছর আমি সংগ্রহ করেছি বঙ্গবন্ধুর শেষ রাতের সময়গুলো সম্পর্কে নানা প্রসঙ্গ।

শেষ রাত। জাতির জনকের শেষ রাত। কেউতো প্রস্তুত ছিলোনা এই নির্মমতার সাক্ষী হতে। ভাগ্যের এই করুন কাহিনীর বর্ণনা শোনা, লেখা, অনুধাবন করা আমাদের জন্য আজও শোকের এক বিষয়। আমরা কাঁদি, বিষন্ন হয়ে পরি, অসহায়ত্ব বোধ করি আজও।

বঙ্গবন্ধু খুব ক্লান্ত ছিলেন সেই রাতে। সুইজারল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সেই রাতে সাক্ষাত করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সাথে। কূটনীতিবিদ ওয়ালিউর রহমান যখন বঙ্গবন্ধুর কক্ষে প্রবেশ করছিলেন সে সময় সেখান থেকে বেড়িয়ে আসছিলেন কালো টুপিপরা খুনি মোশতাক, তোফায়েল আহমেদ সহ অনেকেই। এরপর ওয়ালিউর রহমানকে দেখে বঙ্গবন্ধু খুশি হলেন, বেশ আক্ষেপ করলেন। তিনি সুইস সংবিধান নিয়ে আসতে বলেছিলেন। সেটা আনতে ভুলে গিয়েছিলেন ওয়ালিউর রহমান। নিয়ে এসেছিলেন তার প্রিয় এরিনমোর। বঙ্গবন্ধু খুশি হলেন, রাগ করে বললেন ‘দুকৌটা কিনলে কেনো’। তারপর কৌটা থেকে কিছু তামাক পাইপে নিয়ে নির্মল বাতাসে ধুয়া ছেড়ে বঙ্গবন্ধু অনেক আক্ষেপ করলেন দেশ নিয়ে। মানুষজনের কর্মকান্ড নিয়ে।

বঙ্গবন্ধুকে অনেক ক্লান্ত মনে হয়েছিলো এসময়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের আর্মিকে নিয়ে বেশি কিছু ভাবছিলেন না, তিনি ভাবছিলেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে আরও সুরক্ষিত করতে। নেভির শক্তি বৃদ্ধি করতে বঙ্গোপসাগরে। পরদিন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সপরিবারে দাওয়াত দিয়েছিলেন ওয়ালিউর রহমানকে। সকালে গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে ওয়ালিউর রহমানের। ধানমন্ডি প্রকম্পিত করে নরপিশাচেরা হত্যাযজ্ঞ ঘটায় শেষ রাতে।

সেই রাতে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাত হয়েছিলো সাবেক ডেপুটি স্পিকার অধ্যাপক আলী আশরাফের। খুনি মোশতাকের সাথে কুমিল্লা আওয়ামী লীগের যথেষ্ট বিরোধ চলছিলো এসময় কর্মীদের। সেই বিষয়ে বঙ্গবন্ধুও অবহিত ছিলেন। সেই বিরোধের জের ধরেই বঙ্গবন্ধুর কক্ষে আলোচনা হয়েছিল সেই রাতে। এজন্য বঙ্গবন্ধুর কক্ষে দেখা করতে গিয়েছিলেন আলী আশরাফ সহ অনেকেই।

এদিকে পরদিন যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা দেয়ার কথা ছাত্রলীগ বিভিন্ন প্রস্তুতি নিচ্ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ক্যাফেটেরিয়াতে। গভীর রাতে সেখানে ছাত্রদের মাঝে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী আ ফ ম জাহাঙ্গীর, সাবেক সংসদ সদস্য ও ছাত্রলীগের সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ছাড়া অনেকেই। রাতে শেখ কামাল ছাত্রদের মাঝে উপস্থিত হলেন। কিছুক্ষণ ছাত্রদের সাথে কথা বলে তিনি ধানমন্ডি ফিরে যেতে চাইলেন। মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বললেন, ‘কামাল ভাই আপনি চলে গেলেতো ছাত্ররা ঘুমিয়ে পড়বে’। শেখ কামাল বললেন, ‘আমি খুব ক্লান্ত, সকালেতো দেখা হবেই, এখন যাই। তোমরাও বিশ্রাম নাও’। আ ফ ম জাহাঙ্গীর ছাত্রদের নিয়ে অপরাজেয় বাংলার প্রাঙনে ঘোরাঘুরি করছিলেন। ছাত্ররা তখন যে যার যার হলে, বাড়িতে ফিরে যাবার জন্য তৈরী হতে থাকে। কেউ কেউ সারা রাত পাহারায় থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারা ভেবেছিলো সকালে ঝটপট তৈরী হয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদান করবে। সকালে হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে জহরুল হক হল থেকে ছাত্রদের নিয়ে বের হয়ে এসেছিলেন আ ফ ম জাহাঙ্গীর হোসেন। এসময় বাইরে গিয়ে দেখতে পান নীলক্ষেত মোরে প্রচুর পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশ পথে সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। ছাত্রদের সাথে তাদের কথা হলো। পুলিশ ছাত্রদের হলে থাকতেই পরামর্শ দিলো। ছাত্ররা পাল্টা আঘাতের কথা ভেবেছিলো। কিন্তু সেদিন আওয়ামী লীগে কোন নেতৃত্ব ছিলোনা। সবাই শোকে বিহ্বল, নির্বাক-নিস্তব্দ। কোন প্রতিবাদ ছিলো না রাজপথে, অলিতে-গলিতে। চারপাশ থমথমে। ভয়ংকর এক অবস্থা তখন সারা দেশে। বঙ্গবন্ধুর লাশ বত্রিশ নাম্বার বাড়িতেই পরে থাকলো সকাল পর্যন্ত। আর্মি ঘিরে রেখেছিলো বাড়িটি। মানুষজনের স্বাভাবিক চলাচল তেমন লক্ষ্য করা যায়নি। কি ঘটছে সেটা নিয়েই সকলে চিন্তিত। আওয়ামী লীগের কর্মীদের মাঝে ভয়-আশঙ্কা দানা বাঁধতে শুরু হয়। রক্ষীবাহিনীর প্রধান নুরুজ্জামান কিছুদিন আগেই বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন। রক্ষীবাহিনীর কোন তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়নি দুপুর অবধি। বিভ্রান্তি আরো জোরালো হতে থাকে কর্মীদের মাঝে।
দুপুরের আগেই শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ নিয়ে যাওয়া হলো গোপালগঞ্জে। তড়িঘড়ি জানাজা পরিয়ে কবর দেয়া হলো। বিকেলে ধানমন্ডিতে মানুষজনের স্বাভাবিক দিনের মতোই চলাচল শুরু হয়। রিক্সা-বাস-গাড়ি নিয়ে মানুষজন বেড়িয়ে পরলো। থমথমে ভাবটি আর কোথাও প্রকাশ পেলো না।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিথর দেহ পরে রইলো গোপালগঞ্জের টুঙিপাড়ায়। কোথাও কোন প্রতিবাদ হলো না। সময় বহে চলতে থাকে এভাবেই বছরের পর বছর।

লেখক: সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৬৭ বার

Share Button