» বঙ্গবন্ধু আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন

প্রকাশিত: ২৪. আগস্ট. ২০২০ | সোমবার

আনিসুল হক, এমপি

বঙ্গবন্ধু জীবনের শুরু থেকেই একটি বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে রাজনীতি শুরু করেন। পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি শরিক হন ঠিকই কিন্তু পাকিস্তানের জন্মের পরই তিনি বুঝতে পারেন যে, তিনি যে মানুষগুলোকে ভালবাসেন, যে মানুষগুলোর দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার স্বপ্ন দেখেন এবং যে মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটাতে চান সেই মানুষগুলোর এবং তাঁদের বাসস্থান অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ববাংলার (বর্তমান বাংলাদেশের) কোন পরিবর্তন এই স্বাধীনতা এনে দিবে না। ঠিক এর পাশাপাশি তিনি মনে করেন যে, যারা পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন তাঁদের ভাবনা চিন্তার পরিবর্তনের পাশাপাশি ছাত্র সমাজকে একটি সংগঠনের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ করে তাঁর প্রিয় বাঙালিদের, তাঁর ভালবাসার বাঙালিদের ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াইয়ের জন্য তৈরী করতে হবে। তাহলেই তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হবে। ঠিক সেভাবেই বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অবকাঠামো তৈরী করেছিলেন। তিনি একপাশে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, অন্য পাশে আওয়ামী মুসলিম লীগের হাল ধরেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শুরু থেকেই নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কর্মপন্থা এবং কর্মসূচি জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য নির্বাচনের পথ অবলম্বনে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি সবসময় মনে করতেন জনগণই শক্তি, তাই জনগণের ক্ষমতায়নের মাধ্যমেই কেবল সোনার বাংলা গড়া সম্ভব। অধিকার প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হিসেবে নির্বাচন আর অধিকার হরণ করার আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক একটি বৈশিষ্ট। সেকারণেই ১৯৪৮ সালে বাংলাকে মাতৃভাষা না করার বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ভূমিকা রাখেন ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে জেলখানা থেকে নির্দেশনা দেন। এর অব্যবহিত পরেই তিনি ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৫৪ সালে তিনি প্রথমবারের মত কৃষি, ঋণ, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ১৯৫৬ সালে তিনি আবারও কোয়ালিশন সরকারের বাণিজ্য, শ্রম, শিল্প, সমাজকল্যাণ, সমবায় এবং দুর্নীতি দমন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরেও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্থ করার ষড়যন্ত্র বাংলার জনগণের কাছে উন্মোচিত হয়। বঙ্গবন্ধু পরিষ্কারভাবে বাংলার জনগণকে বোঝানো শুরু করেন যে, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের ভাগ্য উন্নয়ন করতে দিবে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব যতই বাংলাদেশের জনগণ গ্রহণ করছিল ও বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা যতই বাড়ছিল ততই তিনি পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুশূল হয়ে উঠছিলেন এবং তাঁকে পাকিস্তানের সকল সরকার কর্তৃক বারংবার কারাগারে পাঠানো হচ্ছিল। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা ঘোষণা করেন তখন আইয়ুব খান বুঝতে পারেন যে, বঙ্গবন্ধু তাঁর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পথে এগুচ্ছে। এটা বুঝতে পেরেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী করে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।
তবে বারংবার কারাগারে পাঠানো হলেও বঙ্গবন্ধু কখনোই কারাগার থেকে কারো দয়ায় বেরিয়ে আসেন নি। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আদালত থেকে মুক্তি নিয়েছেন তিনি। অনেক সময় জনগণের রোষানল থেকে বাঁচার জন্য সরকার তাঁকে মুক্তি দিয়েছে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেছিল যা পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে এবং বিচারকরা মামলার ঔঁফমসবহঃ-এ বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য এবং পদক্ষেপকে আইনসংগত বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
এখানে প্রথমেই আমি উল্লেখ করতে চাই বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা দুর্নীতির মামলার কথা যা করা হয়েছিল ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৯ সালে। এ মামলায় নিম্ন আদালতে বঙ্গবন্ধুকে সাজা দেওয়ার পরে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট ১৯৬৩ সালের জুলাই মাসে বঙ্গবন্ধুকে বেকসুর খালাস দেন।
এখান থেকেই পরিষ্কার বুঝা যায় যে, স্বচ্ছ ভাষায় বাংলার অধিকার রক্ষার কথা তিনি সবসময় মন্ত্রী হিসেবে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
তারপর ১৯৬৭ সালের আগস্ট মাসের ৯ তারিখে (আরেকটি রায়ে) পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ একটি বিভক্ত রায়ে উবভবহংব ড়ভ চধশরংঃধহ জঁষবং এর আওতায় বঙ্গবন্ধুর আটকাদেশ বৈধ বলে ঘোষণা দেন। এ বিশেষ বেঞ্চ- এ ছিলেন বিচারপতি জনাব বাকের, বিচারপতি জনাব আব্দুল্লাহ এবং বিচারপতি জনাব আব্দুল হাকিম। বিচারপতি আব্দুল্লাহ অপর দুইজন বিচারপতির সাথে ভিন্নমত পোষণ করে বঙ্গবন্ধুর আটকাদেশকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছিলেন।
এরপর আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে আরেকটি মামলার কথা উল্লেখ করতে চাই, সেখানেও বঙ্গবন্ধুকে আটক করা হয় এবং বিচারপতি জনাব আব্দুল হাকিম ৬ মে ১৯৬৯ সালের রায়ে বঙ্গবন্ধুর আটকাদেশ এবং দণ্ডাদেশ অবৈধ বলে রায় দেন।

বঙ্গবন্ধুর আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হচ্ছে ১০ মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি সংবিধান উপহার দেওয়া। সেই সংবিধানে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা ও সদ্য স্বাধীন দেশে ১৯৭৩ সালে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা।

বলতে লজ্জা হয় যে, ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট এদেশেই ঘাতকদের বুলেটে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের প্রায় সকল সদস্যের প্রাণ হারাতে হয় এবং এই খুনিদের রক্ষা করার জন্য ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ সালে একটি কালো আইন জারি করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার পেতে জাতিকে ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়। তার কন্যাকে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে হয় এবং ১২ই নভেম্বর ১৯৯৬ সালে সেই কালো আইনকে বাতিল করতে হয়। সাধারণ আইনে নিয়মিত নিম্ন আদালত থেকে উচ্চতম আদালতে ধাপে ধাপে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই বিচারকার্য শেষ করা হয় এবং রায় কার্যকর করা হয়। ৬১ জন স্বাক্ষীর স্বাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরেই আদালত খুনিদেরকে দণ্ডিত করে। হত্যার বিচার প্রক্রিয়াতেও সাধারণ মানুষের থেকে বঙ্গবন্ধু বিচ্যুত হন নি। জাতির পিতা হিসেবে সুবিধা নেননি। তাই এই মহামানব আজীবন বঙ্গবন্ধু। চিরকাল জাতির পিতা।

লেখকঃ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২১ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031