» বঙ্গবন্ধু : একটি কবিতার জন্মবৃত্তান্ত ও প্রাসঙ্গিক স্মৃতিচিত্র

প্রকাশিত: ০৩. সেপ্টেম্বর. ২০২০ | বৃহস্পতিবার


আসাদ মান্নান

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি আমাদের মহান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯২০সালের ১৭ই মার্চ এ মহামানব জন্ম লাভ করেন বৃটিশ ঔপনিবেশ ভারতবর্ষের পূর্ব বাংলার এক অজগ্রাম টুঙ্গিপাড়ায়। বাবা-মায়ের অতি আদরের ডানপিঠে একরোখা জেদী অথচ আশৈশব অসম্ভব মানব হিতৈশী অসম্প্রায়িক ‘খোকা’ ক্রমান্বয়ে এমনভাবে বেড়ে উঠলেন তাঁর মধ্যে হাজার বছর ধরে পরাধীন বাঙালি জাতির মুক্তিবীজ রোপিত হয়। সেই বীজ ধীরে ধীরে মহীরুহে রূপান্তরিত হয়, যার ফলে বাঙালি জাতি পেল একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন আবাসভূমি — বাংলাদেশ।কিন্তু এর জন্য তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। তিরিশ লক্ষ মানুষ একদিকে যেমন আত্মত্যাগ করেছেন, তেমনি স্বাধীনতা লাভের ৯৬৮ দিনের মাথায় জাতির পিতাকে হারোতে হযেছে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে দেশের জন্য সপরিবারে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে ।জাতির পিতার এ নির্মম মৃত্যুর দায় ও বেদনা জাতিকে কেয়ামত পর্যন্ত বহন করতে হবে। আমিও বহন করে আসছি ৪৫ বছর ধরে। শোকাবহ আগস্টে আমি বিনম্র চিত্তে জাতির পিতা ও তাঁর প্রিয় সহধর্মিনী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবসহ সেই কালো রাতে ঘাতকদের হাতে যারা শহীদ হয়েছেন তাঁদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং নিজের কিছুটা দায় মুক্তির জন্য আমার এ সামান্য লেখা।
জাতির পিতর জন্মশতবর্ষে তাঁর ৪৫ তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে শোকাবহ আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ১৯৭৬ সালে লিখিত আমার ‘ প্রথম এলিজি দ্বিতীয় কবিতা’ সম্পর্কে কিছু কথা বলা দরকার। এ জন্য দরকার যে, এর সঙ্গে প্রকৃত সময়-ইতিহাস ও সঠিক তথ্য প্রকাশের প্রসঙ্গটি জড়িত। এ সম্পর্কে বিশিষ্ট কবি ও গবেষক ড. আমিনুর রহমান সুলতানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে উদ্ধৃত করছি – ” সময়ের সাহসী উচ্চারণ নিয়ে কথা– এটি আত্মপ্রচার নয়, ইতিহাস নির্মাণের উপাদান।” তাই কী! যদি তা-ই হয় তবে বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করছি যে, আমার রুচি ও স্বভাবের বিপরীতে এভাবে কথাগুলো বলবো কখনো ভাবিনি। কাউকে হতাশ করতে নয়, বরং সবার মধ্যে ইতিহাসের শক্তি ও সাহস জোগাতে কথাগুলো বলছি।
কী বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে জাতি বিগত ১০ জানুয়ারি ২০২০ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে পুরাতন বিমানবন্দরে কী ব্যাকুল আনন্দ–উচ্ছ্বাস নিয়ে অধীরভাবে অপেক্ষা করছে। আমিও সেখানে আছি। প্রচন্ড আবেগ ও উত্তেজনায় কেউ বসে আছেন, কেউ বা দাঁড়িয়ে:- বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন স্বদেশের মাটি স্পর্শ করার মাহেন্দ্র ক্ষণ সমাগত।বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমান ধীরে ধীরে যথাস্থানে এসে দাঁড়ালো। বিমানের দরজা খুলতেই আলোর রস্মি হয়ে বঙ্গবন্ধু নামলেন। সবাই দাঁড়িয়ে তাঁকে সন্মান জানালেন। জাতীয় সঙ্গীত বাজলো, গার্ড অব অনার দেয়া হলো। তোপধ্বনি হলো। শত বেলুন ও পায়রা উড়ানো হলো। অপেক্ষার পালা শেষ হতে-না-হতে এক যোগে সারা দেশে ক্ষণ গণনা শুরু হলো– সেই থেকে ১৭ মার্চ ২০২০ তারিখে পর্যন্ত।
জাতির পিতার জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনের বিশাল কর্মসিূচি ঘোষিত হয়েছে। আমরা সৌভাগবান যে, জাতির পিতার জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনের নানা আয়োজনের ও উদ্যোগের অংশীজন হতে পেরেছি। প্রজন্মকে আমরা অন্তঃত এ কথা বলতে পারবো যে, কতিপয় ষড়যন্ত্রীর নির্মম শিকারে প্রয়াত হয়েও তিনি জীবিত আছেন প্রতি মুহূর্তে; কোনও মৃত্যুই বঙ্গবন্ধকে জাতির পিতাকে বাঙালি ও বাংলাদেশ থেকে নিশ্চিহ্ণ করতে পারেনি—পারবেও না। শুধু বাংলাদেশের নন, সারা পৃথিবীর দেশে দেশে সব বাঙালির একমাত্র নেতা তিনি যিনি বাঙালিকে ভাষা ভিত্তিক, জাতি ভিত্তিক একটি ভাষারাষ্ট্র জাতিরাষ্ট্র এনে দিয়েছেন অনেক ত্যাগ তিতীক্ষার বিনিময়ে; এমনকি সপরিবারে নিজের জীবনটাও উৎসর্গ করে গেছেন। পৃথিবীর ইুতহাসে এমন নজির আর একটাও পাওয়া যাবে না। এমন মহামানবের জন্মশতবার্ষিকী কী ভাবে উদযাপন করা হবে তা কি আর বলার প্রযোজন আছে ? প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যৃন্ত সমগ্র জাতি কী বিপুল সমারোহে একটা উৎসবে মেতে ওঠার অপেক্ষা করতে-না-করতে বৈশ্বিক মহামারীর থাবায় আনন্দ-আবেশ থেমে যায়– করোনার প্রাদুর্ভাব সবকিছু এলোমেলো করে দেয়; জাতির আবেগের রশিতে একটা অপ্রত্যাশিত অদৃশ্য টান পড়ে। তারপরও শতবর্ষ উদযাপন কমিটি নীরবে নিবৃত্তে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন; এর বাইরেও অনেক প্রতিষ্ঠান ও সুধীজন নিজ নিজ অবস্থান থেকে নানা ধরনের কাজ করে যাচ্ছেন। জাতীয় কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়।

আমাদের মনে রাখা দরকার যে, বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বর্ষ উদযাপন তো প্রতিবছর হবে না; উদযাপন কর্মযজ্ঞের নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিভিন্ন স্তরে যারা জড়িত আছেন তারাও অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন না। কাজেই এ সব করতে গিয়ে কোথাও কারও অগোচরে কিংবা কারও ক্ষণিকের অবচেতনে কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতি না ঘটে সেদিকে যত্নশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে যদি কোনও বিকৃতি বা বিভ্রান্তি তৈরি হয় তার দায় কিন্তু আমাদের সবার উপরে বর্তাবে। দেশের একজন ক্ষুদ্র নাগরিক হিসেবে এ থেকে আমিও নিস্কৃতি পাব না। যদি সত্যকে উন্মোচন করা না হয় তাহলে তা অন্ধকারে ঢাকা পড়ে থাকবে; অনালোচিত, চিরকাল অনালোকিত হয়ে কালের অতলে হারিয়ে যাবে। আমার কাছে যে তথ্য বহুদিন ধরে সংরক্ষিত আছে তা যদি প্রকাশ না করি তবে তার দায় আমাকেও নিতে হবে। তথ্য গোপন করার অপরাধে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এ ভার বহন করা আসলে কঠিন। আমি এ থেকে মুক্তি চাই।
জাতি অবশ্যই প্রত্যাশা করে: ইতিহাসের একটি স্থায়ী উপাদান সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই যার যার অবস্থান থেকে সতর্কতা অবলম্ভন করবেন , যাতে কোথাও কোনও ধরনের তথ্য বিকৃতি না ঘটে, কেউ যাতে কোনওরূপ বিভ্রান্তি ছড়াতে না-পারে । ভয় ও সংশয় : কোনও মানুষই ভুল ত্রুটি বা লোভের উর্ধে নন; ফলে কাজটি খুবই দুরূহ ।

২.
মহাকালের মহামানব বঙ্গবন্ধু; কিন্তু তাঁর জীবনের আয়ু খুব দীর্ঘ নয়। তাঁর জীবন-সংগ্রাম ও কীর্তিকে ঘিরে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে কত কথা কত ঘটনা কত শত তথ্য-উপাত্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তা নিরন্তর এক চলমান গবেষণার বিষয়। এ কাজটি কে বা কারা কীভাবে করছে তা জানার সুযোগ সবার নেই। থাকলে খুব ভালো হতো। সেগুলো কীভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা যায়? নিশ্চয় এ নিয়ে কেউ–না-কেউ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কিংবা ব্যক্তি উদ্যেগে কাজ করছেন। মূলতঃ তাদের কাজে সহায়তা দিতে এবং ইতিহাসের অকথিত রসদ যোগাতে আমার এ সামান্য কথাগুলো।
আমার বন্ধুরা অনেকেই জানেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার বহু কবিতা আছে। সত্তর দশকের শেষের দিকে বা আশি দশকের গোড়ার দিকে আমার অনেক কবিতায় নানাভাবে বঙ্গবন্ধু উঠে এসেছেন। সে-সব কবিতার উদ্ধৃতি দিতে পারলে ভালো হতো। এ নিয়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল। আমি জানি, সেই শৈশব থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার আছে কিছু ব্যক্তিগত আবেগ ও অলিখিত স্মৃতি। খুব দেরী হয়ে গেছে, বঙ্গবন্ধুর মহাজীবনে কত মানুষ কত ভাবে তাঁর সান্নিধ্যে এসেছিলেন তাঁদের স্মৃতি কথা থেকে অন্য এক বঙ্গবন্ধুকে যদি আমরা মহাকালের ভাণ্ডারে রেখে যেতেপারতাম! এখনও সময় পুরিয়ে যায় নি।
আশৈশব সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আমার একটা নিবিড় টান ছিল। সেই টান কতখানি তুমুল ও তীব্র ছিল সেটা এখানে নাই-বা বললাম; তবে বলা দরকার যে, শৈশব থেকেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও আদর্শের প্রতি সনিষ্ঠ অনুরাগের জায়গা থেকে মুহূর্তের জন্যও কেউ আমাকে একবিন্দু পরিমাণ সরাতে পারেনি;কখনো পারবে না। এটা আমার আদর্শ বা অহংকার যা-ই বলা হোক না কেন, আমি বরাবরই বিশ্বাস করে আসছি -‘‘কুয়াশা উপেক্ষা করে বসে আছে আশা।”– এ বিশ্বাস থেকে কখনও বিচ্যূত হইনি এবং হবো না । আপাতত এ নিয়ে এখানে বাড়তি কিছু না্ বলাই সমীচীন হবে।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার আনুগত্য ও ভালোবাসার তীব্রতা যে কত গভীর ও আবেগঘন সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত। এটা কাউকে বলা বা বুঝানোর বিষয় নয়। বললে সেটা কিছুটা আত্মপ্রচার তো বটে অপ্রাসঙ্গিকও হতে পারে; তবে আমার এ আবেগ ও ভালোবাসা সম্পর্কে কিছুটা ধারনা দিতে যতটুকু প্রযোজন ঠিক ততটুকু বলবো—বেশি কিছু বলবো না। একটা বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত প্রয়োজন বলে মনে করি। ঘটনা বা বিষয়টা অনেকের কাছে সামান্য হতে পারে, কিন্তু আমার বিবেচনায় এটি কোনও হালকা ঘটনা বা বিষয় ছিল না। তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষাপট এবং আমার পেশাগত অবস্থানের কারণে ব্যাপাটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং কিছুটা অপরিণামদর্শিতাও বটে। তারপরও ঘটনাটা ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলাম আমার দু’জন সহকবি কামাল চৌধুরী ও মোহাম্মদ সাদিকের আন্তরিক সমর্থনে। তাঁদের সমর্থন ও সাহসিকতার কাছে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। তবে এও সত্য এ দু’জন না থাকলেও ঘটনাটা আমি একাই ঘটাতাম, ঘটাত পারতাম; এবং সে-জন্যে আমি সেদিন আমার উর্ধ্বতন নিয়ন্ত্রণকারী অফিসারের কাছ থেকে অসুস্থ্যতার অজুহাতে ( কর্মজীবনে আমি যা কোনওদিন করিনি) ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। ঐ মুহূর্তে আমার ভেতরে এমন এক উত্তেজনা কাজ করছিলো যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছাড়া আমি আর কিছুই শুনতে পারছিলাম না। যেহেতু ভাবনা ও পরিকল্পনা আমার, কাজেই কেউ সঙ্গে থাক বা না আমাকেই একা বাস্তবায়ন করতে হতো। এ ক্ষেত্রে আমার কবিস্বভাব ও কবিতাসম্পর্কে যারা সম্যক অবগত আছেন তারা যেমন জানেন, সাদিক-কামালও ভালো জানেন।
১৯৯৪ সালের ৭ই মার্চ- – একটা দুর্বিসহ রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে পুরো জাতি। এমন পরিস্থিতিতে ৩ জন তরুণ সরকারি কর্মকর্তা ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দিবসটি উদযাপন করে। সবাই জানেন এই ভাবনা ও উদ্যোগটা ছিল একান্ত আমারই। এ কথা অন্যত্র বলেছি– যার সাক্ষী কলামিস্ট কবি বন্ধু জাফর ওয়াজেদ। সেদিন বিকেলে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের সবচেয়ে বেশি গৌরবের স্মৃতিময় সোহরাওর্দী জাতীয় উদ্যানে (রেসকোর্স ময়দান) সব ধরনের ভয়-ভীতিকে উপেক্ষা করে নীরবে আমরা তিন জন বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছি ফুল হাতে; স্মৃতি থেকে নিজ কবিতার পঙক্তিমালা পাঠ করেছি। কামাল চৌধুরী ও মোহাম্মদ সাদিক স্মৃতি থেকে তাদের বা অন্যের কবিতা পড়তে পারেন; কিন্তু আমি ঠিক তাদের বিপরীত । অন্যের কবিতা পড়তে ভালো লাগে, কিন্তু স্মরণে থাকে না। একসময় কবিতা লিখার পর প্রায় সব কবিতাই আমার স্মৃতিতে থাকতো। মনে আছে, সে-দিনেও আমি প্রাণ খুলে স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করেছিলাম কয়েকটি কবিতা। তন্মধ্যে ‘সবুজ রমণী এক দুঃখিনী বাংলা’, ‘সুন্দর দক্ষিণে থাকে’ ও ‘সহসা আগুন জ্বলে যমুনার জলে’কবিতা তিনটি উল্লেখযোগ্য। প্রকৃত কবিতার পাঠক বুঝতে পারবেন যে প্রথম দুটি কবিতার সঙ্গে শেষে উল্লিখিত কবিতার মেজাজ, কলা ও প্রকরণ সম্পূর্ণ আলাদা– কাব্যভাষার মধ্যে কোনও ধরনের মিল নেই। কবি হিসেবে যখন আমার কোনও পরিচিতিই ছিল না, তখনই ‘সহসা আগুন জ্বলে যমুনার জলে’ এ কবিতাটি লিখেছিলাম– রাগে ক্ষোভে প্রচণ্ড আবেগ ঢেলে । এ কবিতাটির কোনও কপি বহুদিন আমার কাছে ছিল না। কিছুটা দীর্ঘ কবিতা— পুরোটা মনে ছিল না । কিন্তু এ কবিতার মধ্যে ছয়টি পঙক্তি আমি কেন যেই পড়বেন তার মনে থাকবে। আমার মনে আছে, ‘সহসা আগুন জ্বলে যমুনার জলে’ শিরোনামের এ কবিতার অবিস্মরণী সেই কয়েকটি পঙক্তি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সেদিন আমি মুখস্থ পড়েছিলাম:-

‘‘স্বদেশেী কুত্তার পিঠে বিদেশী শকুন
বেশ্যার ছেলের হাতে ইতিহাস খুন
আগুন লেগেছে তাই যমুনার জলে
আগে আগে হনুমান রাম পিছে চলে
সীতাকে হরণ করে রাক্ষস রাবণ
টুঙ্গিপাড়ায় হবে বঙ্গভবন।”
আগেই উল্লেখ করেছি এ কবিতার কোনও কপি আমার কাছে ছিল না। কিছুটা দীর্ঘ কবিতা—পুরোটা মনে নেই । এটি লিখিত হবার প্রায় ৩ বছর পর ১৯৭৮ সালে ১৫ আগস্ট প্রথম ছাপা হয়েছিল কবি মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরী সম্পাদিত ‘এপিটাফ’-এ। দীর্ঘ ৩৭ বছর পর কবিতাটির মুদ্রিত কপির একটি ছায়ালিপি মিনারের কাছ থেকে ২০১৫ সালে পেয়েছিলাম। বলার অপেক্ষা রাখে না– কাঁচা হাতের কাঁচা কবিতা। কিন্তু উদ্ধৃত ছয়টি পঙক্তি আজও কারও কারও মুখে উচ্চারিত হয়; যেমন ‘এপিটাফ’-এর প্রসঙ্গ উঠলেই এখনও মিনার উচ্চারণ করে থাকেন্ উদ্ধৃত পঙক্তিসমূহ। মিনার ও দিলওয়ারকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই যে, যখন দেশের বিখ্যাত কবি-লেখক- বিদ্যাজীবীদের কাছে বার বার লেখা চেয়েও তরুণ সম্পাদকদ্বয় হতাশ হয়ে পড়লেন তখন আমি কিন্তু ধীরে ধীরে বিখ্যাত হয়ে উঠছি। আমার আজও মনে আজে আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালে বাংলা বিভাগে পড়ছি। বিভাগের একজন তরুণ কবি হিসেবে ইতিমধ্যে একটু একটু সুনাম ও পরিচিতি লাভ করি ;ঠিক সে-সময় একদিন বাংলা বিভাগে আসলেন মিনার। কাঁধে চটের সুদর্শন ঝুলি। এ ঝুলি কাঁধে মানে তিনি কবি। আমারও কাঁধে তখন ঝোলা ছিল। আমিও তো আরেক ধাপ এগিয়ে ছিলাম- পরনে নিয়মিত থাকতো পায়জামা-পাঞ্জাবি। মিনারকে আগে থেকে চিনতাম। কর্ণফুলী সাহিত্য আসরে প্রতি সপ্তাহে আমাদের দেখা হতো । এখানে প্রায় আসতেন খোরশেদ আলম সুজন। আমার বন্ধু—কবিতা লিখতেন তখন। এখন সার্বক্ষণিক রাজনীতি নিয়ে আছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। মিনার মনসুরকে দেখেছি সুজনের সঙ্গে প্রায় সময়।ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত দুজন। কবিতায় নিমগ্ন হয়ে পড়ার কারণে আমি তখন দলের সাংগঠনিক কাজ থেকে দূরে থাকি।
কবিতাই তখন আমার একমাত্র সঙ্গী। সম্ভবত ১৯৭৯ সালের প্রথম দিকে। মিনার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হতে আসে । একদিন জুলাই মাসের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধুর উপর আমাকে একটা কবিতা দিতে অনুরোধ করেন। মনে আছে, ৩/৪ দিন পর আন্দরকিল্লায় অবস্থিত কর্ণফুলী সাহিত্য কেন্দ্রে মিনারকে ‘সহসা আগুন জ্বলে যমুনার জলে’ হাতে লিখা কবিতাটি দিয়েছিলাম। আগস্ট মাসে কবিতাটি যে প্রেসে ছাপা হয় সেখানে আমিও গেছি ২/৩ বার। প্রুফ দেখে দিয়েছি। সে কী উত্তেজনা আমাদের তিন জনের। তিন বছর আগে লিখা কবিতাটি কী করে উদ্ধার হয়েছিল সে আরেক কাহিনী– অন্যত্র বলেছি। তবে একটা বিষয় ভেবে পাই না যে ১৯৭৯ সালে মিনার ও দিলওয়ারই মাইলফলক হিসেবে একটা অতুলনীয় সাহসী কাজ করেছেন — ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ নামে একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন দু’জনে । কিছুটা অবাক হয়ে দেখি যে, এই ঐতিহাসিক গ্রন্থে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে আমার কাছ থেকে কবিতা নেয়া হয়নি। ঢাকা-চট্টগ্রামের কোনও কোনও কবিকে নতুনভাবে যুক্ত করা হলেও কবিদের তালিকায় আমাকে রাখা হয়নি। মিনার বা দিলওয়ারকে কিশোর কাল থেকে যতটুকু জানি ওরা খুব আবেগী, ঈর্ষাতুর নয়। খুবই সজ্জন আদর্শ চরিত্রের দু’জন বঙ্গবন্ধুপ্রেমী জেদী তরুণ। আমি অবাক হয়ে এখনও ভাবি, উল্লিখিত আকর গ্রন্থে আমার কবিতা না-নিতে ওদেরকে কে বা কারা প্ররোচিত করেছিলনে? এতে কী আমার কবি হিসেবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছিল? মনে তো হয় না। একই সময়ের আর একটা কথা মনে পড়ছে। চট্টগ্রামের একজন দাপুটে সম্পাদক, যিনি কবিতাও লিখতেন তিনি ‘স্বনির্বাচিত’ নামে একটি দৃষ্টি নন্দন কবিতা সংকলন বের করেন, যাতে দেশের অনেকের কবিতা থাকলেও আমার কবিতা রাখেননি। কোন কাব্য বিবেচনা থেকে সম্পাদক মহাশয় তার মহা গুরুত্বপূর্ণ সংকলনে আমার কবিতা নেয়ার প্রযোজন বোধ করেননি তা আমার জানা নেই। সম্পাদক বলে কথা! অথচ সেই সময়ে কবি আহসান হাবীব-এর হাত দিয়ে আমার অনেক কবিতা দৈনিক বাংলার সাহিত্য সাময়িকীতে নিয়মিত ছাপা হয়েছে। অন্য কাগজের সাময়িকীতে। এটা আমি মনে করি না যে, ছন্দ-কলা ও প্রকরণঋদ্ধ কবিতা লেখার কৌশল আমার আয়ত্বে ছিল বলে তার মধ্যে হয়তো একটা নীরব ঈর্ষাবোধ কাজ করেছিল। সেসব দিনের স্মৃতি মনে পড়লে আজ আমার হাসি পায়! আমি জানি না, প্রিয় মিনার বা দিলওয়ারের সেই সম্পাদকের মতো কারও অশুভ ছায়া ভর করেছিল কিনা।বিষয়টা আমার জন্য একধরনের অস্বস্তির ও বিব্রতকর বলে মিনানের কাছে আমি ব্যক্ত করিনি তখনও এবং এখন তো নয়ই। আমার এই একান্ত বেদনা বা ব্যর্থতার বিষয়টিও একটি ঐতিহাসিক সত্য। শুধু সত্যের খাতিরে এতদিন পরে কথাগুলো বললাম।এটা অভিযোগ নয়, অভিমান। কবির অভিমান ক্ষমা করা যায়। আশা করি প্রিয় কবি মিনার মনসুর বা দিলওয়ার চৌধুরী তাদের অবচেতনের অনাকাঙ্খিত ভুলের জন্য কখনও বিব্রত হবেন না। শিল্প-সাহিত্যের জগতে আরও কত অস্বস্তির ঘটনা ঘটে এ গুলো মনে না রাখাই ভালো।
এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে। সম্ভবত ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে ‘বিধবা রমণী এক দুঃখিনী বাংলা’ নামে একটি খসড়া কবিতা লিখেছিলাম জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ ও ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের কবিতাগুলো পড়ার পর। মনে আছে, ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসের ১৫ তারিখ রতের বেলায় প্রচণ্ড এক আবেগ ও বেদনার মধ্যে এ কবিতাটি বেশ পরিমার্জন করে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছিলাম। এটি লেখার পর কোথাও ছাপানো বা পড়ার সুযোগ ছিল না। চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে পড়ার সুযোগ না পেলেও সেই সময়কার অন্তরঙ্গ ২/১ জন কবি বন্ধুকে শুনিয়েছি। তার মধ্যে আমার নিত্য সঙ্গী চট্টগ্রামের কবি ইউসুফ মুহম্মদ অন্যতম। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে ইউসুফ স্মৃতিচারণ করেছেন এইভাবে : ‘‘ ছিয়াত্তর সালের জুলাই কি আগস্ট মাস হবে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি-হাওয়ায় একদিন সকাল দশটার দিকে বসে আছি লালদীঘি পার্কে, পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী সেখানে আসে আসাদ মান্নান। তাকে আজ অন্যরকম মনে হলো, যেন কিছু একটা ঘটিয়েছে। মাকড়সার জালে আটকানো ফড়িঙের মত ফড়ফড় করতে করতে বললো, একটা কাজ করে ফেলেছি, দেখো– বলে পকেট থেকে এক সফেদ কাগজ বের করে পড়ে যেতে লাগলো কবিতা—“বিধবা রমণী এক দুঃখিনী বাংলা”। কবিতাটি দু‘তিনবার পড়ে শুনালো । শুনার পর বললাম, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখা এ কবিতা কোথাও ছাপালে বিপদ হবে। সে বললো, দেখা যাক। আমরা চলে যাচ্ছিলাম। এ সময় আসে কবি আবু মুসা চৌধুরী। আমরা কথা বলতে বলতে হাঁটতে থাকি। কাছেই লয়েল রোড, সেখানে একটি টি-স্টলে বসি, আরো বার কয়েক শুনা হয় কবিতাটি।” ১৯৭৭ সালে পুরস্কৃত হবার পর যে কোনও জায়গায় কবিতা পড়তে গেলে প্রথমেই আমি স্মৃতি থেকে এ কবিতাটি পাঠ করে আমার কবিতা পড়া শুরু করতাম। ১৯৯৪ সালে ৭ ই মার্চেও এই কবিতাটি স্মৃতি থেকে পাঠ করেছিলাম । মনে আছে, পরদিন ৮ই মার্চ কবিবন্ধু জাফর ওয়াছেদ এ নিয়ে দৈনিক সংবাদের প্রথম পৃষ্ঠায় বক্স আকারে একটি সংবাদ পরিবেশন করেছিলেন। প্রতিবেদনে আমাদের নাম ছাপানো হয়নি; শুধু লেখা হয়েছিল কতিপয় তরুণ কবি। পরবর্তীকালে ২০১৬ সালে দৈনিক জনকণ্ঠের চতুরঙ্গ পাতায় ‘জাগো কবি কোনঠে সবাই’ শিরোনামে আমার একটি স্মৃতিচারণমূলক নাতিদীর্ঘ লেখা প্রকাশিত হয়। কবি জাফর ওয়াজেদ এ নিয়ে জনকণ্ঠে একটি কলামও লিখেছিলেন। কেউ হয়তো মনে করতে পারেন এসব কথার সঙ্গে মূল প্রসঙ্গের যোগসূত্র কী! যোগসূত্র আছে। এসব উল্লেখ করার পেছনে একটা সঙ্গত কারণ আছে। আমি এখানে যে বিষয়ে কথা বলছি সে-সম্পর্কে আমার অন্তর্মানস ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ-দর্শনকে আমি নীরবে নিভৃতে কীভাবে ধারন করে আসছি সে-সম্পর্কে পাঠকদের সম্যক ধারনা দিতে এ তথ্যগুলো সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
৩.
কবি হয়ে ওঠার পেছনে সবার কোনও-না-গল্প আছে- সে-সব গল্প সবসময় চিত্তাকর্ষক নয়। আমারও তেমন গল্প আছে; তবে তা চিত্তাকর্ষক নয়— রক্তাক্ত বেদনার; তবে তা আমার জন্য গৌরবের এবং গর্বের। গর্ব ও গৌরবের এ জন্যে যে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রকৃত পক্ষে বঙ্গবন্ধুর জন্যই আমি কবি জন্ম লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন। সমগ্র জাতি স্তব্ধ-নির্বাক, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, শোকে মোহ্যমান । তা থেকে ১৭ বছর ৯ মাস ১২ দিন বয়সের আমি এ কিশোর নিজেকে রক্ষা করতে পারিনি। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ ৭ বছরের একজন কিশোর কর্মী সেই দুঃসহ দুর্দিনে কী আর করতে পারতাম!শুধু ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত হওয়া ছাড়া কিছুই পারিনি করতে। তবে হ্যাঁ, একটা কাজ করেছিলাম—অভিভাবকদের না-জানিয়ে ১৯৭৫ সালে অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি পরীক্ষা ড্রপ দিয়েছিলাম। শৈশব থেকে স্বচ্ছল কৃষিজীবী পরিবারেরে একজন মেধাবী ছাত্রের সুনামের অধিকারী ছাত্রের এরকম পরিণতিতে স্বজনেরা আশাহত হবেন, এটাই স্বাভাবিক।
তখন আমি থাকি পূর্ব মাদারবাড়ি এলাকায় বুবুর বাসায়। সিদ্ধান্ত নিলাম – আর পড়াশুনা করবো না; গ্রামের ছেলে গ্রামে ফিরে যাবো—সন্দ্বীপে। ১৯৭৬ সালের প্রথম দিকে সন্দ্বীপে চলে যাই।মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম আর শহরে যাবো না। আমি যে-স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করেছি কিছুদিন সেই সাউথ সন্দ্বীপ হাই স্কুলে খণ্ডকালীন অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছি। কিন্তু গ্রামেও ভালো লাগছিল না। মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। আবার চট্টগ্রামে ফিরে যাই। পরের দিন শুক্রবার বিকেলে উত্তর নালাপাড়ায় ‘কপোত খেলাঘর আসর’-এর সা্প্তাহিক বৈঠকে অংশ নিতে গেলাম। খেলাঘরের দপ্তর ছিল এর সংগঠক হোসেনে আরা রিজওয়ানা আপাদের বাসায়। ছোট বড় পরিচিত সবার সঙ্গে দেখা হলো। ছড়া-কবিতা–গান হচ্ছে শিশু কিশোরদের। আমি যাবার পরপরই একজন শিশুশিল্পীর কণ্ঠে দেশাত্মকবোধক এই গানটি :
‘‘ বিশ্ব কবির সোনার বাংলা
নজরুলের বাংলাদেশ
জীবনানন্দের রূপসী বাংলা
রূপের যে তার নেই কো শেষ
বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ…
আগেও গানটি ২/১ বার শুনেছি । শিল্পীর নাম মনে নাই। কিন্তু আজকের মতো নয়। এ গানের কয়টি চরণ ‘কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া গেল’। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে চিনি শিশুকাল থেকে। কিন্তু ‘জীবনানন্দকে জানতাম না। মনে একটু খটকা লাগলো। তারপরও গানটি শুনতে শুনতে মনটা ভারী হয়ে ওঠে। রক্তাক্ত আগস্টের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের হৃদয় বিদারক ঘটনা মনে ভেসে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, কিন্তু বঙ্গবন্ধু কোথায়? সবার মধ্যে থেকেও আজ কোথাও বঙ্গবন্ধু নেই– এতো এক দুঃখিনী বাংলা! আমার- আমাদের-বঙ্গবন্ধুর দুঃখিনী বাংলা। মনটা আমার বিষণ্ন হয়ে ওঠে। সেই থেকে ‘দুঃখিনী বাংলা’ আমার ভেতরে ঢুকে পড়ে—বাংলাদেশ আমার দুঃখিনী বাংলা।
সেই দিনের আসর শেষ। সবাই চলে যাচ্ছে। আমিও যাব। চলে যেতে উদ্যত হতেই আমার চোখ পড়ে রিজওয়ান আপাদের বইয়ের তাকের দিকে। আগেও দেখেছি- অনেক বই। এরকম বই আমি আর কারও বাসায় এর আগে দেখিনি। পুরো পরিবার খুব উঁচুমানের সংস্কৃতিমনা অসম্প্রদায়িক ঘরানার। রাশিয়াপন্থী সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী পরিবারের ছোটবড় সবাই। আপার বড় ভাই আহসান হাবীব লাবলু ছিলেন তখন ছাত্র ইউনিয়নের জেলা কমিটির স্বনামখ্যাত নেতা। বর্তমানে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা। অসম্ভব মেধাবী ও সজ্জন মানুষ লাবলু ভাই। ওনাদের আম্মাও ছিলেন একজন সংস্কৃতিমনা বিদূষী মহিলা। আমাদের প্রয়াত কবিবন্ধু মোশতাক দাউদীর খালা । খেলাঘরের সবাইকে খুবই স্নেহ করতেন। আমাকেও। তো বইয়ের তাকের কাছে গেলাম। আমাদের দেশের বিখ্যাত লেখকদের বইয়ের পাশাপাশি রুশ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার অনেক অনূদিত বই। বই দেথতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ে ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বইটি। তার মানে জীবনানন্দ দাশও রবীন্দ্র-নজরুলের মতো বড় কবি! আগে কখনো জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়িনি। তিনি যে একজন কবি, এটাও আমার জানা ছিল না। বইটি তাকে দেখে লোভ সামলাতে পারিনি। বইটি আমি নিতে পারি কিনা রিজওয়ান আপাকে জিগ্যেস করি। তিনি বললেন, এক শর্তে নিতে পারো- পরের সপ্তাহে নিয়ে আসবে। এ শর্তে আপা আমাকে কলকাতার দে’জ পাবলিশার্স কর্তৃক প্রকাশিত ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বইটি তাক থেকে নিয়ে আমাকে দিলেন। আমার আর আনন্দ ধরে না।
রূপসী বাংলার কবির কবিতা পাঠ করছি; আর ধীরে ধীরে আমি অন্য এক আমিতে রূপান্তরিত হয়ে উঠছি । নাওয়া-খাওয়া ভুলে সারাক্ষণ জীবনানন্দে বুঁদ হয়ে থাকি। অনেক কবিতা চলতে-ফিরতে মনে মনে তার কবিতা আওড়াতাম। মনে হলে এতদিন আমি টুকটাক ছন্দহীন গোঁজামিল দিয়ে যে-কয়টি কবিতা লিখেছি সেগুলো আসলে কবিতা হয়ে ওঠেনি।
৪.
আগেই বলেছি, স্কুল জীবনে সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি আমার বেশ অনুরাগ ছিল,কবিতার প্রতি কিছুট্ বেশি। এ বিষয়ে আমার দুর সম্পর্কে এক কাজিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাসেম সন্দ্বীপ আমাকে প্রেরণা যুগিয়েছেন। কবি হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। সন্দ্বীপে এক চাঁদনি রাতে আমার কবিতার খাতা নিয়ে তার গ্রামের বাড়িতে হাজির হলে তিনি আমার কবিতার খাতা দেখে আমাকে আধুনিক কবিদের কবিতা পড়ার জন্য পরামর্শ দিলেন।আধুনিক কবিতা কি এবং কারা আধুনিক কবি সে-সম্পর্কে আমার কোনও ধারনাই ছিল না। হাতের কাছে তেমন কোনও কবিতার বই ছিল না। পাঠ্য পুস্তকের বাইরে অন্য কারও কবিতা পড়ার সুযোগ ছিল না।
আমি তখন দশম শ্রেনিতে পড়ছি। স্কুলের প্রধান শিক্ষক একদিন ডেকে বললেন, স্কুল বার্ষিকী প্রকাশ করা হবে। সম্পাদনার দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে। আমাদের স্কুল বার্ষিকী ‘মশাল’ স্বাধীনতা পূর্বকালে সম্পাদক ছিলেন স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র মোঃ হুমায়ুন কবির,(পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে ডক্টর রাজীব হুমায়ুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক, এখন প্রয়াত)। বার্ষিকী সম্পাদক মনোনীত হয়ে প্রথমে আমি যে-কাজটি করেছিলাম তা ছিল বার্ষিকীর নাম পরিবর্তন- ‘মশাল’ থেকে ‘দ্বীপশিখা’। বঙ্গবন্ধু বিরোধী তৎকালীন একটি উগ্রপন্থী রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রতীক ছিল ‘মশাল’। আমি ঐ দলের ঘোর বিরোধী। কাজেই নাম পবির্তন না করে এ নামে আমি বার্ষিকী সম্পাদন করবো না। আমি ‘মশাল’-এর ভাবটা মাথায় রেখে একটা নাম প্রস্তাব করি—‘দ্বীপশিখা’। সবাই খুব প্রশংসা করলেন এবং আমার প্রস্তাব সাদরে গৃহীত হয়। আমার সম্পাদিত এই ম্যাগাজিনে আমার লেখা (গদ্য-পদ্য) প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। সেই অভিজ্ঞতা মনে রেখে ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হবার পর ‘দর্পণ’ নামে একটি ছোট কাগজ বের করি। দুটি সংখ্যা বের করেছিলাম। এ সময় ২/৩ জন সতীর্থ বন্ধুর উৎসাহে টুকটাক লিখতে চেষ্টা করি, কিন্তু কোথাও ছাপা হচ্ছে না। নিজের পত্রিকা ছাড়া অন্য কোথাও ছাপাত পারিনি।। এইভাবে চট্টগ্রামের কবিমহলে আমি তখন কবি নয়, একজন অনগ্রসর কবিতাকর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি। কবি হিসেবে তখনও আমার কোনও স্বীকৃতি ছিল না; তবে চট্টগ্রামের বাইরে ২/৩ টি মফস্বল জেলার ২/৩ জন নবীন কবির সঙ্গে পত্র যোগাযোগ ছিল; যেমন টা্ঙ্গাইলের মাহমুদ কামাল,জামালপুরের আহমদ আজিজ(সম্প্রতি প্রয়াত),সিলেটের রোকেয়া খাতুন রুবি, রাজশাহীরও ২/১ জন ছিল—যাদের নাম সনে করতে পারছি না। পশ্চিম বাংলার ছিলেন মোহিনী মোন গাঙ্গুলী। স্বীকার করছি যে, ঐ সময়ে ৪/৫ টা কবিতা লিখলেও সেগুলো মানসম্মত ছিল না । এ সময় আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করি এবং তা হচ্ছে বাংলা কবিতার ছন্দ সম্পর্কে কিছুটা ধারনা ক্ষেত্রে আমাকে সহায়তা করেন অগ্রজ কবি শেখ খুরশিদ আনোয়ার । তার কাছ থেকে যা শিখেছিলাম তা দিয়ে বিশু্দ্ধ কবিতা লেখার মতো কৌশল ও দক্ষতা অর্জন করতে পারিনি।
মনে আছে, সেই অবস্মরণীয় ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট রাতে কার্ফিও চলাকালীন মোমের আলোয় পেন্সিলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি কবিতার খসড়া লিখেছিলাম। ওটাকে ঠিক কবিতাও বলা যায় না্। ভুলে ভরা ছন্দ-মাত্রা- পর্ব সহযোগে কবিতাটি লিখার পর আমি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ি। মনে ভয়ও ছিল। কয়েকবার পাঠের পর কবিতাটিকে একটি জরজীর্ণ ইংরেজি অভিধানের ভেতর লুকিয়ে রাখি যাতে ধরা না পড়ি। মনে আছে অভিধানটি ছিল সম্ভবত এ.টি. দেবের।
সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতিতে। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা। আমার জন্ম তারিখে ৩রা নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা। সবকিছু কেন জানি ঘোলাটে টেকছে। পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে ৪/৫ বিষয়ের পর কয়েক বন্ধুসহ পরীক্ষা ড্রপ দিলাম। মানসিক দুশ্চিন্তার মধ্যে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পূর্বাভাষ লক্ষ্য করি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখা কবিতার কথা বেমালুম ভুলে যাই। মনঃস্থির করলাম গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপে চলে যাবো লেখাপড়া ইতি ঘটিয়ে। এ হলো আমার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা হারিয়ে থাকা একটি কবিতার অকথিত সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

কিন্তু আমি চাই বা না চাই কবি হওয়াটাই যেন আমার নিয়তি ছিল। তা না হলে এ লেখা তো আমাকে লিখতে হতো না।আগেই উল্লেখ করেছি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার প্রথম কবিতা ‘সহসা আগুন জ্বলে যমুনার জলে’ ১৯৭৫ সালে ১৬ আগস্ট লিখেছিলাম । বহুদিন পর সেটি হঠাৎ হাতের কাছে পেয়ে যাই। কবি মিনার মনসুরের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখা একটি কবিতা দেবার অনুরোধ পেয়ে ‘ সবুজ রমণী এক দুঃখিনী বাংলা’ কবিতাটি দিতে পারতাম।কিন্তু সেটি যেহেতু ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে, সেজন্য দেইনি। ভাবলাম একটি নতুন কবিতা লিখব। ইতিমধ্যে আমি কবিতার ছন্দ কলা প্রকরণ অনায়াসে রপ্ত করে ফেলেছি। তরুণ কবি হিসাবে চট্টগ্রাম তো আছেই, তার বাইরেও ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আমার কিছুটা পরিচিতি পৌঁছে গেছে। ১৯৭৮ সালে সম্ভবত জুলাই মাসে। কলা ও করণে এ কবিতাটি কোন মানের আমি তা বলতে পারি না; তবে এর একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করি। এ সম্পর্কে ইতিপূর্বে কিছুটা বলেছি অন্যত্র; এখানেও সামান্য আলোকপাত করব। নিজের আত্মপ্রচার করার জন্য নয়; বরং সত্যকে সমুন্নত রাখতে কথাগুলো আগামী প্রজেন্মর গবেষকদের জন্য বলে যাওয়া দরকার। আমার বলার বেশি কিছু নাই– যা বলছি সরলভাবে বলেছি– এতে কেউ দ্বিমত করলেও করতে পারেন- তর্ক করবো না , বিতর্কে জড়াতে চাই না।
৫.
এখানে আমি যে কবিতা নিয়ে এত দীর্ঘ ভূমিকার অবতারনা করেছি তার নাম—‘ সবুজ রমণী এক দুঃখিনী বাংলা’। এ কবিতা বা এলিজি আমি কোনো প্রতিযোগিতার জন্য লিখিনি কিংবা হঠাৎ করেও কবিতাটা লিখা হয়নি । আগেই বলেছি বঙ্গবন্ধুর তিরোধানে প্রেক্ষাপটে আমি ১৯৭৫ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা ড্রপ দিয়েছিলাম। যে আশায় ও স্বপ্নে নিজ গ্রামের একটি স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে সন্দ্বীপ উপজেলার সকল পরীক্ষার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে দেশের অন্যতম সেরা কলেজ ‘চট্টগ্রাম সরকারী কলেজে’ ভর্তি হয়েছিলাম আমার সে আশা ও স্বপ্ন বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণে দপ করে নিভে যায়। মনস্থির করি : সন্দ্বীপে গ্রামেই ফিরে যাব; কিছুদিন পর গ্রামে ফিরে যাই; কিন্তু বেশিদিন থাকা হয়নি— মাস দুই তিনেক পর চট্টগ্রামে ফিরে আসি।
চট্টগ্রামের নালাপাড়ায় থাকার সুবাদে হেলাল-পঙ্কজ-পুলক এই ৩ জন বন্ধুকে পাই , যারা আমার সঙ্গে চট্টগ্রাম কলেজে পড়ত। আমরা সবসময় একসঙ্গে থাকতাম। এখানে পরিচয় হয় আমার বুবুর বাসার পাশের এক কিশোরের সঙ্গে– আবু মুসা চৌধুরী। খুব সুন্দর ছড়া লিখত। মুসার সুবাধে ওর বন্ধুদের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। মুসা ও আমার সতীর্থ ৩ বন্ধুর উৎসাহে খেলাঘরের সঙ্গে যুক্ত হই । ‘কপোত খেলাঘর’ এর আমি ছিলাম সাহিত্য সম্পাদক। এখানে নিয়মিত সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর বসত। আমি খুব একটা লিখতাম না তখনও। ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকি। ১৯৭৪ সালের প্রথম দিকে আমি নালাপাড়া থেকে পূর্ব মাদারবাড়ি এলাকায় চলে যাই। এখানে আসার পর আমার প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও অন্যান্য কর্মীদের নিবিড় সান্নিধ্যে আসি। এতদিন দলের কাজ-কর্মে খুব একটা যুক্ত থাকিনি । হাতে টাকা-পয়সা তেমন থাকতো না। পকেট খরচ বলতে যা বুঝায় তা পেতাম ভগ্নিপতির কাছ থেকে। জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযুদ্ধা কমান্ডার রফিকুল ইসলাম ভাই ছিলেন সন্দ্বীপ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি, আমার নেতা। তিনি পরবর্তীতে জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার সুবাদে জেলা শাখায় মাঝেমধ্যে যেতাম।তখন নোয়াখালির ছেলে হয়েও রবিউল হোসেন কচি ভাই ছিলেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি।শিল্প-সাহিত্যের অনুরাগী একজন মানুষ– আমাকে খুব স্নেহ করতেন। যা-ই হোক, এ সময় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকি। বাংলা ছাড়া বাকি সব বিষয়ে ইংরেজিতে পড়তে হচ্ছে। বেশ পরিশ্রম। দেখতে দেখতে ১৯৭৫ সালে জুন মাসে খবর পাই যে ১৪ জুন বঙ্গবন্ধু পতেঙ্গা বিমানবন্দর থেকে সড়ক পথে বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন করতে যাবেন। বঙ্গবন্ধু তখন রাষ্ট্রপতি। চারিদিকে সাজসাজ রব পড়ে গেল। মনে আছে আমরা মাদারবাড়ি এলাকার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ইছহাক ভাইয়ের নেতৃত্বে খোলা মিনি ট্রাকে করে পতেঙ্গা বিমানবন্দরে যাই। যথাসময়ে বঙ্গবন্ধু শোভাযাত্রা সহযোগে বেতবুনিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।আমাদের ট্রাক শোভাযাত্রার অনেক পেছনে – আমরা গগনবিদারী স্লোগান দিতে দিতে বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ করে যাচ্ছি ধীরে ধীরে । চট্টগ্রাম নিউ মার্কেট এলাকায় পৌঁছার পর আমরা ২/৩ জন যারা অপেক্ষাকৃত ছোট ও পরীক্ষার্থী ছিলাম তারা নেমে যাই।
বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছ থেকে সেবারই শেষবারের মতো দেখি; তার ঠিক দু’মাসের মাথায় সংঘঠিত হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরতম হত্যাকাণ্ড – আগস্ট ট্র্যাজেডি। জাতির জীবনে নেমে আসে অমানিশা। এ থেকে আমিও মুক্তি পাইনি- একটা অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে চলছে সবকিছু।এক ধরনের মানসিক বৈকল্য দেখা দেয় আমার মধ্যে । সামনে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। প্রস্তুতি নিতে গিয়ে পড়াশুনায় মন বসাতে পাছিলাম না। পরীক্ষায় অংশ নেয়া প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বলা যায়, ভালো রেজাল্ট করার মতো যে ধরনের প্রস্তুতি থাকা দরকার তা ব্যতিরেকে বাংলা–ইংরেজি পরীক্ষা শেষে মনঃস্থির করলাম পরীক্ষা ড্রপ দেবো। পদার্থ বিজ্ঞান ১ম পত্র দিয়েই পরীক্ষা ড্রপ দিলাম সবার অগোচরে। মাস খানেক পরে সন্দ্র্বীপে গ্রামের বাড়িতে চলে যাই। সন্দ্বীপে ২/৩ মাস থাকার পর আবার চট্টগ্রামে ফিরে আসি। ফিরে আসার পর খেলাঘরে যাই সম্ভবত পরের দিন বিকেল বেলায়
একটা ভীতিকর দুঃসময়ে পার করছি। এ সময়ে খেলাঘরের ঘরোয়া কর্মসূচিতে যুক্ত থাকার ফলে কিছুটা নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ পাই। আগেই বলেছি খেলাঘর আন্দোলনে যুক্ত থাকার সুবাদে কীভাবে ‘’জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ র বইটি পেয়েছিলাম। এর আগে আমি জীবনানন্দের নাম শুনেছি , তার একটাও কবিতা পড়িনি। জীবনানন্দ আমাকে কবিতার এক নতুন জগতে নিয়ে যান। প্রবলভাবে আমি এ কবির দ্বারা আক্রান্ত হলাম। তারই উজ্জ্বল সাক্ষর এ কবিতা, যা লিখিত হয় প্রকাশের কয়েক মাস আগে। কোথাও প্রকাশের সুযোগ নেই । এ কবিতার সুবাদে ইউসুফ মুহাম্মদের সঙ্গে আমার একটা আত্মীক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা এখনও রয়েছে।
কবিতাটি ইউসুফ শুনার পর থেকে তার সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ বেড়ে যায়। তাকে সঙ্গে নিয়ে এখানে ওখানে যাই। মূলতঃ আড্ডা দিতে– বিশেষ করে নন্দনকাননের বোস ব্রাদার্স, ডিসি হিলে, কখনও লালদীঘির নির্জন পার্কে। বোস ব্রাদার্স ছিল চা-মিস্টির দোকান। প্রতিদিন দু বেলা সকাল –সন্ধ্যায় এখানে আড্ডা দিতাম। ইউসুফ লিখেছেন এভাবে , ‘‘ দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে— বোস ব্রাদার্স, লালদীঘির পার, লয়েল রোডের টি স্টল বা নালাপাড়ায় যেখানেই বসি শুধু কবিতা আর কবিতা। ১৯৭৬ সালের শেষার্ধে আসাদ মান্নান আমাকে নিয়ে একদিন বাংলাদেশ পরিষদ চট্টগ্রাম কেন্দ্রে যায়। সেটা ছিল চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের উল্টো দিকে। উদ্দেশ্য ছিল অমর একুশে উপলক্ষে ‘বাংলাদেশ পরিষদ সাহিত্য পুরস্কা’ প্রতিযোগিতায় সে তার একটি কবিতা জমা দেবে। সে-সময় বাংলাদেশ পরিষদ উদীয়মান সাহিত্যিকদের এ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ কবিতা-গল্প- প্রবন্ধ ও একাঙ্কিকা নির্বাচন করে বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করত। তখন বাংলাদেশ পরিষদ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের আবাসিক পরিচালক ছিলেন অনুবাদক ও সাহিত্যিক ফখরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি আসাদ মান্নানকে চট্টগ্রামের একজন কবিতাকর্মী হিসেবে জানতেন এবং সবসময় স্নেহের ছায়ায় রাখতেন। জামান ভাইয়ের দপ্তরে বসে চা খেতে খেতে আসাদ মান্নান কবিতাটি তাকে দেখতে দেয়। জামান ভাই কবিতাটি পড়ে বললেন, বাহ্ ! এতো বেশ দারুণ কবিতা লিখেছ। মান্নান, তুমি এ কবিতাটি বাংলাদেশ পরিষদ সাহিত্য প্রতিযোগিতার জন্য জমা দিতে পারো। তবে শিরোনাম পরিবর্তন করতে হবে এবং ‘বিধবা’ শব্দটি রাখা যাবে না; এটি থাকলে আমি কবিতাটি জমা নিতে পারবো না। আমি ঝামেলায় পড়বো। তিনি কেন ঝামেলায় পড়বেন বা জমা নিতে পারবেন না সেবিষয়ে আমাদের কিছুই বলেন নি। সেখানে বসেই আসাদ মান্নান কবিতার শিরোনাম ও কবিতার শেষের দিকের একটি পঙক্তি থেকে বিধবা শব্দটি বাদ দেয়। কবিতার শিরোনাম দেয়া হয় সবুজ রমণী এক দুঃখিনী বাংলা। কবিতার শরীর থেকে মুছে যায় বিধবা শব্দটি।
আমি আগেই বলেছি এটি প্রতিযোগিতার জন্য লিখা কোন কবিতা নয়। জীবনানন্দের রূপসী বাংলার কবিতাগুলো পড়ার পর আমার মধ্যে একধরণের পুনর্জন্ম ঘটে। কবিতা লিখার কলা ও প্রকরণ আমি বেশ রপ্ত করে ফেলি। এ কবিতার খসড়া লিখি সম্ভবত মার্চ মাসের শেষের দিকে। কিন্তু এ কবিতাটি আমি চূড়ান্ত রূপ দেই ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসের ১৫ তারিখে। কবিতা তো লিখিছি । কিন্তু ছাপাবো কোথায়? তখন কবিতা ছাপানোর মতো কোন পরিবেশ বা পত্রিকা ছিল না। চট্টগ্রামে। যে ২/৩ টি বাংলা দৈনিক ছিল সেগুলোতে সাহিত্য পাতা বের করতো না। ছোট কাগজ বা সংকলন বের করার মতো অবস্থা বিরাজমান ছিল না। এ রকম অবরুদ্ধ সময়ে ইউসুফ মুহাম্মদের উৎসাহে এবং এক নবীন কবির দুর্মর কৌতূহল বশতঃ আমি প্রতিযোগিতার জন্য কবিতাটি জমা দিতে ইউসুফ মুহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ পরিষদে যাই ।
এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘অন্তরে অনির্বাণ’ নামক একটি বিশেষ স্মরণিকায়– ১৯৭৭ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখে। প্রকাশকঃ বাংলাদেশ পরিষদ, তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়। সম্পাদনা করেছিলেন বাংলাদেশ পরিষদ,ঢাকা কেন্দ্রের উপ পরিচালক তোফায়েল আহমদ।
গণসংযোগ বিভাগের অধীন ‘বাংলাদেশ পরিষদ’ তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, পাকিস্তান আমলে যা পরিচিত ছিল ‘পাকিস্তান কাউন্সিল’ নামে। অনেকটা বৃটিশ কাউন্সিলের আদলে তৈরি এ প্রতিষ্ঠানটি। বিভাগীয় শহরেও এর দপ্তর ছিল । মনে আছে, আমাকে অফিসিয়ালি পুরস্কার পাওয়ার বিষটি জানানো হয় এবং ২১-০২-১৯৭৮ তারিখ সকাল ১০.০০ বাংলাদেশ পরিষদ ,ঢাকা কেন্দ্র থেকে পুরস্কার গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে জানানো হয়। মনে আছে, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়ার জন্য প্রথম শ্রেণির ট্রেনের ভাড়া দেয়া হলেও আমি বাসে করে বহু কষ্টে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসি ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮ তারিখ সন্ধ্যায়। উঠলাম বঙ্গভবনের পেছনে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় । ঢাকায় এটি আমার দ্বিতীয় সফর । প্রথম সফর ছিল স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালের ২০ জুলাই ট্রেনযোগে –দুপুরে ফুলবাড়িয়া স্টেশনে নামি। ২১ জুলাই রেসকোর্স উদ্যানে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জাতীয় সম্শেলনে সন্দ্বীপ থানার একজন ডেলিকেট হিসেবে যোগ দেই। তিন রাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন জিমনেশিয়াম ভবনে মেঝের উপর খবর কাগজ বিছিয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম । তখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র। ভীতিকর এক দুঃসাহসিক সফর ছিল এটি । সে-সব এখানে আর নাই-বা বললাম। সন্মেলেন উদ্বোধন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে স্মৃতি কোনওদিন ভুলবার নয়।
যা-ই হোক, পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠান ছিল ২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০ টায় বাংলাদেশ পরিষদ মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানে কবিতাটি আমি পাঠ করেছিলাম স্মৃতি থেকে । আমার কবিতা শুনে সবাই প্রশংসা করলেন । বিশেষ করে কবি আহসান হাবীব। আমাকে নিয়মিত দৈনিক বাংলার সাহিত্যের পাতায় কবিতা পাঠাতে বললেন এবং তার দপ্তরে চায়ের দাওয়াত দিলেন। এ অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট কবি-লেখকদের মধ্যে বিচারকমণ্ডলীর সদস্য কবি আহসান হাবীব, নাট্যকার নুরুল মোমেন, কথাশিল্পী সরদার জয়েন উদদীন, ডক্টর মিজানুর রহমান শেলীসহ সরকারের উপদেষ্টা , সচিব ও বহু পদস্থ কর্মকর্তা এবং আমন্ত্রিত অতিথিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি কথা সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ অসুস্থতাজনিত কারণে অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি; তবে পুরস্কারপ্রাপ্ত তরুণ কবি-লেখকদের শুভেচ্ছো জানিয়ে তিনি একটি বাণী পাঠিয়েছিলেন, যা পাঠ করা হয়েছিল।
সাহিত্য পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান বলে কথা! আমাদের আনন্দের শেষ নেই। আমি এসেছি চট্টগ্রাম থেকে। কবিতা, প্রবন্ধ, ছোট্ট গল্প ও একাঙ্কিকা প্রতিযোগিতায় যে ৪ জন জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষস্থান লাভ করে তারাসহ ৪ টি ক্ষেত্রে ঢাকা বিভাগীয় ও ঢাকা জেলার শীর্ষস্থান বিজয়ী প্রতিযোগীদের আনুষ্ঠানিক পুরস্কার প্রদান করা হয়।
এত বছর পর কেন জানি মনে হলো আমাদের মহান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বর্ষে প্রকৃত তথ্যকে সামনে আনা দরকার। দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর ধরে কবিতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত থাকা সত্ত্বেও বলতে সংকোচ করছি যে, প্রচার ও মিডিয়ার প্রতি উদাসীন থাকলে বাস্তবে যা ঘটে তা-ই ঘটেছে আমার এ কবিতার ভাগ্যে। সত্য বলার সময় সমাগত। নীরব থাকা উচিৎ হবে না। কয়েকজন অগ্রজ কবি ও বন্ধুর তাগিদে আজ একটা ঘটনা বহুদিন পর হঠাৎ মনে পড়ল। ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ তারিখ বাংলাদেশ পরিষদের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে আমি ও মাহমুদ কামাল– দুই কবিবন্ধু– বিকেলে যাই বাংলা একাডেমিতে — ওখানে সীমিত পরিসরে গ্রন্থ মেলা হচ্ছে । বাংলা একাডেমিতে সেদিনই আমার প্রথম যাওয়া। ওখানেই আমার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে দেশের নবীন-প্রবীন বিশিষ্ট কবিদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে যাদের নাম স্মরণে আসছে তারা হলেন সর্বকবি আসাদ চৌধুরী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, সমুদ্র গুপ্ত, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, জাফর ওয়াজেদ, হালিম আজাদ, কামাল চৌধুরী, ওয়াহিদ রেজা, আলমগীর রেজা চৌধুরী, আহমেদ আজিজসহ আরও অনেক। কথাশিল্পী ফারুক মঈনুদ্দিন, সৈয়দ কামরুল হাসান, ইসহাক খান, এদের সঙ্গে পরিচয় হলো । ফারুককে আগে থেকে চিনতাম। চট্ট্রগ্রাম কলেজের মানবিক বিভাগের অসামান্য এক মেধাবী ছাত্র। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করা ছাত্র্। কলেজে আমার এক ব্যাচ জুনিয়র। মনে আছে, কবি হালিম আজাদই সবাইকে আমন্ত্রণ জানালেন পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে “ড্যাফোডিল” আয়োজিত অনুষ্ঠানে কবিতা পড়ার জন্য। আমাকেও অনুরোধ করলেন।
এখন যেমন, তখনও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদাকে ঘিরে থাকতেন একদল তরুণ কবি। হুদা ভাই সদলে সেই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন । দলে আমি আর মাহমুদ কামালও ছিলাম। সে কী আনন্দ!
অনুষ্ঠানে স্মৃতি থেকে আমি এ কবিতাটি পড়েছিলাম। বেশ সাড়া পাই শ্রোতাদের কাছ থেকে। বিশেষ করে উপস্থিত কবিগণ কবিতাটির উচ্চসিত প্রশংসা করলেন। মূলত এ কবিতাটি দিয়ে কবি হিসেবে আমার পরিচিতির ভিত্তি তৈরি হয়। রাজধানী সহ সবখানে আমার আলাদা একটা অবস্থান দৃঢ় হয়। আগেই বলেছি, কবি আহসান হাবীব প্রায়শ আমার কবিতা ছাপতেন দৈনিক বাংলায়। ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রায় সব দৈনিকে ( প্রতিক্রিয়াশীল দৈনিক পত্রিকা ব্যতীত) নিয়মিত ছাপা হতে থাকে। চট্টগ্রামে এতকাল যারা আমাকে অবজ্ঞা করতেন তারাও দেখছি বেশ সমীহ করে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। ওদের দিকে পরবর্তীতে আমি আর কী তাকাবো!
৬.
৭৫ পরবর্তী সময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অজস্র কবিতা লেখা হয়েছে, এবং আগামীতেও হবে। এ কবিতাটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখা আমার ‘‘দ্বিতীয় কবিতা –প্রথম এলিজি” ।
পাঠক অবশ্যই স্বীকার করবেন ‘সবুজ রমণী এক দুঃখিনী বাংলা’ কোনো স্লোগানধর্মী, বিবৃতি সর্বস্ব সাদা মাটা সরল কবিতা নয়; এটি একটি নিখুঁত কবিতা, বিশুদ্ধ এলিজি—রূপকাশ্রয়ী প্রতীকী, একটি নান্দনিক কবিতা । অনেকে মনে করেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখা প্রথম নান্দনিক কবিতা এটি। সত্যের খাতিরে এখানে আরও একটা প্রাসঙ্গিক তথ্য নিবেদন করছি যে, কবিতাটি ‘বিধবা রমণী এক দুঃখিনী বাংলা” শিরোনামে প্রতিযোগিতার জন্য জমা দেওয়ার সময় বাংলাদেশ পরিষদের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের তৎকালীন আবাসিক পরিচালক প্রয়াত কথাশিল্পী ও বিশিষ্ট অনুবাদক ফখরুজ্জামান চৌধুরীর পরামর্শে ‘বিধবা’ শব্দটি ‘ সবুজ’ শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপন করি। জামান ভাইয়ের যুক্তি তখনকার প্রেক্ষাপটে ফেলে দেয়ার মত ছিল না। : সামরিক শাসনামলে এই কবিতা বিপদজনক বিবেচিত হবে ; কাজে তিনি এ কবিতা নিতে পারবেন না। জামান ভাইয়ের কাব্যবোধ ও রুচি অত্যন্ত উঁচু মানের । তিনি বিধবা শব্দে আপত্তি জানিয়ে তার পরিবর্তে অন্য শব্দ বসাতে বলিছিলেন। সে-সময় আমার সঙ্গে কবি ইঊসুফ মুহাম্মদ ছিলেন। এ সম্পর্কে প্রিয় ইউসুফ মুহাম্মদের স্মৃতিচারণার উদ্ধৃতি পূর্বেই দিয়েছি। ফখরুজ্জামান চৌধুরীর পরামর্শ অনুযায়ী আমি তাৎক্ষণিক ‘সবুজ’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করে তাঁর দপ্তরের প্রধান সহকারী আমিন ভাইকে টাইপ করে দিতে অনুরোধ করি। তিনি টাইপ করে দিয়েছিলেন। প্রতিযোগিতার থীম ছিল ‘একুশের চেতনা ও স্বদেশ ভাবনা’। জামান ভাই কবিতাটি পড়ে বলেছিলেন, এটি সেরা কবিতা হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে ঐতিহাসিক সত্যের প্রয়োজনে কবিতাটি এ প্রজন্মের পাঠকের কাছে উস্থাপন করছি। কবিতাটির একটি ইংরেজি অনুবাদও দিচ্ছি এখানে; যা অনুবাদ করেছেন কবি ও কথাশিল্পী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর মোহীত উল আলম। প্রিয় মোহীত ভাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

সবুজ রমণী এক দুঃখিনী বাংলা// আসাদ মান্নান
একটি দরোজা খুলে আমি গান শুনতে পেলে পৃথিবীর বুকে
ধূপের বিমিশ্র হাসি জননীর ঠোঁট ছুঁয়ে রক্তে ভেসে যায়;
মায়ের চোখের মতো কী নরম শব্দ এক আমার সম্মুখে
কেবল লাফিয়ে ওঠে–আমি তার জন্মদাতা –কেবল পালাই;
রাত্রির গুহায় শুয়ে অন্ধকার চারিদিকে দেখে চোখ মেলে,
সবুজ রমণী এক–নামহীন, জেগে আছে মেটে দীপ জ্বেলে।
একটি দরোজা খুলে বাতাসের বন্ধু হয়ে লোকালয় ছেড়ে
গভীর অরণ্যে দেখি– তসবি হাতে ধ্যানে মগ্ন বুড়ো চিতাবাঘ
হরিণ শিশুর খুরে স্বাধিকার বেঁধে দিলে তার লেজ নেড়ে
শিয়াল সাঁতার কেটে গঙ্গাজলে ভুলে যায় সব অনুরাগ;
স্বর্ণের আংটির মতো দরোজা সে খুলে দিয়ে হাত ইশারায়
দ্রুত পায়ে কাছে আসে– নামহীন, চোখে মুখে বুকে চুমু খায়।
সমস্ত দরোজা বন্ধ হয়ে গেলে নক্ষত্রের জামার মতন
একটি ক্যানারি পাখি উড়ে আসে জনকের ফসলের মাঠে;
লোবান জলের মধ্যে কিছু প্রেম ক্রন্দনের করে আয়োজন।
একটি দরোজা খুলে শুয়ে পড়লে অপরূপ অন্ধকার খাটে
বিধবা রমণী এক ভালোবেসে নাম লেখে আমার কপালে:
দুঃখিনী অবলা বাংলা– জন্ম তার কোনো এক একাত্তর সালে।

কবি ও কথাশিল্পী ফারুক মঈনুদ্দিন এর একটি ছোট্ট মন্তব্য এ কবিতার পটভূমি অনুধাবনে সহায়তা করবে। ফারুক লিখেছেন-
‘‘ সে সময়কার হিসেবে তো অত্যন্ত সাহসী কবিতা এটা। তবে চমৎকার এই কবিতাটার মর্মার্থ বোঝার মতো লোক হয়তো ছিল না সরকারি টিকটিকিদের মধ্যে, কিংবা কেউ বুঝেও না বোঝার ভান করেছে। “বিধবা রমণী” কে “সবুজ রমণী” বানাতে হয়েছে এখানে, তাই না? ১৯৮৫ কি ৮৬ সালে আমি যখন খুলনা রেডিওতে আমার অর্বাচীন কবিতা পাঠ করতাম, তখন “রাধা” শব্দটি থাকার জন্য একটা পুরো কবিতা বাদ দিতে হয়েছিল প্রযোজকের পরামর্শে। “দুঃখী নৌকা” কে “সুখী নৌকা” করতে হয়েছে। সে হিসেবে আপনি তো ভাগ্যবানই বলতে হবে।’’… নারায়ণগঞ্জে ড্যাফোডিল আয়োজিত সেই কবিতা পাঠের আসরে আমিও গিয়েছিলাম, তবে প্রবল মঞ্চজড়তার কারণে কিছুই পড়িনি। এ পর্যায়ে অগ্রজ প্রিয় কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা প্রতিক্রিয়ার মাধমে এ ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা ইতি টানছি –‘‘ কবি কবিতা লেখেন নিজের তাড়ায় ও নিজের প্রয়োজনে। ইতিহাসের সত্যপাঠ কবিতাকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব দেয়।আপনার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। কেউ কেউ এগুলো পুঁজি করে লাভালাভের অঙ্ক কষে। তাই প্রথম বা দ্বিতীয় তর্ক তোলে। ইতিহাস হাসে। না, প্রকৃত কবি হারে না। কাল নিরবধি কবিকে সনাক্ত করে।কবিতাকেও, কবির অভিপ্রায়কেও। আপনার বেলায়ও অন্যথা হবে না। আপনার এতোকালের নৈব্যক্তিকতা আমাকেও এই কথাগুলো বলতে প্রণোদনা দিয়েছে। চিরকাল কবিতাসম্মত থাকুন। কেবল কবি হয়েই আছেন, সেটি হোক আপনার শ্রেষ্ঠ নির্লিপ্তি।” হ্যাঁ, প্রিয় জাতি সত্তার কবি আপনার আশীর্বচন মাথায় নিয়ে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে আরও দুটো নতুন কবিতা যুক্ত করছি। আমার এ লেখায় যদি কেউ আহত হয়ে থাকেন কিংবা কেউ অকারণ সম্মানহানির আশঙ্কা পোষণ করেন, তাহলে আমাদের মহান পিতার দোহাই, আমাকে ক্ষমা করবেন—আমার কবিজন্ম একমাত্র বঙ্গবন্ধুর জন্য, আমার মানবজন্ম আজ ধন্য একমাত্র বঙ্গবন্ধুর জন্য। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
বঙ্গবন্ধুর জন্য আরও দুটি কবিতা
১. এপিটাফ

[ মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরী দু’জমজ কবিযোদ্ধা প্রিয়বরেষু।]

তোমরা বলেছ যাকে লাশ ওটা কিন্তু লাশ নয় —
বাঙালি জাতির এক অবিনাশী আত্মার কুসুম;
সহস্র জীবন যাকে বার বার কুর্নিশ করেছে,
যার কাছে পরাজয়ে নত থাকে মহা হিমালয় ;
তার প্রতি জন্মক্ষণে মৃত্যু এসে ক্ষমা চায়, বলে–
মানুষ যদিও মরে মানবেরা কখনো মরে না।
এ কথা সকলে জানে– মুজিব তো মানব ছিলেন,
প্রত্যেক মুহূর্তে যার নাম নিয়ে বাংলার পাখিরা
আকাশে সূর্যের কণা কী নির্ভয়ে খুঁটে খুঁটে খায়!
সমুদ্রের কান্না বুকে স্তব্ধ রয় বাতাস বেহুলাঃ
কী করে নির্বোধ অন্ধ কাঁধে নিয়ে লাশের খাটিয়া
কবরে না নেমে বলে, লোকটাকে দাফন করেছি।
কাফনে কফিনে যদি কেউ লিখে জলের এলিজি
যত পারে লিখতে থাক– কেউ তাকে বারণ করে না;
করুণার ফুল গেঁথে রাজমালা যত খুশি দাও।
অক্ষমেরা কাঁদতে কাঁদতে গাইতে আছে স্বার্থের মর্সিয়া
কে আসল কে নকল– কালা কানা — শব্দের ভিখারি–
কে পিতাকে বুকে নিয়ে পাড়ি দেয় আগুন সাহারা?
যে রক্তে সূর্যের মতো দীপ্তি জ্বেলে ঘুমােচ্ছেন পিতা
সে রক্তের স্বপ্ন ধরে সামনে হাঁটে এতিম সন্তান।
সুযোগের দাস যারা বেশরম –সময় শিকারি–
পাগলেও বুঝে– মরচে পড়া ক্রাচে ভর দিয়ে কারা
লাশের পকেট কাটে– ভাবে– যদি বাড়তি খ্যাতি মেলে
তা হলে যে অমরতা পায়ে দেবে পদক পাদুকা।
ও ভাই ও বোন! এ লাশ রাখার মতো মাটি কই,
লাশটাকে চাপা দিতে কত ঘন ইঞ্চি মাটি দেবো!
মৌসুমি চিৎকার শুনে খোদার ফেরেস্তা হাসতে হাসতে
স্বপ্নে নেমে আসে– কানে কানে ওদেরকে বলে, যাও
বঙ্গোপসাগর তীরে জন্ম নেয়া বালকের কাছে,
যে-কিনা পিতার নামে তৈরি করে শব্দ-এপিটাফ।।

২. দুঃখিনী মুজিব বাংলা

বিশ্ব কবির সোনার বাংলা নজরুলের বাংলাদেশ
জীবনানন্দের রূপসী বাংলা– বাহ্ কী সুন্দর–
কী অপূর্ব বাধভাঙ্গা হৃদয়ের গানের কোরাস!
কিন্তু যে-বাংলা জন্ম হতে-না-হতে অল্প দিনে
পিতাকে হত্যার জন্য ঘরে-বাইরে ষড়যন্ত্রে নামে
তাঁকে সপরিবারে হত্যার জন্য ঘাতকের হাতে তুলে দেয়
তাকে আমি কোন বাংলা নামে ডাকবো–
সে কি ঐ মীর জাফরের নবাবী বাংলা!

কী নামে ডাকলে এই জনম দুঃখিনী বাংলাদেশ
ফিরে আসবে চাষার লাঙলে আর ভোরের হাওয়ায়
ফিরে আসবে শ্রমিকের ঘামে আর প্রেমিকের কামে
বাংলাকে কী নামে ডাকলে সে হবে আমার বাংলা– বাংলাদেশ!

কী করে বিস্মৃত থাকি– সময় ১৭ই মার্চ ১৯৭৬–
কী করে পিতার গৌরবের সৌরভের মহা জন্মদিন
সকলেরে মৌন রেখে নীরবে নিভৃতে চলে গেল!
জলে স্থলে অন্তরীক্ষ্যে নেই বঙ্গবন্ধু
কোথাও দেখিনা তাঁর নাম, মুছে ফেলে দেয়া হয়;
ভেঙে ফেলে দেয়া হলো মুজিবের মার্চের মিনার !

বাগানে বিচিত্র ফুল ফুটছে- রঙহীন-গন্ধহীন –
নীরবে নির্বাক ঝরে পড়ছে;
পিতাহীন বাংলাদেশ,
এক ভয়াবহ দুঃসময় পার করছে।
সর্বত্র বিরাজমান একটা অদৃশ্য নারকীয় অস্থিরতা —
আমরা কোথায় যাচ্ছি — দিকচিহ্নহীন –
অনিশ্চিত গন্তব্য যাত্রা!
এ প্রশ্নের উত্তর কারও কি জানা নেই;
তবে আমি জানি, না জেনে যে
অর্থহীন মূল্যহীন আমার জীবন;
কিন্তু বলতে পারি না , তবুও আমাকে বলতে হবে
যে ভাবেই হোক আমাকে বলতেই হবে।
মনে পড়লো বহুদিন পর; এক অন্ধকার রাতঃ
আধা ঘুম আধা জাগরণ–
হঠাৎ একটা স্বপ্ন দেখি; স্বপ্নের ভেতরে
বহুদূর থেকে এক অলৌকিক জোতির্ময় নক্ষত্র বলয়
ভেঙে ভেঙে তার টুকরো থেকে
একটা সুগন্ধী ছায়া অপরূপ বেরিয়ে আসলো।
অই ছায়া পথ বেয়ে আলো কুঞ্জে তন্দ্রিল হাওয়া
একটা গায়েবী গুরু গম্ভীর আওয়াজ আমি শুনতে পাই:
এতদিন ধরে রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলায়,
নজরুলের বাংলাদেশে আর জীবনানন্দের রূপসী বাংলায়
তুমি যে বাংলাকে খুঁজতে খুঁজতে ঘুমিয়ে পড়েছ
হে বালক! চোখ খুলে দেখো
ঘুম থেকে জেগে ওঠে প্রান্ত থেকে প্রান্তে
অন্তরে অন্দরে শূন্য থেকে মহাশূন্যে যাও , দেখো
আমার রক্তাক্ত বুকে তোমার সে-বাংলা- ‘আমার দুঃখিনী বাংলা’।
২.
‘আমার দুঃখিনী বাংলা’ — দুঃখিনী মুজিব বাংলা!
চিৎকার করতে করতে আমার ঘুম ভেঙে যায়।
সেই থেকে যে তিন মহান কবি বাংলাকে বন্টন করে অমর হলেন
মুজিবের দুঃখিনী বাংলার এ ক্ষুদ্র নফর কবি
পিতার আশ্রম ছাড়া বসবে কোন মায়ার আসনে!
মাজারে খাদেম নাকি ফেরি করে নকল তাবিজ।
গ্রামে গঞ্জে ভুল অশ্বারোহী দুলকি চালে হাঁটে-
এই দৃশ্য দেখতে দেখতে অশ্রুহীন কাঁদে একা
দুঃখিনী বাংলার নদী প্রিয় মধুমতী।

প্রকৃত কবিকে সত্য একদিন অমরতা দেবে ;
পিতার পাদুকা থেকে তৈরি হবে কবিতার সিঁড়ি–
এই সিঁড়ি রক্তমাখা এই সিঁড়ি মলিন হবে না।
এই সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে খুঁজে পাই কবিতার বাড়ি;
কবিতাকে খুঁজতে খুঁজতে ভুলে যাই পিতার কবর
চুয়ান্ন হাজার বর্গমাইল ব্যাপ্ত এই বক্ষ জুড়ে
যে-মানব শায়িত আছেন নিরন্তর
কারা আজ তাঁকে বানাতে চেয়েছে লাশ!
এই লাশে পিতা নেই শুয়ে আছে বাংলার হৃদয়
যে মরে মরুক ভাই বাঙালির মুজিব মরে না।

তারপর শুরু হলো লাশ ফেলে যাত্রা কবিতার
একটা ভ্রুণের মতো আমি সেই কবিতাকে ধারন করেছি ,
গর্ভবতী মা যেমন শিশুকে যত্নের সঙ্গে
আপন গর্ভের মধ্যে সযত্নে ধারণ করে আমিও
পরম আদরে তাকে বুকে ধরে রাখি
এক নদী রক্ত-অশ্রু বিষণ্ণ আকাশ ভরা বেদনার নীলে আমি
ধীরে ধীরে সেই অনাগত কবিতা-শিশুকে কাঠামো দিলাম–
দুঃখিনী বাংলার শিশু একদিন পূর্ণ হয়ে ওঠে :
তারপর,১৫ আগস্ট ১৯৭৬ তারিখ মধ্যরাতে প্রায় পাঁচ মাস পর
‘সবুজ রমণী এক দুঃখিনী বাংলা’ – এ এলিজি জন্ম নেয়।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২১২ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031