বঙ্গবন্ধু, বাংলাসাহিত্য ও বুকের ভেতর জনক আমার

প্রকাশিত: ২:৫৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০

বঙ্গবন্ধু, বাংলাসাহিত্য ও বুকের ভেতর জনক আমার


অধ্যাপক মু. নজরুল ইসলাম তামিজী
মুজিববর্ষ উপলক্ষে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় (২০২০) প্রকাশিত হয়েছে জীবন ও অস্তিত্বের স্বাভাবিক বিকাশের প্রতিবন্ধক এবং সব অসংগতির প্রতিতীব্র প্রতিবাদী কবি প্রদীপ মিত্রের কাব্যগ্রন্থ বুকের ভেতর জনক আমার। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কৃতি, কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব এবং তাঁর আন্দোলন পরিচালনার উপর ভিত্তি করে এ গ্রন্থটি রচিত হয়েছে নির্বাসিত জনক দুহিতার রাষ্ট্রিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ব্যক্তিক সংকটকালের অশ্রুআর্তি আগুন আর্তনাদ আর অঙ্গীকারের সামষ্টিক চেতনায়। এ গ্রন্থটি পাঠ করে আমি মুগ্ধ। এটি একটি মহাকাব্য ।যা গীতল ধারায় হয়েছে উৎসারিত।
কাব্যগ্রন্থটির প্রকাশক য়ারোয়া বুককর্নার। প্রচ্ছদ শিল্পী শফিকুলইসলাম । পৃষ্ঠা ৬৪ । দাম টাকা ২০০.০০। তবে একটি ভূমিকা সংযুক্ত হয়েছে, এখানে গ্রন্থটির উৎস কথা পাওযা যায়। আমি সেই আলোচনায় যাবো।
বঙ্গবন্ধু, মানবসভ্যতার এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম কবিতা লিখেছিলেন বাঙালি রেনেসাঁর অন্যতম সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়। তার ‘যতকাল রবে পদ্মা-মেঘনা-গৌরী যমুনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’ কবিতাটি প্রবাদবাক্যের মতো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম গান রচনা করেন আধুনিক বাংলা গানের এক প্রবাদপ্রতিম গীতিকার গৌরী প্রসন্ন মজুমদার। অংশুমান রায়ের গাওয়া সেইবিখ্যাতগান ‘ শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি’- একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়ে মুক্তিকামী আপামর বাঙালিকে উদ্দীপ্ত করেছিল। তাকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালে বা পরবর্তী সময়ে আরো অসংখ্য কবিতা ও গান রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম দেখেছেন, যুদ্ধ করেছেন কিংবা কোনো না কোনোভাবে এ সংগ্রামে সংশ্লিষ্ট থেকেছেন কিংবা সমর্থন জানিয়েছেন, দুই বাংলার এমন প্রায় সব কবিই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। স্বাধীনতার সপক্ষের বাংলাদেশের সব কবিইতাদের কোনোনা কোনো কবিতায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছেন।
কলকাতা থেকে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কবিও লিখেছেন। কবিদের পাশাপাশি মনীষ ঘটক, শওকত ওসমান, মাহমুদুল হক, রাহাতখান, বনফুলের মতো খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিকরাও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছেন।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন দক্ষিণারঞ্জন বসু, জসীমউদদীন, সুফিয়া কামাল, জগদীশ চন্দ্র চক্রবর্তী, নির্মলেন্দু গুণ, সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেশ্বরমুখোপাধ্যায়, শান্তিকুমার ঘোষ, বিনোদ বেরা, বনফুল, নিশিকান্ত মজুমদার, নির্মল আচার্য, হাবীবুরর হমান প্রমুখ লেখক। এ সময় ত্রিপুরার কবি রামপ্রসাদ দত্তের ‘ইয়াহিয়া খাঁন তা-ব নৃত্য’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের ওপরএকটি দীর্ঘ পালাগান রচনাকরেন, সেখানে বারবার এসেছে বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ। দু’টি লাইন আছে এরকম: আছেন শেখমুজিবুর ভাই জয় বাংলাদেশে/ শাসনতন্ত্র গঠন করে মনের উল্লাসে।’ সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধের সময় খ্যাতিমান কবি অমিয় চক্রবর্তী লেখেন: আশ্চর্য নেতার নামে জড়ো হয়, আয়ামির দল/ মুজিবেরমুখে চেয়েসারাপাকিষÍানে/ ভোটে জেতে, সংঘশক্তি মুক্তির নিশানী,/ রোধকরবেসাধ্য কার?’‘বুকের ভেতরজনকআমার’কাব্যগ্রন্থটিকবিপ্রদীপমিত্ররচিত বঙ্গবন্ধুর উপরএকটি দীর্ঘ কবিতাযামহাকাব্য হওয়ার দাবিরাখে। কবিপ্রদীপমিত্রবলেন, তা থৈ তা থৈ থৈ; শোকেরমাঝে/শোকেরউথাল; মাছেরমাছ বোয়াল।/ভাঙা দাঁতেরভাঙা চোয়াল/মোশতাকতুইঘাতক জোয়াল।/জাবড়া-জঙ্গল কিস্তিমাতের হৈ চৈ/ভুট্টোবলদকিসিহ্জার/বইছে বেজায়চতুরহাল/হায়ওরা, বাবারহাতেহইছে/জব্দ ও নাকাল…/আমারবাবার এক থাপ্পড়ে/ভাঙছিল রে ভাইওদেরজব্বর চোয়াল…।’
পাকিস্তানেরপাঞ্জাবিকবিআহমেদ সালিমপাঞ্জাবিভাষায়‘বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোকএবং সোনারবাংলা’শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কবিতা লেখেন। সেই‘অপরাধে’পাকিস্তানেরশাসকগোষ্ঠীতাঁকে জেলেপাঠায়, ৯ মাস পর ’৭২ সালেরজানুয়ারিমাসে মুক্তি দেয়। লাহোরডিস্ট্রিষ্ট জেলেবসেতিনিরচনাকরেন‘সিরাজউদ্দৌলাহ ধোলা’শিরোনামেএকটিকবিতা। কবিতাটিউৎসর্গ করেন শেখমুজিবুররহমানেরনামে। এখানেতিনিসিরাজউদ্দৌল্লাহ ও শেখমুজিবুররহমানকে স্বাধীনতাররক্ষকহিসেবেতুলেধরেবলেন যে, স্বদেশিমীরজাফরদের (রাজাকারদের) সহযোগিতারকারণে রক্তস্নাত হলোবাংলাদেশ। ভারতেরউর্দুকবিকাইফিআজমী‘বাংলাদেশ’শিরোনামে ১৯৭১ সালেএকটিকবিতালিখেন, যেখানে শেখমুজিবেরছবি ভেসে ওঠে। এভাবে দেশে বিদেশে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনবাংলাদেশেররূপকার বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুররহমানকেনিয়েঅনেককবিতা লেখাহয়েছে।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখালেখিরসবচেয়ে বেশিভীতিপ্রদ দুঃসময় কেটেছে ‘৭৫-এর ১৫ আগস্টের নারকীয়হত্যাকা-ের পর। এ সময় ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটিও দেশের সর্বক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ছিল। তারপরও দেশেরকবি-সাহিত্যিকরাবসে থাকেননি। তাঁরা সব ভয়ভীতিউপেক্ষাকরেইলিখে গেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যারওপরবিভিন্নশিরোনামেপ্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, ছড়া ও কবিতা। হত্যারপরে বঙ্গবন্ধুর ওপরঅধ্যাপকআবুলফজলরচিতপ্রথমগল্প ‘মৃতেরআত্মহত্যা’কবিসিকান্দর আবুজাফরসম্পাদিত ‘মাসিকসমকাল’-এ প্রথমপ্রকাশিতহয়। এরপর এ মাসিকেইআবার ১৯৭৭ সালেপ্রকাশিতহয়নির্মলেন্দু গুণ ও খালেক বিন জয়েনউদ্দীনের পৃথক পৃথক ছড়া ও কবিতারবই।
নির্মলেন্দু গুণের কাছ থেকে আমরাজানতেপারি, আরবিশিক্ষক বঙ্গবন্ধুর বাল্যবন্ধু মৌলভী শেখআবদুলহালিমআরবিভাষায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়েকবিতারচনাকরেন। আরবি থেকে তিনিনিজেবাংলাকরেনএবংনির্মলেন্দু গুণ সেটাকাগজে লেখেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর মরদেহ কাফনেরকাপড়েমুড়িয়েসমাধিস্থ করার পর মনোবেদনা থেকে আরবিতেএকটিকবিতা লেখেন। বঙ্গবন্ধু শহীদহওয়ার পর এটিইপ্রথমকবিতা । (‘শহীদ বঙ্গবন্ধুর ওপররচিতপ্রথমআরবিকবিতা’, মাওলানাএম এ রহমান, দৈনিককালের কণ্ঠ, ১৭ জুন, ২০১১ )। ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার দলিল’-এরবরাতদিয়ে লেখককবিতাটি উদ্ধৃত করেছেনএভাবে‘হেমহান, যাঁর অস্থি-মজ্জা, চর্বি ও মাংস এই কবরে প্রোথিত।/ যাঁরআলোতেসারাহিন্দুস্থ’ান, বিশেষকরেবাংলাদেশ-আলোকিতহয়েছিল।/ আমি তোমারমধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ দেখেছিক্ষমা, দয়া ও দানশীলতা।/ নিশ্চয়ইতুমিবিশ্বেরউৎপীড়িতএবংনিপীড়িতদের পৃষ্ঠপোষকহিসেবেজন্মগ্রহণকরেছিলে।/এবং সেই হেতুঅত্যাচারীরা তোমাকেনিষ্ঠুরভাবেহত্যাকরেছে,/ আমিআমরাবাংলাদেশেররাষ্ট্রপতিরকাছেতাদের বিচারেরপ্রার্থনাজানাই,/ যারা তোমাকেবিনাবিচারেহত্যাকরেছে।’
এ প্রেক্ষিত থেকেই প্রদীপমিত্ররচিতবুকের ভেতরজনকআমারকাব্যে ৭৫ পরবর্তী রক্তশোক থেকে জ¦লে উঠাঅশ্রুআগুনফুটেউঠেছে। প্রদীপবলেন, ‘মালাগাঁথি, চোখেরজলেআমিমালাগাঁথি/আমারহাতেগাঁথাঅশ্রুমালা, এই শোকেরই/শব্দমালা যেন সদ্যোজাতমন্ত্রমালা; Ñ দেশ-বোধেরই’।
সেবাদিতেঅক্ষম যে পতœী, শুশ্রূষা দিতেপারেননা যে চিকিৎসক, সখ্য বন্ধুরঅসাধ্য যে,কবিতা সে চিকিৎসাবিদ্যা আরকবিহলেনচিকিৎসক। ফলেকবিহয়েওঠেন ক্রমশ-নিঃসঙ্গ, আর এই নিঃসঙ্গতা থেকেই উঠে আসেকবিতাভাবনা।এদিক থেকে কবিপ্রদীপসফল। তারকাব্য ভাবনাপ্রবল। ৭৫ এরনারকীয়তান্ডবের পর শোককে শক্তিকে পরিণতকরে ৭১ চেতনাপ্রতিষ্ঠারবিষয়উপজীব্য করেমহাকাব্য রচনার অসম্ভব কল্পনাকেহাতেরমুঠোরবাস্তবতায়পরিণতকরেনআলোচ্য কাব্যগ্রন্থে। এখানেকবিপ্রদীপমিত্রেরঅপরিমেয়প্রতিভারপ্রখরঝলকানিরপ্রমানপাওয়াযায়।প্রসঙ্গত উলেখকরা যেতেপারেমহাকবিমাইকেলমধুসূধন দত্ত যখন মেঘনাদবধকাব্য লেখেনতখনবাংলাভাষা অত বিকশিত ও শক্তিশালী ছিলনা । এটিছিল ক্ষুদ্র একটিজনগোষ্ঠীরআঞ্চলিকভাষা। মহত্তমভাবপ্রকাশেরজন্য বাংলাপর্যাপ্তএবংপরিস্রুতএবংঅদরণীয়ছিলনা। এটিতখনসমাজেরচাষাভূষামানুষেরঅবহেলিতভাষা । উঁচুমহলেএর কোনঠাইছিলনা। ওই সময়বাংলাভাষায় মেঘনাদবধকাব্য লেখাছিল দুঃসাধ্যেরইনামান্তর। এরবাস্তবাযনছিল অসম্ভব কল্পনা। কিন্তুপ্রবল জেদে, স্বভাবজাত একগুয়েমিতেতিনি সেইঅসাধ্য সাধনকরেছিলেন।
মহাকবিকালিদাসের মেঘদূতমকাব্যের মেঘকবির চেতনারউৎসহলেওবাঙলাভাষার লোকায়তসুর স্বর ছন্দেরপ্রবাহমানধারাইগ্রন্থটিরপ্রাণ। এ প্রাণ থেকে মেঘেরআকারে মেঘহয়েঝরেছেনির্বাসিতজনক-দুহিতারঅশ্রু, আর্তনাদ আর অঙ্গীকার। উনিশপঁচাত্তরেরপনেরোআগস্টের ভয়ঙ্কর বার্তাবহ পঙক্তি : ঐ গলাটাভরাটছিলো/ কণ্ঠমাখ্ াদরদ ছিল/ বুকের ভেতর রৌদ্র ছিল/হাতের ভেতরএকটাহাত;/ হায়, ক্যামনে দেখিশ্রাবণআকাশ…!’ এভাবেইশুরু। কবিতারচরণেচরণেগতি পেয়েছেজনকহারানোর শোক-অশ্রুএবং দেশবোধ অর্জনের প্রতিজ্ঞা। একই সঙ্গে জনকেরনির্যাতিত-নিপীড়িতমানুষেরঅধিকারপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনেরচিত্র যেমনআছে তেমনইআছে বঙ্গমাতার অপার ¯েœহ-বাৎসল্যেরচিত্রগাঁথা।কবিরভাষায় : উদার চোখেরম্যান্ডেলা, মাও সেতুঙ/ এই তোবাবা, বুকফুলিয়েঊর্ধ্ববাহু/ সাতইমার্চেওঠিকওেওঠা, অবিশ^াস্য;/এক আবিনাশী, রৌদ্র দুপুর! আহা!/তাঁররূপোচ্ছটাতুলতে কত ক্যামেরায়/ পড়ছিলহিড়িক: লেখে হেরালড, টাইমম্যাগাজিন/এ যে গ্রেট বেঞ্জামিনকিংবা লেনিন…।/ যেনআগেরকালেরসিংহরথ/ছুটিয়েচলাদিব্যদেহের/ জ্যোর্তিমালা, জ্যোর্তিমালা।’

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

http://jugapath.com