» বছরে ফসলোত্তর খাদ্যশস্য নষ্ট হচ্ছে ৭৭ লক্ষ টন

প্রকাশিত: ১৬. মে. ২০১৮ | বুধবার

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ’-এর অর্থনীতির সাথে কৃষির রয়েছে গুরুত্বপূর্ন সম্পর্ক এবং কৃষিই অর্থনীতির গতির এক বিশেষ নিয়ামক হিসাবে কাজ করে থাকে। কেবল খাদ্য নিরাপত্তাই নয়, ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্য অধিকার ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে উৎপাদিত ফসলের প্রাপ্তি প্রধান মাধ্যম। দেশে খাদ্য উৎপাদনে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে এবং দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তাসহ সরকারের বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। তথাপি ফসলত্তোর ক্ষতি এবং খাদ্যের অপচয় খাদ্য অধিকার ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এ প্রেক্ষাপটে ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ এর উদ্যোগে ১৬ মে, ২০১৮ ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ক্রিশ্চিয়ান-এইডের সহায়তায় খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ আয়োজিত ‘খাদ্যের অপচয় রোধে রাষ্ট্রের ভুমিকা ও খাদ্য অধিকার’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেমিনারে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক, হরট্রেক্স ফাউন্ডেশন-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৃষিবিদ মো: মনজুরুল হান্নান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনষ্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম। খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’-এর ভাইস-চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদে’-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম-এর সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক সানোয়ার সাইদ শাহীন। সেমিনার সঞ্চালনা এবং স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক এবং ওয়েভ ফাউন্ডেশন-এর নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী।
কৃষিবিদ মো: মনজুরুল হান্নান বলেন, উৎপাদন ক্ষেত্রে অপচয়ের পাশাপাশি খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে অপচয় রোধ করতে পারলে আমরা ৫% খাদ্য অপচয় রোধ করতে পারব। অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলেন, খাদ্য অপচয় রোধ করতে পারলে আমরা অধিক সংখ্যক লোকের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব পাশাপাশি পুষ্টির যোগান দিতেও সক্ষম হব। সভাপতির বক্তব্যে খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, খাদ্যের অপচয় রোধে প্রয়োজন রাষ্ট্রের উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন। মহসিন আলী বলেন, দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু ব্যবস্থাপনা, খাদ্যশস্যের সহজলভ্যতা এবং নীতি ও কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রয়ে গেছে অনেক সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে গড়ে প্রতি বছর নষ্ট হওয়া শস্যের বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় ৩১ শতাংশ। খাদ্যশস্যের এ ধরনের অপচয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যেমন হুমকি, তেমনি খাদ্য অধিকারকেও বঞ্চিত করছে। সার্বিকভাবে পুষ্টি নিরাপত্তাকে করছে বাধাগ্রস্থ। আর দেশের অর্থ ও সম্পদের অপচয়ও হচ্ছে। এজন্য প্রয়োজন খাদ্য অধিকার আইন প্রনয়ণ ও আইন-এর যথাযথ বাস্তবায়ন।
প্রবন্ধ উপস্থাপনে বলা হয়, বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নয়নে কৃষি নানা দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ খাত। খাদ্য জোগানের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদনের কাঁচামালের উৎস ছাড়াও এর সঙ্গে জড়িত দেশের সার্বিক উন্নয়নের অনুষঙ্গ। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টন শস্য নষ্ট হয়েছে, যা মোট উৎপাদিত শস্যের প্রায় ১৪ শতাংশ। শস্য নষ্ট-এর প্রধান খাত হল, ফার্ম পর্যায়: ব্রেকিং, স্কেটারিং, ইকসেক্ট ইনফেকশন, প্রযুক্তির অভাব, শুকানোর সক্ষমতার অভাব এবং বিপণন পর্যায়ে: সীমিত গুদামজাতকরন, দূর্বল পরিবহনজাতকরন এবং প্যাকেজিং এর অভাবকে ফসলোত্তর ক্ষতির কারন হিসাবে উল্লেখ করা হয়। যার প্রক্রিয়া হিসাবে উৎপাদন-হারভেস্ট লস- থ্রেসিং লস- ড্রাইং লস- প্রোসেসিং লস- গ্রেডিং এ্যান্ড ট্রিমিং লস- ট্রান্সপোর্টেশন লস- স্টোরেজ লস- ডিসট্রিবিউশন লস- কনসামশন লস- চুড়ান্ত ভোগ উল্লেখযোগ্য। চাল: কৃষি পণ্যে ক্ষতি হিসাবে প্রতি বছর গড়ে উৎপাদিত সাড়ে তিন কোটি টন চালের ১২-১৩ শতাংশই নষ্ট হচ্ছে। যার পরিমান প্রায় ৪৫ লাখ টন এবং গড়ে ৪০ টাকা কেজি হিসেবে এর মূল্য প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। ফল: দেশে প্রায় ৭০ প্রজাতির ফল উৎপাদন হচ্ছে এবং গড়ে এর ১৭ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে। গত অর্থ বছরে ৪৮ লাখ ১০ হাজার টন ফল উৎপাদন হয়েছে এবং নষ্ট হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ১৮ হাজার টন এবং গড় দাম ১০০ টাকা কেজি দরে বাজার মূল্য প্রায় ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। পেয়াঁজ ও ভুট্টা: ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে সাড়ে ২৪ লাখ টন ভূট্টা উৎপাদিত হয়েছে এবং এর প্রায় ৪ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে যার পরিমান প্রায় ৯৮ হাজার টন। ২০ টাকা প্রতি কেজির বাজার মূল্য হলেও ক্ষতির পরিমান প্রায় ১৯৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে এই সময়ে প্রায় ১৭ লাখ ৩৫ হাজার টন পেয়াঁজ উৎপাদন হয়েছে। এ পন্যটির ৩ শতাংশ হারে পোস্ট হারভেষ্ট লস হচ্ছে, যার পরিমান প্রায় ৫২ হাজার টন এবং ৫০ টাকা কেজি দরে বাজার মূল্য দাড়ায় প্রায় ২৬০ কোটি টাকা। সবজি: দেশে প্রায় ১৩০ প্রজাতির সবজি এবং গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৪৯ লাখ টন সবজি উৎপাদন হচ্ছে। এসব সবজির গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে। যা পরিমানে প্রায় ১০ লাখ টন এবং ৩০ টাকা কেজি হিসেবে মূল্য প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। আলু: গত অর্থ বছরে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। পর্যাপ্ত গুদাম এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নত না থাকায় প্রায় ১৫ লাখ টন আলু নষ্ট হয়েছে। প্রতি কেজি ১০ টাকা হিসেবে ধরলে বাজার মূল্য দাড়ায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
ফসলোত্তর ক্ষতির প্রভাব হিসাবে খাদ্যের অপচয়; অর্থনৈতিক ক্ষতি; দাম বৃদ্ধি পায়; খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় হুমকি; দারিদ্রতা বৃদ্ধি ও সম্পদের অপূর্ণ ব্যবহার; দরিদ্রপ্রবণ এলাকার মানুষ বেশি ক্ষতির শিকার বলে প্রবন্ধে বলা হয়। খাদ্যের অপচয় রোধ এবং খাদ্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’-এর সুনির্দিষ্ট সুপারিশসমূহ হল ১. অপচয় রোধে সচেতনতা বাড়াতে সম্প্রসারণ কর্মীদের দক্ষতা এবং পর্যাপ্ত শস্য গুদাম নির্মাণ; ২. চালের অপচয় রোধে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মতো প্রথাগত এঙ্গেলবার্গ পদ্ধতিতে উৎপাদন নিষিদ্ধ করা; ৩. আদ্রতা পরিমাপের জন্য মেশিন সরবরাহ নিশ্চিত করা; ৪. গণমাধ্যমে অপচয় রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর নতুন প্রযুক্তি সঠিক সময়ে সংশ্লিষ্টদের (সম্প্রসারণ কর্মী, বেসরকারী উদ্যোক্তা, বিপণন কর্মীর) কাছে পৌঁছানো; এবং ৫. অবিলম্বে সরকারী উদ্যোগে খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করতে হবে। যেখানে খাদ্যকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতির পাশাপাশি ফসলোত্তর ক্ষতি কমিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ থাকতে হবে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৯৩ বার

Share Button

Calendar

September 2018
S M T W T F S
« Aug    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30